এক মায়ের গল্প : তানভীর আলাদিন

শনিবার, ৩১ আগস্ট ২০১৯

রাতের ট্রেনে চড়ে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যাচ্ছিলাম। আমার লাগোয়া পাশের সিটে এক ভদ্রলোক বসা। মাঝখানে করিডোর। আমাদের সোজা লম্বালম্বি করিডোরের ওই প্রান্তে লাগোয়া দুই সিটের একটিতে একজন মধ্য বয়স্ক মহিলা আর জানালার পাশের সিটে একজন অসাধারণ সুদর্শন তরুণ। বয়স ১৯-২০ বছর হয়ত হবে। যুবকটি সেলফোনে গান শুনছে আর দামি ব্র্যান্ডের চকোলেট খাচ্ছে। ট্রেন ছাড়ার ঘোষণা শেষ হতেই যুবকটি আমার দিকে তাকিয়ে অভিবাদনের মতো হাত তুলল, আমিও হাত তুললাম। ছেলেটি মুচকি হেসে আবার তার চকোলেট খাওয়ার দিকে মনোনিবেশ করল।

আমার তন্দ্রা আসছিল- হঠাৎ কিছু শব্দে আমার ঘুম ভেঙে গেল। অবিশ^াস্য দৃষ্টিতে দেখলাম ছেলেটি তার পাশে বসা মহিলাটিকে কিল-ঘুষি-চড় মারছে! মহিলাটি যুবকটিকে শান্ত কার চেষ্টা করছে আর আস্তে আস্তে বলছে ‘থামো বাবা, ছিঃ ট্রেনে সবাই দেখছে…।’

মহিলাটির নাক থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে… চোখ বেয়ে নেমে আসছে পানি। আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ়! এর মধ্যে নানাজনের নানা মন্তব্য শুরু হয়ে গেছে। ছেলেটিও হঠাৎ শান্ত হয়ে বসে বসে ফের চকোলেট খাচ্ছে… মন্তব্য চলছেই…।

মিনিট পনের পরে মন্তব্য শিথিল হতেই মহিলাটি উঠে দাঁড়ালেন এবং বললেন- এত রাতে হয়ত আপনাদের অনেকের চোখে ঘুম এসেছিল, আপনাদের ঘুমের ব্যাঘাতের জন্য আমি দুঃখিত। আসলে আমার ছেলেটি গত এক বছর ধরে সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত। ও পাগল নয়, অসুস্থ। সিজোফ্রেনিয়া তীব্র একটি মানসিক রোগ, যার ফলে রোগী বাস্তবতার বোধ বা উপলব্ধি হারিয়ে ফেলে। প্রায়ই তার হেলুসিনেশন হয়। অর্থাৎ বাস্তবে

নেই বা ঘটছে না এমন কিছু ঘটতে দেখা বা শোনা এবং ডিলিউশন হয় অর্থাৎ মনে এমন বিশ্বাস বা মনোবিকার থাকে, কেউ বুঝি তাকে গায়েব বা অদৃশ্য থেকে নিয়ন্ত্রণ করছে বা তাকে হত্যা করার চেষ্ট করছে। তিনি বললেন, আপনারা অনেকে অনেক কিছু বললেন, সে জন্য আমি একটুও কষ্ট পাইনি, এই ধরনের পরিস্থিতিতে আমি প্রতিদিনই পড়ছি। আপনাদের কোনো ভয় নেই ও অন্যদের ওপর হাত তোলে না। সবাই ওকে ছেড়ে চলে গেলেও আমি তো মা, আমি তো আমার নাড়িছেঁড়া ধনকে দূরে ঠেলে দিতে পারি না। বরং আমি তার জন্য, তাকে দেখাশোনা করার জন্য সরকারি কলেজে নিজের শিক্ষকতার চাকরিটাই ছেড়ে দিয়েছি। ছেলেটা আমার প্রচণ্ড মেধাবী ছিল, আইটি নিয়ে পড়তে চেয়েছিল, জানেন- গত বছর জাপানিজ একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যাওয়ার চান্সও পেয়েছিল। কিন্তু বিধি বাম, সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ায় আমাদের সব স্বপ্ন থমকে গেছে। অনেক কথা বলে ফেললাম, আমাকে ও আমার ছেলেকে ক্ষমা করবেন। আপনারা আমার ছেলেটির জন্য দোয়া করবেন সে যেন স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে।

আমার পাশে বসা ভদ্রলোক আমাকে বললেন, কী ভয় পেয়েছেন? আমি তার দিকে তাকাতেই তিন বললেন, ‘ভয়ের কিছু নেই, ও আপনাকে কিছু করবে না…।’

-আপনি কি করে বুঝলেন, ও আমাকে কিছু করবে না? যেখানে সে নিজের মাকে মেরে আহত করেছে?

-আপনি এবং আমি হয়ত জানি না কিংবা জানব না, তবুও এটি এখন এই মায়ের নিয়তি হয়ে গেছে, এখানেই মা এবং মাতৃত্ব। এই মা জানেন, তার এই ছেলের কোনো একটা উল্টাপাল্টা কর্মকাণ্ডে তার মৃত্যুও হতে পারে, তারপরও তিনি তো মা…। আপনি যদি ভয় পেয়ে থাকেন আপনি আমার সিটে আসুন, আমি আপনার সিটে বসি (আমি বিনা বাক্যে সিট বদল করে নিলাম)। ভদ্রলোক নিজের পরিচয় দিলেন- তিনি একজন মানসিক চিকিৎসক। তারপর বললেন, তিনি প্রায় প্রতিদিন এমন রোগীর মুখোমুখি হন। তিনি আরো জানান, মায়ের ওপর যে আক্রমণ করেছে এটিও সম্পূর্ণ অবচেতন মনে করেছে ছেলেটি। মূলত, সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্তরা অন্যের ওপর সহিংসতা না করে বরং নিজেই সহিংসতার শিকার হন। এই রোগ পুরোপুরি ভালো হয় না। তবে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। অনেক সময় সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্তরা লজ্জার কারণে কারো সাহায্য চাইতে আসে না। আবার অনেক সময় লোকে তাদের ছেড়ে চলে যায়, কেননা সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্তরা অযথাই লোককে ভয় পায়, তারা হয়ত তার ক্ষতি করবে। এ কারণে লোকে অনেক সময় সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্তদের পাগল মনে করেন। আসলে ওরা পাগল নয়। সিজোফ্রেনিয়াকে বলা হয় একটি জীবন্তু দুঃস্বপ্ন। কিন্তু সঠিক ধারণা না থাকলে লোকে আসলে বুঝতেই পারেন না সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত একজন মানুষ কী রকম দুঃসহ জীবনযাপন করেন। তাদের ডিলিউশন এবং হেলুসিনেশন বা উৎকল্পনাগুলো যখন চরম মাত্রায় পৌঁছে যায়, তখন সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত রোগী অন্যদের ক্ষতি না করে বরং নিজের ক্ষতি করে। তবে সে সময় তারা জিনিসপত্র ছুড়ে ফেলতে পারেন এবং দেয়ালে কিল-ঘুষি মেরে নিজেকেই আহত করতে পারেন। এ সময় অন্য কেউ এসে তাদের পাশে দাঁড়ালে তারা শান্ত হয়ে আসেন এবং বাস্তবতার বোধ ফিরে পান।

এই রোগ জীবনভরই থাকে। ভালোবাসা এবং মানসিক সহায়তার মাধ্যমেই শুধু একজন সিজোফ্রেনিয়া রোগীকে সুস্থ করে তোলা যায়। তাদের মানসিকভাবে সহায়তা করতে হয়, তাদের বারবার মনে করিয়ে দিতে হয়, তাদের উৎকল্পনাগুলো বাস্তব নয়। সেগুলো থেকে বেরিয়ে আসলেই তারা সুস্থ থাকতে পারে, যা এমন মাকে দিয়েই সম্ভব।

সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্তরা প্রতিদিনের স্বাভাবিক কাজকর্ম করতে সক্ষম নয় বলে মনে করা হয় এবং তাদের কোনো মানসিক চিকিৎসালয়ে নজরদারির মধ্যে রাখা উচিত বলেও বিশ্বাস করা হয়। কিন্তু এই ধারণা ভুল। বরং সঠিক চিকিৎসা এবং ওষুধ দিলে তারা কাজকর্মে অন্যদের ছাড়িয়ে যাওয়ার ক্ষমতা রাখে।

সিজোফ্রেনিয়া আক্রান্তরা খুবই সৃজনশীল হয়ে থাকে, আপনি হয়ত জেনে অবাক হবেন- প্রফেসর জন ন্যাশ একজন নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত গণিতবিদ। যার সিজোফ্রেনিয়া ছিল। তাকে নিয়ে হলিউডে একটি বিখ্যাত সিনেমা বানানো হয়। সিনেমাটির নাম ‘অ্যা বিউটিফুল মাইন্ড’। সিনেমাটিতে দেখানো হয় কী করে স্ত্রীর সহযোগিতায় জন ন্যাশ সিজোফ্রেনিয়া থেকে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী গণিতবিদ হয়ে ওঠেন। গবেষণায় দেখা গেছে, উচ্চমাত্রায় সৃষ্টিশীল লোকদের চিন্তার প্রক্রিয়ার সঙ্গে সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্তদের মিল রয়েছে। সৃজনশীলতার নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষায় সাধারণের চেয়ে তাদের চিন্তা অনেক বেশি সৃষ্টিশীল বলে প্রমাণিত হয়েছে।

চিকিৎসক ভদ্রলোক বললেন, টেনশন করবেন না, ঘুমিয়ে পড়–ন। তিনি কিছুক্ষণ পরই ঘুমিয়ে পড়লেন। আমি শত চেষ্টা করেও চোখের পাতা দুটো আর এক করতে পারিনি। যুবকটি তখন তার মায়ের বুকে মাথা রেখে শিশুর মতো ঘুমাচ্ছিল, আর মা তার মাথায় বিলি কেটে দিচ্ছিল…। ট্রেন চলছে। বাইরে যেন কিছুটা আলো ফুটছে। দারুণ এক পবিত্র ভোরের প্রস্তুতি। আশপাশের অনেকেই ঘুমিয়ে গেছে, তবে আমি এক অজানা ভয়ে জেগেই আছি। আর জেগে আছেন পরম মমতাময়ী এক মা, যিনি ছেলের মাথায় বিলি কাটতে কাটতে নিদ্রা এলেও হাই তুলে নিদ্রাকে দূরে ঠেলে দিতে চাচ্ছেন। যেন তার ছেলেটা একটু শান্তিতে ঘুমায়…!

:: মাথিয়ারা, ফেনী

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj