পথে পথে দিলাম ছড়াইয়া

শুক্রবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯

আলাউদ্দিন খোকন

দশতলা সিঁড়ি বেয়ে দু’জনে উঠলাম। একটা বই বিক্রির আশায়। সাত-আটটা অফিস ঘুরলাম। কেউ বই দেখলো, কেউ দেখতে চাইলো না। আবার কেউ পিওন বেয়ারা দিয়ে তাড়িয়ে দিলো। কেউ বই দেখার নাম করে ঘণ্টা দু’ঘণ্টা বকবক করে সময় নষ্ট করলো। শেষে ব্যর্থ মনোরথ হয়ে নেমে এলাম আবার দু’জনে। দিদির লিফট ভীতি ছিল, তাই লিফট সাধারণত এড়িয়ে চলতাম। দিদির রোগ-জীর্ণ, ক্লিষ্ট শরীর নিয়ে বেয়ে বেয়ে উঠতেন এইসব পাঠকের কাছে। উদ্দেশ্য একটা- বই বিক্রি, সাথে একটা আবেদন ‘আমার মুক্তিযুদ্ধে শহীদ দুই সন্তানের নামে একটি অনাথ আশ্রম গড়তে চাই এই বই বিক্রির টাকায়’।

এভাবেই কত কত বছর চলে গেল আমাদের দু’জনের। রোদ-বৃষ্টি-ঝড়-জল, শীত-গ্রীষ্মে, সুখে-অসুখে আমরা পথ চলেছি। পথে পথে আমাদের জীবন, আমাদের সময়ের ব্যাপ্তি ফুরিয়েছে। আমরা দিনে অফিস পাড়া, রাতে ডাক্তার পাড়া এভাবে ছুটেছি বই নিয়ে। পথে কোনো সস্তা হোটেলে খেয়েছি যে দিন কিছু বিক্রি হয়েছে আর না হলে উপোস। হয়তো চারটা-পাঁচটার দিকে রুমে এসে স্টোভে চাল ডাল আলু যা ঘরে থাকতো রান্না করে খেয়ে নিতাম।

দিদির পোষা বিড়ালগুলোর জন্য একটু দুধ বা একপিস মাছ দোকান থেকে এনে মুড়ি মাখিয়ে দিতাম। চট্টগ্রাম শহরে চেরাগি পাহাড়ের লুসাই ভবনের চারতলায় দশ ফিট বাই বারো ফিটের একটি রুম ভাড়া নিয়ে আমরা কাটিয়েছি প্রায় আঠারো বছর এভাবে।

আমরা সকাল নয়টা-দশটায় পথে নামতাম বই নিয়ে। সারা শহর ঘুরতাম লোকাল টেম্পো অথবা বাসে করে, তবে বেশি সময়ই হাঁটতাম। দিদি হাঁটতেই পছন্দ করতেন। মাইলের পর মাইল আমরা হেঁটেছি বই বিক্রির আশায়। দিদি সন্তান হারানো যন্ত্রণায় খালি পায়ে, আর আমি পাশপাশে বই কাঁধে। অনেকবার চেষ্টা করেছি দিদির মতো খালি পা হতে, কিন্তু পারিনি। আমি যে দিদির মতো মহাত্মা নই!

অধিকাংশ ব্যাংকের গেটে দিদিকে আটকে দিতো খালি পা, কাঁধে ঝোলা দেখে। দারোয়ানগুলোই আটকাতো, আর আমার সাথে তাদের ঝগড়া লেগে যেতো! আমি বলতাম, ব্যাগে কী বোমা নিয়ে এসেছি? দেখো ব্যাগে বই আছে। তাতেও কোনো লাভ হতো না। অর্ধ শিক্ষিত সিকিউরিটির লোকগুলো বলতো, এখানে এসব চলবে না, বড় সাহেবের বারণ আছে। ফিরে চলেছি আবার অন্য কোনো অফিসের দিকে। ভালো মানুষ যে ছিল না তা নয়। অনেক অনেক ভালো মানুষ, ভালো পাঠকের দেখাও পেয়েছি আমরা। না হলে এই দীর্ঘ প্রায় চব্বিশ বছর শুধু বই বিক্রি দিয়ে কীভাবে চলেছি আমরা?

এভাবেই শুরু করছি আমার পথে পথের কাব্য।

চলবে অনেকদূর। দিদি একটা বই লিখতে চেয়েছিলেন ‘মানুষ খুঁজে বেড়াই’। বইটি দিদি লিখে যেতে পারেননি। তবে যেভাবে লিখতে চেয়েছিলেন আমি জানতাম, তারই অংশ হিসেবে আমি লিখে রাখছি পথে পথে দিলাম ছড়াইয়া।

পৃথিবীতে রমা চৌধুরী একজনই জন্মেছিলেন। একজনই বীরমাতা শহীদ সন্তানের স্মরণে খালি পায়ে ঝোলা কাঁধে পথে পথে ঘুরেছেন। এ ইতিহাসে আমি সঙ্গী হয়ে সাক্ষী হয়ে রইলাম। আমিও পথে পথে ছড়িয়া দিলাম আমার ভালোবাসা।

দুই.

‘গিয়েছিলাম রমণীমোহন হাই,

হাঁটতে হাঁটতে- ধায় পরান যায়।

পথে একটা শিব-মন্দির পাই,

মন্দির শুধু আছে সেথায়,

শিব সেখানে নাই।’

আমি তখন দিদির সাথে তাঁর পৈতৃক ভিটে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত পোপাদিয়ায় থাকি। ঘর আছে দরজা নাই! চালা আছে বেড়া নাই। খাট নাই, চৌকি নাই, বিছানা নাই, বালিশ নাই। খড়ের বালিশ খড়ের বিছানা হোগলা বিছিয়ে থাকি। মুক্তিযুদ্ধে পোড়ামাটির ঘর। পোড়া দরজা, পোড়া জানালা, পোড়া মাচান, পোড়া আড়া। এখনো আছে সেই স্মৃতির সার। সেই ঘরে মাটিতে পনের-ষোলটা বিড়াল, কিছু হাঁস, একটা ১৭ বছর বয়সী বৃষ গরু। এসব নিয়ে থাকি। সকালে উঠে গরুর খাবার দেই, মাঠে বেঁধে আসি। বিড়ালগুলোকে খাইয়ে নিজেরা যা পারি মাটির চুলায় রান্না করি। আমি যে মানুষ কোনোদিন রান্নাঘরে ঢুকিনি, কোনোদিন এক গøাস পানি ঢেলে খাইনি। সেই আমি এইসব করে সকাল নয়টায় দিদিকে নিয়ে বেরিয়ে পড়তাম বই বিক্রিতে।

প্রথম প্রথম আমরা বই বিক্রি করতাম স্কুল-কলেজে। দিদি বলতেন আমি যেহেতু হেড মিস্ট্রেস ছিলাম তাই আমার অধিকার আছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর। এভাবেই আমরা প্রতিদিন চলেছি পথে পথে। আমরা বই নিয়ে শহরে যেমন আসতাম গ্রামে গ্রামেও ঘুরতাম। চট্টগ্রাম জেলার সব থানার অধিকাংশ গ্রামের স্কুল-কলেজগুলোতেই আমাদের যাওয়া হয় এভাবেই।

একদিন ঘোর বর্ষায় আমরা প্যাচপেচে কাদাজল ভেঙে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার হেঁটে গিয়েছিলাম রমণীমোহন হাইস্কুলে। দিদির রোগা শরীর একহাতে ধরে ছাতা বই সামলে এই পড়ছি সেই পড়ছি এভাবে গিয়ে দেখলাম হেডমাস্টার নেই। অন্য টিচাররা কোনো বই নিলেন না। এদিকে বেশি বৃষ্টি থেকে বাঁচতে আশ্রয় নিলাম একটা শিব মন্দিরে। সে মন্দিরে শিব নেই। আর এই নিয়ে দিদি ধায় কাতরাতে কাতরাতে উপরোক্ত ছড়া বাঁধলেন। ‘গিয়েছিলাম রমণীমোহন হাই… ’ আমি বললাম মেলেনি। দিদি শিশুসুলভ হাসি দিয়ে বললেন, মিলুক না মিলুক মজা তো পেলাম!

এই হচ্ছে দিদি। শত কষ্টেও মুখে হাসি নিয়ে সবকিছু মেনে নিতেন।

আমরা চট্টগ্রাম শিক্ষক সমিতি থেকে চট্টগ্রাম জেলার সমস্ত স্কুলের নাম ও ঠিকানা পেয়েছিলাম। সেই ঠিকানা ধরে ধরে যেতাম বই নিয়ে। পথে পথে এভাবে কেটেছে আমাদের অনাহারে অর্ধাহারে বছর বছর। কখনো একশ টাকা, কখনো পাঁচশ টাকা আবার কখনো শূন্য হাতে আমাদের ফিরতে হতো। সেই দিনগুলোর স্মৃতি আজ আমি একাই বয়ে বেড়াচ্ছি। একজন রমা চৌধুরী নিজের মতো করে একটি পথ কেটেছিলেন। দিদি দেখিয়েছিলেন কীভাবে কত কম নিজের প্রয়োজন দিয়ে জীবনধারণ করা যায়। দিদির দেখিয়ে দেয়া পথ আজ হুমকির মুখে। সবার ভালোবাসা পেলে হয়তো আবার দিদির একজন উত্তরসূরি হিসেবে আমি এগুতে পারবো।

এই পথ যে পড়ে আছে। আবার নামতে চাই পথে।

তিন.

যে কথা লিখতে গেলে চোখ ভেসে যায় জলে

দুই হাজার দুই সাল। বাংলা বৈশাখের শেষ দিকে। এক সন্ধ্যায় দিদি একা গ্রামের বাড়ি থেকে ফেরার পথে আছাড় খেয়ে পা ভেঙে ফেলেন। তখন আমার অনিবার্য কারণে (গ্রাম্য রাজনীতি) পোপাদিয়ায় যাওয়া বন্ধ। উনিশশ নিরানব্বই সাল থেকে দুই হাজার পাঁচ সাল পর্যন্ত আমি পোপাদিয়ায় নিষিদ্ধ ছিলাম। সে ঘটনা কোনো এক পর্বে লিখবো।

তখন আমের মৌসুম। দিদির বাড়িতে প্রচুর আম ধরে। দিদির প্রিয় ফল আম। নিজের গাছের আম নিয়ে ফিরছিলেন শহরে। সন্ধ্যার কিছু পরে বেরিয়েছেন বাড়ি থেকে। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার তার মধ্যে কয়েকদিন প্রচুর বৃষ্টি হওয়ায় রাস্তায় হাঁটু সমান কাদাজল। কাঁধে আমের থলি এক হাতে রাতের খাবার রান্না করে আনছেন (শহরে কেরোসিন খরচ বেশি তাই বাড়ি থেকে রান্না করে আনছেন) অন্য হাতে নারকেলের মালায় আড়াল করে ছোট্ট একটা মোমবাতি।

এভাবেই সে দিন বাড়ি থেকে বের হলেন দিদি। ছেলে জহর বাড়িতে, তিনি তার মতো করে থাকেন। নিজের রান্না নিজে করে খান। দিদি খরচ দেন। মা এই অবস্থায় বের হচ্ছেন ছেলে দেখেও কিছু বললো না। একটু এগিয়ে দেয়ার কথাও তুললো না। তিনি এমনই। দিদি এই অবস্থায় আধা কিলোমিটার পথ যাবেন। দিদি এমনই! ছেলে বললেও তাকে বলতেন থাক তোর যেতে হবে না! আমাকে এগিয়ে দিতে গিয়ে যদি তোর বিপদ হয়। হেঁটে চলেই এসেছিলেন প্রায়। একটা কালীবাড়ি ফেলে মহাজন বাড়ির শ্মশান। দুইপাশে শ্মশান মাঝখানে কর্দমাক্ত কাঁচা রাস্তা। কোনো লোকজন নেই আলো প্রায় নিভে এসেছে। চারদিক থেকে বিশাল বিশাল গাছের শেকড় বেরিয়ে আছে। ঠিক সেই জায়গায় পা ফসকে পড়ে গেলেন। এক পায়ের পাতা ঢুকে গেল গাছের শেকড়ের মধ্যে। সেই অবস্থায় পড়ে রইলেন। চিৎকার করেছিলেন কিন্তু এই নির্জন জায়গায় কে শুনবে?

আমি এই দৃশ্যটি যতবার ভেবেছি আমার চোখের সামনে ভেসে উঠেছে ‘লেডি উইথ ল্যাম্প ফোরেন্স নাইটিংগেল’-এর ছবি। দিদি যেন অন্ধকার এই দেশের আনাচে-কানাচে আলোকবর্তিকা হয়ে জ্বেলে যাচ্ছেন দেশ মুক্তির আলো। দিদি কী এই দেশ দেখবে বলে নিজের সন্তান-সম্ভ্রম বলি দিয়েছিলেন? দিদি দেশের মানুষের মুক্তি চেয়েছিলেন, শুধু দেশের মাটির মুক্তি নয়। দিদি আজ নেই। আমাদের মানব মুক্তি সুদূরপরাহত।

দিদি সেই রাস্তায় প্রায় আধাঘণ্টার ওপর পড়ে থেকে ব্যথায় কাতরাচ্ছিলেন। সেই সময় তাঁর বাড়ির এক প্রতিবেশী ছেলে যাচ্ছিল সেই পথ দিয়ে শহরের দিকে। সেই ছেলেটি দিদিকে উদ্ধার করে। দিদির সারা গায়ে কাদা, উঠে দাঁড়াতে পারছেন না। ছেলেটি দিদিকে ধরে ধরে জিনিসপত্র সামলে একটু ভালো জায়গায় বসিয়ে রেখে ছুটল দিদির বাড়ির দিকে ছেলে জহরকে খবর দিতে। ছেলে এলো না। বললো আমি গিয়ে কি করবো? তুই শহরে নিয়ে যা।

প্রতিবেশী ছেলেটা অবাক হলেও জানে, উনি এমনই। কোনো দায়িত্ব কখনোই নেন না। ছেলেটা আবার দৌড়ে ফিরে এলো দিদির কাছে। ছেলেটি এবার নিজেই দায়িত্ব নিয়ে দিদির জন্য একটা টেড়ি ভাড়া করে শহরে লুসাই ভবনে নিয়ে এলো। ততক্ষণে পা ফুলে কালো হয়ে গেছে। দিদি বসে থাকতেও পারছেন না। ছেলেটি কষ্ট করে কোনোমতে লুসাই ভবনের চারতলায় দিদিকে মালপত্রসহ তুললো। আর তখনই দেখা দিলো আরো বড় বিপত্তি। দিদির রুমে তালা দেয়া। দিদির কাছে চাবিও নাই। চাবি যেটা তাঁর কাছে থাকে সেটা ফেলে এসেছেন বাড়িতে। আমি তখনো মোবাইল ব্যবহার করি না। দিদি রুমের সামনে বারান্দায় বসে গেলেন। আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। ছেলেটার অফিসে যাওয়ার তাড়া থাকায় সেও চলে গেছে। সে নাইট ডিউটি করে।

দিদি জানতো আমি আন্দরকিল্লায় বইয়ের কাজ করছি। দিদি ছেলেটাকে ঠিকানা দিয়ে বলেছিল সেখানে একটা খবর দিতে। কিন্তু ছেলেটি সে অফিস খুঁজে না পেয়ে কোনো খবর না দিয়ে চলে যায়। দিদি বসে থাকেন বারান্দায়। রাত দশটায়ও যখন আমি আসছি না দেখলো তখন খুঁজলো প্রতিবেশীদের। দেখলো কেউ নেই। শেষে সেই ভাঙা পা নিয়ে খোঁড়াতে খোঁড়াতে নিজে আবার চারতলা বেয়ে নেমে আন্দরকিল্লা গেলেন। চেরাগি পাহাড় মোড়ে কত সাংবাদিক, লেখক, সাংস্কৃতিক কর্মীরা দেখলো দিদির এই কষ্টকর যাওয়া, কেউ এগিয়ে এলো না। আমি রাত আটটা পর্যন্ত দিদির অপেক্ষায় রুমেই ছিলাম। দিদি বলেছিলেন সন্ধ্যার আগেই ফিরবেন, পরে ভাবলাম বৃষ্টি বেশি বলে আজ আর আসবেন না। কী ভুলই না করেছিলাম! আটটার পরে আন্দরকিল্লা যাই ও দিদির বইয়ের কাজ ছিল, জরুরি, তাই। দিদি ওখানে পৌঁছলেন। আমি দিদির অবস্থা দেখে তাড়াতাড়ি একটা টেড়ি নিয়ে আগে ডাক্তারের কাছে গেলাম। ডাক্তার দেখে কিছু ব্যথা কমার ওষুধ দিলেন আর বললেন পরের দিন যেন এক্সরে করিয়ে নিই এবং একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দেখাই। সারারাত কষ্ট যন্ত্রণা সয়ে সকালেই এক্সরে করে একজন ডাক্তার দেখাই, ডাক্তার বলেন পা ভাঙা। পায়ের পাতার হাড় ভেঙে গেছে দ্রুত প্লাস্টার করতে হবে। মেডিকেলে নিয়ে গেলাম সেখানে প্লাস্টার করে বলে দিলেন তিন মাস বেড রেস্ট। রুমে ফিরে এলাম। তখন রুমে কোনো চৌকি ছিল না। আমরা দুজন রুমের দুই দিকে পড়ে থাকতাম। আমরা রুমে চৌকি এনেছি দুই হাজার পাঁচ সালে তিনশ টাকা দিয়ে।

সেই তিন মাস দিদি শুয়ে রইলেন। কোলে করে বাথরুমে নিয়ে যেতাম আবার আনতাম। দিনরাত পাহারায় কাটাতাম প্রতিবেশী বন্ধুবান্ধব কাউকে বসিয়ে রেখে বের হতাম কাজে বা বই নিয়ে সাথে দিদির চিঠি পাঠকদের কাছে।

এই তিন মাস দিদি শুয়ে থাকতে চাইতো না। দিদি সব সময় দৌড়ানো মানুষ। একদিন কৈবল্যধাম যেতে চাইলেন। নিয়ে গেলাম টেড়ি করে। চার-পাঁচতলা সমান পাহাড়ের ওপর কোলে করে তুললাম। কৈবল্যধাম দিদির গুরুবাড়ি, দিদির শৈশবের একান্ত আপন জায়গা। একদিন যেতে চাইলেন গোল পাহাড় কালীবাড়ি। নিয়ে গেলাম কোলে করে। সেই ভাঙা পা জোড়া লাগলো। দিদি আবার পথে নামলেন আবার বই বিক্রি করতে শুরু করলেন।

শেষ পর্যন্ত আরেক ভাঙাতেই দিদি বিছানা নিলেন। আর শেষ পর্যন্ত চলেও গেলেন। আমি এখনো বিশ্বাস করি দিদির ভাঙা কোমর অপারেশন করলে আবার দিদি হাঁটতে পারতেন। আমি পথে পথে ছড়াতে পারতাম ভালোবাসা।

চার.

ছয় আগস্ট দুই হাজার পনেরো। সকাল দশটায় দিদি আর আমি এসে বসেছি এই জায়গায়। এখন প্রায় একটা। গত তিনদিন ধরে এসে ফিরে যাচ্ছি। এটা চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা সিডিএর চেয়ারম্যান আব্দুচ ছালাম সাহেবের চেম্বার। বিশাল এই চেম্বারে আমাদের মতো আরো অনেকেই বসে আছেন। দিদি সাধারণত বড় বড় হোমড়া-চোমড়াদের কাছে যান না। কয়েকদিন আগে শিল্পকলায় তারুণ্যের উচ্ছ¡াসের আয়োজনে দিদির সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ছালাম সাহেব। সেই অনুষ্ঠানে সংগঠকদের অনুরোধে দিদি চেয়ারম্যান সাহেবকে একটা বই দেন। দিদি বই বিক্রির টাকায় চলেন তাই কাউকেই সৌজন্য বা উপহার দিতে পারেন না। তবু অনুরোধ রাখতে গিয়ে উপহারই দিলেন। চেয়ারম্যান সাহেব দিদিকে বললেন তাঁর অফিসে যেতে। দিদি তাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও গেলেন। আমি বই নিলাম বেশি করে। ভাবলাম চেয়ারম্যান সাহেব নিশ্চয়ই প্রতিষ্ঠানের জন্য অনেক বই নেবেন। দিদি হাসলেন! দিদির অভিজ্ঞতা আছে এসব বড় বড় মানুষের সম্পর্কে। এভাবে তিনদিন যাওয়া-আসা চলছে। আজ ধৈর্য ধরে বসে আছি। দেখা না করে যাবো না। শেষ পর্যন্ত একটা পনেরোতে ডাক এলো ভেতর থেকে। তাও চেয়ারম্যানের পিএ নূরুল কবির ভাইয়ের চেষ্টায় সফল হলো। কবির ভাই এর আগে অন্য ডিপার্টমেন্টে থাকতে দিদির নিয়মিত পাঠক ছিলেন দিদির সব বই তিনি কিনেছেন। অনেক সময় দুই-তিন সেটও নিয়েছেন।

ভেতরে গেলাম দিদিসহ। আরো অনেক লোকই বসা সেখানে। দিদি বসলেন একটা চেয়ারে, আমি দাঁড়িয়ে রইলাম। প্রায় দশ মিনিট পর দিদির দিকে মনোযোগ দিলেন চেয়ারম্যান সাহেব। কুশল বিনিময়ের পর দিদি বই এগিয়ে দিলেন। দিদির প্রকাশিত আঠারোটি বইয়ের মধ্যে তখন হাতে ছিল আটটি। সবগুলো থেকে এককপি করে দিলেন নেয়ার জন্য। তিনি বইগুলো দেখলেন, এটা সেটা অনেক কথা বললেন দিদিকে উপদেশ দিলেন কীভাবে চলতে হয় এইসব। তারপর বললেন, আপনার বইয়ের দাম অনেক বেশি। দিদি বললেন আমি বইয়ের দাম নেই না, আমি নেই ভালোবাসা। যারা আমাকে জানেন তারা আমাকে ভালোবেসে যা দেন তাই নেই। সবগুলো বইয়ের এক কপি করে দাম আসে দুই হাজার আটশ টাকা। তিনি আধাঘণ্টা ধরে দিদিকে বোঝালেন দিদির কাজটা ঠিক না। বইগুলো দোকানে দেয়া উচিত ইত্যাদি ইত্যাদি। আমরা আশা করছিলাম অন্তত আর বেশি না হোক একসেট বই তিনি নেবেন। তিনি বইগুলো রেখে অনেক অনিচ্ছায় পকেট থেকে এক হাজার টাকা ধরিয়ে দিলেন। দিদিও কিছু না বলে এক হাজার টাকার বই টেবিলে রেখে বাকি বইগুলো আমাকে তুলে দিয়ে বেরিয়ে এলেন। সালাম সাহেব আশ্চর্য হয়ে তাকিয়ে দেখলেন দিদির চলে যাওয়া। দিদি বাইরে এসে নূরুল কবির ভাইকে বললেন ভিতরের খবর। কবির ভাই কিছুই বললেন না। নিজের পকেট হাতড়ে পেলেন পনেরোশ টাকা। সেটা দিয়ে আবারো বই কিনলেন যে বইগুলো আগেও তিনি নিয়েছেন সে বই আবার নিলেন দিদির কষ্টের ভার কমাতে। আরো এক পরিচিত জনের কাছে বিক্রি করিয়ে দিলেন এক হাজার টাকার বই।

দিদি বাইরে এসে আমাকে বললেন, বড় বড় বাঁদরের বড় পেট, লংকা যাবার তরে মাথা করে হেঁট!

আমরা বই নিয়ে পথে পথে ঘুরে বেড়াই। সাধারণ মানুষ ভালোবেসে বই নেন, খুশি হই। অসাধারণ মানুষরা বই দেখেন উপদেশ দেন। বই নিতে গেলেই আর নেন না বলেন দাম বেশি।

আটানব্বই-নিরানব্বইয়ের দিকে একদিন আমরা বই নিয়ে খাতুনগঞ্জ ঘুরছিলাম। কে একজন আমাদের নিয়ে গেলেন সাবেক সাংসদ, মন্ত্রী, লেখক, ব্যবসায়ী নূরুল ইসলাম বিএসসির কাছে। তিনি দিদিকে আগে থেকেই চিনতেন কিন্তু সেই প্রথম দেখা। দিদির বইগুলো দেখলেন উল্টেপাল্টে তারপর বললেন, কোথায় যাবেন? দিদি চেরাগি পাহাড় বলায় তিনি বললেন চলেন আমার গাড়িতে নামিয়ে দেবো। তিনি আমাদের নিয়ে এলেন তবে আন্দরকিল্লা এসে আমাদের নামিয়ে দিয়ে বললেন তার কাজ আছে। একশ টাকা দিদিকে ধরিয়ে দিলেন নামাবার পরে আর একটা দেড়শ টাকার বই রেখে দিলেন গাড়িতে। আমরা আর কিছু না হোক অন্তত পাঁচশ টাকার বই নেবেন আশা করেছিলাম। কিছুই না বলে চলে এলাম আমরা হেঁটে চেরাগি পাহাড়। আমাদের সেদিন আর বই বিক্রি হলো না।

দিদি নিজে একটা পথ কেটেছিলেন। তিনি নিজের লেখা বই নিজে ছাপিয়ে নিজেই বিক্রি করতেন। অনেকে সেটা ভালো চোখে দেখতো না। আবার অনেকেই শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় পাশে থাকতো দিদির। অনেকে বই না নিয়ে দিদিকে উপদেশ দিতেন। অনেকে অপমান করতেন। অনেকে দূর দূর করতেন। সব প্রতিক‚লতা পেরিয়ে দিদি একটা জীবন পার করে গেলেন। পথগুলো সাক্ষী হয়ে আছে আজো। শুধু দিদি নেই। দিদি বই বিক্রির সমস্ত ডকুমেন্ট জমা রাখতেন খাতায়। পাঠকের কাছ থেকেই লিখিয়ে নিতেন তাঁদের নাম ঠিকানা এবং কত টাকার বই নিচ্ছেন সব। সেই খাতা ঘেঁটে পেলাম ছালাম সাহেবের হাতের লেখা। দিদিকে দেয়া তার সম্মান। দিদি মারা যাওয়ার পরেও তিনি এসেছিলেন দিদির মরদেহে ফুল দিতে। আমি শোকে পাথর, তাই সব দেখছিলাম দূরে দাঁড়িয়ে। কিছুই বলিনি। ইচ্ছে করছিল এই অসম্মানের শ্রদ্ধার্ঘ্য ছুড়ে ফেলে দেই। কিন্তু দেয়া হয়নি। আজ লিখে রাখলাম ইতিহাসের পাতায়।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj