ড. মুহম্মদ ইব্রাহিম ও ডেন্টাল বিভাগ প্রসঙ্গ

শনিবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯

১৯৮৬ সালের মার্চ মাসের একটি সকালে। আমি তখন তদানীন্তন ইনস্টিটিউট আব পোস্ট গ্র্যাজুয়েট মেডিসিন এন্ড রিসার্চ (ওচএগ্জ) বা পিজি হাসপাতালে বর্তমান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ^বিদ্যালয়ের ডেন্টাল বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। তখনকার সময়ের ডাইরেক্টর পিজি হাসপাতাল জাতীয় অধ্যাপক নুরুল ইসলাম। একদিন সকালে ডেন্টাল বিভাগে ফোন আসল যে বারডেম থেকে জাতীয় অধ্যাপক ডা. মুহম্মদ ইব্রাহিম দাঁত পরীক্ষা করতে আসছেন। সেদিন আমাদের বিভাগীয় প্রধান এবং অধ্যাপক আবু হায়দার সাজিদুর রহমান ছুটিতে ছিলেন। সুতরাং দায়িত্ব পড়ল আমার। যথারীতি ডা. মুহম্মদ ইব্রাহিম স্যার আসলেন বিভাগে। আমি সালাম দিয়ে আমার পরিচয় দিলাম। তিনি আমাকে বললেন ‘আমার দাঁতের একটি ধারালো অংশের জন্য জিহ্বাতে ঘা হয়েছে, একটু দেখে দাও তো আর কোনো সমস্যা আছে কিনা।’ আমি স্যারকে ডেন্টাল চেয়ারে বসিয়ে দাঁত ও মুখ পরীক্ষা করে দেখলাম, সত্যিই তার একটি দাঁত ভেঙে ধারালো হয়ে গেছে সেইসঙ্গে মাড়িতেও প্লাক জমা হয়ে প্রদাহ হয়েছে। এমতাবস্থায় তার দাঁতের ধারালো অংশ তাৎক্ষণিকভাবে ঘষে মসৃণ করে দিলাম সেইসঙ্গে ডেন্টাল স্কেলিং করে দিলাম, দাঁতগুলো পরিষ্কার হয়ে গেল। সঙ্গে একটি প্রেসক্রিপশনও করলাম। তিনি খুব খুশি হয়ে আমার নাম পরিচয় জেনে গেলেন। পিজি থেকে বারডেমে পৌঁছেই তিনি তদানীন্তন স্বাস্থ্যমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. মতিন স্যারকে ফোন করলেন এবং আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। অধ্যাপক ডা. মতিন আমার সঙ্গীত জীবন ও পেশার প্রতি নিষ্ঠা ও কর্তব্যজ্ঞান সম্পর্কে অনেক কিছু জানালেন, ইব্রাহিম স্যার তখন স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে বললেন ‘এক কাজ করো ডা. অরূপরতনকে বারডেমে দিয়ে দাও’। অধ্যাপক ডা. মতিন মন্ত্রী তখন বললেন স্যার অরূপ তো সরকারি চাকরিতে পিজিতে আছে, ওকে কীভাবে দিবো? ডা. ইব্রাহিম স্যার সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলেন ‘ডেপুটেশনে দাও’। এর দুদিন পর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে একটি অর্ডার এলো এ রকমভাবে যে, আমি সপ্তাহে দুদিন পিজিতে চাকরিরত অবস্থাতেই বারডেমে এসে ডায়াবেটিক রোগীদের মুখ ও দাঁত পরীক্ষা করে চিকিৎসা দেব।

আমি অর্ডারটি নিয়ে পিজির পরিচালক অধ্যাপক নুরুল ইসলামের স্যারের অনুমতি নিয়ে বারডেম এসে ইব্রাহিম স্যারের সঙ্গে দেখা করে স্যারকে সালাম দিয়ে আমার কৃতজ্ঞতার কথা তাকে জানালাম এবং আমি বললাম, স্যার আমি আজ ধন্য, আপনি আমার জন্য স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে সুপারিশ করে বারডেম ডায়াবিটিক রোগীদের কাজ করার সুযোগ করে দিয়েছেন।

পরের দিন আমার চেম্বার থেকে একটি ডেন্টাল চেয়ার নিয়ে এসে বারডেমের নিচতলায় এখন যেখানে ী-ৎধু করা হয় সেখানের একটি ছোট রুমে ডেন্টাল চেয়ার বসালাম। সঙ্গে চেম্বার থেকে কিছু যন্ত্রপাতিও নিয়ে এলাম। এভাবেই চলল আমার প্রতি সপ্তাহে দুই দিন বারডেম এ ডায়াবেটিক রোগীদের মুখ ও দাঁতের চিকিৎসাসেবা দেয়ার কাজ। পরবর্তী সময় ইব্রাহিম স্যার বাংলাদেশ-জাপান সহযোগিতা চুক্তির মাধ্যমে যে সিটি স্কেন মেশিনটি বাংলাদেশে এনেছিলেন তার সঙ্গে একটি ডেন্টাল চেয়ারও জাপান থেকে আমাকে এনে দিয়েছিলেন কাজ করার জন্য। ধীরে ধীরে আমার রোগীর সংখ্যাও বাড়তে লাগলো এর ঠিক এক বছর পর তিনি আবার স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে সরাসরি ফোন করে ১৯৮৭ সালে আমাকে পূর্ণাঙ্গভাবে পিজি হাসপাতাল থেকে ডেপুটেশন এ নিয়ে এলেন এবং ১৯৮৭ সাল থেকে আমি বারডেম হাসপাতালে ফুলটাইম কাজ শুরু করি। সবচেয়ে বড় কথা হলো ইব্রাহিম স্যারের সান্নিধ্যে আসার পর থেকে আমার পেশাগত জীবনেরও অনেক পরিবর্তন শুরু হয়। আমি এখানে কাজ করার সঙ্গে সঙ্গে ইব্রাহিম স্যারের অনুপ্রেরণায় গবেষণা কাজও শুরু করি। পরবর্তী সময় আমার ডায়াবেটিস ও মুখের রোগের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে প্রায় ৩৮টি গবেষণা প্রবন্ধ বিশে^র ২৪টি দেশে উপস্থাপন করার সুযোগ পাই। বিশেষত প্রায় সব বিশ^ ডায়াবেটিক সম্মেলন ও আন্তর্জাতিক ডেন্টাল সম্মেলনে ইতোমধ্যে আমার প্রায় ২১টি প্রবন্ধ ছাপা হয়েছে এবং পরবর্তী সময় ২০০০ সালে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় থেকে ডায়াবেটিস ও মাড়ির রোগের সঙ্গে এন্টিঅক্সিডেন্ট সম্পর্ক নিয়ে আমার গবেষণার জন্য পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করি। ডায়াবেটিস ও মুখের রোগ নিয়ে আমার অসংখ্য লেখা বিভিন্ন পত্রিকায় নিয়মিত ছাপা হয়েছে। ইতোমধ্যে ১৪টি বই প্রকাশ পেয়েছে। রোগীদের যে ডায়াবেটিক গাইড বই দেয়া হয়, তাতেও আমি মুখ ও দাঁতের যতœ সম্পর্কে একটি অধ্যায় রচনা করে দিয়েছি।

আজ আমি গর্বের সঙ্গে বলতে পারি এখন আমাদের ডেন্টাল বিভাগ আগের চাইতে অনেক বড় হয়েছে। এখানে প্রায় প্রতিটি ডেন্টাল বিষয়ের বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন বিভাগে কাজ করছে। সেই সঙ্গে ইব্রাহিম মেডিকেল কলেজের সঙ্গে খোলা হয়েছে ইব্রাহিম ডেন্টাল ইউনিট। যেখানেও প্রতি বছর প্রায় ২৫ জন ছাত্রছাত্রী ভর্তি হচ্ছে এবং এ বছরই একটি নতুন ডেন্টাল সার্জন ব্যাচ বেরিয়ে আসবে এই কলেজ থেকে। সুতরাং বারডেম হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগের যেমন- বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা চিকিৎসা দিচ্ছেন তেমনি ডেন্টাল বিভাগের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ও বিশেষজ্ঞরা চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন এবং কলেজ থেকে প্রতি বছর নতুন ডেন্টিস্টরা বের হয়ে যাবেন। তার এই দূরদৃষ্টি না থাকলে আজ অগণিত ডায়াবেটিক রোগীরা মুখের ও দাঁতের চিকিৎসাসেবা থেকে শুধু যে বঞ্চিত থাকতো তা নয়, তারা অনেক জটিলতায়ও আক্রান্ত হতো। এর সবই সম্ভব হয়েছে ডা. মো. ইব্রাহিমের মতো একজন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মহাপুরুষ এর মহান চিন্তাধারার জন্য। গতকাল ছিল স্যারের মৃত্যুবার্ষিকী। তাঁকে স্মরণ করছি শ্রদ্ধাভরে।

অধ্যাপক ড. অরূপরতন চৌধুরী
সাম্মানিক সিনিয়র কনসালট্যান্ট, ডেন্টাল বিভাগ
বারডেম জেনারেল হাসপাতাল।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj