নাট্যালোচনা : আরশীনগরের ‘রহু চণ্ডালের হাড়’

শনিবার, ২৪ আগস্ট ২০১৯

হেমন্ত প্রাচ্য

উপন্যাস থেকে মঞ্চনাটক এখন ঢাকার মঞ্চে যেন নিয়মিত ঘটনা। নাটকের পাণ্ডুলিপি সংকটের এই সময়ে উপন্যাসকে মঞ্চে রূপায়ন করে যেন দুধের স্বাদ ঘুলে মেটাচ্ছেন নাট্যনির্দেশকরা। কেউ কেউ অবশ্য বিষয়টিকে বলছেন, ‘উপন্যাসের মঞ্চ ভ্রমণ’। উপন্যাসকে মঞ্চে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে যে ক’জন নাট্যনির্দেশক প্রশংসিত হয়েছেন তাদের মধ্যে রেজা আরিফ অন্যতম। এর আগে শহিদুর জহিরের ‘সে রাতে পূর্ণিমা ছিল’ উপন্যাসটিকে মঞ্চে উপস্থাপন করে ঢাকার নাট্যাঙ্গনে তুমুল প্রশংসা কুড়িয়েছেন তিনি। আর গত বছরই মঞ্চে আনলেন অভিজিৎ সেনের উপন্যাস ‘রহু চণ্ডালের হাড়’। নাট্যাচার্য সেলিম আল-দীন স্মরণে গতকাল শুক্রবার নাটকটির দুটি প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হলো জাতীয় নাট্যশালার পরীক্ষণ থিয়েটার মিলনায়তনে। এটি প্রযোজনা করেছে আরশীনগর। দলটির দ্বিতীয় প্রযোজনা ‘রহু চণ্ডালের হাড়’।

রেজা আরিফের নাটক মানেই মঞ্চে আঙ্গিক অভিনয়ের সুনিপুণ প্রয়োগ। ‘রহু চণ্ডালের হাড়’ নাটকটিও সেই পথেই হেঁটেছে। মঞ্চজুড়ে অভিনয় কুশীলবদের এনার্জিটিক পদচারণা দর্শককে ভীষণভাবে আকর্ষণ করে রাখে পুরো নাটকজুড়ে। ‘রহু চণ্ডালের হাড়’ উপন্যাসটি প্রসঙ্গে উপন্যাসিক অভিজিৎ সেন বলেন, এ উপন্যাস শুধু একশ্রেণির যাযাবরের জীবন-সংগ্রামের কাহিনী নয়। এই যাযাবর গোষ্ঠী, আমার উপন্যাসে যে গোষ্ঠীর নাম বাজিকর তাদের এক-দেড়শ বছরের ঘোরাফেরাকে কেন্দ্র করে আমি একটা বিস্তৃত অঞ্চলের ওই সময়কার ইতিহাস, সমাজ, ব্যবসা-বাণিজ্য, ধর্ম ইত্যাদি বিষয়কে টুকরো টুকরো করে তুলে এনেছি। ‘রহু চণ্ডালের হাড়’ লেখা শুরু করি ১৯৮০ সালের মাঝামাঝি। আশির দশকের সেই উপন্যাসটিকে ২০১৮ সালে রেজা আরিফের নির্দেশনায় মঞ্চে আনলো আরশীনগর। ২০১৯ সালের এক সন্ধ্যায় শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত নাগরিক প্রসেনেয়িাম মিলনায়তনে বসে দেখা হলো নাটকটি। দলিত শ্রেণির জীবনগাথা নাগরিক থিয়েটারের দর্শকদের অনেকটাই দাগ কেটে গেল।

এ নাটকের মূল উপজীব্য বাজিকরদের জীবনের প্রবাহমান যাত্রা। ভারতবর্ষের প্রায় দেড়শ বছরের ইতিহাসের সঙ্গে বাজিকরের পাঁচ পুরুষের পরিভ্রমণ, থিতু হওয়ার চেষ্টা আর বিতাড়িত হওয়ার বেদনাগাথা নিয়ে আবর্তিত হয়েছে রহু চণ্ডালের হাড় নাটকের কাহিনী। ঘটনার সময়কাল ঊনবিংশ শতকের মাঝামাঝি। রাজমহলের গঙ্গায় গড়ে ওঠে বেদে জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত বাজিকরের অস্থায়ী ছাউনি। বাজিকরদের জীবনের প্রবাহমান বাস্তবতার চিত্র উঠে এসেছে নাটকটির গতিময় উপস্থাপনায়। সমগ্র ভারতবর্ষ-জুড়ে সাঁওতাল বিদ্রোহ যখন তুঙ্গে তখন কেমন করে যেন বাজিকরেরা মিশে যায় সেই বিদ্রোহের সঙ্গে। এমনি প্রেক্ষাপটে সর্দার পীতেম চেয়েছিল থিতু হোক তার জীবন। এক টুকরো জমি হোক, হোক জাতপাতের পরিচয়। কিন্তু কোথায় হবে সেই স্থির দেশ আর স্থিতিশীল জীবন। তাই তো আকাক্সক্ষার সঙ্গে মেলে না বাস্তবতা। ধর্ষণের শিকার হয় পীতেমের মেয়ে পেমা। বাজিকর পীতেম আর সালমার বেঁচে থাকার নিরন্তর চেষ্টা কিংবা লুবিনী জামিরের স্বপ্নময় ভালোবাসার কথা নিপুণ নাট্যকৌশলে প্রাণ পেয়েছে নাটকে। নাটকটিতে আঙ্গিক অভিনয়ের প্রয়োগ দর্শককে আকর্ষণ করে, তবে কোনো কোনো জায়গায় অভিনয় শিল্পীদের শারীরিক অভিনয়ে জোর দিতে গিয়ে বাচ্যিক অভিনয়ে ছন্দপতন হয়। কোনো কোনো সংলাপ অস্পষ্ট হয়ে উঠে। আঙ্গিক অভিনয়ের সঙ্গে বাচ্যিক অভিনয়ের সমন্বয় ঘটাতে হলে আরো বেশি সচেতন থাকতে হবে অভিনয় কুশীলবদের। নাটকের কোরিওগ্রাফি, আলোক প্রক্ষেপণ মুগ্ধ করবে দর্শকদের। সেই সঙ্গে অ্যাক্রোবেটিকের প্রয়োগ নাটকটিকে দিয়েছে ভিন্নমাত্রা।

‘রহু চণ্ডালের হাড়’ নাটকে রহু চরিত্রে অভিনয় করছেন আসাদুজ্জামান আবির। অন্যান্য চরিত্রে রয়েছেন- স্বপ্নীল সোহেল, শ্যামাঙ্গিনী শ্যামা, শারমিন ডেইজি, ওয়াহিদ খান সঙ্কেত, নুসরাত জিসা, বৈজয়ন্তী খীসা, হৃদয় বসাক, ফারজানা মুক্ত, তানজিম আহমেদ, প্রিন্স সিদ্দিকী, নাজমুল রিগান, নওরীন নিপু, হাসান অমিত, জিনাত জাহান নিশা, আইনুন পুতুল প্রমুখ। শাহীন রহমানের আলোক পরিকল্পনায় নাটকের পোশাক পরিকল্পনা করেছেন রেজওয়ানা মৌরি রেজা প্রমুখ।

মেলা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj