গড বেøস ইয়ানা

শনিবার, ২৪ আগস্ট ২০১৯

স্মৃতিকণা বিশ^াস

শরতের মিষ্টি বিকেলে তামান্নারা ৪ জন বসে আছে বিশ^বিদ্যালয় ক্লাবে। সদ্য বিলেতফেরত সোহানা পিএইচডি ডিগ্রি শেষ করে দেশে ফিরেছে। নানা অভিজ্ঞতা শেয়ার করছিল সে। সন্ধ্যা নামতে বেশি দেরি নেই। তামান্না বাসায় ফিরবে। হঠাৎ দেখতে পেল বেশ সুন্দরী স্মার্ট একজন মেয়ে তাদের টেবিলের দিকে এগিয়ে আসছে। বন্ধু মুরাদকে হাত তুলে সালাম দিল। সোহানাকেও সালাম দিয়ে বলল, ম্যাডাম, কেমন আছেন? সোহানা, মুরাদ সবাই মোটামুটি ¤øান মুখে উত্তর দিল। তুহিনও উদাস ভঙ্গিতে রিপ্লাই দিল। তামান্নার কাছে তাদের আচরণ একটু অন্য রকম, একটু অচেনা লাগল। মেয়েটির সঙ্গে তারা তেমন ঘনিষ্ঠভাবে কথা কেন বলল না?

মেয়েটি ততক্ষণে তাদের টেবিল থেকে বিদায় নিয়ে সামনের একটি রুমের ভেতর দিয়ে গেটের বাইরে চলে গেছে।

মুরাদের কাছে জানতে চাইল তামান্না, মেয়েটি কে? আর তোমরাই বা মুচকি হাসছিলে কেন পরস্পর মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে!

মুরাদ বলল, ওর নাম ইয়ানা, সে লন্ডন থেকে উচ্চতর ডিগ্রি নেয়া মেয়ে। কিন্তু সম্প্রতি সে মানসিকভাবে ডাউন। কিছু বিষয়ে সে এখন বলতে পারো মানসিক রোগী। বেশ ভালো একটি ছেলের সঙ্গে মেয়েটির বিয়ে হয়। নর্থ বেঙ্গলের একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারে ইয়ানার বেড়ে ওঠা। ভালো স্কুল-কলেজে পড়ার সুযোগ তার হয়েছে। পরে লন্ডন থেকে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়েছে। লন্ডনে যাবার পর তার বাবা-মা তাকে একটি ভালো ঘরের সুশিক্ষিত ছেলের সঙ্গে বিয়ে দেন। সব কিছুই ঠিকঠাক চলছিল। কিন্তু তাদের বিয়ের বছর দেড়েকের মাথায় একদিন তার বর বাসায় ফিরে তার সঙ্গে বেশ দুর্ব্যবহার করতে থাকে। কারও কাছে সে কোনো ইনফরমেশন পেয়েছে, বারবার তাকে একটি কথাই বলতে থাকে। তুমি প্রতারক, তুমি বেইমান! আমি তোমাকে ছাড়ব না। আমি দেখে নেব। আমার জীবনটা নিয়ে গেইম খেলেছ তোমরা। আমি আইনের আশ্রয় নেব।

ইয়ানা তার কাছে গিয়ে জানতে চাইল, কি হয়েছে? কেন সে অমন আচরণ করছে! কিছু না বলে তার স্বামী রায়হান চৌধুরী ইয়ানাকে জোরে ধাক্কা মেরে ফেলে দেয়। আর চিৎকার করে বলতে থাকে, সরে যাও আমার সামনে থেকে, মিথ্যে নাটক করতে আসবে না। একপর্যায়ে সে একটি কাচের গøাস ভেঙে ফেলল। ইয়ানা ভাবল, হয়তো রায়হান ওভার ড্রিংক করেছে তাই এমনটা করছে। কিন্তু না, সে ইয়ানার হাত ধরে টানতে টানতে বলল, চল তোমার মা-বাবার কাছে যেতে হবে, যা বলার তাদের বলব। ইয়ানা নিরুপায় হয়ে গাড়িতে উঠে চুপচাপ বসে রইল। দ্রুতগতিতে গাড়ি চালাচ্ছিল রায়হান। ভয় পাচ্ছিল ইয়ানা। তবু সাহস করে গাড়ি ধীরে চালাতে বলতে পারল না। শান্ত স্বভাবের রায়হানকে সে বিয়ের পরের দেড় বছরে কোনোদিন এভাবে রাগতে দেখেনি। গাড়ি গেটের সামনে থেমেছে। ইয়ানার হাত ধরে টানতে টানতে গিয়ে গেটের সামনে দাঁড়িয়ে বারবার কলিং বেল টিপতে থাকে রায়হান। ইয়ানার বাবা দরজা খোলেন, রায়হান রুদ্রমূর্তিতে ইয়ানার হাত ধরে ঘরের ভেতর ঢুকে চিৎকার শুরু করে। ইয়ানার মা-বাবা অবাক হয়ে যান। জিজ্ঞেস করেন কী হয়েছে? রায়হান উপহাসের সুরে বলতে থাকে, আপনারা কিছুই জানেন না? নাটক করছেন আমার সঙ্গে? একটি পরিচয়হীন মেয়েকে আমার ঘাড়ে তুলে দিয়েছেন কেন? তার কী বংশ-পরিচয়? সে কোন জাতের মেয়ে? হিন্দু, না মুসলিম নাকি খ্রিস্টান? কেন লুকিয়েছেন আমাকে যে তার কোনো বংশ-পরিচয় নেই? ইয়ানার মা-বাবা চুপ করে দাঁড়িয়েছিলেন। ইয়ানা এ কথা শুনে হাউমাউ করে চিৎকার করে তার মাকে জড়িয়ে কাঁদতে থাকে। বলে, মা ও কী বলছে এসব? আমি কি তোমাদের সন্তান নই?

ইয়ানার পৃথিবীটা শূন্য মনে হতে থাকে। সেদিন রায়হান একা চলে যায় তার বাসায়। ইয়ানা অনেকক্ষণ বিলাপ করতে করতে জ্ঞান হারায়। মেডিকেলে কাটে প্রায় দুই সপ্তাহ। রায়হান কোনোদিন তাকে সেখানে দেখতে আসেনি। সে তার উকিল ধরে ডিভোর্স লেটার পাঠায় ইয়ানাকে। ইয়ানা দুই সপ্তাহ পর কিছুটা স্বাভাবিক হলে ডাক্তার তাকে মা-বাবার কাছে বাসায় পাঠায়। তবে ইয়ানা মানসিকভাবে পুরো সুস্থ হতে পারেনি। এখনো অনেকটাই অস্বাভাবিক আচরণ করে। রায়হানকে সে এখনো অনেক ভালোবাসে।

ইয়াকুব আলী আর রেহানা বেগম নিঃসন্তান দম্পতি। এতিমখানা থেকে ছোট্ট ইয়ানাকে নিয়ে আসেন দত্তক হিসেবে। ছোটবেলা থেকেই সে মেধাবী। ইয়াকুব আলীও তাই তাকে উচ্চশিক্ষিত করাতে কোনো কার্পণ্য করেননি। ইয়ানা ওনাদেরই মা-বাবা জেনে বড় হয়েছে। রায়হান সেদিনের পর আর কোনোদিন ইয়ানার মুখ দেখেনি। ডিভোর্স দিয়ে চিরবিদায় করেছে। কিন্তু মা-বাবা তাকে পর করেনি। তাকে তাড়িয়ে দেয়নি। আগলে রেখেছে মমতায়।

তামান্না মুরাদকে প্রশ্ন করল, তোমরা কেন মেয়েটিকে কাউন্সিলিং করছ না?

মুরাদ বলল, দেখ সে অস্বাভাবিক আচরণ করে, কথা বলতে বলতে দেখা গেল সে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করে অনেক সময়, তখন আমরা বিব্রত হই। আমরা বিজি মানুষ, তাকে সব সময় এলাউ করলে আমাদের কাজের ক্ষতি হয়। তাই নিতে পারি না।

তামান্না ওদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ক্লাব থেকে বেরিয়ে এলো। মনের ভেতর কোথায় যেন যন্ত্রণা অনুভব করল। ইয়ানা ফুঁপিয়ে কাঁদে কেন? তার ভেতরের ক্ষতটা গভীরভাবে সে অনুভব করল। একদিন মুরাদের কাছে ফোন করে ইয়ানার ফোন নাম্বারটা চাইল তামান্না। ওপাশ থেকে মুরাদ বলল, বন্ধু, তুমি ওই মেয়েকে খুঁজতে যেও না, তাকে বোঝাতে গেলে তুমিও পাগল হয়ে যাবে বলে দিলাম। তার ইমোশন সইতে পারবে না। এত সময় নষ্টের চিন্তা কর না।

তামান্না আর কথা বাড়ায়নি। সেদিনের পর অনেকদিন ভেবেছে, কী ছিল ইয়ানার অপরাধ? কোন অপরাধে রায়হান বা ইয়ানার বন্ধুরা তাকে একলা ফেলে চলে গেল? মানুষের স্বভাব বোঝা মুশকিল। এই মুরাদ, সোহানা- এরা তামান্নারই বন্ধু! তেইশটি বছর ধরে জানত এরা তার বন্ধু! তারা মুখে মানবতার কথা বলে। পত্রিকায় কলাম লেখে মানবতার পক্ষে। টেলিভিশনে টকশোতে মানবতার কথা বলতে বলতে মুখে ফেনা তোলে! তাদের ভেতরটা এত দরিদ্র জানত না। মনে মনে সে ইয়ানাকে ধন্যবাদ দিচ্ছিল, কারণ ইয়ানা সেদিন সামনে না এলে সে তার মানসিক দরিদ্র বন্ধু মুরাদ বা সোহানাকে চিনতে পারত না। তাদের ভণ্ডামি বুঝত না। ইয়ানার জন্য তামান্না আশীর্বাদ করল- মানসিক শক্তির জোরে সে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখুক। গড বেøস ইয়ানা।

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj