আমৃত্যু এক অন্যরকম মুক্তিযোদ্ধা

শুক্রবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯

আনোয়ারা আলম

চট্টগ্রাম শহরের রাজপথে, অলিতে-গলিতে আর কখনো চোখে পড়ে না এক অনন্যসাধারণ কিন্তু ব্যতিক্রমী দৃশ্য। এক মধ্যবয়সী নারীর বই হাতে পথচলা। সঙ্গী এক তরুণ, কাঁধে কাপড়ের থলে আর একটা ছাতা। কী রোদ, কী বৃষ্টি- নিরন্তর তাদের পথচলা।

একজন মহান ব্যক্তিত্ব চিত্তরঞ্জন সাহার হাত ধরে বাংলা একাডেমির মহান একুশের বইমেলায় বইয়ের উৎসব যেমন, তেমনি একজন রমা চৌধুরীর লেখা বই বিক্রির লক্ষ্য অনাথ আশ্রম পরিচালনা। নব্বইয়ের দশক থেকে একুশ শতকেও। কেউ ফিরিয়ে দিচ্ছেন! আক্ষেপ নেই। কষ্টকে একপাশে রেখে আবারো আরেক দোরে।

আজীবন সংগ্রামী ও সৃজনশীল মানুষটির কাছে জীবন ও সাধনা একটি বিন্দুতে। সাধারণ পোশাক, অকৃত্রিম সারল্য, কথার পরিশীলন ও নিজস্বতা। এর সঙ্গে বিনয়। বই বিপণনে সব কৃপণতা একপাশে রেখে দিতেন অন্তরের ঐশ্বর্য দিয়ে।

আমরা অনেকেই অন্তরের এক দৈন্যের সংকটে- যত না যোগ্যতা, তার চাইতে বেশি প্রত্যাশা। অনায়াসে না পেলে হতাশা-আক্ষেপ। চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে রমাদি এসব চাওয়া-পাওয়ার ঊর্ধ্বে ছিলেন। লিখেছেন নিমগ্ন চৈতন্যে। ছোট্ট একটা কক্ষে যাপিত জীবনের ক্ষুদ্রতম আয়োজনে খাটের এক পাশে লেখালেখি- একের পর এক সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায়। লক্ষ্য একটাই- আশ্রমের ব্যয়ভার বহন।

তাঁর সঙ্গ, সহজ-সরল কথাবার্তা এক ব্যতিক্রমী চিত্র, যার স্পর্শ এখনো আমার অনুভূতিতে- যা সহজে ভোলার নয়। বস্তুত, একজন লেখকের জীবন কেমন হবে তা কি কেউ বলতে পারে? বহুজনের যাপিত জীবনের নানা অভিজ্ঞতায় লেখক চান তাঁর নিজের একটা জীবন গড়ে তুলতে। যে কারণে নির্দিষ্ট ছকে তাঁকে মাপা কঠিন।

রমাদি আত্মমগ্ন, নিভৃতচারী এক লেখক- আমৃত্যু। এরই মাঝে নিঃসঙ্গ সন্তের মতো সাধনায় নিজেকে মগ্ন রেখেছেন আর সঙ্গে ছিল খোকন- তাঁর বিবেকানন্দ হয়ে- আমৃত্যু তাঁর সুখে-দুঃখে, সংকটে-বিপর্যয়ে। কষ্টের মোড়কে আবদ্ধ রমাদির পুরো জীবন। ব্যক্তিজীবনে বঞ্চনা ও ব্যর্থতা, সঙ্গে প্রিয় সন্তানের অকালে বিদায়- যদিও কষ্টের নীল যন্ত্রণা- যাপিত জীবনের অভাব অভিযোগ দুঃখ বেদনার মধ্যে থেকেই তিনি সৃজনশীল ভুবনকে নানা রঙে রাঙিয়েছেন। সাংসারিক, জাগতিক ভোগবিলাস, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ও স্বীকৃতি প্রতিষ্ঠার ইঁদুরদৌড়ে কখনো শামিল হননি। অনেক সময় আপনজনের সঙ্গেও সম্পর্ক ভেঙে জীবনকে নিজের মতো সাজিয়েছেন- যাকে এক উদাসী বাউলের সঙ্গে তুলনা করা যায়।

বাঁধাধরা জীবনযাপনের মধ্যে মন বসাতে পারেননি- তীব্র দহন থেকে উত্তরণে শিল্পকেই আরাধ্য জেনেছেন। তবে সাহস ছিল এবং একই সঙ্গে প্রত্যয়। নিজের ওপর এমন ভরসা অর্জনের যোগ্যতা সবার থাকে না। রমাদির ছিল। লেখনীশক্তি দিয়ে সব সীমাবদ্ধতাকে উতরে উঠেছিলেন। জীবন তাঁকে বারে বারে প্রতারিত করেছে- অল্প বয়স থেকে শিক্ষকতা পেশায়, জ্ঞান বিতরণে; একটা সময় সব ছেড়ে নিভৃতে লেখালেখিতে। প্রথা ভেঙে পুত্র টুনুকে সমাধিস্থ করা- এটিও নীরব বিপ্লব। সমাজের ভ্রæকুটিকে উপেক্ষা করতেও দ্বিধা করেননি। আবার পরম প্রিয়জনের আঘাতে নিশ্চিত মৃত্যুকে পরাভূত করেন জীবনের উৎসবে। এটি সম্ভব হয়েছে প্রচণ্ড মানসিক শক্তির কারণে।

জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পান। আমি বলি বিধাতার দান। মিডিয়ায় তখন দিদিকে নিয়ে তোলপাড়। ইচ্ছে করলে পারতেন তিনি বিত্তবৈভবের সারথি হতে। কিন্তু এখানেও ব্যতিক্রম তিনি। সবকিছুর মোহকে তুচ্ছ করে একাকী ধ্যানমগ্ন। নিত্যকার লেনদেন তাঁর মেধা ও মননকে স্পর্শ করেনি। বরং নষ্ট ও বিষাক্ত এ সমাজের বাইরে তিনি ছিলেন মুক্তচিন্তা, মুক্তমনের একজন মানবব্রতী লেখক।

লেখক হিসেবে তাঁর সাহিত্যিকমূল্যও কম নয়। বহু রচনায় অনুভূতির আন্তরিকতা, প্রকাশভঙ্গির সাবলীলতা প্রশংসনীয়। তাঁর প্রতিভার সর্বতোমুখিতার বিচিত্র বর্ণচাতুর্য এই সাধনাকে অনুরঞ্জিত করেছে। রমাদির তথা একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার জীবনকাহিনী ও অপরিমেয় ত্যাগের কথা নানা কারণে জাতির জানা প্রয়োজন। যদিও বেদনার সঙ্গে বলতে হয়- আমরা মনে রাখি না। পুরুষশাসিত এ সমাজে নারী হলে তো এই কথা আরো বিশেষভাবে প্রযোজ্য। রমা চৌধুরীর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁকে স্মরণ করি বিনম্র শ্রদ্ধায়।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj