নজরুল-কাব্যে প্রেম

শুক্রবার, ৩০ আগস্ট ২০১৯

শ্যামল কান্তি দত্ত

বাংলা কাব্যসাহিত্যে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬) আবির্ভূত হন রোম্যান্টিক প্লাবনের যুগে। ফলে তিনিও বিবেক-বর্জিত আবেগাপ্লুত হতে বাধ্য হন অনেকটা যুগের প্রভাবে। প্রেমের কবিতা লিখতে গিয়েও তিনি মূলত বুদ্ধিনির্ভর কবি নন, হৃদয়নির্ভর কবি। প্রেমের ক্ষেত্রেও তিনি মিলনের কবি নন; বিরহের কবি, ব্যথার কবি, চোখের জলের কবি। তাঁর বিরহ বৈষ্ণব পদাবলির রাধার মতো বুক ভাঙা বিরহ নয়; সংসার অনভিজ্ঞ বাউণ্ডুলে তরুণ-তরুণীর ইচ্ছে করে পরস্পরের অভাবজনিত মন উদাস করে রাখা- খামখেয়ালিপনা। তাঁর প্রেমিকা রবীন্দ্রনাথের জীবনদেবীর মতো নিরুদ্দেশ যাত্রী নয়- সে প্রেমিকা কামনাকাক্সক্ষী মর্ত্যরে নায়িকা। আর তাই তীব্র বেদনায় সমাচ্ছন্ন হলেও সুন্দর এক আশার অভীপ্সায় তিনি মুখরিত কবি। ব্যক্তি এবং কবি হিসেবে নজরুল ছিলেন রোম্যান্টিক, সুন্দরের পূজারী; আর প্রেমিক নজরুলের গভীর প্রেমানুভূতির রসে টইটুম্বুর করা কাব্য দোলন-চাঁপা। এখানে দেখা যায় : নারী অধিকার করেছে তাঁর অভিজ্ঞতা আর অভিজ্ঞানকে। বস্তুত, ‘বিদ্রোহী’ কবিতা লিখে বিদ্রোহী কবি অভিধায় সমধিক পরিচিতি লাভ করলেও, তিনি তাঁর প্রেম সম্পর্কিত কবিতার মাধ্যমেই কাব্য-জগতে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।

প্রেমিক নজরুলের প্রণয়লীলা-উদ্ভূত মান-অভিমান, অনুরাগ-বিরাগ ও দ্ব›দ্ব-সংশয়ের অপূর্ব প্রকাশ দোলন-চাঁপা। তিনি প্রেসিডেন্সি জেলে অবস্থানকালে দোলন-চাঁপা (১৯২৩) রচনা করেন। কবির কারাবাসের সুযোগে তাঁর প্রেমিকা অন্যের হতে যাচ্ছেন এ পটভূমিতে রচিত হয় দোলন-চাঁপা। তবে দোলন-চাঁপা কাব্যের প্রেমানুভূতিই তাঁর প্রেমের কবিতার মূল সুর। ‘দোল’ অর্থ আন্দোলিত, দোদুল্যমান। কবি প্রিয়া দোদুল্যমান, একনিষ্ট নয়; চাঁপা একপ্রকার ফুল। আসলে এ গ্রন্থের নামকরণেও কবির প্রেমিক মনের প্রতিক্রিয়া বহুলাংশে ব্যবহৃত। কাব্যগ্রন্থের নামকরণে কবি তাঁর প্রেয়সী প্রমীলা নজরুল ওরফে দোলনের নাম ঘোষণা করেন। কবি দোলন শব্দটির সাথে নিজেকে চাঁপা অর্থে কল্পনা করে শব্দ দুটিকে পাশাপাশি বসিয়ে মাঝখানে হাইফেন দিয়ে চমৎকার এক ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করেন।

কবি-হৃদয়ের হাসি-কান্না, দ্বিধা-দ্ব›দ্ব, স্বপ্ন-আবেগ, আশা-আকাক্সক্ষা, সুখ-দুঃখ, বেদনা ও বিরহ এ গ্রন্থের কবিতাগুলোর নামকরণেও পরিস্ফুট। দোলন-চাঁপা কাব্যের কবিতা ভিত্তিক আলোচনা করলে দেখা যায়- ‘দোদুল-দুল’ দোলন-চাঁপার প্রথম কবিতা; এখানে কবি বলেছেন- ‘সকল কাজ / করায় ভুল / প্রিয়ার মোর / কোথায় তুল?’ (দোদুল-দুল)। প্রিয়ার রূপ, প্রিয়ার স্পর্শ, তাঁর হৃদয়ে প্রতিধ্বনিত হয়েছে। স্পর্শমণির মতো কবি-হৃদয়কে রূপান্তরিত করে তাঁর সমস্ত সত্তাকে আলোড়িত করেছে। ‘পথহারা’ কবিতায় ফুটে উঠেছে কোনো এক বিরহিনীর জীবনের দুঃসহ একাকীত্ব আর হৃদয় বেদনার চিত্র। ‘অবেলার ডাক’ কবিতায় কবি মানব জীবনের সুখ-দুঃখ হাসি কান্না বিরহ মিলন আশা আকাক্সক্ষার কথা প্রকাশ করতে চেয়েছেন। এতে এক হতভাগিনীর মর্মবেদনা প্রকাশিত হয়েছে। কবি প্রেমের অমৃত শক্তিতে বিশ্বাসী। তাই প্রেমিকার উক্তিতে তিনি বলতে পারেন যে, প্রেমিক-প্রেমিকার মৃত্যু অভিমানজনিত ক্ষণকালের বিরহ ছাড়া কিছুই নয়। সুতরাং প্রেমিক অবশ্যই প্রেমিকার সেই চিরন্তন শক্তিতে প্রেমাস্পদের কাছে ফিরে আসবে। প্রেমিকা তার খোঁজে আঁধারে হারিয়ে গেলেও তিনি হতাশ নন; কেননা তিনি জানেন বা বিশ্বাস করেন- ‘মা গো আমি জানি জানি/আসবে আবার অভিমানী’ (অবেলার ডাক)।

‘পূজারিনী’ কেবল দোলন-চাঁপা কাব্যগ্রন্থ নয় বলতে গেলে নজরুলের প্রেমের কবিতাগুলোর মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য কবিতা। খণ্ডিতার খণ্ডিত মন নিয়ে কবিচিত্ত এ কবিতায় পরিতৃপ্ত হয় না। তিনি চান সর্বব্যাপী, বিশ্বব্যাপী এক অখণ্ড প্রেম, সে আশায় তিনি বলেন- ‘ছিল আশা ছিল শক্তি বিশ্বটারে টেনে এনে/ছিঁড়ে তব রাঙ্গা পদতলে ছিন্ন রাঙ্গা পদ্মসম পূজাদেব এনে!/কিন্তু হায়! কোথা সেই তুমি?’ (পূজারিনী)। তবু রবীন্দ্রনাথের প্রেমের আত্মনিবেদন ও প্রশান্তি নজরুলের কাব্যে অতটা নেই বললে চলে। নজরুল নারী কিংবা প্রেয়সীকে শ্রদ্ধা করেছেন, অকপটে স্বীকার করেছেন ঠিকই। কিন্তু গভীর ও একনিষ্ঠ প্রেমের ক্ষেত্রে তাঁর চিত্ত সন্দেহ, অশ্রদ্ধা এবং অনীহায় ভরে উঠেছে। তিনি নারীকে লোভী, অতিলোভী, ছলনাময়ী, মায়াময়ী ও মায়াবিনী ইত্যাদি অভিধায় অভিহিত করেছেন আর অবলীলায় ভর্ৎসনা করেছেন- ‘এ তুমি সে তুমিতো আজ নও/আজও হেরি তুমিও ছলনাময়ী/তুমিও হইতে চাও মিথ্যা দিয়া জয়ী।’ (পূজারিনী)। কিন্তু এরপরও আপন প্রেমে অবিচল রয়ে যান কবি চিরকাল। বিরহের বিষ পান করে নীলকণ্ঠ হয়ে যেতে কবির কোনো আপত্তি নেই- ‘তব প্রেমে মৃত্যুঞ্জয়ী/ব্যথা বিষে নীল কণ্ঠ কবি!’ (পূজারিনী)। অভিশাপ যে, বিশ্ব প্রকৃতির একটা ক্ষণিক বিদ্রোহমাত্র, তা নজরুলের কবিতায় পরিস্ফুট- ‘আমার বুকে যে কাঁটা ঘা তোমায় ব্যথা হান্ত/ সেই আঘাতই যাচবে আবার হয়তো হয়ে শান্ত/আসব তখন পান্থ।’ (অভিশাপ)।

ঐ অভিশাপের আড়ালে রয়েছে প্রেমিক মনের মমতার ছবি যা স্বপ্নের মাধুরী দিয়ে ঘেরা। আর তাই ‘আশান্বিতা’ কবিতায় প্রেমের এক চিরন্তন আশ্বাসের সুর ধ্বনিত হয়েছে। প্রেমিকা জানে তার নাথ তার ডাকে সাড়া না দিয়ে পারবে না। এবং সত্যিকার প্রেমিক জনের কাছে তার হার মানতে হবে। প্রেমের দুর্বার আকর্ষণ শক্তি প্রেমিককে মৃত্যু থেকে ফিরিয়ে আনে এবং প্রেমিক-প্রেমিকার সব অপরাধ ক্ষয়ে তাকে বুকে টেনে না নিয়ে থাকতে পারে না। প্রেম চিরন্তন অমর এবং দীর্ঘ বিরহেই প্রেমের পরীক্ষা। তাই কবি বলেন- ‘যতই কেন বেড়াও ঘুরে/মরণ বনের গহন জুড়ে/দূর সুদূরে/কাঁদলে আমি আসবে ছুটে রইতে দূরে না রবে নাথ।’ (আশান্বিতা)। ‘পিছুডাক’ কবিতায় নিজের মন-মন্দিরে কবি প্রেয়সীর আরাধনা করেছেন। নিজের অসাধারণ কবিত্বশক্তি দিয়ে কবি প্রেয়সীর প্রতি প্রেম নিবেদন করেছেন- ‘সখি! নতুন ঘরে গিয়ে আমায় পড়বে কি আর মনে/সেথায় তোমার নতুন পূজা নতুন আয়োজনে।’ (পিছুডাক)। ‘শেষ প্রার্থনা’ কবিতায় নজরুলের প্রেমিক হৃদয়ের এক চিরন্তন আশা আকাক্সক্ষা উচ্ছ¡াস আর আকুতি প্রকাশ পেয়েছে। প্রেমের সমস্ত দ্ব›দ্ব-বিরোধ, দুঃখ-বেদনা আর হতাশার যেন এ জনমেই সমাপ্তি ঘটে। এবং পরবর্তী জীবনে যেন আনন্দময় রসময় প্রেমের নিত্য আবির্ভাব ঘটে- এ তাঁর একান্ত প্রত্যাশা। তাইতো তিনি বলেন- ‘আজ চোখের জলে প্রার্থনা মোর শেষ বরষের শেষে/যেন এমনি কাটে আসছে জনম তোমায় ভালোবেসে।’ (শেষ প্রার্থনা)। এ যেন কেবল কোনো রোম্যান্টিক কবির প্রার্থনা নয়, এ যেন প্রতিটি আধুনিক নর-নারীর, যুগলজীবন যাপনকারীর প্রাণের কথা। এভাবে নজরুলের সমগ্র কবিতার আলোচনায় না গিয়ে কেবল দোলন-চাঁপা কাব্যগ্রন্থের কবিতার ভিত্তিতে বলা চলে, ওয়ার্ডসওয়ার্থ, রবীন্দ্রনাথ কিংবা জীবনানন্দ দাশের মতো নজরুল প্রকৃতি প্রেমিক ছিলেন না। মানব প্রেম তথা নারী-প্রেমকে তিনি সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন। কিন্তু নারীর ঔদাসিন্য, অবমাননা এবং নির্মম আচরণ কবিকে অবিশ্বাসী করে তুলেছে বারবার। আর তাই কবি তাঁর অলব্ধ প্রেমিকার অনামিকা প্রেমকে দোলন-চাঁপার কবিতার মাধ্যমে শিল্প সুষমা দান করেছেন। চিরন্তন যে প্রেম প্রতিটি পুরুষ প্রতিটি নারী ধারণ করে মানব হৃদয়ে। প্রেমাস্পদকে পেয়েও সে পরিপূর্ণ তৃপ্তি পায়নি। আবার তাকে হারাতেও চায় না কেউ চিরতরে। অনাগত দিনে আবার পাবার প্রত্যাশায় দিন যাপন করে- এই যেন প্রেমের রীতি। নজরুলগীতি ও নজরুল-কাব্যে প্রেমের সেই সুরই প্রতিধ্বনিত হয়েছে বিচিত্র রূপে।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj