সম্বলহীন নারীদের অবলম্বন ফরিদা

সোমবার, ১৯ আগস্ট ২০১৯

সেবিকা দেবনাথ

ফরিদা ইয়াসমিন। যিনি নিজে ‘স্বপ্ন’ দেখেন এবং অন্যকেও ‘স্বপ্ন’ দেখান। এই স্বপ্ন দেখানোর মধ্য দিয়ে সহায়-সম্বলহীন নারীদের কাছে তিনি হয়ে উঠেছেন অবলম্বন। কুড়িগ্রামের উলিপুরের সহায়-সম্বলহীন নারীদের ফরিদা ‘স্বপ্ন’ দেখাতে শুরু করেছিলেন ২০০৯ সালে। সেই ‘স্বপ্ন’ এখন বাস্তবে রূপ পেয়েছে। বিস্তারও ঘটেছে। তবে এই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে ফরিদাকে। এখনো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

বিদেশি দাতা সংস্থার আর্থিক সহযোগিতায় কুড়িগ্রামের উলিপুরে বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট সার্ভিস সেন্টারের নারী প্রকল্পের যাত্রা শুরু হয় ২০০৬ সালে। ঢাকার সাভারের মেয়ে ফরিদা ২০০৯ সালে ওই প্রকল্পের সমন্বয়ক হিসেবে কাজ শুরু করেন। শুরু হয় তার স্বপ্ন দেখানোর যাত্রা। অসহায়, সম্বলহীন নারীদের অবলম্বন হয়ে ওঠা ফরিদার চ্যালেঞ্জ, কর্মযজ্ঞ এবং ভবিষ্যৎ ভাবনা নিয়ে অন্যপক্ষের সঙ্গে তার কথোপকথন নিয়ে এই প্রতিবেদন।

কাজে যোগ দেয়ার পর নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে ফরিদা বলেন, তখন নারীদের মর্যাদা ও সম্মান বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্য, পুষ্টি, এইচআইভিসহ বিভিন্ন ইস্যুতে তাদের সচেতনতা করার কাজ করতাম। তখন থেকেই ভাবতাম প্রকল্প বন্ধ হয়ে গেলে যাতে এসব নারী আবার পিছিয়ে না পড়ে। প্রকল্প শেষেও কীভাবে কাজগুলোকে স্থায়ী রূপ দেয়া যায় সেই বিষয়ে কাজ শুরু করলাম। দাতা সংস্থাদের সঙ্গে কথাবার্তা চলতে থাকল। অবশেষে সুফল পেতে শুরু করলাম। নারী এসোসিয়েট ফর রিভাইভার এন্ড ইনিশিয়েটিভ (নারী) নামের সংগঠন গড়ে উঠল।

শুরুটা কীভাবে হলো জানতে চাইলে তিনি বলেন, দাতা সংস্থার সহযোগিতায় আমাদের নিজস্ব জমি হলো। সরকারি রেজিস্ট্রেশন নিয়ে ২০১২ সালে মাত্র ২৫টি তাঁত মেশিন নিয়ে কাজ শুরু করি। তখন ফ্লোর মেট ও পাপোশ বানানো শুরু হলো। বর্তমানে আমাদের ৫৮টি তাঁত মেশিন আছে। কারখানায় মেশিনে কাজ করে দেড়শ নারী শ্রমিক। এ ছাড়া বিভিন্ন সময় অর্ডার বেশি হলে তখন আরো নারী এই কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়। তখন আড়াই হাজার নারী শ্রমিক কাজ করেন। এদের প্রায় সবাই সুবিধাবঞ্চিত। কেউ আছেন বিধবা, কেউবা তালাকপ্রাপ্ত, স্বামী পরিত্যক্ত, কেউবা যৌন নিগ্রহসহ বিভিন্ন নির্যাতনের শিকার।

এরপর কোথাও কি বাধার মুখে পড়েছিলেন? এমন প্রশ্নের উত্তরে ফরিদা বলেন, ২০১৬ সালে প্রকল্প বন্ধ হয়ে যায়। বন্ধ হয়ে যায় দাতা সংস্থার সহায়তাও। ভেবেছিলাম ঢাকায় ফিরে যাব। বিভিন্ন জায়গা থেকে আকর্ষণীয় বেতনের চাকরির প্রস্তাব আসতে থাকল। কিন্তু এখানকার মানুষের ভালোবাসার কাছে হার মানতে হলো। তাদের তখন একটাই প্রশ্ন, স্বপ্ন দেখিয়ে মাঝপথে কেন চলে যেতে চাইছি? নতুন করে আবার ভাবতে শুরু করলাম। কোনো প্রকার আর্থিক সহযোগিতা ছাড়া কীভাবে নিজে চলব এবং যেসব নারী এখানে শ্রম দেবেন তাদের বেতন হবে- এ নিয়ে ভাবনা শুরু হলো। তখন ঠিক করলাম, এখানে পাট খুব সহজলভ্য। এ ছাড়া পাট প্রক্রিয়াজাত করে বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই নারীরা সম্পৃক্ত থাকতে পারবেন এবং তা অনেকটাই সহজ। কাজ শুরু করলাম।

কী ধরনের পণ্য উৎপাদন করেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা পাটের আঁশ দিয়ে বিভিন্ন ব্যবহার্য পণ্য উৎপাদন করি। শতরঞ্জি, কিচেন ম্যাট, ঝুড়ি, নানা ধরনের ব্যাগ, হাতপাখা, পাপোশ, বালিশ কুশন, টেবিল ম্যাট, কার্পেট, ছিঁকে, শো-পিস, গহনাসহ ঘর সাজানোর বিভিন্ন উপকরণ। উৎপাদিত পণ্য ডিসপ্লে করতে শো-রুম খোলার পাশাপাশি বিভিন্ন শিল্পমেলায় অংশগ্রহণ করে ক্রেতাদের মাধ্যমে বাজারজাত করা হয়।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে এই নারী উদ্যোক্তা বলেন, দেশের বাজারের গণ্ডি পেরিয়ে আমাদের উৎপাদিত পণ্য এখন বিদেশে যাচ্ছে। তবে দেশীয় কিছু প্রতিষ্ঠান আমাদের কাছ থেকে পণ্য কিনে তাদের নিজস্ব ট্যাগে সেসব পণ্য বিদেশে পাঠাচ্ছেন। আমাদের উৎপাদিত পণ্য আমাদের প্রতিষ্ঠানের ট্যাগে বিদেশে পাঠাবো সেই লক্ষ্যেই আমি কাজ করছি। আশা করি একদিন সফলতা আসবেই।

প্রতিক‚লতার কথা বলতে গিয়ে ফরিদা বলেন, নারী উদ্যোক্তারা সহজে ঋণ পায় না। আমার ক্ষেত্রেও তেমনটা হয়েছে। আমি কোনো ব্যাংক থেকেই ঋণ পাচ্ছি না। গত দুই তিন বছর ধরে জনতা, অগ্রণী, সোনালীসহ বিভিন্ন ব্যাংকের ম্যানেজারের সঙ্গে ঋণের বিষয়ে কথা বলেছি। কিন্তু কোনো ব্যাংকই সহায়তা করছে না। আমার মনে হয়, নারীদের ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো এক ধরনের অনিশ্চয়তায় ভোগে। কেননা নারীদের ঋণ নেয়ার ক্ষেত্রে কোনো প্রকার বন্ধকের সিস্টেম নেই। তাই ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এ ক্ষেত্রে আগ্রহী হচ্ছে না। পরিবারের সদস্য এবং আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে ধারদেনা করে কাজ চালাতে হচ্ছে।

নিজের সংগঠনের শ্রমিকদের প্রতি রয়েছে তার গভীর মমত্ববোধ। শ্রমিকদের সম্পর্কে তিনি বলেন, সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে সমাজে নারীদের মর্যাদা ও সম্মান বৃদ্ধির কাজ দিয়েই আমার কর্মজীবন শুরু। আমি চাই প্রতিটি নারী মাথা উঁচু করে বাঁচুক। তারা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হোক। আমার এখানে যেসব নারী শ্রমিক কাজ করে উৎপাদন অনুযায়ী তারা মাসে তিন থেকে ৮ হাজার টাকা বেতন পেয়ে থাকেন। এতে করে সমাজে তাদের সম্মান বেড়েছে বলেই আমি মনে করি। তবে প্রতিষ্ঠান বড় হলে আরো নারীর কাজের সুযোগ বাড়ত। সেই লক্ষ্যেই কাজ করছি।

অন্যপক্ষ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj