বটবৃক্ষ

শুক্রবার, ৩০ আগস্ট ২০১৯

বঙ্গ রাখাল

বড়বিলে ধানের বিস্তৃত মাঠ। চারদিকে ধান হেলেদুলে একে অন্যের ওপর লুটেপুটে পড়ছে। এই ধান ক্ষেতের মাঝ দিয়ে এঁকেবেঁকে গেছে অজাগর রাস্তা। রাস্তা ধরে সামনের দিকে গেলেই গোলকনগর গ্রাম। গ্রামের মাঝখানে ইউনিয়ন পরিষদের বোর্ড অফিস আর এই বোর্ড অফিসের সামনেই একদিন সৈকত সাধু এবং ছাত্তারের রোপণকৃত বিশাল বটবৃক্ষ আপন মহিমায় দাঁড়িয়ে আছে।

একদিন গ্রামের মানুষের প্রাণের জায়গা ছিল এই বটবৃক্ষ। সবাই বটতলে এসে আনন্দ উল্লাস করতো। যাত্রা-গাজীর গান হতো এমনকি ওষুধের ক্যানভাচাররাও ওষুধের পুঁটুলি খুলে এখানেই বিক্রির জন্য বসে যেত। এই বটবৃক্ষ যেমন গ্রাম্য মানুষের আনন্দের সাক্ষী তেমন বেদনারও। একবার এই গ্রামেরই ছেলে জাইবারকে যৌথবাহিনী সন্ত্রাস ভেবে- এই বটবৃক্ষের সাথে পিঠমোড়া করে বেঁধে কি যে মারা মেরেছিল তা মুখে বলা যায় না। এই বৃক্ষের অন্তরেও কম কষ্ট নেই। গ্রামে যেবার খাঁ আর মণ্ডলদের বড় কেজে হয়েছিল তারও সাক্ষী এই বৃক্ষ। দুই পক্ষেরই ইটের আঘাতে শরীর ক্ষত-বিক্ষত হয়েছিল বৃক্ষটির।

এখন বিশালাকায় এই বটতলে হাট বসে। সবাই হাটের নাম রেখেছে বটতলার হাট। হাটের উত্তরদিকে ডাকপিয়ন তাহাজউদ্দিনের এবং গ্রাম্য চৌকিদার সাহেবের চায়ের দোকান। পশ্চিমে রব্বান মণ্ডলের হোমিওপ্যাথির দোকান যা এক সময় এখানকার বড় মুদিখানার দোকান ছিল। দবির ও ছাত্তারের মুদিখানার দোকানও পশ্চিমে আর দক্ষিণের দিকে সেলিমের দোকান। হাটের উত্তর-দক্ষিণ দিকে পুরাতন বোর্ডের অতি প্রাচীন প্রাসাদ কার্তিকের শক্তি সম্বল করে দাঁড়িয়ে আছে।

এই বটবৃক্ষে বাসা বেঁধেছে এক রাজশালিক। এই শালিকটি আমার অতি পরিচিত। তার সাথে আমার মনের সম্পর্ক হতে হতে জৈবিক সম্পর্ক পর্যন্ত গড়ায়। তার বাসায় যাই, ঘুমাই তার শরীরে মুখ লুকিয়ে পড়ে নিই তার শরীরী সংবাদ। একসাথেই এক ডাল হতে অন্য ডালে ঘুরে বেড়াই, পাতায় পাতায় সংসার সাজাই। আমাদের এত এত আনন্দ গ্রামের মানুষের সহ্য হলো না। তারা আমার আর শালিকের মাঝে তুলে দিলো নারী-পুরুষের দেয়াল। আমি কেন শালিকের সাথে মিশি? আমি কেন শালিকের বাসায় গিয়ে থাকি এমন নানা প্রশ্ন।

একদিন গ্রামের মানুষদের ডাকা হলো সালিশ বসলো আমাকে আর শালিককে নিয়ে। আমি বেহুদা পুরুষের মতো দুগালে হাত দিয়ে বসে আছি। গ্রাম্য মাতব্বরের বিচার হলো এমন অশ্লীল কাজ করার জন্য শালিককে পাথর নিক্ষেপ করবে আর আমাকে ক্ষমা করা হলো। কারণ আমাকে কেন শালিক তার ঘরে তুলতো? আমার তো কোনো দোষ নেই? সব দোষ শালিকের। আমি পুরুষ না হলে হয়তো আমাকেও পাথর মেরে হত্যা করা হতো। কারণ এ সমাজ তো পুরুষের কথাতেই পরিচালিত হয়। আমি চিৎকার করে বলি- আমি মানি না সমাজের মনগড়া নিয়মনীতি। আমরা তো কোনো দোষ করিনি, আমরা ডালে ডালে ঘুরেছি, একসাথে মিশেছি এটা কি অপরাধ? এরপর থেকে আমিও এক ঘরে হলাম আর শালিক হারালো জীবন।

অতঃপর একদিন ঘাসফুলের সাথে ধানের মাঠে ঘুড়ি উড়াচ্ছি। দেখি আকাশে একঝাঁক রাজশালিক, তারা আমার দিকে পাথর নিক্ষেপ করছে আর বলছে- তুই পুরুষ না তুই নপুংসক। কেন সমাজের অন্যায়ের বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিবাদ করলি না। কেন আজো মানিস সমাজের আদি কাঠামো। ভেঙে ফেল মানুষের সুবিধাভোগী সমাজ পরিচালনার যত সব ভণ্ডামীর মাথা…ততক্ষণে ভোরের আলোয় চারদিকে আলোকিত হয়েছে।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj