নাগরিক দায়বদ্ধতা ও ডেঙ্গু মোকাবেলা

বৃহস্পতিবার, ২২ আগস্ট ২০১৯

এ বছর রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ডেঙ্গু নিয়ে জনসাধারণের মধ্যে আতঙ্কের শেষ নেই! গত বছর চিকুনগুনিয়া নিয়ে বেশ আতঙ্কেই ছিল শহরবাসী। বছর বছর বেড়েই চলেছে মশাবাহিত রোগ ও রোগীর সংখ্যা। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রভাব পড়ছে পরিবেশগত ব্যবস্থাপনার ওপর। পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ঋতুবৈচিত্র্য ও বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে বিভিন্ন রোগের যেমন সম্পর্ক আছে, ফলে একই রোগ ভিন্ন ভিন্ন ধরন ও লক্ষণ নিয়ে দৃশ্যমান হচ্ছে। আগে যেসব জায়গায় মশা টিকতে পারত না, তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে সেসব জায়গায় মশা অবস্থান করছে। বৃষ্টিপাত বেশি হওয়ায় এডিস মশার বংশবিস্তার বেশি হচ্ছে। বিশেষ করে বৃষ্টির সময় পানি জমে থাকার কারণে এডিস মশার প্রজনন বেড়ে যাচ্ছে। শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশে^র বিভিন্ন দেশে বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোতে ডেঙ্গু ব্যাপকতা লাভ করেছে। বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) এক তথ্যে বলা হয়েছে, বিশে^র মোট জনসংখ্যার ৫০ শতাংশ সাধারণ ও মারাত্মক ডেঙ্গু জ¦রে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, শ্রীলঙ্কা, লাওস, কম্বোডিয়া, মিয়ানমারসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ডেঙ্গুর বিস্তার ঘটেছে এবং মানুষের মৃত্যুও ঘটছে। ফিলিপাইনে ডেঙ্গুতে ৬০০ জনের বেশি মৃত্যু হয়েছে। ফিলিপাইনে ডেঙ্গুর কারণে ‘জাতীয় মহামারি’ ঘোষণা পর্যন্ত করতে হয়েছে। দক্ষিণ আমেরিকাতেই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে প্রায় ১৬ লাখের বেশি মানুষ। এর মধ্যে ৮০ শতাংশই ব্রাজিলের নাগরিক। এ ছাড়া রয়েছে নিকারাগুয়া, হন্ডুরাস ও অন্যান্য দেশের নাগরিক।

বাংলাদেশে ডেঙ্গুর ভয়াবহতা বিবেচনায় বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ভাবতে হবে। আগে শুধু রাজধানী বড়জোর বিভাগীয় শহরগুলোতে ডেঙ্গু দেখা দিত। আর এখন কমবেশি সারাদেশে ডেঙ্গুর বিস্তার ঘটেছে। জনস্বাস্থ্যের বিষয়টি কোনোভাবেই হেলাফেলা করার সুযোগ নেই। সর্ব্বোচ গুরুত্ব দিয়ে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বিষয়টি মোকাবেলা করতে হবে। ডেঙ্গুতে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ে শিশু, প্রবীণ, গর্ভবতী নারী, ডায়াবেটিস রোগীসহ আগে অন্য কোনো ধরনের রোগের জটিলতা যাদের আছে তারাই। এডিস মশার উৎসস্থল ধ্বংসে জনসাধারণই মূল ভরসা। কেননা বাসাবাড়ি, সরকারি-বেসরকারি স্থাপনায়, আমাদের চারপাশে এডিস মশার লার্ভা তৈরির বহু ক্ষেত্র থাকে। শীতকালেও ডেঙ্গুবাহী এডিস মশার ডিম থাকে। এই ডিমে একটু বৃষ্টির পানির ফোঁটা পড়লেই লার্ভার জন্ম হয়। শুষ্ক ও আর্দ্র উভয় মৌসুমে এডিস মশা সক্রিয় থাকে। বর্ষায় এদের আধিক্য বেশি দেখা যায়। এ জন্য মশা ও মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। ঢাকা শহরের প্রতিটি ওয়ার্ডে এ ব্যাপারে কার্যক্রম নেয়া যেতে পারে। ওয়ার্ডের সদস্যসহ তরুণদের সম্পৃক্ত করে স্বেচ্ছাসেবী দল গঠন করা যেতে পারে। ডেঙ্গু নির্মূলে কলকাতার অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো যেতে পারে।

বিজ্ঞানসম্মত লড়াই চালানোর ফলে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে সফলতা পেয়েছে কলকাতা। সেখানে কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি জনগণও সমানতালে এ ব্যাপারে সক্রিয়। কলকাতায় আইন করে কর্তৃপক্ষ জনগণকে বাধ্য করেছে ডেঙ্গু নির্মূলে অংশ নিতে। কলকাতায় ডেঙ্গু নির্মূলে জনসাধারণের গাফিলতি বা অবহেলা হলে জরিমানার বিধান সক্রিয় আছে। ঢাকা শহরেও এমনটি করা যেতে পারে। বাসাবাড়িসহ আশপাশ, নিজের বাসাবাড়ির সামনের নালা ও রাস্তাঘাট অপরিচ্ছন্ন থাকলে বা পানি জমলে জবাবদিহি করতে হবে- এমন কিছু ভাবা যেতে পারে। তার আগে কর্তৃপক্ষকেও নিজেদের জবাবদিহিতার জায়গাটাও পরিষ্কার করতে হবে! কেননা কর্তৃপক্ষের দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিতার চর্চা থাকলেও জনসাধারণও এ ব্যাপারে এগিয়ে আসবে। বলে রাখা ভালো, স্যাঁতসেঁতে বা উপযুক্ত পরিবেশে ডেঙ্গুবাহী এডিস মশা দুই বছরেরও বেশি সময় পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে। তাই এখন ডেঙ্গু মশার ভাইরাস প্রতিরোধে শুধু বর্ষা মৌসুম বা মশার উৎপাত হলে নয়, অন্তত আগামী কয়েক বছর মাসব্যাপী ডেঙ্গু মশার বংশবিস্তার প্রতিরোধে ধারাবাহিক অভিযান সক্রিয় রাখতে হবে। পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা, ওষুধ ছিটানো, নাগরিক সম্পৃক্ততা নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে ডেঙ্গুর ভয়াবহতা রোধ হবে বলে মনে করি। পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা মানে পরিকল্পিত নগরায়ন, নগরের জলাধার রক্ষা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জলাবদ্ধতা রোধ, প্রকৃতি রক্ষা, দূষণ রোধ ইত্যাদি বিষয়গুলোর দিকে নজর দিতে হবে। আর ওষুধ ছিটানো বিষয়টা কর্তৃপক্ষের কাজ এবং এ ব্যাপারে পরিস্থিতি ও ভাইরাসের ধরন অনুযায়ী সর্বদা সতর্ক থাকতে হবে। এ ছাড়া সর্বোপরি নাগরিক দায়বদ্ধতা অর্থাৎ সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে আইন তৈরি করে হলেও সেটা করতে হবে- যেমন, বাসাবাড়ির চারপাশ পরিষ্কার রাখা, কোথাও যেন বেশিদিন পানি জমে না থাকে ইত্যাদি। দরকার হলে ডেঙ্গু নির্মূলে গণসচেতনতা ও সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে দেশব্যাপী সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রায় সাড়ে তিন কোটিরও বেশি শিক্ষার্থীর সরাসরি সম্পৃক্ততার বিষয়টি ভাবতে হবে।

:: সাধন সরকার, ঢাকা।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
গাজী মহিবুর রহমান

অনুগ্রহ করে ঘরে থাকুন

আর কে চৌধুরী

আমরা যেন হেরে না যাই

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

ফোর্স নয়, সেবকও নয়, বন্ধু চাই

নিতাই চন্দ্র রায়

এই যুদ্ধে জয়ী হতে হবে

ড. মো. তাসদিকুর রহমান

আসুন সরকারের নির্দেশনা মানি

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

ব্যক্তিগত আক্রমণ গ্রহণযোগ্য নয়

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

ঐক্যের বিকল্প কিছু নেই

Bhorerkagoj