টুটলু ও কুড়িয়ে পাওয়া বিড়ালছানা : অদ্বৈত মারুত

বুধবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯

আজ খুব সকালে ঘুম ভাঙল মা বানরের। দুহাতে চোখ কচলাতে কচলাতে তাকাল পাশের ডালের দিকে। ডালটিতে শুয়ে আছে টুটলু।

টুটলু মা বানরের ছোট ছেলে। খুব চটপটে। দুষ্টু। এক মিনিটও চুপ থাকে না। সারাক্ষণ ডালে ডালে ছোটাছুটি করে। একে ওকে খামছে দেয়। যাকে তাকে ধাওয়া করে। ধরতে পারলে তো কথাই নেই। আচ্ছামতো মার দেয়। শুধু কি অন্যদের? সে দিন বড় আপুর চুল ধরেই টান মারল। মারও খেলো খুব। ওর আম্মুই মারল। উঁহুঁ, কী যে মার রে বাবা!

বেশি দুষ্টুমি করায় টুটলু ফলও পায় হাতে হাতে। এই পা ভাঙল, তো পরে মাথা ফাটল। গতকালই ঘটল বড় এক ঘটনা। টুটলু বড় ডাল থেকে মারল লাফ। ভাবল পাশের ডালটা ধরতে পারবে। পারল না। দুম করে পড়ে গেল নিচে। মাটিতে। নড়েও না, চড়েও না! পরে মাথায় পানি ঢালা হলো, চোখে-মুখে পানি ছিটানো হলো, ওর মা বুকে-পিঠে হাত বোলানোর পরই না চোখ খুলল সে।

টুটলুকে নিয়ে সবাই খুবই বিরক্ত। তাকে নিয়ে কী করা যায় ভাবল টুটলুর মা।

পুটলু বলল, ওকে ছোট খালার বাড়ি রেখে এসো। ওর ভালো লাগবে। ছোট খালার ছেলেমেয়েদের সঙ্গে খেলা করবে। বাড়ির পাশেই তো ছোট্ট লেক। কী যে টলটলে পানি, বনজুড়ে কত্ত গাছ। এত চমৎকার পরিবেশে কেউ দুষ্টু থাকে? টুটলুও থাকবে না। লেকের পানিতে খেলতে পারবে। কুমির ভায়াও ভালো। কিচ্ছু বলে না। শুধু লেকের পাড়ে শুয়ে গায়ে রোদ লাগায়।

কী বলো আম্মু? পুটলু মায়ের উত্তর জানতে চাইল।

পুটলুর কথা মনে ধরল মা বানরের। ভাবল, ঠিকই তো। কতদিন ছোটবোনের সঙ্গে দেখা হয় না। বেড়াতে গেলে ভালোই হয়। বোনের সঙ্গেও দেখা হবে, ছেলেমেয়েদেরও ভালো সময় কাটবে।

পুটলু, উটলু, কুটলু আর টুটলুকে নিয়ে মা যাচ্ছে ছোটবোনের বাড়ি। অনেক পথ। হেঁটে যেতে হয়। তারা যাচ্ছে বহুদিন পর।

পুটলু : আম্মু, পথ চিনবে তো?

বানর : না চেনার কী আছে? কতবারই তো গেলাম।

পুটলু : না, বলছিলাম, আগে যখন যেতে, তখন তো পরিবেশ অন্যরকম ছিল।

বানর : হ্যাঁ, তা বদলে গেছে অনেকটা। গাছপালা কেটে একাকার।

পুটলু : শেষবার যখন খালাদের বাড়ি গেলাম, তখনো গাছপালা ছিল।

মা বানরের মন খারাপ হলো। আহা রে, এইভাবে গাছ কেটে শেষ করলে আমাদের কী হবে? আমরা কোথায় থাকব- ভাবতে ভাবতে একটা ছোট গর্তে পড়ে যাচ্ছিল। নিজেকে সামলে নিল। ছেলেমেয়ের দিকে তাকাল। ওদেরও মন খারাপ। শুধু টুটলু ছাড়া। দুষ্টুমি এতটুকু কমেনি। একটা ফিঙেপাখি দেখে তাকে ধরতে গেল। প্রজাপতিকে ধাওয়া করল। একটা ফড়িং মরা ডালে বসেছিল। ওকে ধরতে গেল। ধরবে কি করে? ওদের তো পাখা আছে। টুটলুকে দেখেই উড়াল দিল ওরা। টুটলুর দৌড়াদৌড়ি ভালোই লাগছিল মা বানরের। ঘরের বাইরে এসে বাচ্চাটা খুব আনন্দ পেয়েছে- মনে মনে ভাবল মা বানর।

তারা হাঁটতে হাঁটতে অনেক দূর চলে এলো। আগের চেয়ে পথ বেশি। নানা পথ ঘুরে যেতে হচ্ছে। কোথাও কোথাও কোনো বনই নেই। বাড়ি হয়েছে। পাড়া বসে গেছে। হাট বসেছে। মানুষ আর মানুষ। কত্ত মানুষ রে বাবা, কুটলু বলল।

তারা একটা গাছের নিচে এসে বসল। সবাই খুব ক্লান্ত। পোঁটলা খুলে সবাই খেলো। সারা পথ ছোটাছুটি করে টুটলু ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। একবার বড়বোন কোলে নিয়ে হেঁটেছে। আবার ছোটবোনটি। মা বানর কোলে নিয়ে হাঁটছিল সেই কখন থেকে!

তারা আবার যখন রওনা হলো, তখন সন্ধ্যে। সূর্য পুরো ডুবেনি। টুটলুর দুষ্টুমি তখন কিছুটা কমেছে। ও কি যেন দেখছে। মা ডাকল টুটলুকে। নড়লো না। চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। এগিয়ে গেল সে। টুটলু মাকে একটা ছানা দেখালো। বিড়ালছানা কাঁদছে।

তাড়াতাড়ি হাঁটতে গিয়ে মা বানর খেয়ালই করেনি। বিড়ালছানাটা সে কোলে নিল। কান্না থামাতে চাইল। বাড়ি কোথায় জানতে চাইল। বিড়ালছানা কিছুই বলতে পারল না। শুধু কান্না করছে।

টুটলু মাকে বলল, আম্মু, ওকে নিয়ে যাই আমাদের সঙ্গে? আপুকেও বলল। আপু মাথা নাড়ালো। আম্মুও।

বিড়ালছানা নিয়ে ওরা খালাবাড়ি গেল। দেখল গায়ে প্রচণ্ড জ্বর। কাঁপছে। জলপটি দিল মাথায়। ডাক্তার ডাকল। নানা রকম গাছগাছালির পাতা দিয়ে বানানো ওষুধ দিল। খালাবাড়ি আসার পর থেকে টুটলুর দুষ্টুমি বন্ধ। বিড়ালছানার সঙ্গে থাকে, ওষুধ খাওয়ায়, মুখে খাবার তুলে দেয়, ঘুম পাড়িয়ে দেয়। বিড়ালছানার সঙ্গে খেলাধুলাও করে।

বিড়ালছানাটা সুস্থ হয়ে উঠেছে। মা বানরের খুব ভালো লাগছে। এই ভোর সকালে বিড়ালছানাটার ঘুমানো মুখটা দেখে তার খুব আনন্দ হচ্ছে। নিশ্চয় ওর মা ওকে খুঁজছে।

ইষ্টিকুটুম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj