তিনি আমাদের যুক্ত করেছেন আধুনিকতার সঙ্গে

শুক্রবার, ১৬ আগস্ট ২০১৯

আবিদ আউয়াল

বাংলা সাহিত্যের অন্যতম কবি আবুল হোসেন। ত্রিশোত্তর আধুনিক বাংলা কবিতার যে ধারা উত্তরকালের কবিদের হাতে বিকশিত হয়েছিল, আবুল হোসেন ছিলেন সে ধারার সফল উত্তরাধিকারী। কবি আবুল হোসেনের জন্ম ১৯২২ সালের ১৫ আগস্ট বাগেরহাট জেলার ফকিরহাট উপজেলার আরুয়াডাঙা গ্রামে। তাঁর ধারাবাহিকতার ইতি ঘটে ২০১৪ সালের ২৯ জুন, ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে।

আবুল হোসেনের কবিতায় স্পন্দিত হয়েছে মানব জীবন ধারা আধুনিক হয়ে ওঠার গল্প। আধুনিক বাংলা কবিতার জন্মই হয়েছে গীতিময়তা বিরোধিতা করে। বাংলা কবিতাকে গীতিময়তা থেকে মুক্ত করার কাজটি করেছিলেন তিরিশের কবিরা সম্মিলিতভাবে। কাব্যভাষার এই পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত হলো গদ্যকবিতা। যদিও রবীন্দ্রনাথই প্রথম গদ্যকবিতা লিখতে শুরু করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের ধারণা ছিল, ছন্দমিলের যে কবিতা, সেটাতে সবকিছু লেখা যায় না। তিনি গদ্যকবিতাকে এক ধরনের গল্পও বলেছেন। যা হোক পরবর্তী সময় সমর সেন সাহসিকতার সঙ্গে এর জবাব দিতে পেরেছিলেন গদ্যকবিতার প্রাণপ্রতিষ্ঠা করে। আবুল হোসেন সমর সেনের অনুসৃত পথেই আত্মমুক্তির পথ খুঁজে পেলেন। অসীম সাহসিকতায় জীবনদৃষ্টি দিয়ে তিনি আমাদের যুক্ত করে দিলেন আধুনিকতার সঙ্গে।

রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-জীবনানন্দ দাশের সঙ্গে ছিল তাঁর ব্যক্তিগত পরিচয়; জীবনানন্দের বনলতা সেন কাব্যের প্রথম সমালোচকও ছিলেন তিনিই। নজরুল প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন তাঁর প্রথম কাব্য নববসন্ত প্রকাশের লগ্নেই। তাঁর কবিতা প্রকাশিত হচ্ছিল সে সময়কার হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে পরিচালিত বাংলাভাষার সেরা পত্রিকাগুলোতে। নিজেই জানিয়েছেন পরিশীলনের উৎসাহ তিনি পেয়েছিলেন আবু সয়ীদ আইয়ুবের কাছে। বোধ হয় পরিশীলনের প্রতি এতটা গুরুত্ব দেয়ার জন্যই হয়তো আবদুল মান্নান সৈয়দ বা অন্যরা তাঁকে আমাদের প্রথম আধুনিক কবি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। কারণ পরিশীলন আধুনিকতা অর্জনেরই অন্যতম উপায়।

কবি আবুল হোসেন কবিতাচর্চা শুরু করেছিলেন স্কুলজীবন থেকেই। এ প্রসঙ্গে তিনি একবার বলেছিলেন, “আমার প্রথম কবিতাটি ছাপা হয়েছিল স্কুলের ম্যাগাজিনে। তখন বোধ হয় ক্লাস ‘এইটে’ পড়ি। কবিতার নামটা ‘আকবরের প্রতি রানা প্রতাপ’ এই রকম। চৌদ্দ অক্ষরের পয়ারে লেখা। ততদিনে পাঠ্যবইয়ে মধুসূদন, নবীন সেন, হেমচন্দ্রের কবিতা পড়েছি। তাদেরই ধরনে লেখা। যখন ক্লাস টেনে পড়ি, সেই সময় আমি একটা দীর্ঘ কবিতা লিখলাম ‘হে ধরণীর কবি’। কি মনে করে সেটা পাঠিয়ে দিলাম রবীন্দ্রনাথকে। কি হয়, কি হয়, দুরু দুরু করে বুক কাঁপে। কবি কি প্রাপ্তিস্বীকার করবেন! অনেক দিন চলে গেল, কোনো জবাব নেই। আশা ছেড়ে দিলাম, ব্যাপারটা প্রায় ভুলতে বসেছি, এমন সময় ৩/৪ মাস পরে আমার নামে একটা বড় লম্বা খাম এলো। দেখি তার মধ্যে একটা চৌকা চিরকুট। তাতে মাত্র একটি শব্দ ‘আশীর্বাদ’। তার নিচে স্বাক্ষর, শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। মনে আছে সকাল ১১টার দিকে পেয়েছিলাম চিঠিটা। সেই খামটা নিয়ে উঠে গেলাম আমাদের দোতলার ছাদে। তারপর ছাদে সেই একটি শব্দের দিকে চেয়ে চেয়ে সারা দুপুর কেটে গেল। তখন আর আমাকে পায় কে? দুদ্দাড় লিখে যাচ্ছি কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ। স্থানীয় পত্রিকায়, কলকাতার দৈনিকে, সাপ্তাহিকে, মাসিক কাগজে। লেখার উৎসাহেই লিখে যাচ্ছি।”

কবি আবুল হোসেনের পরম সৌভাগ্য যে তিনি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের সান্নিধ্য পেয়েছিলেন। ১৯৪০ সালের ১৪ কি ১৫ জুলাইতে রবীন্দ্রনাথ এসেছিলেন মংপুতে। সেই খবর পেয়ে রবীন্দ্রনাথের সাথে দেখা করার জন্য মংপুতে ছুটে যান কবি। রবীন্দ্রনাথের সাথে সাক্ষাতের সেই স্মৃতি তিনি নিজেই বর্ণনা করেছেন- ‘মংপুতে রবীন্দ্রনাথকে না পেয়ে কলিংপুতে ছুটে গেলাম। আমরা যখন পৌঁছালাম রবীন্দ্রনাথ তখন ঘুমিয়ে ছিলেন। রুমের বাইরে আমরা যখন বারান্দায় দাঁড়িয়ে কথা বলছি রবীন্দ্রনাথ আমাদের কথা শুনে তার সেক্রেটারিকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন কে এসেছে? সেক্রেটারি বললেন আবুল এসেছে আপনার সাথে দেখা করতে। তিনি ভেতরে যেতে বললেন, গিয়ে দেখলাম একটা খাটে রবীন্দ্রনাথ শুয়ে আছেন, একটা কালো চাদরে ঢাকা পা, আমি পা ছুঁয়ে প্রণাম করলাম। পা ছুঁতেই চোখ তুলে বললেন, “জানো বড় দুর্দিন, প্যারিসের পতন হয়েছে। জার্মানরা গিয়ে প্যারিস দখল করেছে, দেখ, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র সেটা এই জার্মানদের হাতে। তারপর আর বেঁচে কী লাভ। আবার চোখ বন্ধ করলেন, আবার চোখ খুললেন।” রবীন্দ্রনাথের আশীর্বাদ পাওয়া কবি তার স্মৃতি ও ভাবনার কথা কবি তার কবিতার শব্দমালায় প্রকাশ করেছেন।

‘সেদিনের কথা স্মরি যবে ঘরে ভীর কম্পিত হদয়ে

গভীর সংকোচ ভরে করেছিনু তোমারে, হে কবি,

মোর শ্রদ্ধা নিবেদন। অক্ষম অপটু হস্তে লয়ে

দিয়েছিনু নিঃশেষিয়া মোন ক্ষুদ্র অন্তর সুরভী।

প্রসাদহীন মোর চিত্তের সে গুরু অপরাধ,

মৃদু হাসি হয়তো বা লীলাচ্ছলে, হে কবি স¤্রাট, সেদিন পাঠিয়েছিলে মোরে তব স্নেহ-আশীর্বাদ’।

(রবীন্দ্রনাথ- আবুল হোসেন)

রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে তার মূল্যায়ন দেখতে পাই কবি ইকবাল আজিজ এর এক সাক্ষাৎকারে। তিনি কবিকে প্রশ্ন রেখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন?

উত্তরে কবি আবুল হোসেন বলেছিলেন, আমি জীবনে যত মানুষ দেখেছি, রবীন্দ্রনাথ ছিলেন তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে অসাধারণ। তাঁর চেয়ে বড় কাউকে দেখিনি।

এবার দেখা যাক কবি আবুল হোসেনের চোখে কাজী নজরুল ইসলামকে।

এক সাক্ষাৎকারে কবি নিজেই এ বিষয়ে বললে, ১৯৩৯-৪০ সালে কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে খুবই ঘনিষ্ঠতা হয়। এ-সময় প্রায় প্রতি সপ্তাহে তাঁর সঙ্গে দেখা হতো। তবে কবির বাড়িতে নয়; কলকাতায় শ্যামবাজারে ‘হিজ মাস্টারস ভয়েস’ গ্রামোফোন কোম্পানির রিহার্সাল রুমে। নজরুলকে যেভাবে তাঁর সাহিত্যপাঠের মধ্যে খুব উজ্জ্বলভাবে পেয়েছি; ব্যক্তিগতভাবে আমার সঙ্গে যখন তাঁর আলাপ, তখন তাঁর মধ্যে সেই ঔজ্জ্বল্য ছিল না। তাঁর স্ত্রী তখন অসুস্থ, সংসারে সাচ্ছল্য নেই। পাওনাদাররা প্রায়ই তাঁকে বিব্রত করত। তিনি তখন যোগাভ্যাস করতেন। তখন আমরা কেউই বুঝতে পারিনি যে, তিনি মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। একদিনের কথা বলি, তখন কাজী নজরুল ইসলাম দৈনিক নবযুগ পত্রিকার সম্পাদক, আবুল মনসুর আহমদ পত্রিকার যুগ্ম সম্পাদক। নজরুল সাধারণত অফিসে আসতেন সন্ধ্যের দিকে; আমরা ক’জন নবযুগ অফিসে গিয়ে তাঁর সঙ্গে আড্ডা দিতাম। আমি আর চতুরঙ্গ পত্রিকার আতাউর রহমান তাঁর কাছে যেতাম। একদিন সন্ধ্যায় কাজী নজরুল ইসলাম অফিসে ঢুকতে ঢুকতে চিৎকার করছিলেন, ‘মনসুর, জানো কাল রাতে একটা দারুণ ব্যাপার ঘটেছে। অরবিন্দ আমার কাছে এসেছিলেন।’ এসব কথা শুনে আমরা সবাই অবাক। অরবিন্দ তো পন্ডিচেরিতে থাকেন। তাঁর সঙ্গে গতরাতে নজরুলের কীভাবে দেখা হতে পারে? কবি বললেন, ‘কালরাতে অরবিন্দ আমার কাছে এসেছিলেন। আমার যোগসাধনার সময় অরবিন্দকে দেখতে পেলাম, তাঁর সঙ্গে অনেক কথা হলো। দেখলাম লোকটা ভ্রান্ত। মনে হলো তিনি একচক্ষু হরিণ। বাণ আসছে বিপরীত দিক থেকে; অথচ তিনি দেখতে পাচ্ছেন না। নির্ঘাত তিনি মারা পড়বেন।’ নজরুলের এসব কথাবার্তা শুনে আমরা আশ্চর্য হয়েছিলাম। পরে আমরা বুঝতে পেরেছি, যোগাসনে বসে নজরুল অনেক কিছু দেখতে পেতেন, যা আমাদের মতো সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। পরে আমাদের মনে হয়েছে, নজরুলের মধ্যে মানসিক বিকারের সূচনা হয়েছিল তখন থেকেই। কাজী নজরুল ইসলাম কবি ও সংগীতজ্ঞ হিসেবে অসাধারণ। আমি তাঁকে কবির চেয়ে সংগীতজ্ঞ হিসেবে বড় বলে মনে করি। নজরুল শুধু গান লিখতেন কিংবা সুর দিতেন না; সেইসঙ্গে তিনি অনেককেই গান শেখাতেন। শৈল দেবী হিজ মাস্টারস ভয়েস অফিসে নজরুলের কাছে অনেকদিন গান শিখেছেন। এছাড়া কাননবালা, আঙ্গুরবালা প্রমুখ নজরুলের কাছে গান শিখেছেন। সহকারী হিসেবে কমল দাশগুপ্ত নজরুলের নির্দেশ মানতেন, কবিকে নানাভাবে সহযোগিতা করতেন।

এরপর আসি জীবনানন্দ দাশ পর্বে। কবি আবুল হোসেন জীবনানন্দ দাশ সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করেছেন এভাবে, জীবনানন্দ খুব কম কথা বলতেন। শুনতে চাইতেন বেশি। মাঝে মাঝে মুচকি হাসতেন। তেমন সামাজিক ছিলেন না। ঠিক লাজুক নয়। কিন্তু কম কথা বলতেন। ওঁর স্ত্রীকে একবারও দেখিনি। আমি আর আমার বন্ধু শান্তি রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় একবার জীবনানন্দের বাড়িতে গিয়েছিলাম; সেবার তিন ঘণ্টা তাঁর সাথে কথা বলেছি। এই তিন ঘণ্টায় তাঁর পরিবারের কেউ একবারও সেখানে আসেনি। কেউ এক পেয়ালা চাও আমাদের খেতে দেয়নি। নিজের বাসায় জীবনানন্দ খুব সুখী ছিলেন বলে মনে হয় না।

রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-জীবনানন্দ দাশের স্পর্শ পেলেও কবি আবুল হোসেন ছিলেন তাদের থেকে ভিন্ন। তাঁর কবিতায় ছিল আধুনিকতার ছোঁয়া। কবি আবুল হোসেনের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘নব বসন্ত’ প্রকাশিত ১৯৪০ সালে। এই গ্রন্থ আমাদের কবিতার আধুনিক ধারার পথনির্দেশকের ভূমিকা পালন করে। এটিকে এই অঞ্চলের প্রথম আধুনিক কবিতার বই হিসেবে গণ্য করা হয়। ১৯৪৭-এর দেশভাগের পর আবুল হোসেন বাংলা কবিতার মূল ধারার সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন এবং ১৯৪৭-পরবর্তী তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান, বর্তমান বাংলাদেশ ভূখণ্ডের কবিতাকে প্রগতিশীল চিন্তার বাহন করে এগিয়ে গেছেন। দেশভাগের পর কেউ কেউ যখন রবীন্দ্র-সাহিত্য বর্জনের কথা বলেছেন; ইসলামী ধারায় কাব্যচর্চায় মনোযোগী হওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন, সেই সময়ে আবুল হোসেন আধুনিক চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে কবিতার মূল ধারাকে বেগবান করার কাজে প্রয়াসী হয়েছিলেন। কবিতার শুদ্ধতায় বিশ্বাসী ছিলেন তিনি। তাঁর কাব্যবিশ্বাসে কবিতার পরিমাণ মুখ্য ছিল না, কবিতার মানই ছিল আসল নিক্তি। তাঁর জীবনদৃষ্টি ও কাব্যভাষা দিয়ে তিনি আমাদের যুক্ত করেছিলেন আধুনিকতার সঙ্গে।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj