মুস্তাফিজ শফি : বিরহ, বিষণœতার ভিন্নস্বরে ভেজা কবি

শুক্রবার, ৩০ আগস্ট ২০১৯

নব্বই দশকের দীর্ঘ কবিদের ভিড়ে কবি মুস্তাফিজ শফি ভিন্নস্বরে ভেজা একটি অন্যতম প্রধান নাম। বর্তমানে তিনি স্বনামেই খ্যাত। তার কবিতা পাঠককে সামনের সমুদ্র বা বাতিঘরের দিকেই নিয়ে যায়। নিয়ে যায় নস্টালজিক ভিন্ন এক জীবনানুভূতিতে। তিনি তার বিরহ, বিষণœতার ভিন্নস্বরে ভেজা কবিতা দিয়ে মানুষের জীবনের নানাবিধ গল্প ও যন্ত্রণার কথা, বেদনার কথা- সুখের কথা বলে যান আমাদের। তিনি একটি প্রাপ্তি ও অপূর্ণতার কথা বলে যান। অনুশোচনায় দগ্ধ হয়ে, বেদনায় পুড়ে পুড়ে কবি খাঁটি বাংলা, আমাদের এই সুন্দর-স্বাধীন দেশের কথা বলে যান এবং এখানেই তিনি স্বকীয়-সুন্দর। শফির কবিতার ছন্দ, অলঙ্কার (উপমা-উৎপ্রেক্ষা, প্রতিয়োমানোৎপ্রেক্ষা), চিত্রকল্প, প্রতীক কিংবা গভীরতর ভাব-ব্যঞ্জনা দ্রুত পাঠককে আন্দোলিত, উদ্বেলিত করে। ব্যথায় তিরতির করে লাফিয়ে ওঠে পাঠকের মানসজগৎ। পাঠকের মনে, সংবেদনশীল ইন্দ্রিয়ে একটা জটিল প্রেম ও পৌষের ঝরাপাতার মতো হাহাকারের সংকেত তৈরি করতে পারেন কবি মুস্তাফিজ শফি। এটা কবির মুনশিয়ানা। তার কবিতার পঙ্ক্তিতে পঙ্ক্তিতে মানুষের জীবনের একটা সামগ্রিক চিত্র আছে। চিত্রকল্প আছে। ‘বিরহসমগ্র’টিতে কবি ঘুরে-ফিরে ব্যথা ও বিষণœতার কাছেই নিজেকে সঁপে দিয়েছেন। গ্রন্থটিতে প্রেম আছে, বিরহ থেকে বাঁচার তাড়না আছে- কিন্তু শেষ পর্যন্ত কবিকে না পাওয়ার ব্যথা-বেদনা আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে। কবির কবিতাগুলো পড়তে পড়তে কখনো কখনো মনে হয়, কবি আমাদের এই সমাজের, দেশের, আমাদের ভেতর-বাইরের ঘটনার এপিঠ-ওপিঠ সব জানেন। বোঝেন। কবি তার ফেলে আসা সুন্দর শৈশব-কৈশোর, প্রেম-ভালোবাসা, জীবন-যন্ত্রণার ছবি দিয়ে আমাদের ইন্দ্রিয়-অনুভূতিতে ভালোবাসার বিকাশ ঘটাতে চান। মহৎ বেদনাবোধ না থাকলে, মনের ভেতর হাহাকার না থাকলে- কখনো সৃষ্টি হয় না ভালো কোনো কবিতা কিংবা সুরের। মন যদি কেমন না করে, তবে কিসের প্রেম, কিসের ভালোবাসা? কবি তার নিঃসঙ্গ বেহালার তারে সেই মন কেমন করা হাহাকারটাই নিয়মিত বাজিয়ে চলেন। কবি তার নিজস্ব ভাষাশৈলী দিয়ে আমাদের আরো সুন্দর-সজাগ করতে চান এবং আমরা শেষ পর্যন্ত বেড়ে উঠি একটি সবুজ প্রান্তরে। সাগর-সমুদ্রে।

নীল কষ্টকে শিশিরে ধুয়ে আমি আজ সাদা করবো, কিংবা সবুজ।

বছরের প্রথম বৃষ্টিতে যেমন পবিত্র হয়ে ওঠে শহরের পিচ ঢালা কালো পথ- আজ এই জোছনা বৃষ্টিতে তুমিও কি আমার কাছে দৃশ্যের ভেতর থেকে সেরকম কোনো দৃশ্যমান হয়ে উঠছ?

রজনীগন্ধা কিংবা বেলীফুলের চেয়ে আমার কাছে প্রিয় মহুয়ার গন্ধ। বনে বনে কদম ফুটলে নাগরিক দালালগুলো কি রকম জানি আর্তনাদ করে ওঠে।

মহুয়া মাতাল আমিও আজ বুকের ভেতর ভাঙনের শব্দ শুনি।

-দহনের রাত : ভাঙনের শব্দ-২৬

কবি মুস্তাফিজ শফি নিঃসঙ্গ ও নির্জনতার কাছে তার দীর্ঘশ্বাস গচ্ছিত রাখেন। কবি আটকে থাকেন বিষণœ দুপুরের কাছে। কবির কিছুই ভালো লাগে না। অবশেষে, দিনরাত- সর্বক্ষণই তিনি নির্জনতাকেই সঙ্গী করে নেন। কবি বলেন-

নির্জনতা- আমি আজ যাব তোর বাড়ি।

-নির্জনতার বাড়ি

জানি, বৃষ্টি নামলেই তুমি

কিছু দীর্ঘশ্বাস লিখে রাখ।

বিরামহীন বৃষ্টির মধ্যে

ছলকে ওঠে জলের শব্দ, কান্নার শব্দ।

-জানি বৃষ্টি নামলেই

যারে উড়ে যা, উড়ে যা বেদনা পাখি

এই ভালো, তবু একেলা থাকি।

-দহনের রাত-৩৫

ক্ষয়ে পড়া, ক্ষয়িষ্ণু এই পৃথিবীর বুক থেকে কবির সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। প্রেম-প্রীতি, ভালোবাসা আজ তার আর কিছু নেই। আছে উজ্জ্বল দিনের শেষের হাহাকার, মুছে যাওয়া আলো আর গুচ্ছ গুচ্ছ অন্ধকারসহ কোলাহলহীন ব্যথা-বেদনা আর প্রেম-প্রতারক ভালোবাসা। ভেঙে দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া, ব্যথায় নীল হওয়া কবি বলেন-

দৃশ্যে অদৃশ্যে থাকো তুমি, আত্মার চিৎকারে

করুণার বালুচরে খুঁজে নিও আহত পাখিটারে।

-ব্যক্তিগত রোদ এবং অন্যান্য : চার

না হয় হলো না কিছু- চলো আজ খেলি মরীচিকা মরীচিকা।

– মরীচিকা মরীচিকা খেলা-১

কবি মুস্তাফিজ শফির ব্যথা ও বিষণœতার শেষ নেই। হাহাকারের শেষ নেই। রিমঝিম বৃষ্টি এলে অথবা একা ঘরে কবির বুকের ব্যথা চাড়া দিয়ে ওঠে। ‘কবির বিষণœ বান্ধবীরা’ গ্রন্থের ৩৭নং কবিতায় কবি বলেন-

রিমঝিম রিমঝিম শব্দ শুনি, বৃষ্টি পড়ে কই

মনের ঘরে একলা আমি, একলা জেগে রই।

-কবির বিষণœ বান্ধবীরা-৩৭

পল্লীবালা বা প্রকৃত নারীরা অনেক কিছুই মুখ ফুটে বলে না। বলতে পারে না। নিজে জ্বলে-পুড়ে শেষ হয়ে যায়; তবু স্বামী বা তার প্রিয়জনকে কিছুই বলে না। কোথায় যেন একটা দ্বিধা-দ্ব›দ্ব, লজ্জা কাজ করে। অথচ চায়- একেই বলে লজ্জা। লজ্জা নারীর ভূষণ। আমরা মুস্তাফিজ শফির কবিতাতেও দেখতে পাই, নারীর সেই ভূষণ। সে ভোরকে বিদীর্ণ করে, গলে গলে যায়। তবু মুখ ফুটে কিছু বলে না-

আর রমণীর দুঃখ-

শেষ রাতে অতৃপ্ত বেদনায়

মোমের মতো গলে গলে

ভোরকে বিদীর্ণ করে।

মধ্যবিত্ত কবিতাগুচ্ছ : দুঃখ

বেদনাহত, বিদগ্ধ নারী অথবা ভারী দুঃখ নিয়ে মুস্তাফিজ শফি আরো বলেন-

… নারী তার খুলেছে কপাট- ধবধবে প্রিয় বিছানায় নগ্ন দুঃখ। সহসা ক’ফোঁটা বৃষ্টি; ছুড়ে ফেলি জোছনার মদে ভর্তি গøাস।

যারা প্রেমিক তারা নির্বোধ। বোধের দেয়ালে খুলে গেলে দৃষ্টির দরোজা- মধ্যরাতে ভুল গদ্যময় জীবনের চেয়ে সত্য কিছু নেই।

পড়ো তোমার প্রেমিকার নামে : প্রসব বেদনায় নীল এক কবি

মানুষের ব্যথা পুঞ্জীভূত হতে হতে একদিন পাহাড় বা পাথর হয়ে যায়। সেই পাহাড়সম বুক ভরা ব্যথা নিয়ে মানুষ বাঁচতে পারে না; বাঁচে না। কবিও মানুষ এবং শেষ পর্যন্ত সে তার ব্যথা ও বিষণœতাকে তাড়ানোর জন্য উঠেপড়ে লাগে। কবি মুস্তাফিজ শফি তার ‘ব্যক্তিগত রোদ এবং অন্যান্য’ কাব্যগ্রন্থের আট ও নয় নম্বর কবিতায় তার এই পুঞ্জীভূত ব্যথাকে তাড়ানোর জন্য বলেন-

আজও আমি এই বাতাসে শিস দিয়ে বেড়াই

আজও আমি আনমনে বিষণœতা তাড়াই।

-ব্যক্তিগত রোদ ও অন্যান্য-৮

বলো, কতো আর পুষে রাখি-

লোকে যাকে দুঃখ বলে আমি বলি পাখি।

-ব্যক্তিগত রোদ ও অন্যান্য-৯

কবি মুস্তাফিজ শফিকে নিয়ে নওশাদ জামিলের মন্তব্যের সাথে আমি অনেকটা একমত। তিনি কবি মুস্তাফিজ শফি সম্পর্কে বলেন, ‘কবি মুস্তাফিজ শফি টানা গদ্যেই লিখেছেন অধিকাংশ কবিতা। স্পষ্ট ও নমিত ভাষায় কথা বলেন তিনি, বাকচাতুর্যে নয়, কবিতায় যা অনিবার্য হয়ে ধরা দেয়, তার পঙ্ক্তিতে তা-ই উঠে আসে। তার কবিতায় অলঙ্কারের বাহুল্য আছে, আছে বুদ্ধিপ্রবণ উপস্থিতিও। কবিতাগুলো যেন চর্চিত কবিতার খোলস ভেঙে বেরিরে আসার বাসনায় কাতর। কবির মন ও মানসের সুপ্ত কথাকলি তিনি যেভাবে ব্যক্ত করেন, নির্বিকারভাবে খোলাসা করেন, তাতে জড়তা নেই। কবিতায় সোজাসাপ্টা বলা দরকার, বলেছেন। যেখানে বাঁকা কিংবা কিছুটা-বা আড়াল করে বলা দরকার, কবিতায় বাঁকা কথাতেই যেন ব্যঞ্জনা গভীর হয়, শফি তাও করেছেন।

:: মৃধা আলাউদ্দিন

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj