কিপটে শফিক মাস্টার : ইসমত জাহান লিমা

শনিবার, ৩১ আগস্ট ২০১৯

শফিক সাহেব পেশায় একজন স্কুল শিক্ষক। ছেলে-মেয়ের পড়ালেখার সুবিধার্থে পরিবারসহ শহরের একটি ভাড়া বাসায় থাকেন। আপাতদৃষ্টিতে শিক্ষক হলেও উত্তরাধিকার সুত্রে পাওয়া পৈতৃক সম্পত্তির জোরে আর্থিকভাবে বেশ সচ্ছল জীবন যাপন করেন। কিন্তু তিনি স্বভাবে বেশ কিপটে প্রকৃতির মানুষ। একটা টাকা এপাশ ওপাশ হলে সে চিন্তায় উনার ঘুম হয় না এমন অবস্থা! এই কারণে স্কুলের সব শিক্ষক এমনকি স্টুডেন্টরাও উনাকে কিপটে শফিক মাস্টার নামেই চিনেন। অপরদিকে শফিক সাহেবের স্ত্রী আলফা বেগম দয়ালু মহিলা। মানুষকে খাওয়াতে খুব ভালোবাসেন।

সেদিন একটা বিশেষ কাজে তিনি গ্রামের বাড়িতে যান। পুরনো কাজের ছেলে মতিনকে নিয়ে গ্রামের বাজারে গিয়ে দেখেন শহরের তুলনায় এখানে কাঁচা বাজার থেকে শুরু করে মাছ, দেশি মুরগী, দুধ, ডিমের মত আমিষের দামও অনেক কম। এমন দাম শুনে তিনি মনে মনে হিসেব কষে দেখলেন- এখান থেকে বাজার করলে অনেক টাকা বাঁচবে সেইসঙ্গে সবকিছুই টাটকা পাবেন। তিনি ভাবলেন, কাল সকালেই যখন শহরে যাব তাহলে এখান থেকেই কাঁচা বাজার, দেশি মাছ, মুরগী, ডিম এসব কিনে নিয়ে যাই। বাসায় ফ্রিজে রেখে অনেকদিন পর্যন্ত খাওয়া যাবে। এতে শুধু বাজারের টাকাই বাঁচবে না, অন্তত আরো ২ সপ্তাহ অটো ভাড়া খরচ শহরের ঘিঞ্জি বাজারে যেতে হবে না।

শিফক সাহেবের যেই ভাবা সেই কাজ! মতিনকে নিয়ে অনেক বাজার করলেন। কিন্তু, একাই যেহুতু সবকিছু নিয়ে আসতে পারবেন না তাই মতিনকে সঙ্গে করে পরের দিন শহরে আসলেন। আলফা বেগম একসঙ্গে এতো বাজার দেখে একবারে থ বনে গেলেন। শফিক সাহেবের মত কিপটে মানুষ একদিনে যে এতো বাজার করার মতো মানুষ না, তা তিনি ভালোমতোই জানতেন। স্ত্রীকে অবাক হয়ে থাকতে দেখে বাজারের ব্যাগটা তার হাতে দিয়ে এতো বাজার করার পিছনের সমস্ত ঘটনা খুলে বললেন। এরপর ফ্রেশ হয়ে সোফায় বসে টিভি অন করতে একটা হেডলাইন দেখে শফিক সাহেবের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল! ঠিক সেই সময়ে কারেন্টও চলে গেল।

হতবিহŸলের মতো তিনি স্ত্রী আলফা বেগমকে ডাকলেন। আলফা বেগম কাছে আসতেই তিনি বললেন, ‘আমি এইমাত্র খবরের শিরোনামে দেখলাম কারিগরি ত্রুটির কারণে আগামী চার দিন শহরের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকবে। এই দেখ, এখনই কারেন্টও চলে গেল। তার মানে পুরো চার দিন আর কারেন্ট আসছে না! আমি যে এতোগুলো বাজার করলাম এসব তো এখন ফ্রিজে রাখা যাবে না। এখন তাহলে সব নষ্ট!’

আলফা বেগম দেখলেন সত্যিই তো কারেন্ট নাই। তিনি

একটু ভেবে বললেন, ‘এতকিছু অনেক কষ্ট করে যখন আনলে কিন্তু কারেন্ট না থাকায় এখন তো ফ্রিজে রাখলেও পঁচে যাবে। তারচেয়ে এক কাজ করি। আমার বান্ধবী শায়লার বাসায় আমরা বেশ ক’বার খেয়ে আসলেও ওদেরকে একদিনও দাওয়াত দেওয়া হয়নি। আবার তোমার কলিগরাও তোমাকে কিপটে শফিক মাস্টার বলে ক্ষেপায়। ওদেরকে আজ আসতে বলি। তাছাড়া নয়ন মিতুর ফ্রেন্ডরাও নাকি অনেকদিন থেকে আমাদের বাসা আসতে চাচ্ছে, এই সুযোগে তাদেরও দাওয়াত দেই। তাহলে এক ঢিলে দু পাখি মরবে।’

শফিক সাহেব অনেক ভেবেচিন্তে দেখলেন এছাড়া আর কোন উপায় নাই। অগত্যা ফোনের টাকা খরচ করে সবাইকে দুপুরের দাওয়াত দিলেন।

শুক্রবার হওয়ায় দুপুরের দিকে সবাই শফিক সাহেবের বাসায় উপস্থিত হল।

এত টাকা খরচ করে বাজার করা, গ্রাম থেকে শহরে আনতে মতিনের আসা-যাওয়ার ভাড়া দেওয়া আবার ফোনের টাকা খরচ করে সবাইকে ফোন দেওয়া। আর এখন সব অন্যদের খাওয়াতে হবে- শুয়ে শুয়ে তা ভাবতেই শফিক সাহেবের মাথা চিনচিন করছিল। এদিকে কিপটে শফিকের জন্য কাউকে খাওয়াতে না পারা আলফা বেগম এই সুযোগে সবাইকে খাওয়াতে পেরে মনে মনে বেজায় খুশি।

সবার খাওয়া যখন শেষের দিকে তখন হুট করে কারেন্ট আসলো। শফিক সাহেব তড়িঘড়ি করে দৌড়ে ডাইনিংয়ে এসে ফ্রিজে রাখার মত আর রান্না করা কিছু অবশিষ্ট আছে কি না দেখতে লাগলেন! কিন্তু, ততক্ষণে প্রায় সব খাবারই শেষ। তা দেখে কিপটে শফিকের মুখ অন্ধকার হয়ে বুক ফেটে পানি আসতে চাইলো।

কিছুক্ষণ পরে আলফা বেগম ড্রয়িংরুমের দরজায় এসে দেখেন- শফিক সাহেব টিভির দিকে তাকিয়ে আছেন আর টিস্যু দিয়ে নিঃশব্দে চোখের পানি মুছছেন। তা দেখে মুচকি হেসে পাশের রুমে চলে গেলেন আলফা বেগম। তিনি নিশ্চিত এতো টাকা নষ্টের শোকে আজকে শফিক সাহেবের রাতে ঘুম হবে না।

আসলে, নিউজের হেডলাইনে ছিল, ‘কারিগরি ত্রুটির কারণে চার ঘণ্টা সারা শহরে বিদ্যুৎ থাকবে না।’

:: ইংরেজি বিভাগ, হাবিপ্রবি, দিনাজপুর

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj