বাংলাদেশকে সতর্ক থাকতে হবে : কী ঘটতে যাচ্ছে আসামের ভাগ্যে

বৃহস্পতিবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯

মাত্র এক মাস আগে ভারতের সংবিধানের ৩৭০ ধারা বাতিল করে জম্মু-কাশ্মিরিদের বিশেষ মর্যাদা রহিত করা হলে সমগ্র ভারত তথা বিশ্বজুড়ে মারাত্মক ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। কাশ্মির পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে ভারত-পাকিস্তানের মাঝে একাধিকবার সীমান্তে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে এবং উভয় দেশের সেনাবাহিনীর একাধিক সৈনিক নিহত হয়। বাংলাদেশেও কাশ্মিরের মুসলমানদের অধিকার ফিরিয়ে দিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়। কাশ্মির পরিস্থিতি নিয়ে যখন সমগ্র বিশ্ব উত্তাল ঠিক তখনই গত শনিবার প্রকাশ করা হয়েছে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামের জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি)। প্রথমে আসামের ৪১ লাখ নাগরিকের নাম এনআরসি থেকে বাদ পড়লেও গত শনিবার প্রকাশিত তালিকায় দেখা যায় বাদ পড়াদের সংখ্যা এখন ১৯ লাখ। এই বাদ পড়া ১৯ লাখ নাগরিকের মাঝে এখন সর্বদা আতঙ্ক বিরাজ করছে এই ভেবে যে তাদের এখন আদালতে শরণাপন্ন হয়ে বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে এহেন কথা প্রমাণ করতে হবে যে তারা প্রকৃত আসামের নাগরিক। যদি আদালতের মাধ্যমে কোনো নাগরিক তথ্য-প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয় তাহলে তাদের বিদেশি হিসেবে আখ্যায়িত করা হবে এবং রাষ্ট্রীয় নানা সুযোগ-সুবিধা বাতিল করা হবে। কিন্তু বিদেশি হিসেবে আখ্যায়িত হলে তাদের ভাগ্যে কী ঘটবে তা ভারত সরকার এখনো স্পষ্ট করেনি। এমন পরিস্থিতিতে আসামের বাদ পড়া নাগরিকদের মাঝে সর্বদা আতঙ্ক বিরাজ করছে এবং তাদের ভাগ্যের আকাশে ক্রমশই অশান্তির কালো মেঘ জমা হচ্ছে।

চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের আগে আসামের মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল অবশ্য জানান যাদের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়বে তাদের ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালসে (এফটি) আবেদন করতে হবে। এফটিতে আবেদনের সময়সীমা আগে ৬০ দিন থাকলেও বর্তমানে তা ১২০ দিন করা হয়েছে। আপাতত আসামে এফটির সংখ্যা ১০০। আগামী মাসে আরো ২০০ এফটি খোলা হবে। পর্যায়ক্রমে খোলা হবে মোট এক হাজার। মুখ্যমন্ত্রী এই কথাও আশ্বস্ত করেন যে নাগরিকত্ব প্রমাণে প্রত্যেক নাগরিককে সব রকমের আইনি সহায়তা দেয়া হবে। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি বলছে ভিন্ন কথা। নাগরিকত্ব প্রমাণে আদালতের শরণাপন্ন হতে হলে একজন নাগরিককে প্রায় ৪১ হাজারেরও বেশি রুপি খরচ করতে হবে। এত বড় খরচের অংশ অনেক নাগরিকই বহন করতে অক্ষম বলে জানা যায়। এমতাবস্থায় এসব অক্ষম নাগরিক কীভাবে আইনি সহায়তা পাবেন তাও স্পষ্ট করে কিছু বলা হয়নি। ভারতজুড়ে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা অব্যাহত রয়েছে এই এনআরসি নিয়ে। অসন্তোষ রয়েছে ক্ষমতাসীন বিজেপির মাঝেও। আসামের ক্ষমতাসীন বিজেপি বলছে তাদের ভোট ব্যাংক হিসেবে পরিচিত অনেক ভোটারই বাদ পড়েছে নাগরিকপঞ্জি থেকে।

ফরেইন ট্রাইব্যুনালে কোনো নাগরিক নাগরিকত্ব প্রমাণে ব্যর্থ হলে তিনি হাইকোর্টের দ্বারস্থ হতে পারবেন, সেখানেও ব্যর্থ হলে সুপ্রিম কোর্টেও যেতে পারবেন। সব আইনি প্রক্রিয়া শেষ হলেই কেবল তাদের বিদেশি বলা হবে এবং ডিটেনশন ক্যাম্পে (ডি-ক্যাম্প) পাঠানো হবে। বর্তমানে আসামে এমন শিবিরের সংখ্যা ছয়টি। তাতে বন্দি রয়েছেন প্রায় এক হাজার। ভারতের সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ, তিন বছরের বেশি কাউকে এভাবে বন্দি রাখা যাবে না। আরো ১০টি ডি-ক্যাম্প খোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজ্য সরকার। ভারতের প্রখ্যাত কলাম লেখক সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায় এই ডি-ক্যাম্প নিয়ে কিছু প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন- কত লোক তাতে আটবে? খুব বেশি হলে ৫০ হাজার? বাকিরা যাবেন কোথায়? থাকবেন কোথায়? খাবেন কী? খাওয়াবে কে? কোনো প্রশ্নেরই উত্তর নেই কারো কাছে। এমন শত শত উত্তরবিহীন প্রশ্নের উত্তর কেবল আসামের নাগরিকদের মাঝে নয়, প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশের নাগরিকদের মাঝেও আলোচনা হচ্ছে। কী ঘটতে যাচ্ছে আসামের ভাগ্যে।

আসামের এমন উদ্ধত পরিস্থিতে বাংলাদেশকে সতর্ক থাকতে হবে। কারণ বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী ভারতের একটি রাজ্যে এত বিপুলসংখ্যক মানুষ রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়লে তার প্রভাব সহজেই বাংলাদেশে পড়বে বলে ধারণা। তারা চাইবেন যে কোনোভাবে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করতে। আমাদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ আরো বেড়ে গেছে এই কারণে যে, গত সোমবার ভারতীয় সংবাদমাধ্যমকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে আসাম রাজ্যের অর্থমন্ত্রী হেমন্ত বিশ্ব শর্মা বলেছেন- বাংলাদেশকে বলব এবং আহ্বান জানাব এনআরসি থেকে বাদ পড়া লোকদের ফিরিয়ে নিতে। রাজ্যের অর্থমন্ত্রীর এমন বক্তব্যে নিশ্চয়ই বাংলাদেশকে এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। যদি আগাম কোনো সতর্কতা নেয়া না হয় এবং এ ব্যাপারে জনমত গঠন করতে দেশ ব্যর্থ হয় তাহলে মিয়ানমার থেকে আগত রোহিঙ্গা পরিস্থিতির মতো আরেকটি ভয়াবহ পরিস্থিতি ঘটবে। যা আমাদের জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তাকে বিঘ্নিত করবে।

আবদুল্লাহ আল মাউন

শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
মযহারুল ইসলাম বাবলা

ক্ষমতার রাজনীতি ও কাশ্মির সংকট

মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

কর আদায় নয় আহরণ

আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার

বায়ুদূষণ রোধে করণীয়

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

রাষ্ট্রের স্বভাব ও চরিত্র

মাহফুজা অনন্যা

পেঁয়াজ সংকট কোন পথে?

মুসাহিদ উদ্দিন আহমদ

দিল্লিকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে ঢাকা

মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

একজন সৃজনশীল সুভাষ দত্ত

মুহম্মদ জাফর ইকবাল

ধূসর আকাশ, বিষাক্ত বাতাস

অধ্যাপক ড. অরূপরতন চৌধুরী

আসুন, পরিবারকে ডায়াবেটিসমুক্ত রাখি

Bhorerkagoj