রহিমা চেšধুরানী : অনির্বাণ মহীয়সী

শুক্রবার, ৩০ আগস্ট ২০১৯

সৈয়দ জাহিদ হাসান

আগস্ট মাস বাঙালি জাতির জন্য অশ্রæবর্ষণের মাস। বাঙালি জাতি এই আগস্ট মাসে তার অনেক শ্রেষ্ঠ সন্তানকে হারিয়েছে। এই শ্রেষ্ঠ সন্তানদের মধ্যে আছেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, আছেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, নোবেল জয়ী প্রথম বাঙালি কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ আরো অনেক বরেণ্য ব্যক্তিবর্গ। এই আগস্ট মাসের ২৮ তারিখেই আমরা হারিয়েছি আরেকজন দেশপ্রেমিক, মানবতাবাদী, দক্ষ সংগঠক, দুঃসময়ের আশ্রয়, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম যোদ্ধা রহিমা চৌধুরানীকে। অত্যন্ত নিভৃতচারী এই মহীয়সী নারী বাংলাদেশের বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রেরণা জুগিয়েছেন।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে রহিমা চৌধুরানী অসামান্য অবদান রাখেন। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানিরা ঘুমন্ত বাঙালি জাতির ওপর বর্বর হত্যাযজ্ঞ শুরু করলে রাজারবাগে বাঙালি সৈনিকরা প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। এক পর্যায়ে রাজারবাগের দেশপ্রেমিক সৈনিকরা পালাতে বাধ্য হন। তখন তারা অনেকেই রহিমা চৌধুরানীর বাসার ইঁদারার মধ্যে রাইফেল রেখে নিরাপদ স্থানে চলে যান। ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর হত্যার পরে জাসদের ক্যাডাররা হামলা চালায় তার বাসায়। সেনাবাহিনীর সদস্যরা লুট করে রহিমা চৌধুরানীর বাড়ি। তাতে অনেক টাকা-পয়সা ও স্বর্ণালঙ্কার খোয়া যায়। সেনাবাহিনীর সদস্যরা গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায় তাকে ও তার পুত্র আবদুর রহিম চৌধুরীকে। পরে তাদের সসম্মানে ছেড়ে দেয়া হয়। রেখে দেয়া হয় তাদের লাইসেন্সকৃত রিভলবার। পরে অবশ্য রিভলবারও ফেরত দেয় সেনাবাহিনীর সদস্যরা। জীবনে অনেক নির্যাতন সহ্য করতে হয় তাকে ও তার পরিবারকে। তবু দেশসেবার ব্রত থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করেননি তিনি। বরং তার দেশপ্রেম ও দেশের মানুষের প্রতি ভালোবাসা হৃদয়ে চির বহমান ছিল।

রহিমা চৌধুরানী তার জীবদ্দশায় রাস্তাঘাট, স্কুল-কলেজের উন্নয়নসহ অনেক দাতব্য প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তিনি বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন ফর ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ (বিএফডিআর)-কে তার স্মৃতিবিজড়িত ২৩ চামেলীবাগের বাসার ৫০০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট স্বেচ্ছায় দান করেন। এই প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠা করেন দেশবরেণ্য সাবেক সফল অর্থমন্ত্রী প্রয়াত শাহ এ এম এস কিবরিয়া ও লেখক-গবেষক-কলাম লেখক মোনায়েম সরকার। এখনো বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন ‘থিংক ট্যাংক’ হিসেবে নিরলসভাবে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও উন্নয়ন বিষয়ক নানা গবেষণা করে যাচ্ছে।

রহিমা চৌধুরানী দীর্ঘজীবী (৯৬ বছর) হয়েছিলেন। মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত তিনি সুস্থ-স্বাভাবিক ছিলেন। আমার সৌভাগ্য হয় তাকে খুব কাছ থেকে দেখার ও তার ¯েœহধারা পান করার। তাকে যতটুকু দেখেছি এবং বুঝেছি তাতে মনে হয়েছে তার অকাল প্রয়াণ দেশের জন্য একটি বিরাট ক্ষতির কারণ। তার মৃতদেহ দেখার জন্য এ দেশের অনেক গুণীজন ২৮ আগস্ট তার বাসভবনে এসেছিলেন। কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরীকে আমি নিজে তার জন্য অঝরে অশ্রæ বিসর্জন করতে দেখেছি। তার শবযাত্রার সাথী হয়ে আমি যখন টাঙ্গাইল জেলার ঘাটাইল উপজেলার দীঘলকান্দি গ্রামে যাই তখন রাত প্রায় আটটা বাজে। বন্যাদুর্গত দীঘলকান্দি গ্রামে রাত আটটা মানে অনেক রাতই বলতে হয়। অত রাতেও তার জানাজায় হাজার হাজার নারী-পুরুষ-শিশু এসে শরিক হয়। একজন নারীর জানাজায় এত রাতে হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতি জানিয়ে দেয় মানুষ হিসেবে মানুষের কাছে তিনি কত প্রিয় ছিলেন। তিনি দয়াময়ী ও পরোপকারী ছিলেন। স্বাধীনতার পরে মনি সিংয়ের স্ত্রী অনিমা সিং একবার তার কাছে এক হাজার টাকা ধার চান। অনিমা সিংয়ের পুত্র মস্কো যাওয়ার জন্য গরম পোশাক কিনবে বলে ওই টাকার দরকার ছিল। এই কথা শোনার পরে তিনি সঙ্গে সঙ্গে অনিমা সিংকে এক হাজার টাকা বের করে দেন। তবে ধার হিসেবে নয়, একজন সন্তানের মা হিসেবে তিনি এই টাকা সন্তানকে উপহার দেন।

শ্রদ্ধাভাজন মোনায়েম সরকারের কাছে রহিমা চৌধুরানী ছিলেন মাতৃসমা। তার কাছে রহিমা চৌধুরানীর অনেক গল্প শুনেছি। তার একটি হলো বিশিষ্ট কলামিস্ট ও লেখক আবদুল গাফফার চৌধুরী বিষয়ক। আবদুল গাফফার চৌধুরী রহিমা চৌধুরানীকে নিয়ে ম্যাক্সিম গোর্কির ‘মা’ উপন্যাসের মতো একটি উপন্যাস লিখতে চেয়েছেন। তার মতো একজন বিরলপ্রজ কথাশিল্পী যদি রহিমা চৌধুরানীকে উপন্যাসের উপজীব্য করেন, নিঃসন্দেহে তাতে অনেক অজানা ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য থাকবে। আমরা আশা করবো আবদুল গাফফার চৌধুরী দ্রুত তার পরিকল্পিত উপন্যাসটি সমাপ্ত করে পাঠকের সামনে তুলে ধরবেন। একবার রহিমা চৌধুরানী তার এলাকার মানুষদের অনুরোধে একটি রাস্তার আবেদন নিয়ে মহামান্য রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের কাছে যান। জিল্লুর রহমান তাকে দেখেই চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ান এবং তিনি বিনীতভাবে জানতে চান ‘খালাম্মা কি জন্য এসেছেন’। তখন তিনি রাস্তার দাবি জানালে সঙ্গে সঙ্গে জিল্লুর রহমান যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। এমনি আরো অসংখ্য ঘটনা আছে রহিমা চৌধুরানীকে নিয়ে, যা ছোটখাটো নিবন্ধে ধারণ করা কঠিন।

কিছু কিছু মানুষ থাকেন যারা সামান্য আয়ু দিয়ে এমন সব অসামান্য কাজ করেন যে, এই জন্য পৃথিবীর মানুষ তাদের কাছে চিরদিন ঋণী হয়ে থাকেন। এরকম লোকের সংখ্যা কম হলেও সব যুগে, সব দেশেই এমন ক্ষণজন্মা, মহৎপ্রাণ মানুষেরা জন্মগ্রহণ করেন। রহিমা চৌধুরানী ছিলেন এমনই একজন ক্ষণজন্মা মহৎপ্রাণ নারী। যার মৃত্যুতে মৃত্যুই হেরে গেছে, মৃত্যুঞ্জয় হয়েছেন তিনি। এমন এক অনির্বাণ, মহীয়সী নারীকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj