২৪ আগস্ট ও একজন ইয়াসমিন : অন্যপক্ষ প্রতিবেদক

সোমবার, ২৬ আগস্ট ২০১৯

বেঁচে থাকলে কিশোরী মেয়েটার বয়স এখন হতো ৩৮। হয়তো স্বামী-সন্তান নিয়ে সংসার করত। তাদের নিয়েই সুখী হতো। কিন্তু এসবের কিছুই হলো না। মাত্র ১৪ বছর বয়সী মেয়েটাকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হলো। মেয়েটার জীবনের সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যু হলো অসংখ্য স্বপ্নের। মেয়েটির নাম ইয়াসমিন। ঢাকার একটি বাসায় গৃহপরিচারিকার কাজ করত। টানা তিন বছর মা-বাবার কাছ থেকে দূরে থাকায় মনটা ব্যাকুল হয়েছিল তার। মাকে এক নজর দেখার জন্য কাউকে কিছু না বলে ঢাকা থেকে রওনা হয়েছিল দিনাজপুরের দিকে। প্রায় পৌঁছেও গিয়েছিল। কিন্তু যাওয়া হলো না।

দিনাজপুর শহরের কাছাকাছি ‘দশমাইল’ এলাকায় ইয়াসমিন যখন নাইট কোচ থেকে নামে, ঘড়ির কাঁটা তখন রাত সাড়ে ৩টা। চারদিক গভীর অন্ধকার। একটি মাত্র চায়ের দোকানে দু-তিনজন ক্রেতা বসে ছিল নিজেদের মতো করে। এত রাতে রাস্তায় এবং চারপাশে লোকজন কম থাকবে, এমনটাই স্বাভাবিক। রাতের অন্ধকার ভেদ করছিল মহাসড়কে ছুটে চলা বড় বড় গাড়ির হেডলাইটের আলো। সেই সঙ্গে গাড়ির শব্দ যেন ভেঙে দিচ্ছিল চারদিকের নীরবতা। এত নির্জন পরিবেশে একা দাঁড়িয়ে বাসের জন্য অপেক্ষা করতে কিছুটা ভয়ও পাচ্ছিল মেয়েটা। তার চোখেমুখে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার ছাপ ছিল স্পষ্ট। ভয় কাটাতে চায়ের দোকানের কাছ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ছিল। আর অপেক্ষা করছিল গাড়ির। কিছুক্ষণ পর মেয়েটির সামনে এসে দাঁড়ায় টহল পুলিশের গাড়ি। গাড়িতে তিন পুলিশ সদস্য। বাড়ি পৌঁছে দেয়ার আশ্বাস দিয়ে ইয়াসমিনকে ওরা তুলে নেয় ওদের গাড়িতে। পুলিশের গাড়ি বলেই নিশ্চিন্তে তাতে ওঠে বসে ইয়াসমিন। দ্রুত মায়ের কাছে পৌঁছে যাবে সেই ভাবনায় কোনো দুর্ভাবনা তার মনের ত্রিসীমানায়ও আসেনি। কিন্তু যা ভাবেনি তাই হলো মেয়েটির সঙ্গে। গাড়ি কিছুদূর এগিয়ে যাওয়ার পরই পুলিশের পোশাক পরা মানুষগুলো হয়ে উঠল রাতের অন্ধকারের চেয়েও ভয়ঙ্কর। ওরা গাড়িতে ইয়াসমিনকে ধর্ষণের চেষ্টা করে। অতর্কিত হামলায় যেমন কোনো প্রস্তুতি থাকে না তেমনটাই হলো ইয়াসমিনের বেলায়। নিজেকে বাঁচাতে গাড়ি থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে। কিন্তু রক্ষকই যখন ভক্ষক হয় তখন বাঁচার উপায় নেই। ওরা ইয়াসমিনকে জোর করে তুলে নেয় গাড়িতে। দশমাইলের আদিবাসী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ওকে নিয়ে যায়। চলে ধর্ষণ। ওর শেষ নিঃশ^াসটুকুও কেড়ে নেয় ওরা। ধর্ষণ শেষে আবারো গাড়িতে তুলে নিয়ে চলন্ত গাড়ি থেকে ছুড়ে ফেলে দেয় ইয়াসমিনকে। শেষ হয় অনেক স্বপ্নের। এই ঘটনায় উত্তাল হয়ে ওঠে পুরো দেশ। তবে ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টাও হয়েছিল। এমনকি বিচারের দাবিতে রাস্তায় নামা মানুষের ওপর গুলিও চালায় পুলিশ। এতে প্রাণ হারান দিনাজপুর শহরের সামু, সিরাজ, কাদেরসহ সাতজন। আর পঙ্গু হয় অগণিত মানুষ। সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে উদ্যোগী হয়। কয়েকটি মামলা করা হয়। ১৯৯৭ সালের ৩১ আগস্ট এই মামলার রায় ঘোষিত হয়। রায়ে আসামি পুলিশের এএসআই মইনুল, কনস্টেবল আবদুস সাত্তার ও পুলিশের পিকআপ ভ্যানচালক অমৃত লাল বর্মণের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন বিশেষ বিধান, ১৯৯৫-এর ৬ (৪) ধারায় ধর্ষণ ও খুনের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাদের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুর আদেশ দেয়া হয়। ২০০৪ সালের সেপ্টেম্বরে অভিযুক্ত পুলিশের তিন সদস্যকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মামলার বিচারের রায় কার্যকর করা হয়।

ইয়াসমিন হত্যার পর দশমাইল মোড়ে তার নামে একটি সরণি ও স্মৃতিস্তম্ভ করা হয়েছে। প্রতি বছর ২৪ আগস্ট পালিত হয় ‘ইয়াসমিন হত্যা দিবস’ বা ‘নারী নির্যাতন ও প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে। ইয়াসমিন আজ আর কোনো একটি নাম বা কোনো অসহায় ধর্ষিতা কিশোরী মাত্র নয়। ইয়াসমিন আজ নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে সচেতন মানুষের একটি মিলিত প্রতিরোধের প্রতীক।

অন্যপক্ষ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj