আপনার যাত্রা শেষ হয়নি

শুক্রবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯

নীতুল জান্নাত নীতি

আমাদের এই স্বাধীন বাংলাদেশের পেছনে যে কত গল্প লুকানো রয়েছে তা আমরা অনেকে হয়তো একটু আধটু জানি। মুক্তিযুদ্ধে কত শহীদের প্রাণ গেল, কত পরিবার অকালে হারিয়ে গেল, কত লক্ষ মা-বোন সম্ভ্রম হারালো তার হিসাব আজো ব্যাখ্যাহীন। সবাই কি আর পারে নিজের ভয়াবহ অতীতকে নিজের হাতে তুলে ধরতে? পারে না। কারণ কি জানেন? কারণটা হচ্ছে মানুষ অনিশ্চিত ভবিষ্যৎকে চোখ বুজে বরণ করে নিতে শিখেছে, হোক সেটা মন্দ বা ভালো। কিন্তু প্রকৃতি কখনই অতীতকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করার ক্ষমতা কোনো মানুষকে দেয়নি। সবাই এটা পারে না। আর যারা পারে, তাদের গল্পগুলোই হয়তো আশপাশের আরো কিছু আত্মার নীরব কান্না, নীরব আর্তনাদের প্রতিফলন। কিন্তু এমন একজন বীরাঙ্গনার গল্প আমরা আজ শুনবো, যিনি এই কঠিন অতীতকে নিজের হাতে দৃঢ়ভাবে তুলে ধরেছিলেন। কীভাবে একাত্তরে লক্ষ লক্ষ মা-বোনের সাথে তিনিও নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন, কত দুঃসহ দিনগুলো পেরিয়েছিলেন সবটুকু অকপটে লিখে গেছেন ‘একাত্তরের জননী’ নামক গ্রন্থে।

আচ্ছা কে হতে পারেন এই বীরাঙ্গনা? তিনি আর কেউ নন, আমাদের অদম্য সাহসী রমা চৌধুরী।

এই বীরাঙ্গনা জন্মেছিলেন ১৪ অক্টোবর, ১৯৪১ সালে চট্টগ্রামের বোয়ালখালী থানার পোপাদিয়া গ্রামে। এবং তিনিই দক্ষিণ চট্টগ্রামের প্রথম নারী স্নাতকোত্তর (এমএ) যিনি ১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। তারপর জানা যায়, কক্সবাজার বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে তিনি তার পূর্ণাঙ্গ কর্মজীবন শুরু করেন এবং দীর্ঘ ১৬ বছর তিনি বিভিন্ন উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭১ সালে তিনি যখন তিন পুত্র সন্তানের জননী, তখন থাকতেন নিজের বাড়ি পোপাদিয়ায়। তার স্বামী তখন ভারতে ছিলেন। এমনই এক সময় ১৩ মে তার বাড়িতে পাক হানাদার বাহিনীরা হামলে পড়ে এবং তিনিও নির্যাতনের শিকার হন। তাকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হয় পাশের নির্জন বাড়িতে। হারান সম্ভ্রম। আত্মহত্যার চিন্তা মাথায় এলেও তিনি নিজেকে আটকান, সন্তানদের কথা ভেবে। হয়তো বেঁচে থাকার এই প্রয়াসটুকুই তার মধ্যে ইচ্ছে জাগিয়ে তুলেছিল আত্মরক্ষার। তাই যখন পাকবাহিনী তার বাড়িতে গানপাউডার ছিটিয়ে আগুন জ্বালাতে ব্যস্ত, তিনি নেমে গেছিলেন পাশের পুকুরে। শুধু তাই নয়, তিনি বেঁচেছিলেন এরপরও ঘরবাড়িহীন। তিন শিশুসহ বৃদ্ধা মাকে নিয়ে যাযাবর জীবনযাপন করেছেন বাকি আটটি মাস। বেঁচে থাকার খোরাকি বলতে কি ছিল তার? আমি বলবো- সাহস। অদম্য সাহসী ছিলেন বলেই হয়তো তিন সন্তানের মৃত্যুর মতো অমানুষিক যন্ত্রণাকে তিনি নীরবেই বরণ করেছিলেন, তারপরও বেঁচেছিলেন। এই যুগে যখন আত্মহত্যার মতো বস্তু ডালভাত অনেকের কাছেই, সামান্য আবেগ যখন হয়ে ওঠে বিস্তর কিছু তাদের কাছে একটাই অনুরোধ দয়া করে অন্তত এই নারী বীরাঙ্গনার জীবনী একবার পড়ে দেখবেন। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থসমূহ হচ্ছে একাত্তরের জননী, ১০০১ দিন যাপনের পদ্য, আগুন রাঙা আগুন ঝরা অশ্রæ ভেজা একটি দিন, ভাব বৈচিত্র্যে রবীন্দ্রনাথ, অপ্রিয় বচন। একাত্তরের জননী গ্রন্থের ২১১ পৃষ্ঠায় রমা চৌধুরী লিখেছেন, ‘ঘরে আলো জ্বলছিল হারিকেনের। সেই আলোয় সাগরকে দেখে ছটফট করে উঠি। দেখি তার নড়াচড়া নেই, সোজা চিৎ হয়ে শুয়ে আছে সে। মা ছটফট করে উঠে বিলাপ ধরে কাঁদতে থাকেন, ‘আঁর ভাই নাই, আঁর ভাই গেইয়্যে গোই’ (আমার ভাই নেই, আমার ভাই চলে গেছে)। আর এই যে মূল্যহীন বেদনার সমুদ্রগুলো দেখছেন, তার সামনে আপনার আমার ছোট ছোট ব্যথাগুলো কিছুই না আমি নিশ্চিত। জীবন তার সুবিশাল দুহাত কখনোই তার দিকে প্রসারিত করেনি। এ জন্যই হয়তো শেষজীবনেও একরকম অবহেলার শিকার হয়েছিলেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে। অসুস্থ হয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (চমেক) গিয়ে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের শিকার হন। জানা যায়, তিনি চমেকের বারান্দায় তিন ঘণ্টা পড়েছিলেন এবং সেবা না পেয়ে ক্ষোভে ও অপমানে রাত একটায় বাধ্য হয়ে হাসপাতাল ছেড়ে নগরীর মেডিকেল সেন্টারে ভর্তি হতে হয়েছে তাকে। সে সময় তার পাশে দাঁড়িয়েছেন মেডিকেল সেন্টারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. মনিরুজ্জামান। কোনো অর্থ না নিয়ে দুই সপ্তাহ ধরে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের দিয়ে দুই দফা মেডিকেল বোর্ড বসিয়ে চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছিলেন। হাসপাতালের বেডে শুয়ে রমা চৌধুরী বলেছিলেন, ‘আমি বাঁচতে চাই। একাত্তর সালে পরাজিত হইনি। স্বাধীন দেশে রোগ ও অর্থের কাছে পরাজিত হতে চাই না।’ এ সময় তার দেখাশোনা করেছিলেন ছেলে জহর লাল চৌধুরী। তিনি জানিয়েছিলেন, ‘মা ডায়াবেটিস, গলব্লুাডারে পাথর, অগ্ন্যাশয় ক্যান্সার, হৃদরোগ, অ্যাজমাসহ অনেক রোগে আক্রান্ত। গত জুন মাস থেকেই গুরুতর অসুস্থ। চট্টগ্রামের ডায়াবেটিক হাসপাতালে ১৪ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর কিছুটা সুস্থ হলে তাকে বাসায় নিয়ে যাই, কিন্তু বাসায় যাওয়ার কয়েক দিনের মধ্যে হঠাৎ পড়ে গিয়ে কোমরে ও পায়ে ব্যথা পান।’

কিন্তু মৃত্যুর মতো যুদ্ধে যেখানে হারই নিশ্চিত দিনশেষে, সেখানে তিনিই আর কতক্ষণ লড়াই করে টিকে থাকতে পারতেন?

পারেননি তিনিও। দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হাড়ের ব্যথাসহ নানা রোগে ভোগার পর ২০১৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর সোমবার ভোররাত ৪টা ৪০ মিনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৭৬ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন একাত্তরের এই বীরাঙ্গনা রমা চৌধুরী। জীবদ্দশায় তিনি বাঁচার মতো করেই বেঁচেছিলেন, লড়াই করে হোক কিংবা নতুন জীবন আবিষ্কারের প্রতিটি ধাপ পেরোনোর মধ্য দিয়েই হোক। আর এ জন্যই তার মৃত্যু সংবাদ শুনে আমার হৃদয়ে প্রিয় একটি কবিতার চারটি লাইন বেজে উঠেছিল-

‘ঞযব ড়িড়ফং ধৎব ষড়াবষু, ফধৎশ ধহফ ফববঢ়,

ইঁঃ ও যধাব ঢ়ৎড়সরংবং ঃড় শববঢ়,

অহফ সরষবং ঃড় মড় নবভড়ৎব ও ংষববঢ়,

অহফ সরষবং ঃড় মড় নবভড়ৎব ও ংষববঢ়.’

রমা চৌধুরী! মৃত্যুর পরও আপনার যাত্রা শেষ হয়নি, এটা কি আপনি জানেন? ‘একাত্তরের জননী’ গ্রন্থে প্রতিটি পাতায় রয়েছে আপনার অবাধ বিচরণ। বাঙালির মস্তিষ্কে, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিতে সর্বত্র আছেন আপনি এবং থাকবেনও চিরকাল। লক্ষ লক্ষ বীরাঙ্গনার ভিড়ে প্রস্ফুটিত একটি নাম রমা চৌধুরী, যিনি ছিলেন তাদের একমাত্র প্রতিফলন।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj