নজরুলের স্মৃতি বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ের গভীরে

শুক্রবার, ৩০ আগস্ট ২০১৯

রফিকুল ইসলাম

অবিভক্ত বাংলায় রাজধানী ছিল পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা মহানগরীতে। ইংরেজের হাতে গড়া এই আধুনিক নগরী ছিল পশ্চিমবাংলাকেন্দ্রিক। কলকাতাকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল অবিভক্ত বাংলার প্রশাসনিক, বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক ক্রিয়াকলাপ। উপেক্ষিত ছিল ঢাকাকেন্দ্রিক পূর্ববাংলা, রাজশাহীকেন্দ্রিক উত্তরবাংলা এবং চট্টগ্রামকেন্দ্রিক দক্ষিণবাংলা। মোটকথা ইংরেজ আমলে প্রায় দুশত বছর অবিভক্ত বাংলার বৃহত্তর অংশ এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ অধিবাসী ছিল শিক্ষা-দীক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-সংস্কৃতি এবং জীবনযাত্রার মান, সবদিক থেকেই পশ্চাৎপদ। দারিদ্র্য, মহামারি, অশিক্ষা-কুশিক্ষা ও কুসংস্কারে আচ্ছন্ন অবিভক্ত বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ছিল ঘুমন্ত। বাংলার এই অঞ্চলে কাজী নজরুল ইসলামের প্রথম আগমন ঘটে ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দে ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশাল থানার কাজীর শিমলা ও দরিরামপুর অঞ্চলে এখন থেকে শতবর্ষ আগে। ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দে নজরুল দরিরামপুর স্কুলে সপ্তম শ্রেণির ছাত্র ছিলেন। সে সময় তিনি জায়গির থাকতেন প্রথমে কাজীর শিমলা গ্রামের দারোগা বাড়িতে এবং পরে দরিরামপুরে বিচুতিয়া ব্যাপারীর বাড়িতে।

১৯১৪ খ্রিস্টাব্দে নজরুল তাঁর ত্রিশাল জীবনে প্রথম পূর্ববাংলার কৃষিপ্রধান পল্লী অঞ্চল, মুসলমানপ্রধান গ্রাম্যসমাজ এবং ষড়ঋতুর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত হবার সুযোগ পান যার প্রভাব পরবর্তীকালে তাঁর সাহিত্যে লক্ষ করা যায়। নজরুলের জীবনে পূর্ববাংলার সঙ্গে পুনরায় ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ঘটে ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে যখন তিনি কুমিল্লা ও দৌলতপুরে আসেন। কলকাতায় বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতিতে পরিচিত কুমিল্লার মুরাদনগর থানার দৌলতপুর গ্রামের আলী আকবর খানের সঙ্গে কুমিল্লা অঞ্চলে তিনি এসেছিলেন। তাঁরা দৌলতপুর যাওয়ার পথে কুমিল্লা কান্দিরপাড়ে ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্তের বাড়িতে যাত্রাবিরতি করেন। ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্তের স্ত্রী বিরজাসুন্দরী দেবীকে আলী আকবর খান মা বলে ডাকতেন। এবারে তিনি নজরুলেরও মা হলেন। ঐ বাড়িতে আরো ছিলেন বিরজাসুন্দরী দেবীর বিধবা জা গিরিবালা দেবী এবং তাঁর মেয়ে দোলনা ওরফে প্রমীলা। এ বাড়িতেই নজরুল ও প্রমীলার প্রথম পরিচয় হয়েছিল। দৌলতপুর গ্রামে আলী আকবর খানের পরিবার ছিল কৃষিনির্ভর। ঐ পরিবারে আলী আকবর খানের এক বিধবা বোনের মেয়ে সৈয়দা খানম ওরফে নার্গিস আসার খানমের সঙ্গে নজরুলের বিয়ে ঠিক হয়েছিল। দুর্ভাগ্যবশত যথাযথভাবে তাঁদের বিবাহ সম্পন্ন হতে পারেনি। বিয়ের রাতেই নজরুল দৌলতপুর ত্যাগ করে কুমিল্লা চলে যান এবং কলকাতা ফেরার আগে কয়েকদিন কুমিল্লায় অবস্থান করেন।

১৯১৪ খ্রিস্টাব্দে নজরুলের পরিচয় হয়েছিল ময়মনসিংহ অঞ্চলের সঙ্গে আর ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে পরিচয় হয় কুমিল্লা ও গোমতী তীরবর্তী দৌলতপুর অঞ্চলের মানুষের সমাজ ও জীবনধারার সঙ্গে। নজরুল নার্গিসকে নিয়ে ঘর বাঁধতে না পারলেও নার্গিস নজরুলের হৃদয়ে গভীর ছাপ ফেলেছিল। পরবর্তীকালে রচিত নজরুলের বিভিন্ন কবিতা, গান ও চিঠিতে নার্গিসের স্মৃতি অমøান হয়ে রয়েছে। কুমিল্লা অঞ্চলেই নজরুল নার্গিসকে হারিয়েছিলেন কিন্তু পেয়েছিলেন প্রমীলাকে। কিন্তু নজরুলের জীবনে কুমিল্লা শুধুমাত্র ব্যক্তিগত কারণেই গুরুত্বপূর্ণ নয়, রাজনৈতিক কারণেও তা তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে কুমিল্লা তোলপাড় ছিল অসহযোগ আন্দোলনে। সে সময়ে তিনি কুমিল্লাতে ছিলেন এবং অসহযোগ আন্দোলনে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেন। শুধু সভা ও শোভাযাত্রায় যোগদান নয়, সঙ্গে সঙ্গে স্বদেশি গান রচনা, সুর সংযোজন এবং গলায় হারমোনিয়াম ঝুলিয়ে রাজপথে স্বদেশি গান পরিবেশন। এভাবেই ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে কুমিল্লা শহরে নজরুলের প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড জাগরণমূলক সঙ্গীত রচনার সূত্রপাত হয়েছিল।

১৯২২ খ্রিস্টাব্দে নজরুল অর্ধসাপ্তাহিক ‘ধূমকেতু’ পত্রিকা প্রকাশ করেন। এই ধূমকেতু পত্রিকাকে আশীর্বাদ জানিয়ে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন :

আয় চলে আয়, রে ধূমকেতু,

আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু,

দুর্দিনের এই দুর্গশিরে

উড়িয়ে দে তোর বিজয় কেতন!

অলক্ষণের তিলকরেখা

রাতের ভালে হোক না লেখা,

জাগিয়ে দে রে চমক মেরে

আছে যারা অর্ধচেতন!

নজরুল রবীন্দ্রনাথকে আশাহত করেননি। ধূমকেতু ২৬ সেপ্টেম্বর ১৯২২ সংখ্যায় নজরুলের সুবিখ্যাত রাজনৈতিক রূপক কবিতা ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ প্রকাশিত হয়। রচনাটি ইংরেজ শাসকদের দৃষ্টি এড়ায়নি। ফলে ধূমকেতুর এই সংখ্যাটি বাজেয়াপ্ত এবং নজরুলের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয় নভেম্বর মাসে। নজরুল তখন কুমিল্লায় চলে যান এবং বিরজাসুন্দরীর বাড়িতে আশ্রয় নেন। পুলিশ নজরুলকে কুমিল্লা থেকে ১৯২২ খ্রিস্টাব্দের ২৩ নভেম্বরে গ্রেপ্তারের পর কলকাতা নিয়ে যায়। কুমিল্লা থেকে নজরুলের গ্রেপ্তার একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। বিচারাধীন বন্দি নজরুলকে রবীন্দ্রনাথ তাঁর গীতিনাট্য ‘বসন্ত’ উৎসর্গ করেন। নজরুলের বিরুদ্ধে রাজদ্রোহের মামলার রায় প্রকাশিত হয় ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দের ১৬ জানুয়ারি। তিনি এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। বন্দি নজরুল হুগলি জেলে বন্দিদের প্রতি দুর্ব্যবহারের প্রতিবাদে মে মাসে আমরণ অনশন ধর্মঘট করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ শিলং থেকে টেলিগ্রাম করেছিলেন, ‘এরাব ঁঢ় যঁহমবৎ ংঃৎরশব, ড়ঁৎ ষরঃবৎধঃঁৎব পষধরসং ুড়ঁ’. কিন্তু সে টেলিগ্রাম নজরুলের হাতে পৌঁছায়নি। শেষ পর্যন্ত ঊনচল্লিশ দিন পর বিরজাসুন্দরী দেবী নজরুলের অনশন ভাঙাতে সমর্থ হয়েছিলেন। এরপর নজরুলকে বহরমপুর জেলে বদলি করা হয় এবং সেখান থেকে তিনি ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি মাসে মুক্তিলাভ করেন। নজরুল জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর কুমিল্লায় আসেন এবং প্রমীলাকে বিবাহের প্রস্তাব দেন কিন্তু এই প্রস্তাবে প্রমীলার মা গিরিবালা দেবী ছাড়া পরিবারের কেউ সম্মত ছিলেন না। নজরুল তখন গিরিবালা দেবী ও প্রমীলাকে নিয়ে কলকাতা চলে আসেন। সেখানে মাতৃসমা হুগলির মিসেস এম রহমানের তত্ত্বাবধানে ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দের ২৫ এপ্রিল নজরুল ও প্রমীলার বিবাহ সম্পন্ন হয়। এভাবেই সমাপ্ত হয় নজরুল জীবনের কুমিল্লা অধ্যায়।

কুমিল্লা অধ্যায়ের পর নজরুলকে দেখা যায় ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে ফরিদপুরে কংগ্রেস অধিবেশনে যোগ দিতে এবং মহাত্মা গান্ধী ও দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের সামনে ‘র্ঘ্ োরে ঘোর আমার সাধের চরকা ঘোর’ প্রভৃতি স্বদেশি গান পরিবেশন এবং তাঁর নিষিদ্ধ গ্রন্থসমূহ বিক্রয় করতে। ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে নভেম্বর মাসে নজরুল পূর্ববাংলা থেকে ভারতীয় কেন্দ্রীয় আইন সভার নির্বাচনে প্রতিদ্ব›িদ্বতা এবং পরাজয়বরণ করেন। ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে শুরু হয় তাঁর ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ। ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে জুলাই মাসে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়। অতি অল্প সময়ের মধ্যেই এ বিশ^বিদ্যালয় পূর্ব-উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের মুসলমান ছাত্রদের উচ্চ শিক্ষাকেন্দ্র হয়ে ওঠে। এ বিশ^বিদ্যালয়কে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ এবং ‘বুদ্ধির মুক্তি’ আন্দোলন, প্রকাশিত হয় মুখপত্র ‘শিখা’। এই আন্দোলনকে বলা যায় সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি মুসলমান সমাজের প্রথম সাংস্কৃতিক আন্দোলন। এই আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন যশোর থেকে আগত ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ আবুল হুসেন। বিজ্ঞানের অধ্যাপক কাজী মোতাহার হোসেন, ঢাকা কলেজের অধ্যাপক কাজী আবদুল ওদুদ, ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলের শিক্ষক আনওয়ারুল কাদের। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্রদের মধ্যে ছিলেন কবি আবদুল কাদির ও সাহিত্যিক আবুল ফজল। মুসলিম সাহিত্য সমাজের আদর্শ ছিলেন ধর্মনিরপেক্ষ তুর্কি প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা মুস্তাফা কামাল আতাতুর্ক। ঢাকার সাহিত্য সমাজের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের যোগাযোগ স্থাপিত হয়। ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত মুসলিম সাহিত্য সমাজের প্রথম বার্ষিক সম্মেলনে তিনি আমন্ত্রিত হয়ে যোগদান করেন। কৃষ্ণনগর থেকে ঢাকায় আসার পথে স্টিমারে বসে রচনা করেন ‘খোশ আমদেদ’ গানটি যার প্রথম দুটি কলি ছিল ‘আসিলে কে গো অতিথি উড়ায়ে সোনালি ও চরণ ছুঁই কেমনে দুই হাতে মোর মাখা যে কালি’। এ গানটি নজরুল সাহিত্য সম্মেলনে প্রথমদিন পরিবেশন করেন। প্রথমদিনের অধিবেশন শেষে এবং দ্বিতীয়দিনের অধিবেশন শুরু হয় নজরুল পরিবেশিত গজল গানের আসর দিয়ে। এই দিন নজরুল তাঁর শ্রেষ্ঠ ইসলামি কবিতা ‘খালেদ’ আবৃত্তি করে সকলকে মুগ্ধ করেছিলেন। এ সভায় তিনি বলেছিলেন, ‘আজ আমি এই মজলিসে আমার আনন্দবার্তা ঘোষণা করছি। বহুকাল পরে কাল রাতে আমার ঘুম হয়েছে। আজ আমি দেখছি এখানে মুসলমানদের নূতন অভিযান শুরু হয়েছে। আমি এই বার্তা চতুর্দিকে ঘোষণা করে বেড়াব।’ নজরুলের ঐ বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, তিনি ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ‘বুদ্ধির মুক্তি’ আন্দোলনের প্রবক্তাদের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পেরে কতটা আশান্বিত হয়েছিলেন।

১৯২৮ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে ঢাকায় মুসলিম সাহিত্য সমাজের দ্বিতীয় বার্ষিক সম্মেলন হয়, অধ্যাপক কাজী মোতাহার হোসেন তখন সাহিত্য সমাজের সম্পাদক। ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে দ্বিতীয় বার্ষিক সম্মেলনে যোগদান করতে এসে নজরুল বেশ কিছুদিন ঢাকায় কাটান। এ সম্মেলনের উদ্বোধনের জন্যই তিনি নূতনের গান ‘চল্্ চল্্ চল্্ ঊর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল’ রচনা করেছিলেন। গানটি ‘শিখা’ পত্রিকা ছাড়াও ইংরেজি বিভাগের ছাত্র বুদ্ধদেব বসু এবং অজিত দত্ত সম্পাদিত ‘প্রগতি’ পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। ঢাকায় এবারের সফরে নজরুল ‘এ বাসি বাসরে আসিলে কে গো ছলিতে’, ‘নিশি ভোর হলো জাগিয়া পরাণ প্রিয়া’, ‘আমার কোন ক‚লে আজ ভিড়ল তরী’ প্রভৃতি গজল রচনা করেন যার প্রথম দুটি ‘প্রগতি’তে প্রকাশিত হয়েছিল। ঢাকায় এবারে নজরুলের ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল অনেক বিদগ্ধজনের সঙ্গে যাদের মধ্যে ছিলেন ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ সুরেন্দ্রনাথ মৈত্রেয়, তাঁর গুণবতী কন্যা উমা মৈত্রেয় (নোটন), অধ্যাপক কাজী মোতাহার হোসেন, কৃতী ছাত্র ও সাহিত্যিক বুদ্ধদেব বসু এবং কবি অজিত দত্ত, সুগায়িকা রানু সোম (প্রতিভা বুস), অঙ্ক বিভাগের এম এ ক্লাসের ছাত্রী ফজিলাতুন্নেসা প্রমুখ। পরে তিনি আর দু’একবার ঢাকায় আসেন তবে সুস্থাবস্থায় তিনি শেষবারের মতো ঢাকায় এসেছিলেন ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে ঢাকা বেতার কেন্দ্রের প্রথম বার্ষিকী অনুষ্ঠানে যোগদানের জন্য। সেবারে তিনি ঢাকা বেতার কেন্দ্র থেকে তাঁর রচিত ‘পূর্বালী’ নামক একটি গীতিবিচিত্রা পরিচালনা করেন। এই গীতিবিচিত্রায় সঙ্গীতে চিত্ত রায় ও শৈলদেবী এবং ঢাকা বেতারের স্টাফ আর্টিস্ট রণেন কুশারী অংশ নেন। এই গীতিবিচিত্রার জন্য তিনি ঢাকা আসার পথে স্টিমারে বসে রচনা করেছিলেন ‘আমি পূরব দেশের পুরনারী’।

বাংলাদেশের আর যে স্থানটি নজরুলের কাব্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে তা হলো, বন্দর নগরী চট্টগ্রাম। ১৯২৬ ও ২৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি চট্টগ্রামের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ মরহুম আবদুল আজিজের দৌহিত্র সাহিত্যরসিক হবীবুল্লাহ বাহার তাঁর ভগিনী শামসুন নাহার (মাহমুদ)-এর আমন্ত্রণে চট্টগ্রামে আসেন। চট্টগ্রামের প্রকৃতি অর্থাৎ সাগর, নদী, পাহাড় এবং ঝর্না নজরুলকে এতই মুগ্ধ করেছিল যে তিনি ‘সিন্ধু’ কবিতা (তিন তরঙ্গ) ‘কর্ণফুলী’, ‘শীতের সিন্ধু’, ‘বাতায়ন পাশে গুবাক তরুর সারি’ এবং ‘সাম্পানের গান’ প্রভৃতি রচনা করেছিলেন। বস্তুত চট্টগ্রাম নিয়ে রচিত কবিতা সংবলিত দুটি উৎকৃষ্ট কাব্যগ্রন্থ রয়েছে যার একটি ‘সিন্ধু-হিন্দোল’ এবং অপরটি ‘চক্রবাক’। এ ছাড়া তিনি মরহুম আবদুল আজিজকে নিয়ে ‘বাংলার আজিজ’ নামে একটি কবিতা রচনা করেছিলেন যা মাসিক মোহাম্মদী পত্রিকার প্রথম সংখ্যায় মুদ্রিত হয়েছিল। তিনি ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে রাজশাহী ও সিলেট সফর করেন।

১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে নজরুলকে পুনরায় চট্টগ্রামে আমন্ত্রণ জানানো হয়, উদ্দেশ্য ছিল কবি সংবর্ধনা। নজরুল সম্পর্কে মোহাম্মদী পত্রিকায় বিরূপ সমালোচনায় ক্ষুব্ধ হয়ে চট্টগ্রামবাসীদের পক্ষ থেকে নজরুলকে ব্যাপকভাবে সংবর্ধনা জানানোর আয়োজন করা হয়েছিল। ফলে নজরুল ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি মাসের শেষদিকে পুনরায় চট্টগ্রাম সফর করেছিলেন। এ সময় তিনি তাঁর পরম সুহৃদ রাজবন্দি কমরেড মুজফ্্ফর আহমদের জন্মস্থান স›দ্বীপ সফর করেন। স›দ্বীপে কার্গিল স্কুলের মাঠে কবিকে সংবর্ধনা জানানো হয়। পরে তিনি কমরেড মুজফ্্ফর আহমদের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে তাঁর স্ত্রীর খোঁজ-খবর নেন। ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দে নজরুল চট্টগ্রামের রাউজান সফর করেন যার উদ্যোক্তা ছিলেন সাহিত্যিক মাহবুব-উল আলমের পরিবার-পরিজন। সেখানেও কবিকে বিপুল সংবর্ধনা জানানো হয়।

নজরুল পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ এবং শৈশবকাল অতিবাহিত করেন। ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দে ছাড়া কৈশোরের বাকি সময় তাঁর অতিবাহিত হয় রানীগঞ্জ এবং আসানসোল অঞ্চলে। যৌবনে আড়াই বছর করাচি সেনানিবাসে কাটে তাঁর জীবন। তারপর থেকে কিছুকাল হুগলি এবং কৃষ্ণনগর বাদ দিলে তাঁর কর্মজীবন কাটে কলকাতায় অথচ সেই বাল্যকালেই তিনি পূর্ববাংলার ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশাল অঞ্চলে সপ্তম শ্রেণিতে এক বছরের স্কুল জীবন কাটান আর ১৯২০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দে তিনি বারবার পূর্ব, উত্তর ও দক্ষিণবাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে ছুটে আসেন। বরিশাল, কুমিল্লা, ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিরাজগঞ্জ, ফরিদপুর, রংপুর, কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনা, চুয়াডাঙ্গা প্রভৃতি অবিভক্ত বাংলার পশ্চাৎপদ জনপদসমূহের মানুষের কাছে এসেছেন, সভা ও অনুষ্ঠান করেছেন। ঐ সব জমায়েতে তিনি জাগরণের কথা বলেছেন, স্বাধীনতার বাণী শুনিয়েছেন, ধর্মান্ধতা ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে মন্ত্র দিয়েছেন অর্থাৎ কাজী নজরুল ইসলাম অবিভক্ত বাংলার বৃহৎ অংশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে জাগিয়ে তুলেছেন বক্তৃতায়, গানে, আবৃত্তিতে এবং তাঁর বর্ণাঢ্য ব্যক্তিত্বের উপস্থিতিতে। আর সে কারণেই মুক্তিযুদ্ধের পর স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম নজরুল জন্মবার্ষিকীর প্রাক্কালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁকে সপরিবারে বাংলাদেশে নিয়ে আসেন এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে অধিষ্ঠিত করেন। একই কারণে তাঁর শেষ শয়ান বাংলাদেশের মাটিতে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় মসজিদের পাশে। নজরুলের স্মৃতি বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ের গভীরে। তাই তিনি বাংলাদেশের জাতীয় কবি, তিনি বাঙালির জাতীয় কবি, বাংলাদেশের জাতীয় কবি।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj