দগ্ধ হৃদয়ের প্রতিচ্ছবি

শুক্রবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯

রাশেদ রউফ

সম্ভবত বুদ্ধদেব বসুই বলেছিলেন, তিনি জীবনযাপন করেন না, সাহিত্যযাপন করেন। রমা চৌধুরীরও উচ্চাশা ছিল প্রায় সেরকমই। তাঁর চলাফেরা, জীবনাচরণ, স্বপ্ন-আকাক্সক্ষা এবং কথাবার্তার অন্তরঙ্গ আলোকে আমাদের বুঝে নেয়া কষ্ট হয়নি যে, তিনি ছিলেন সাহিত্যের জন্য নিবেদিতপ্রাণ এক অনন্য মানুষ। বই লিখেছেন, প্রকাশ করেছেন এবং তা প্রচার-বণ্টন করে অতিবাহিত করেছেন তাঁর পুরোটা সময়। তাঁর জীবন-চলায় কোনো ছেদ ছিল না, নিরন্তর ছুটেছিলেন সামনে। ঘুরে বেড়িয়েছেন সমাজের অলিতে-গলিতে। কেউ কী ভাবলো, তার বিন্দুমাত্র ভ্রæক্ষেপ ছিল না তাঁর। তিনি একাকী। নৈঃসঙ্গের হাত ধরে তাঁর এগিয়ে চলা। বাইরের বিরূপ প্রতিবেশ ও রূঢ় প্রতিবন্ধকতা কখনো তাঁর গতিরোধক হিসেবে কাজ করেনি। বই তাঁর সব সময়ের বাহন। এই বাহন আবার হাতিয়ার হিসেবেও কাজ করেছে। সে বাধা সরিয়েছে, সাহস বাড়িয়েছে, আলোর বানে আঁধার তাড়িয়েছে। সাহিত্য ও জীবনের মধ্যে এমন সেতুবন্ধন ঘটেছে, তার দ্ব›দ্বশীর্ণ জটিল-কঠোর জগৎকে তাই আত্মস্থ করতে পেরেছেন সহজে। জীবনের দাবদাহে তিনি দগ্ধ হয়েছেন, হয়েছেন দুখী ও ব্যথিত। তবে সাথে সাথে গড়ে উঠেছিল একটা প্রতিরোধী মন। তাই হয়েছেন প্রতিবাদী ও বিক্ষুব্ধ। নানা যন্ত্রণা, বঞ্চনা, দুঃখ- বেদনার তীক্ষè তরবারিকে বুকে ধারণ করে হয়েছেন পরিণত, পুড়ে পুড়ে হয়েছেন প্রাজ্ঞ। আমি তাঁর বুকের উষ্ণতার খবর রেখেছি এবং দেখেছি অন্তরঙ্গতার আলো।

দুই.

বড় মনের মানুষেরা বড় মাপের মানুষও। তাঁরা নিজেরা বড় মাপের বলে অন্যকে ‘বড়’ মনে করেন। অন্যকে ‘বড়’ করে তুলে ধরেন। অন্যের কর্মকে স্বীকৃতি দিতে কিংবা মূল্যায়নে দ্বিধান্বিত হন না। রমা চৌধুরীও ছিলেন ঠিক সেরকম একজন বড় মনের মানুষ। তিনি অন্যের সফলতায় আনন্দিত হয়েছেন, ব্যথায় হয়েছেন ব্যথিত। আমার ‘নির্বাচিত কিশোর কবিতা’ সংকলনটি প্রকাশের পর তিনি তার ওপর যে আলোচনাটি লিখেছেন, ঠিক সেরকম আলোচনা এখনো আর কেউ লিখতে পারেননি। কিংবা লিখেননি। ঐ আলোচনায় তিনি আমার লেখার যে মূল্যায়ন করেছেন, বড় মনের মানুষ না হলে তা সম্ভব নয়। আজকাল হিংসা-দ্বেষ-ঈর্ষাই পরিলক্ষিত হয় বেশি। সহজে কেউ কারো প্রশংসা করে না, স্বীকৃতি দেয় না কাজের। এ ক্ষেত্রে রমা চৌধুরীকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করা যায়। ভণ্ড-মুখোশধারী-স্ববিরোধী অনেক মুখের ভিড়ে তিনি হারিয়ে যাননি। তাঁর মুখের ঔজ্জ্বল্য ছড়িয়ে পড়েছে সবখানে। তাঁর প্রতিবাদী মন, দগ্ধ হৃদয় ও প্রাজ্ঞ অভিব্যক্তি আমাদের উৎসাহিত করে সামনে চলার। আমরা শত কষ্টেও স্থির থাকি, সাহসে বুক বাঁধি। তাঁর সুরের আগুনে উষ্ণতা পাই। শক্তি পাই। সেই রমা চৌধুরীর মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁকে জানাই শ্রদ্ধা।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj