বর্বরতা রোধে ঐক্যবদ্ধ হোক শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ : দিল মনোয়ারা মনু

সোমবার, ২৬ আগস্ট ২০১৯

এ দেশের সচেতন বিবেকবান মানুষ অসহায় ইয়াসমিনের করুণ মৃত্যু এবং দিনাজপুরের প্রতিবাদী মানুষসহ এ দেশের মানুষের সেই কঠিন লড়াইকে কোনোদিনই ভুলতে পারবে না। কারণ ইয়াসমিন আজ আর কোনো একটি নাম বা কোনো অসহায় ধর্ষিতা কিশোরী মাত্র নয়। ইয়াসমিন আজ দেশপ্রেমিক বাংলাদেশের সচেতন মানুষের কাছে একটি মিলিত প্রতিরোধের প্রতীক। ইয়াসমিনের ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিল ভদ্রতার মুখোশধারী, রক্ষক সেজে ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া ক্ষতিকর ঘুণে পোকাটিকে কবর দিতে হবে চিরতরে। ১৯৯৫-এর ২৪ আগস্ট এই নির্মম হত্যাকাণ্ড অনুষ্ঠিত হয়। সেই থেকে এই দিনটি নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। কিন্তু এত আন্দোলন, এত প্রতিরোধ সত্ত্বেও পুলিশের নির্মম নির্যাতন, ধর্ষণ এখনো ঘটে চলেছে। যেই থানায় অসহায়, নির্যাতিতরা বিচার চাইতে যায় সেখানেই রক্ষকদের হাতে নতুন করে নির্যাতিত হয়। বিচারের সত্যতাকে মিথ্যা দিয়ে ধামাচাপা দেয়ার জন্য নানা কৌশলের আশ্রয় নেয়। ঢাকার কাছে ক্ষমতার কাছে প্রায়ই নতজানু হয় তারা। এই বাহিনী কবে শান্তির প্রহরী হবে? আদৌ হবে কি?

নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধের জন্য একই কথা আমরা বারবার বলছি? আবার সভা, সেমিনার, গোলটেবিলের আলোচনা শুনতে শুনতে ত্যক্ত-বিরক্তও হচ্ছি? একই কথা বারবার শুনতে বা বলতে কারই বা ভালো লাগে। কিন্তু না বলে উপায় কি? নারীর প্রতিনিয়ত ঘটে যাওয়া নির্মম সহিংসতাকে সমান গুরুত্ব দিয়ে যথাযথ পরিকল্পনা গ্রহণ ও তা বাস্তবায়ন না করলে নারী উন্নয়ন ও তাদের ক্ষমতায়নসহ সব প্রক্রিয়া স্তব্ধ হয়ে যাবে। তাই এই ইস্যুটি সমধিক গুরুত্ব দিয়ে উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। একই ধরনের নির্যাতনের ঘটনা যদি বারবার ঘটতেই থাকে বা এর মাত্রা এবং নির্মমতা যদি সমাজকে ক্রমাগত বিদীর্ণ করতে থাকে, নারীর অস্তিত্ব যদি হুমকির মুখে পড়ে ক্রমাগত বিপন্ন হয়ে ওঠে, তবে না বলে কি পারা যায়? যদিও জানি দীর্ঘ সময় ধরে বারবার বলেও এর তেমন কোনো টেকসই প্রতিকার হচ্ছে না। কোনো প্রাচীনকালে নারী নির্যাতনের সূত্রপাত হয়েছিল, তা এখনো অব্যাহত রয়েছে। নির্যাতনের হার বৃদ্ধি এবং নিত্য নতুন ধরন ও কৌশলের কথা বিবেচনা করলে শঙ্কিত না হয়ে পারা যায় না। কালের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নির্যাতকরা শিখে নিয়েছে নানা নিপীড়ন ও নির্মমতার নানা উপায় ও কৌশল। এসিড থেকে আগ্নেয়াস্ত্র সবই প্রয়োগ করা হচ্ছে নারীর ওপর। সম্প্রতি এক পরিসংখ্যানে জানা গেছে, গত ছয় মাসে গড়ে প্রতিদিন ৩ জন করে মোট ৬৩০ জন ধর্ষিত হয়েছে। এর মধ্যে ৩৭ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। মে মাস থেকে জুন পর্যন্ত যৌতুকের কারণে হত্যা করা হয়েছে ১৩ জনকে এবং নির্যাতিত হয়েছেন ১৫ জন। শ্লীলতাহানি ১১২ জন, গণধর্ষণ ১৩ জন, অগ্নিদগ্ধে মৃত্যু ১৫ জন, পতিতালয়ে বিক্রি ১২ জন। কিন্তু আমরা এও জানি নারীরা সব বাধাকে তুচ্ছ করে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধে শামিল হচ্ছে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নানা উদ্যোগের মধ্য দিয়ে নারীরা অগ্রগতির পথে অনেক দূর অগ্রসর হয়েছে। নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রেও তারা ভূমিকা রাখছে। ভূমিকা রাখছে কৃষিতে, কলকারখানায়, পোশাক শিল্পে, সাহিত্য, বিজ্ঞান, ক্রীড়া, সাংবাদিকতা, জাতিসংঘ শান্তি মিশনে অংশগ্রহণ এবং সব শেষে পর্বতারোহণের মতো চ্যালেঞ্জিং উদ্যোগেও সফল হয়েছেন তারা। কিন্তু তারপরও বড় সত্য হচ্ছে সব ক্ষেত্রে নারীরা এখনো সমানভাবে এগিয়ে আসেনি। নারীর ক্ষমতায়ন ঘটেনি সমাজ, রাষ্ট্র, পরিবারসহ সব অঙ্গনে। মহিলা পরিষদের সভানেত্রী আয়শা খানম বলেন, আমরা আন্দোলন কর্মীরা অনেক ঘরে গিয়েছি কিন্তু সব ঘরে পারিনি। নারীর অগ্রগতির পথ অবাধ ও উন্মুক্ত করতে নারীর ক্ষমতায়নের কোনো বিকল্প যে নেই তা সবাই বলছেন। কয়েক বছর আগে নেপালের কাঠমান্ডুতে অনুষ্ঠিত নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধে সম্মিলিত উদ্যোগ শীর্ষক দুদিনব্যাপী এক সেমিনারে দক্ষিণ এশিয়ার নারী নেত্রীরা নারীর প্রতি সহিংসতা বৃদ্ধিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে। তারা সহিংসতা বন্ধে নীরবতা ভেঙে নারীদের সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। যদিও আমরা জানি নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে বাংলাদেশ সরকার নানা ধরনের আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন এবং আন্তর্জাতিক নীতিমালায় স্বাক্ষর করেছে, কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে আইন প্রণয়ন করে তার সঠিক প্রয়োগের অভাবে এই সহিংসতা বন্ধ করা যাচ্ছে না। নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধে আগামী জেন্ডার বাজেটে বরাদ্দ বাড়ানোর দাবি উঠেছে। কমনওয়েলথ সচিবালয় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এক সময়ে নারী উদ্যোক্তারা ৭০০ মিলিয়ন ডলার অর্থের জন্য তহবিল গঠন করারও তাগিদ দিয়েছিলেন। ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব বিজনেস এন্ড প্রফেশনাল উইমেন্স ক্লাবের প্রেসিডেন্ট ফ্রেডা মিরিকলিস সেই সভায় আহ্বান জানিয়েছিলেন। বলেছিলেন নারীদের পেছনে বিনিয়োগ বাড়ালে তা শুধু পরিবার নয়, সমাজ ও রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। উদ্যোক্তা হওয়ার ক্ষেত্রে নারীকে শুধু নারী বলেই বাধাগ্রস্ত হতে হয়। বিনিয়োগের স্বল্পতা ও জ্ঞানের অভাবই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। কমনওয়েলথ নারীদের সেই সম্মেলনে প্রতিনিধিরা নারীকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বেশি করে যুক্ত হওয়ার রূপরেখা প্রণয়নে উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তারা মনে করেন, এতে দেশের দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) বাড়বে এবং দেশের অর্থনীতিতে নারীর ভূমিকা শক্ত মজবুত হবে। নারীর ক্ষমতায়নের প্রথম ও প্রধান শর্ত হচ্ছে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা। এই স্বাধীনতার মূল্য বুঝতে পেরেছেন বলেই আজকের নারীরা অনেকেই বিস্তৃত কর্মক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়ছেন। নারীরা বুঝতে পেরেছেন পুরুষের সমকক্ষ হওয়া মানে নারিত্ব বিসর্জন দেয়া নয়। সত্যিকার অর্থে নারীর কল্যাণময়ী মূর্তির সঙ্গে আধুনিক ভাবমূর্তির কোনো বিরোধ নেই। নারী সমাজ, পরিবার, রাষ্ট্র- সব ক্ষেত্রে সমানভাবে ক্ষমতায়িত হলে নারীর প্রতি সহিংসতা বহুলাংশে হ্রাস পাবে। ইদানীং নারী নির্যাতনের অসংখ্য ঘটনা আমাদের নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে। এর কারণ নির্যাতনকারী পুরুষের পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা, অপরাধ করে শাস্তি না পাওয়ার দৃষ্টান্তের আধিক্য, রাষ্ট্রের কার্যত উদাসীনতা এবং পুরুষ সমাজে নারীর চরম অসহায়তা। নারীর ক্ষমতায়ন ঘটলে এই অসহায়তার বিরুদ্ধে সে রুখে দাঁড়াতে পারবে। যদিও আমাদের সমাজের নারীরা ক্রমশ পুরুষের আধিপত্য ভাঙছে তবুও এ কথা অনস্বীকার্য যে, প্রগতিশীলতা স্বাধিকার ও অর্থনৈতিক স্বয়ম্ভরতার তাৎপর্য অনুভব করতে পারছেন আমাদের নারী সমাজের সীমিত একটা অংশ মাত্র। তাই বিস্তৃত অঙ্গনের প্রতিটি নারীকে নিজের ওপর আস্থা রাখতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে, তাদের অনুপ্রাণিত করতে হবে, ভাবতে হবে পুরুষের সমকক্ষ মানুষ হিসেবে। প্রচলিত মানদণ্ডে নিজেকে না মেপে, গতানুগতিক ¯্রােতে গা না ভাসিয়ে শক্তি অর্জন করতে হবে তাকে ¯্রােতের মুখ ঘুরিয়ে দেয়ার বিরল ক্ষমতা অর্জনে।

সব শেষে বলতে হয় নারীর ক্ষমতায়ন, সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা, উন্নয়ন দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক অর্থনৈতিক রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক পরিকল্পনার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই অব্যাহত শোষণ, নির্যাতন, বৈষম্য থেকে নারী সমাজকে মুক্ত করার জন্য শোষণ বৈষম্য নির্যাতনহীন সুস্থ সমতাপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্র প্রস্তুত থাকতে সরকার, রাজনৈতিক দলকে। সুশীল সমাজকে নিতে হবে সমন্বিত প্রয়াস গ্রহণ করার উদ্যোগ। পরিবারকেও নারীর ক্ষমতায়নের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। নারীকে অধিকার সচেতন, শিক্ষিত এবং সুনাগরিক হয়ে ওঠার শিক্ষা সে পরিবার থেকেই পেয়ে থাকে। সেই প্রতিবাদী সত্তা, মানবিকতা, সৎ সাহস, নির্ভীক, মুক্ত মানসিকতা গঠনে যা হতে পারে তার যথার্থ দিশারি, শিক্ষক এবং স্বপ্নদ্রষ্টা।

পাশবিকতা ও নিষ্ঠুরতার ব্যাপক প্রসারে আজ আমাদের মানবতা, গণতন্ত্র বিপন্ন, লাঞ্ছিত। শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ একতাবদ্ধ হয়ে লক্ষ্যমুখী লড়াইয়ের মাধ্যমেই কেবল এই অপশক্তি রোধ এবং উৎখাত করতে পারে। কাজে লাগাতে হবে নারী ও পুরুষের সম্মিলিত প্রয়াস ও শক্তিকে। সেই লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে একমাত্র ক্ষমতায়িত নারী আর এর পেছনে সাহস প্রেরণা জোগাবেন তার শিক্ষা সচেতন পরিবার, মুক্তবুদ্ধির সমাজ এবং সঙ্গে গণতন্ত্রের সত্যিকার অর্থবহ চর্চা।

এর পাশাপাশি এই মুহূর্তে যা জরুরি তা হলো বেঁচে থাকার অধিকার প্রতিষ্ঠায় পারিবারিক এবং সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে সমান অংশীদারিত্বের যথাযথ শিক্ষা, তথ্য ও প্রযুক্তি ব্যবহারের নিরবচ্ছিন্ন, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, রাজনীতিতে নারীর সমান অধিকার, আদিবাসী নারীদের জীবন মানের নিশ্চয়তা, সম্পত্তিতে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সিডও সনদ দুইয়ের অনুমোদন, কৃষিতে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা। তাহলেই আজকের ক্ষমতায়িত নারীই উপহার দিতে পারবে আগামীর জন্য এক সৃজনশীল নতুন প্রজন্ম।

অন্যপক্ষ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj