মাতৃত্বের সুখ

শনিবার, ২৪ আগস্ট ২০১৯

খায়রুননেসা রিমি

বিয়ের পর থেকেই আমার বর বলতেন, ছোটবেলায় মাকে হারিয়েছি, মায়ের আদর কেমন হয়, আমি জানি না। আল্লাহর কাছে আমার একটাই চাওয়া আমার প্রথম সন্তান যেন মেয়ে হয়। সেই মেয়ের মাঝেই আমি আমার মাকে খুঁজে নেব। আমিও মনে মনে চাইতাম আমাদের প্রথম সন্তান মেয়ে হোক। আল্লাহ যেন আমার স্বামীর মনের ইচ্ছা পূরণ করেন। বিয়ের তিন বছর পর বুঝতে পারি, আমি মা হতে চলেছি।

হাসি-আনন্দে কেটে যায় ৭টি মাস। এক সকালে আমার বর তার কলেজের ডিগ্রি পরীক্ষার খাতা দেখছিলেন। আর আমি তার পাশে বসে গল্প করছিলাম। আমরা তখন রহমতউল্লাহ কলেজ কোয়ার্টারে থাকি।

হঠাৎ মনে হলো কে যেন আমার পেটের ভেতর থেকে জোরে লাথি মারছে আর অমনি পানিতে বিছানা ভিজে যাচ্ছে। আমি বারবার ওয়াশরুমে যাওয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হই। তার আগেই সব ভিজে যাচ্ছে। আমি ভীষণ ভয় পেয়ে যাই। বাধ্য হয়ে বরকে জানাই। সে তখন খাতা দেখা বন্ধ করে কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে বিষয়টা নিয়ে আলোচনা করে, মাত্র সাত মাসের মাথায় এমন হচ্ছে কেন?

বন্ধুরা পরামর্শ দিল ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলতে। আমার মামা ডাক্তার। অবস্থা জটিল বুঝতে পেরে মামা তখনই অ্যাম্বুলেন্স পাঠিয়ে দিলেন। আম্মা ফোন করে বলে দিলেন কাপড়চোপড় গুছিয়ে রাখতে। আমার বর জানালেন আম্মা ও মামি অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে এসেছেন।

কলেজে ক্লাস চলছিল। বর ছুটি নিয়ে এলেন কলেজ থেকে। অ্যাম্বুলেন্স দেখে মুহূর্তের মধ্যে পুরো ক্যাম্পাসে রটে গেল- ইংরেজি স্যারের স্ত্রী খুব অসুস্থ। অ্যাম্বুলেন্সে উঠে বসলাম। মামি ও আম্মা আমার দুই পাশে আর আমি মাঝখানে। যানজট আর জনজট ঠেলে অ্যাম্বুলেন্স ছুটে চলে। ক্রমে বেড়ে চলে আমার পেটের অসহ্য ব্যথা। আম্মা আমার ডান হাতটা শক্ত করে ধরে তার মুখস্থ করা সব দোয়া পড়ে আমাকে ফুঁ দেন। মামি আম্মাকে অনেক রকম ভরসা দেন। আম্মা অনেক কিছু মানত করেন। আমার বরও ভীষণ টেনশন করছেন। মামা বারবার ফোন করে বলছেন, টেনশনের কিছু নাই। আমি ঐ হসপিটালের সিনিয়রদের সঙ্গে কথা বলে সব ব্যবস্থা করে রেখেছি। ওখানে পৌঁছেই আগে ওটিতে ভর্তি করাতে হবে।

একজন ভদ্রমহিলা মেশিন অন করে আল্ট্রাসনোগ্রামে কী দেখলেন কে জানে। হতাশ হয়ে বললেন, নাহ্্ বাচ্চার হার্টবিট পাওয়া যাচ্ছে না। অবস্থা খুবই ক্রিটিক্যাল। দুজনের একজনকেও বাঁচানো যাবে না। আমার বর আমার হাতটা শক্ত করে ধরলেন। কেঁদে ফেললাম। ভদ্রমহিলা মেশিনে আবার চোখ রেখে বললেন, কপাল ভালো হলে একজনকে বাঁচানো সম্ভব। আবার না-ও সম্ভব। এর মধ্যে মামা এসে হসপিটাল মাথায় তুলে ফেললেন। মামার রাগারাগিতে কাজ হলো। খুব দ্রুত হতে লাগল সবকিছু। আমার বর কোনো কিছু চিন্তা না করে বন্ডপেপারে সই করলেন। আম্মা আর মামি আমাকে অভয় দিলেন। কিচ্ছু হবে না মা। সব ভালোভাবে হবে। নার্স বারবার বলছে পেশেন্টের হাত ছেড়ে দিন। তার অবস্থা ভালো না। আমার বর অনেকটা জোর করে তার হাত ছাড়িয়ে নিল। আমার মনে হলো আমি ফাঁসির আসামি। যে কোনো মুহূর্তেই আমার মৃত্যু হবে। আমি আর কাউকে দেখব না। দোয়া পড়ছি আর কাঁদছি। নার্স আমাকে ওটিতে নিয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর আমার তন্দ্রার মতো এলো। হঠাৎ আমার কানে এলো কারা যেন কথা বলছে।

: সব কিছু রেডি তো?

: জি আপা সব কিছু রেডি।

: তাহলে এবার ভালো দেখে একটা রবীন্দ্রসঙ্গীত ছাড়ো। আজকে রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনতে শুনতে অপারেশন করব।

চোখে প্রচণ্ড ঘুম। হাত, পা, পুরো শরীর নাড়াতে পারছি না। অথচ কান খানিকটা সজাগ। তাদের কিছু কিছু কথা আমার কানে আসছে। তার খানিকক্ষণ পরে ‘মারিয়া, বাচ্চা সরাও, বাচ্চা সরাও’ শোনার পর আমি জ্ঞান হারালাম। যখন আমার জ্ঞান ফিরল, ডাক্তার আপা আমার মুখের ওপর ঝুঁকে এসে বললেন, ‘কনগ্রাচুলেশন্স, আপনি চাঁদের মতো ফুটফুটে একটা কন্যা সন্তানের মা হয়েছেন।’

ডাক্তার আপার কথা শুনে আমি বুঝে গেলাম আমার বাচ্চাটা আর নেই। কেননা, আল্ট্রাসনোগ্রাম রুমে আগেই বলা হয়েছিল, ভাগ্য ভালো হলে একজনকে বাঁচানো যাবে। আমি যেহেতু বেঁচে আছি আমার বাচ্চাটা বোধ হয় আর নাই। আমি কাঁদতে কাঁদতে ডাক্তার আপাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপা, আমার বাচ্চাটা কি বেঁচে আছে?’

‘কী সব অলক্ষুণে কথা বলছেন? আপনার বাচ্চা খুব ভালো আছে। সুস্থ আছে।’

‘যদি সত্যি আমার বাচ্চাটা বেঁচে থাকে তাহলে আমাকে একটু দেখান প্লিজ…’

সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তার আপার নির্দেশে আমার আম্মা একটা গোলাপি তোয়ালেতে জড়িয়ে সাদা ধবধবে একটা বাচ্চা এনে আমার চোখের সামনে ধরলেন। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারলাম না। আম্মার কাছে জানতে চাইলাম, ‘আম্মা, ও কি বেঁচে আছে?’

‘হুম, বেঁচে আছে। ভালো আছে। সবই আল্লাহর রহমত।’

‘আম্মা ওর মুখটা আরেকবার দেখান।’

আম্মা আমার নাড়িছেঁড়া ধনকে আরেকবার দেখালেন।

…সেদিনের স্মৃতি আমি আজো ভুলিনি। ওটাই ছিল এই পৃথিবীতে পাওয়া আমার শ্রেষ্ঠ সুখ।

কন্যা সন্তানের বাবা হওয়ার খবরে পুরো হাসপিটাল মাথায় তুলে চিৎকার করে আমার বর বলল, ‘আল্লাহ, তোমার কাছে অশেষ শুকরিয়া। আমার মা নেই, তুমি আমাকে মা দিয়েছ।’ হসপিটালের সবাই বলাবলি করছে, মেয়ে হলে যে মানুষ এত খুশি হয় তা জীবনে এই প্রথম দেখলাম। আমার বর হসপিটালে এবং তার কলেজে সবার মধ্যে মিষ্টি বিতরণ করলেন।

আমিও আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করলাম, আমার বরের স্বপ্ন পূরণ করতে পেরেছি বলে। হসপিটাল থেকে রিলিজ করে দেয়ার পরেও মামি আমাদের বাসায় যেতে দিলেন না। তার বাসায় রেখে আমার ও আমার কন্যার পরিচর্যা করলেন। মামাতো বোন নাবিলা আর নাজিয়া ব্যস্ত হয়ে পড়ে আমার মেয়ের নাম রাখা নিয়ে। ওরা একেকজন একেক রকম আধুনিক নাম খুঁজে বের করে কিন্তু আমার পছন্দ হয় না। ওদের বুঝালাম, তাদের ভাগনির নাম হবে আপা আর দুলাভাইয়ের নামের সংযুক্তিতে। পরে নাজিয়া অনেক খ্ুঁজে বের করল ‘সুরীতি’। এই নামটা আমার পছন্দ হলো। আমার বরের নাম সুরুজ। আমার নাম রীমি। দুজনের আদ্যক্ষরে ‘সুরী’ আর অতিরিক্ত একটা ‘তি’ বসালে অর্থবোধক শব্দ হয় ‘সুরীতি’ যার অর্থ সুন্দর নিয়ম। বরের বংশ পদবি ‘মালিথা’ মিলিয়ে ওর নাম দাঁড়াল সুরীতি মালিথা। সুরীতি মালিথা নাম নিয়েই আস্তে আস্তে আমার মেয়ে বড় হতে থাকে। আমার মেয়ে বর্তমানে একাদশ শ্রেণিতে পড়ে। আর যে নাম রেখেছে সে বর্তমানে অস্ট্রেলিয়াতে আছে। নাজিয়া এখন একজন নামকরা ডাক্তার। সবই এখন স্মৃতি। ১৮ বছর আগের ঘটনা। মনে হয় এইত সেদিনের ঘটনা।

সিনিয়র শিক্ষক, সাউথ পয়েন্ট

স্কুল, বারিধারা, ঢাকা।

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj