আওয়ামী লীগে সুবিধাবাদীদের কী হবে?

মঙ্গলবার, ২০ আগস্ট ২০১৯

আওয়ামী লীগ টানা ১১ বছর ক্ষমতায় আছে। সামনে আরো ৪ বছরের বেশি সময় আছে। এর আগে আওয়ামী লীগ ১৯৯৬-২০০১ সময়ে ক্ষমতায় ছিল। আওয়ামী লীগের সেই শাসনামল অনেক প্রতিক‚লতাকে অতিক্রম করে বাংলাদেশকে মুক্তিযুদ্ধের ধারায় ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রেখেছে। দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা এবং দল হিসেবে আওয়ামী লীগ একাট্টা হয়েই এমন মিশন-ভিশন বাস্তবায়ন করেছিল। সে কারণে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের অনেক ব্যক্তি ও গোষ্ঠী আওয়ামী লীগকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতে থাকে। আওয়ামী লীগের বাইরে থাকা অনেকেই শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের ভূমিকাকে গুরুত্বের সঙ্গে উপলব্ধি করেছে। তাদের অনেকেই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। এটি আওয়ামী লীগের রাজনীতির জন্য একটি নতুন রক্তের সংযোজন হিসেবেই দেখার বিষয়।

মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে বিশ্বাসী প্রগতিশীল চিন্তাধারার মানুষজনের রাজনৈতিক দল হিসেবে ১৯৯০-এর পর থেকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ব্যতীত আর কোনো দলের অবস্থান হতে পারেনি। আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসার পর প্রগতিশীলদের অনেক বেশি ধারণ করতে পেরেছে। তখন আওয়ামী লীগের ভেতরে স্বাধীনতাবিরোধী কিংবা আওয়ামীবিরোধী ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর অনুপ্রবেশ সেভাবে হতে শোনা যায়নি। কারণ ওইসব শক্তি রাজনৈতিকভাবেই আওয়ামী লীগের বিরোধী শক্তি হিসেবে দীর্ঘদিন থেকে মাঠে ময়দানে অবস্থান করেছে, ক্ষমতায় থেকে তাদের ধারণাও হয়ে গিয়েছিল যে বাংলাদেশে তাদের রাজনীতির অবস্থান এতটাই শক্তিশালী যে ঘুরেফিরে তারাই বাংলাদেশের ক্ষমতায় আসবে বা থাকবে। সুতরাং তাদের আওয়ামী লীগের দরজা দিয়ে ঢোকার চিন্তা খুব বেশি ছিল না। তারা এটাও বিশ্বাস করত যে বাংলাদেশে রাষ্ট্র ক্ষমতায় আওয়ামী লীগ খুব একটা আসতে পারবে না। এটি ১৯৯১ সালের নির্বাচনের পর তাদের মুখে হরহামেশাই উচ্চারিত হতো। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসতে পারবে এটি তাদের ধারণার বাইরে ছিল। আসার পর তারা ধরে নিয়েছিল এরপর আর আসার সুযোগ ঘটবে না। আওয়ামী লীগ যাতে পরবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতায় আসতে না পারে সে জন্য ১৯৯৯ সালে চারদলীয় ঐক্যজোট গঠিত হয়। আওয়ামী লীগ এবং গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলো সেই সময়ে চারদলীয় জোট গঠনের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য এবং ফলাফল কী হতে পারে সেটি বিবেচনা খুব একটা নেয়নি। সে কারণেই ২০০১ সালের নির্বাচনে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির মধ্যে তেমন কোনো জাতীয় ঐক্য গড়ে ওঠেনি।

অপরদিকে স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ ও গণতন্ত্রবিরোধী সব শক্তির মেরুকরণ চারদলীয় জোটে ঘটেছিল। এই শক্তি ২০০১ সালের নির্বাচনে বিজয় লাভের জন্য দেশি-বিদেশি শক্তির সমর্থন যেভাবে নেয়া প্রয়োজন ছিল তার সবটাই নেপথ্যে নিয়েছিল। ক্ষমতায় আসার পরপরই বাংলাদেশের রাজনীতিকে সম্পূর্ণরূপে তাদের কব্জায় নেয়ার পরিকল্পনা থেকে হামলা, হত্যা, দখল এবং নেতৃত্বশূন্য করার জন্য দীর্ঘ পরিকল্পনা নিয়ে তারা মাঠে নামে। সে ক্ষেত্রে জঙ্গিদের তারা একভাবে ব্যবহার করেছে, প্রশাসনকে নিজেদের মতো করে এবং প্রচার ও শিক্ষাব্যবস্থাকে সম্পূর্ণরূপে বিকৃত ইতিহাসনির্ভর করা হয়েছে। আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করা হয়েছিল। আওয়ামী লীগ ৫ বছর সেই হত্যা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছিল। ২১ আগস্ট ছিল আরেকটি ১৫ আগস্ট সংঘটিত করার পরিকল্পনা। ভাগ্যক্রমে শেখ হাসিনা বেঁচে যাওয়ায় সেই পরিকল্পনা অনেকটা ব্যর্থ হয়েছিল। তবে আওয়ামীবিরোধী শক্তি কতটা বাংলাদেশকে নিয়ে পরিকল্পিতভাবে অগ্রসর হচ্ছিল সেটি সেই সময়ে অনেকটাই উন্মোচিত হয়েছিল। আওয়ামী লীগ এবং অন্যান্য রাজনৈতিক গণতান্ত্রিক শক্তি বুঝতে পেরে চারদলীয় জোটের পাল্টা ১৪ দল তথা মহাজোট গঠন করে। নতুন এই মেরুকরণ রাজনৈতিক ও আদর্শগতভাবে এক ও অভিন্ন না হওয়া সত্ত্বেও এক প্ল্যাটফর্মে জড়ো হওয়ার ফলে ২০০৭ সালের জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে চারদলীয় জোটের পরিকল্পনা অনেকটাই ভেস্তে যায়। চারদলীয় জোট টানা দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে তাদের পরিকল্পনা মোতাবেক অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশকে নিশ্চিহ্ন করার ষড়যন্ত্রে নির্বাচন কমিশন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও নির্বাচনকে পদদলিত করার সব আয়োজন সম্পন্ন করেছিল। কিন্তু বাধ সেধেছিল ১/১১। তবে চারদলীয় জোটের রাজনীতির স্বরূপটি বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে বেশ ভালোভাবে উন্মোচিত হয়েছিল। সে কারণে মানুষ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের দিকে স্বতঃস্ফ‚র্তভাবে এগিয়ে আসে ২০০৮-এর নির্বাচনে। আওয়ামী লীগ বিপুল ভোটে অবিস্মরণীয় বিজয় নিয়ে ২০০৯ সালে সরকার গঠন করে। সরকার গঠনের পরও চারদলীয় জোটভুক্ত শক্তিসমূহ সরকারকে নানাভাবে চ্যালেঞ্জের মুখে রেখেছিল। ২০০৯-১৫ এই সময়ে জামায়াত-শিবির, জঙ্গিবাদী গোষ্ঠী বিএনপির একনিষ্ঠ শক্তি আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা থেকে উচ্ছেদ করে শেখ হাসিনাকে যে কোনো মূল্যে সরিয়ে ক্ষমতায় তাদের পুনরুত্থানের নানা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছিল। বিশেষ করে ৫ মে’র শাপলা চত্বরের আয়োজন, ১৮ ডিসেম্বর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের সমাবেশের নেপথ্যে ছিল ক্ষমতা থেকে আওয়ামী লীগকে অপসারণ করা। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রতিহত করার নামে দেশব্যাপী তাণ্ডব, গুজব, হত্যাকাণ্ড, হরতাল, অবরোধ, অগ্নিসংযোগ ইত্যাদির মধ্য দিয়ে যে বিষয়টি পরিষ্কার তা হলো ক্ষমতা থেকে শেখ হাসিনা সরকারকে হটানোর সর্বশক্তি নিয়োগ করা। ২০১৪ সালের নির্বাচন প্রতিহত করাও সেই পরিকল্পনারই অংশ ছিল। ২০১৫ সালের জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসের অবরোধ ও জ্বালাও-পোড়াও ব্যর্থ হওয়ার পর জামায়াত, বিএনপি ২০ দলীয় ঐক্যজোট এবং এর শুভানুধ্যায়ীরা নতুনভাবে বুঝতে পেরেছে যে শেখ হাসিনা এবং রাষ্ট্রব্যবস্থা অনেক বেশি দৃঢ় হয়েছে। এটিকে সন্ত্রাসবাদী কায়দায় উচ্ছেদ করা সম্ভব নয়।

এখান থেকেই আওয়ামী বিরোধী ওইসব শক্তির রাজনৈতিক মূল্যায়নে পরিবর্তন আসতে থাকে। তবে সেই পরিবর্তনে তারা ইতিবাচক চিন্তাধারায় নয় বরং কৌশল পরিবর্তনের মাধ্যমে রাজনীতিতে তাদের অবস্থান মেলে ধরার নানা কৌশল নিয়েছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। এই সময়ে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে জামায়াত এবং বিএনপির অনেকেই প্রবেশ করেছে। এ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মীরা নিজেদের স্বার্থে এসব ব্যক্তিকে দলে অনুপ্রবেশ করার সুযোগ করে দিয়েছে। আওয়ামী লীগের নেতাদের সমস্যাটি হচ্ছে দলের অভ্যন্তরে উপদলীয় কোন্দলে একে অপরকে চলতে না দেয়া। সে ক্ষেত্রে অন্য দলের বিত্তশালী কাউকে দলের ভেতরে ঢুকিয়ে নিজে লাভবান হওয়া এবং প্রতিপক্ষকে মোকাবেলা করার সুযোগ নিয়েছে। স্থানীয় জামায়াত-বিএনপির নেতারা এই সুযোগটি চমৎকারভাবে নিতে পেরেছে। এরচেয়েও বড় বিষয় হচ্ছে আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠনের পরিচয় দিয়ে অসংখ্য সংগঠন গড়ে উঠেছে যেগুলোর আর্থিক সুযোগ-সুবিধাপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে এসব অনুপ্রবেশকারীর সাহায্য নেয়া হয়েছে। সংগঠনগুলোর অনেক নেতাই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ বাণিজ্যে জামায়াত-শিবির, বিএনপি, স্বাধীনতাবিরোধী তরুণদের কাছ থেকে দুহাতে অর্থ নিয়ে চাকরি পাইয়ে দিতে তদবির ব্যবসা করেছে। অনেকেই সফল হয়েছে। এভাবে নিয়োগপ্রাপ্তদের একটা বিরাট অংশ এসেছে জামায়াত-শিবির এবং স্বাধীনতাবিরোধী পরিবারগুলো থেকে।

বাংলাদেশে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী এবং অনুসারীদের চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য ইত্যাদিতে প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে কার কি ভূমিকা ছিল, বিনিময় প্রাপ্তি কি ছিল সেটি তদন্ত করলে অনেক কিছুই বোঝা যাবে- যা সবাইকে হতবাক না করে পারবে না। এই সময়ে শুধু জামায়াত-বিএনপি নয়, ফ্রিডম পার্টিসহ গুরুতর আওয়ামীবিরোধী অনেকেই আওয়ামী লীগের কোনো কোনো স্তরে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। এ নিয়ে একাধিক সংবাদপত্রে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন রয়েছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ এসব প্রতিবেদনে যেসব ব্যক্তির নাম প্রকাশিত হয়েছে তাদের ব্যাপারে কী সিদ্ধান্ত নিয়েছে বা নেবে সেটি সবারই দেখার-প্রতীক্ষার বিষয়। তবে আওয়ামী লীগে এখন অসংখ্য ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর প্রবেশ ঘটছে যা একেবারেই পরিকল্পিত মিশন-ভিশন নিয়েই করা হচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে এখন অসংখ্য পেশাজীবীকে দেখা যায় যারা চিরকালই কট্টর আওয়ামীবিরোধী বলে পরিচিত ছিল। এখন তাদের মুখে বঙ্গবন্ধু এবং শেখ হাসিনার প্রশংসা করতে দেখা যায়। এমনকি ধানমন্ডি ৩২ নম্বরেও তাদের যেতে দেখা যায়। বিষয়টি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এ কারণে যে, আওয়ামী লীগকে ওইসব শক্তি ও গোষ্ঠী এখন কব্জা করার পরিকল্পনা থেকেই হয়তো এভাবে বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার বন্দনায় মুখরিত হতে দেখা যাচ্ছে। এ ছাড়া সুবিধাবাদী ব্যক্তি ও গোষ্ঠীরা তো ১৯৯৬-এর পর থেকেই আওয়ামী তরীতে ওঠার মিছিল গড়ে তুলেছে। সেই সময়ে ততটা সফল না হলেও ২০০৯ সালের পর থেকে তারা কতটা সফল সেটি এরই মধ্যে অনেকের সুযোগ-সুবিধা, পদ-পদবি বাগিয়ে নেয়ার অবস্থা দেখেই বোঝা যায়। কথা হচ্ছে এভাবে তো আওয়ামী লীগকে এগিয়ে নেয়া যাবে না। ভেতর থেকে ওইসব অনুপ্রবেশকারী সময়মতো একে একে ছুরি ধরবে না এর কোনো নিশ্চয়তা আছে কী? আওয়ামী লীগ যদি এখনই এসব আওয়ামীবিরোধী শক্তির বোঝা তরী থেকে ছুড়ে না ফেলে দেয় তাহলে আওয়ামী তরী কতটা আওয়ামী থাকবে, বঙ্গবন্ধুর আদর্শের কিংবা শেখ হাসিনার মিশন-ভিশন বাস্তবায়িত হবে- সেটি মস্তবড় প্রশ্ন। আগামী সম্মেলনের আগেই আওয়ামী লীগের তরী কীভাবে অসাম্প্রদায়িক ও বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক আদর্শে উজ্জীবিত মানুষদের নিয়ে গঠিত হবে সেটি শুভানুধ্যায়ীদের প্রত্যাশা। আগামী সম্মেলনে সেই প্রত্যাশার রূপটি আমরা দেখতে চাই।

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী : অধ্যাপক (অবসরপ্রাপ্ত), ইতিহাসবিদ ও কলাম লেখক।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
গাজী মহিবুর রহমান

অনুগ্রহ করে ঘরে থাকুন

আর কে চৌধুরী

আমরা যেন হেরে না যাই

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

ফোর্স নয়, সেবকও নয়, বন্ধু চাই

নিতাই চন্দ্র রায়

এই যুদ্ধে জয়ী হতে হবে

ড. মো. তাসদিকুর রহমান

আসুন সরকারের নির্দেশনা মানি

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

ব্যক্তিগত আক্রমণ গ্রহণযোগ্য নয়

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

ঐক্যের বিকল্প কিছু নেই

Bhorerkagoj