জীবনের ভোর বেলায়

শনিবার, ২৪ আগস্ট ২০১৯

কাঞ্চন রানী দত্ত

দুর্জয়, ঋতু, মম ও সুপার্থ। ছোট্ট এক পাড়ায় এই চারজনের বেড়ে ওঠা। দুর্জয় আর ঋতু ভাইবোন। ক্লাস ওয়ান থেকে টেন, মম ও সুপার্থের সঙ্গে তাদের দশ ক্লাসের বন্ধুত্ব। তারপর বিচ্ছিন্নতার গল্পগাথা।

দুর্জয় ও ঋতুর বাবা চাকরিজীবী, তাই ওদের মা একটু অহংকারী ছিলেন। ছেলেমেয়ে পড়ালেখায় ডাব্বা, তারপরও কী অহংকার ছিল তার! মমর বাবা কৃষিজীবী আর ছোটখাটো ব্যবসায়ী। বড় ভাইবোন আর মায়ের আদর্শে পড়ালেখাই তার একমাত্র মূলধন। আহ্লাদ, অহংকার এগুলোর কোনো সুযোগই তার নেই। সুপার্থ বাবা-মায়ের আহ্লাদে আটখানা। পাড়া-প্রতিবেশীদের কারো সঙ্গে মেশা একদম বন্ধ। কেউ তাকে কিছু বললেই মায়ের কাছে নালিশ, সঙ্গে সঙ্গে তার মায়ের তেড়ে আসা।

প্রাইমারি স্কুলের দূরত্ব ৩-৪ কিলোমিটার। হেঁটে যাওয়া ছাড়া বিকল্প নেই। খালি পায়ে ধুলা উড়িয়ে হেঁটে যাওয়া। জুতা স্যান্ডেল পরে কেউ গেলে বাঁকা চাহনির শিকার হয় সে। ছাতা নেই কারো। বৃষ্টি আসলে কচুপাতা আর পলিথিন ভরসা। স্কুলে যাওয়ার পথে মিত্র বাড়ির কাছে একটি পুল, ফেরার পথে ওখানে বসে বিশ্রাম নেয় ওরা। সুপার্থের আছে একটি স্টিলের ছোট স্কুল ক্যারি ব্যাগ। বৃষ্টি এলে সবার বইখাতা মাঝে মাঝে ওর ব্যাগে নিয়ে পালাক্রমে মাথায় বহন করে বাড়ি ফেরে ওরা।

গ্রামের একজন কাকা পাশের গ্রামের প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক। প্রতিদিনই পথে তার সঙ্গে চার সহপাঠীর দেখা হয়। একদিন ৩ জন মমকে বলল, স্যার যখন আমাদের অতিক্রম করবে তখন জিজ্ঞাসা করবি স্যার দেখেন তো ঘোড়ায় (অর্থাৎ ঘড়ি) কয়টা বাজে। মম সহজভাবে যেই বলল, উনিতো চোখ বড় করে সাইকেল দ্রুত চালিয়ে চললেন বাড়ির পথে। কথাটা কতটা

অশোভন তখন না বুঝলেও বড় হয়ে মমর সেটি অনুধাবন হয়েছিল।

দুর্জয় আর ঋতুর বাবা কাকা পিসিরা দশ ভাইবোন, যৌথ পরিবার। বাড়িতে মেয়ে-জামাই আত্মীয়-স্বজনের হাট যেন। জামাই ষষ্ঠীতে উঠান ভর্তি সারি সারি জামাই। আম-কাঁঠাল-মিষ্টির আপ্যায়ন। এসব দেখে মাঝে মাঝে মমর মন খারাপ হয়। ওদের বিশাল এল আকৃতির টিনের ঘর, এক ঘর থেকে অন্য ঘরে সবার হাঁটাহাঁটি। বারান্দায় কাঠের অনেক বড় বেঞ্চ। সেখানে বসে পা দুলিয়ে দুলিয়ে বাড়ির সদস্যদের গল্প করা।

ঋতুর মামা দিদা যখন আসে ভ্যান ভরে আম, কাঁঠাল, ডালের বড়ি, মুড়কি, নাড়ু আনে। গরমের ছুটি হলেই ঋতুদের মামারবাড়ি এক মাসের জন্য চলে যাওয়া। মমর মামারা ১৯৭১ সালে ভারতে চলে যাওয়ায় ওর মাঝে মাঝে মনে হয়, ওর যদি মামা বাড়ি থাকতো!

সুপার্থের মামারা তখনো দেশেই ছিল। মাঝে মাঝে শোনা যেত তারাও ভারতে চলে যাবে। সুপার্থকেও ভারতে পড়ালেখা করানো হবে- এই গল্প শুনে মম ভাবে ওখানে গিয়ে সুপার্থ বড় মানুষ হবে। আর মমদের না হলো মামাবাড়ি যাওয়া, না হলো ভারতে পড়ালেখা।

পাড়ায় শুধু সুপার্থের একটি পুকুর থাকায় ওদের বেশ অহংকার। সবাই ওদের পুকুর অবাধে ব্যবহার করলেও মাঝে মাঝেই সুপার্থের মা ঠাকুরমার গালমন্দ শুনতে হয় প্রতিবেশীদের। মাঝে মাঝে জেলেরা মাছ ধরতে আসে। সবাই তখন মাছ কিনতে ওদের বাড়িতে ছুটে আসে।

চৈত্র সংক্রান্তিতে পাশের গ্রামে ঘোড় দৌড়ের আয়োজন বিকেলে। পাড়া-প্রতিবেশীর সব বয়সী মানুষদের সঙ্গে চারজনের ঘোড় দৌড় উপভোগ করা। দূর থেকে ঘোড়া বা চালক কাউকেই ঠাওর করতে না পারলেও সবার সে কি উচ্ছ¡াস। চৈত্র সংক্রান্তি পয়লা বৈশাখের মেলায় আড়ং খরচের টাকা বাবদ শুধু মমর এক পিসি (বাল্যকালে তিনি বিধবা হয়েই বাপের বাড়িতে থাকতেন) ২/৫ টাকা দিতেন। সেটা দিয়েই কিছু মাটির হাঁড়ি/পুতুল আর মালাই কিনেই খুশি চিত্তে বাড়ি ফেরা মমর।

চৈত্র মাস তথা গরমকাল আসলেই মাইক বাজিয়ে মালাই ভ্যান/বাদাম বিক্রি করতে আসে। আট আনা/এক টাকা কখনো ছোলা মসুরির বিনিময়েও মালাই মিলত। স্কুল থেকে ফেরার পথে চৈত্র মাসে অষ্টক গানের দলকে দেখলেই কে কার আগে দৌড়ে বাড়ি গিয়ে খবর দিবে তার প্রতিযোগিতা চলত।

ঋতুদের উঠান অনেক বড়। ওদের বাড়িতে পাড়ার অন্যদের উদ্যোগে মাঝে মাঝে ভিসিআর এনে সিনেমা (বিশেষত ভারতীয় পুরনো বাংলা সিনেমা) চালানো হতো। সববয়সী মানুষের সঙ্গে ওদের মাঝে মাঝে এটি দেখা হয়। ভোররাতে যারা একটু বড় ছেলে কলেজে পড়ত তারা দরজা লাগিয়ে হিন্দি সিনেমা উপভোগ করে নিষিদ্ধ বস্তুর মতো।

প্রাইমারি পর্ব শেষ করে চারজনের হাইস্কুলে পদার্পণ। ঋতু আর দুর্জয়ের কাকা হাইস্কুলের শিক্ষক। স্যারের ভাতিজা-ভাতিজি হিসেবে মম আর সুপার্থ থেকে ওরা বেশি গুরুত্ব পায়। অন্যরা ওদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করার চেষ্টায় অনবরত লিপ্ত। মাঝে মাঝে দুর্জয় আর সুপার্থ টিফিনের পর ক্লাস ফাঁকি দিয়ে শহরে সিনেমা হলে সিনেমা দেখত। আবার স্কুল ছুটির সময় মিলিয়ে মম আর ঋতুর সঙ্গেই বাড়ি ফিরত। দুর্জয় আর সুপার্থ যেদিন সিনেমা দেখত তারা তাদের গল্প কথায় সেটি (কখনো নায়ক-নায়িকার নাম, কোন গান গেয়ে) প্রকাশ করত অজান্তেই। ঋতু আর মমকে সারা রাস্তায় একটাই অনুরোধ- বাড়ি ফিরে যেন ওদের সিনেমা দেখার বিষয়টি অপ্রকাশিত থাকে।

মম ক্লাসে প্রথম। তাই শিক্ষকদের কাছে সে বরাবরই পছন্দের। নবম শ্রেণির ঘটনা, মম ক্লাসের ক্যাপ্টেন তাই টিফিনের পর কে স্কুলে পালিয়ে বাড়ি ফিরল, কে ক্লাস করল না পরদিন এসবের হিসাব প্রধান শিক্ষকের কাছে দিতে হয়। প্রধান শিক্ষকের কথাবার্তা একটু অস্পষ্ট, বুঝতে অন্যদের কষ্ট হয়। একদিন ক্লাসে এসে মমকে বললেন, গতকাল তুমি টিফিনের পর স্কুলে ছিলেন না? মম বলল, হ্যাঁ কিন্তু শিক্ষক এটাকে না বুঝে সঙ্গে সঙ্গে মমকে চড়-থাপ্পড় মারা শুরু করলেন। শিক্ষকের সিকো ব্রান্ডের ঘড়ি মাটিতে পড়ে গেল। মমর হেয়ার ব্যান্ড ভেঙে গেল। সহপাঠীরা অবাক হয়ে গেল, কেউ কিছু বুঝতে পারছে না। মমও নির্বাক হয়ে মার খাচ্ছে। এক পর্যায়ে শিক্ষক একজন ছাত্রকে বললেন, যাও শিক্ষক রুম থেকে জোড়া বেত নিয়ে এস। তখন সবাই বলল, স্যার মমকে কেন মারছেন? উত্তরে তিনি বললেন, মম ক্লাসের প্রথম। ক্লাসের ক্যাপ্টেন কেন টিফিনের পর ক্লাস না করে বাড়িতে গেল। সবাই বলল, মম তো ক্লাস না করে বাড়ি যায়নি। শিক্ষক নির্বাক। তাহলে আমি নির্দোষ মেয়েকে এত সময় মারলাম তবু সে কিছু বলল না!

পরদিন প্রধান শিক্ষক দশম শ্রেণির ক্লাসে গিয়ে বললেন, আমি নির্দোষ মেয়েকে মারায় আমার প্রিয় ঘড়িটাও ভেঙে গেছে। শিক্ষককে অনুতপ্ত দেখে মমর সব কষ্ট উঠে গেল। বিজ্ঞান বিভাগে পড়ালেখা আর টিউশন ফির খরচ বেশি হওয়ায় মম আর্টস নেয়। শিক্ষকরা বললেন, তুমি ক্লাসের প্রথম তুমি যদি বিজ্ঞান বিভাগে না যাও তাহলে অন্যরা তো নিরুৎসাহিত হবে। কিন্তু তাতে কিছু করার নেই মমর। নবম শ্রেণি শেষে দশম শ্রেণিতে উঠবে মুহূর্তে সুপার্থের জ্যাঠা মশাই জানতে পারলেন, সুপার্থ মানবিক বিভাগ নিয়েছে। তিনি তো রেগে আগুন। বিজ্ঞান বিভাগ নিতেই হবে। অন্য কোনো বিভাগের কোনো ভরসা নেই, ভবিষ্যৎ নেই। সুপার্থ বাধ্য হয়ে বিজ্ঞান বিভাগে গেল।

ঋতু আর দুর্জয় পড়ালেখায় অতি দুর্বল। তার শিক্ষক কাকা আর বাড়ির লোকের একটাই ধান্দা। ভালো ছাত্রের পাশে সিট দিয়ে পাস করানো। ঋতু মাঝে মাঝে শিক্ষক কাকার উপজেলা সদরের বাসা থেকে স্কুলে যাওয়া-আসা করে। ঋতুর গাঁয়ের রং ফর্সা। প্রচলিতভাবে গাঁয়ের রং ফর্সা হলেই তাকে সুন্দর বলা হয়। একদিন ঋতু মমর উদ্দেশ্যে বলল, কালো মুখ দেখলে অযাত্রা। এটি মম সারাজীবন বয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এত বড় আঘাত সে কম পেয়েছে। ঋতু প্রায়ই রূপের অহংকারে মমর সঙ্গে কথা বলা বন্ধ রাখত। সোজা কথায় আড়ি। এক মাস দুই মাসও চলত আড়ি। কিছু দিন পর আবার কথা।

মমর মামা বলেছিলেন, ভোরে উঠে পড়লে মনে থাকে। সেই থেকে মম নিয়মিতই ভোরে উঠে পড়ালেখা করত। ওর দেখাদেখি সুপার্থও ভোরে পড়ালেখা শুরু করেছিল।

এসএসসি পরীক্ষার আগে ফরম পূরণ বাবদ যে টাকা লাগে সেটি জোগাড় করতে মমর বাবার অনেক কষ্ট হয়। মমর বাবা ভেবেছিল মেয়ে যেহেতু ক্লাসে প্রথম তার থেকে বোর্ড নির্ধারিত ফিসের অতিরিক্ত টাকা হয়তো দাবি করা হবে না। কিন্তু না, তাকেও স্কুলের অতিরিক্ত দাবি মেটাতে হলো। মম এসএসসির রেজাল্টে স্কুলেও প্রথম হলো। সুপার্থ, ঋতু ও দুর্জয় সব ডাব্বা। পরের বছর তারা সি গ্রেডে পাস। দুর্জয় গার্মেন্টস শিল্পে, সুপার্থ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়ালেখা করে স্কুল শিক্ষক। ঋতু কলেজে থাকাকালীন শ্বশুর ঘরে। মম সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স শেষ করে সরকারি চাকরিতে। কলেজ জীবনের পর কখনোই আর চারজনের দেখা হয়নি। সবাই অতি ব্যস্ত। কিন্তু মমর প্রতি ঋতুর সেই অবহেলা, সুপার্থের আহ্লাদে আটখানা ভাব, দুর্জয়ের মায়ের অহংকার সারাক্ষণই মমর স্মৃতির জানালায় উঁকি মারে। মনটা তার ছুটে যেতে চায় ছোটবেলার সেই বন্ধুত্বে।

:: ঢাকা

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj