ছোটদের প্রিয় কবি কাজী নজরুল : জহিরুল ইসলাম

বুধবার, ২৮ আগস্ট ২০১৯

কাজী নজরুল ইসলামের জন্ম ১৮৯৯ সালের ২৫ মে; ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে। নজরুল বাংলাদেশের জাতীয় কবি। পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ- দুই বাংলাতেই তার কবিতা ও গান সমানভাবে জনপ্রিয়। তার কবিতায় বিদ্রোহী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তাকে বিদ্রোহী কবি নামে ডাকা হয়। কবিতা ছাড়াও নজরুল ইসলাম গল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধ লিখেছেন। তিনি প্রায় ৩ হাজার গান রচনা করেছেন এবং এর অধিকাংশ গানে সুরারোপ করেছেন। শিশুদের জন্যও তিনি অনেক মজার মজার ছড়া, কবিতা ও গান লিখেছেন। নজরুলের মধ্যে ছিল শিশুসুলভ সারল্য। তিনি নিজেই বলেছেন, আমি চির শিশু, চির কিশোর। সেজন্যই তিনি সহজ ভাষায় শিশুদের জন্য লিখতে পারতেন মজার মজার ছড়া-কবিতা-গান।

ভোর হলো দোর খোল

খুকুমণি ওঠো রে

ঐ ডাকে জুঁই শাঁখে

ফুল খুকি ছোট রে।

খুলি হাল তুলি পাল

ঐ তরী চলল

এইবার এইবার

খুকু চোখ খুলল।…

নজরুল ইসলামের উপরের কবিতাটি পড়েনি এমন লোক খুঁজে পাওয়া কঠিন। তার আরো একটি জনপ্রিয় শিশুতোষ কবিতা সকাল বেলার পাখি। কবিতাটি এমন :

আমি হব সকাল বেলার পাখি

সবার আগে কুসুম-বাগে

উঠব আমি ডাকি!

সুয্যি মামা জাগার আগে

উঠব আমি জেগে,

হয়নি সকাল, ঘুমো এখন,

মা বলবেন রেগে।…

কিশোর বয়সে নজরুলের রচিত বাংলা-ইংলিশ মেশানো একটি কমিক গান বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। গানটি এ রকম :

রব না কৈলাসপুরে

আই অ্যাম ক্যালকাটা গোইং।

যত সব ইংলিশ ফ্যাশন

আহা মরি, কি লাইটনিং।

ইংলিশ ফ্যাশন সবি তার

মরি কি সুন্দর বাহার

দেখলে বন্ধু দেয় চেয়ার,

কামঅন ডিয়ার গুড মর্নিং।…

তরুণ বয়সে তিনি ‘মুক্তি’ নামে একটি কবিতা লেখেন। কবিতাটির অংশবিশেষ এরকম :

রানীগঞ্জের অর্জুনপট্টির বাঁকে,

যেখান দিয়ে নিতুই সাঁঝে ঝাঁকে ঝাঁকে

রাজার বাঁধে জল নিয়ে যায় শহুরে বৌ কলস কাঁখে-

সেই সে বাঁকের শেষে

তিনদিক হতে তিনটে রাস্তা এসে

ত্রিবেণীর ত্রিধারার মতো গেছে একেই মিশে।…

সিয়ারসোল স্কুলে পড়ার সময় নজরুল রচনা করেন ‘চড়–ই পাখির ছানা’ নামের কবিতা :

মস্ত বড় দালান বাড়ির উঁই লাগা ঐ কড়ির ফাঁকে

ছোট একটি চড়াই ছানা কেঁদে ডাকছে মাকে।

‘চু’ ‘চা’ রবের আকুল কাঁদন যাচ্ছিল নে বসন বায়ে।

মায়ের পরান- ভাবলে বুঝি দুষ্টু ছেলে নিচ্ছে ছায়ে।…

শিশু বয়সে সব শিশুই যেমন মায়ের কাছে সব কিছু

জানতে চায় নজরুলও তেমনি চেয়েছেন। তবে ছড়ার মাধ্যমে :

মাগো! আমায় বলতে পারিস

কোথায় ছিলাম আমি

কোন না জানা দেশ থেকে তোর

কোলে এলাম নামি?

১৯২১ সালের কথা। নজরুল এসেছেন কুমিল্লায় বেড়াতে। উঠেছেন ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্তের বাড়িতে। তার মিষ্টি মেয়ে অঞ্জলি। একদিন নজরুল বারান্দায় বসে আছেন। হঠাৎ তার চোখ পড়ল অঞ্জলির দিকে। দেখলেন, একটা পেয়ারাগাছের নিচে দাঁড়িয়ে অঞ্জলি কার সঙ্গে যেন কথা বলছে। তিনি ভাবলেন, গাছে যে আছে তার কাছে অঞ্জলির জন্য একটা পেয়ারা চাইবেন। কিন্তু কাছে গিয়ে গাছে কাউকেই দেখতে পেলেন না। তাহলে কার সঙ্গে কথা বলছিল অঞ্জলি? অঞ্জলিকে জিজ্ঞেস করলেন নজরুল, তুমি কার সঙ্গে কথা বলছিলে? অঞ্জলি বলল, ওই দেখো দুষ্টু কাঠবেড়ালি। রোজ রোজ দুষ্টুটা পেয়ারা খেয়ে পালিয়ে যায়। আমাকে একটাও দেয় না। কাঠবেড়ালির সঙ্গে অঞ্জলির এই মান-অভিমানের ঘটনাটি নজরুলের মনে এতটাই দাগ কাটল যে, তিনি লিখে ফেললেন ‘খুকী ও কাঠবিড়ালি’ নামের কবিতাটি-

কাঠবেড়ালি! কাঠবেড়ালি! পেয়ারা তুমি খাও?

গুড়-মুড়ি খাও? দুধ-ভাত খাও? বাতাবি নেবু? লাউ?

বেড়াল-বাচ্চা? কুকুর-ছানা? তাও?…

নজরুলের লিচুচোর নামের বিখ্যাত কবিতাটিও তো আমাদের সবার পড়া তাই না?

বাবুদের তাল-পুকুরে

হাবুদের ডাল-কুকুরে

সে কি বাস করলে তাড়া,

বলি থাম্ একটু দাঁড়া…

কী, তোমরা পড়োনি কবিতাটি? আবৃত্তির সঙ্গে সঙ্গে অভিনয় করার মতো এমন কবিতা নজরুল ছাড়া আর কে লিখবেন! আর শিশুদের এই গানটি কে লিখেছে জানো? কোন গানটি? ওই যে-

প্রজাপতি প্রজাপতি

কোথা পেলে ভাই এমন রঙিন পাখা!

টুকটুকে লাল নীল

ঝিলিমিলি আঁকাবাঁকা।…

এটাও কিন্তু আমাদের প্রিয় কবির লেখা।

কাজী নজরুল ইসলাম শিশুদের প্রতি অন্তরের ভালোবাসা দিয়ে শিশুসাহিত্যকে করে তুলেছেন আবেগময় ও হৃদয়স্পর্শী। ছোটদের জন্য রচিত তার প্রতিটি কবিতায় ফুটে উঠেছে শিশুদের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা। তোমরা বড় হতে হতে তার শিশুতোষ রচনাগুলো পড়বে। আর বড় হলে পড়তে পারবে নজরুলের আরো অনেক অনেক লেখা।

সবশেষে তোমাদের একটা তথ্য জানাতে চাই। তোমাদের অনেকের মনেই প্রশ্ন আসতে পারে, নজরুল ইসলামের জন্ম ভারতে, তিনি আমাদের জাতীয় কবি হলেন কী করে? এই প্রশ্নের উত্তরটা জানা দরকার, তাই না? ১৯৭২ সালের ২৪ মে অসুস্থ কবিকে স্বাধীন বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়। তাকে দেয়া হয় জাতীয় কবির মর্যাদা। সেদিন কবির সঙ্গে ছিল তার পুরো পরিবার। বড় ছেলে কাজী সব্যসাচী ও তার স্ত্রী উমা কাজী, ছোট ছেলে কাজী অনিরুদ্ধ ও তার স্ত্রী কল্যাণী কাজী এবং তাদের সন্তানেরা এসেছিলেন কবির সঙ্গে। তার আগে তখনকার বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান ভারতের কলকাতায় গিয়ে কবিকে স্বাধীন বাংলাদেশে আনার সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করে এসেছিলেন। ধানমন্ডির ১৮ নম্বর সড়কের একটি ভবনে কবিকে রাখা হয়েছিল রাষ্ট্রীয় মর্যাদায়। ১৯৭৫ সালের ২৩ জুলাই তাকে তৎকালীন পিজি (বর্তমান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট মারা যান কাজী নজরুল ইসলাম। তবে তার জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী পালনের ক্ষেত্রে বাংলা তারিখ (১১ জ্যৈষ্ঠ ও ১২ ভাদ্র) অনুসরণ করা হয়।

ইষ্টিকুটুম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj