দোহারের ছদ্মবেশ

শুক্রবার, ১৬ আগস্ট ২০১৯

প্রশান্ত মৃধা

ধারাবাহিক উপন্যাস : পর্ব ১

এক.

সঞ্জয় আর রচনার ঘটনার জল যে এতদূর গড়াবে তা কে জানত। ঘটনা যখন ঘটে তখন তো এর ডালপালা গজায় না, গজায় পরে। ধীরে ধীরে সেই ডালপালা বাড়ে, বেড়ে বেড়ে ঝাড়ে-বংশে এমন আকার ধারণ করে যে তার লাগাম টানার ক্ষমতা আর কারও হাতে থাকে না।

এক্ষেত্রে অবশ্য পুরোপুরি তা নয়, এ ঘটনার ডালপালা আগেই গজানো ছিল। হালদারবাড়ির সঞ্জয়ের সঙ্গে প্রতিবেশী মল্লিকবাড়ির রচনার সম্পর্কের কথা আরও কিছুদিন আগে থেকে সবার জানা ছিল। সঞ্জয় সুযোগ পেলেই কচুয়া থেকে বাড়ি আসে, তখন তাদের একসঙ্গে দেখা যায়। রচনা এমনিতেই হালদারবাড়ি যায়। তাদের বাড়ির দক্ষিণের বাগান থেকে হালদারবাড়ি যাওয়াও সোজা। মেয়ের পা বেড়েছে, সে পায়ে এমন টেংরিও গজিয়েছে- এ কথা রণজয়কে বলছে গীতা। ওদিকে মল্লিকবাড়ির শরিকি কৃপাসিন্ধুর বউ পার্বতীও সঞ্জয়ের বড়দা সুনীলকে বলেছে, তার ভাইকে কচুয়া থেকে বাড়ি না আসতে দিতে।

এর আগে যে ঘটনা ঘটেছিল, সেদিন সুনীল কচুয়া থেকে বাড়ি এসেছিল। নিজেদের বাড়িতে যাওয়ার আগে সে পার্বতীর কাছে গেলে, সে তাকে বলেছিল সঞ্জয় আজকাল যা শুরু করেছে তাতে প্রতিবেশীতে প্রতিবেশীতে কবে কোন্ বিরোধ শুরু হয়ে যায়, তাই-বা কে জানে।

ভোররাতে সঞ্জয়দের শরিকি দেবুর ঘর থেকে রচনা নিজের বাড়ির দিকে এলে, সেখানেই রণজয় তাকে পাকড়াও করে। তারপর নিজেদের উঠোনে এনে ও ঘরের ভিতরে নিয়ে আচ্ছাসে ঠেঙায় মেয়েকে। এরপর সবকিছু প্রায় থেমেই গেছিল। কিন্তু সেদিনই সুনীল বাড়ি এসে সব শুনে সঞ্জয়কে বলে, সে যেন কালই তার সঙ্গে কচুয়ায় যায়। সঞ্জয় গিয়েছিল। কিন্তু ঘটনাটা যে সেখানেই শেষ হবে না, তা মনে হয়েছিল সুনীলের পরের ভাই স্বপনের। রণজয় হালদার যেভাবেই হোক এই ঘটনার শোধ তুলবে। তখন পরিস্থিতি আরও জটিল হবে। স্বপন গলা তুলে কথা বলে, কিন্তু সুনীলের তুলনায় টাকা-পয়সায় কাবু। সঞ্জয় লেখাপড়া জানা। সুনীল-সঞ্জয় দুজনই কচুয়া উপজেলা সদরে থাকে। ওদিকে রণজয় পাশের ইউনিয়নের স্কুলের হেডমাস্টার। সামাজিকভাবে স্বপনের চেয়ে উপরের মানুষ। আবার যা-ই করুক, করেছে স্বপনের ছোটভাই- সে ক্ষেত্রে তারও তো তাতে কিছু দায় পড়ে।

এদিকে এমন ঘটনায় হালদারদের সঙ্গে মল্লিকদের প্রতিবেশীর সম্পর্কেরও তো খানিকটা এদিক-ওদিক ঘটে। আবার, গোড়াখালের দীনেশ মলঙ্গির কাছে থেকে সুদে টাকা আনার যে প্রস্তাব রণজয়কে দিয়েছে সঞ্জয়দের জ্ঞাতি দেবু, সেখানেও তো কিছুটা ওলটপালট ঘটেছে। রচনা এসেছিল দেবুর ঘরে, সেখানেই ছিল সঞ্জয়- এ কথা গ্রামের আজ আর কারও জানতে বাকি নেই। তাহলে দেবুই-বা এখন কোন মুখে রণজয়ের সামনে এসে দাঁড়ায়। ওদিকে স্বপন বা সুনীলের যতই পিসতুতো ভাইদের গুষ্টির হোক দীনেশরা, সেদিক থেকে দেবুরও লতায় পাতায় জড়ানো আত্মীয়, কিন্তু রণজয়ের মতো মানুষ না- বললে দেবুর ঋণ পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

এই সমস্ত ঘটনায়, গ্রামে যখন এ নিয়ে কথা ওঠে তখন কোত্থেকে যে সমস্ত পুরনো কথা উড়ে আসে আর তার পিঠে আবার কথা ওঠে, আর সে কথা তখন সামাল দেওয়া মুশকিল হয়ে পড়ে। যেমন, সঞ্জয় আর রচনার ঘটনার অনেক অনেক দিন আগে হালদারদের সঙ্গে মল্লিকদের প্রায় এমন বিরোধেরই সৃষ্টি হয়েছিল। অথচ সে কত কতকাল আগের ঘটনা। হিন্দুস্থান-পাকিস্তান তখন সবে হয়েছে। স্বপনের বাবা বীরেন্দ্রনাথের তখন বসে গোঁফ উঠেছে আর তার বড়দা অবনীন্দ্রনাথ সবে সংসারী, অবিনাশ ও অঞ্জুর জন্ম হয়েছে। সেই সময়ের ঘটনা। আজ সে ঘটনার প্রায় বছর পঞ্চাশেক বাদে ডালপালা নিয়ে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। এই এক ব্যাপার। ঘটনা বংশপরম্পরায় বাহিত হয়। এমনভাবে বয়ে চলে যেন এতদিন এই সবই তাদের কাছেই ছিল এখন সুযোগ পেয়ে হুট করে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। থলের মুখ খুলে দিলে বিড়াল যেভাবে লাফিয়ে নামে সেভাবে একেবারে সামনে এসে গা চাটতে চাটতে চারদিকে তাকাতে তাকাতে নিজের পথে চলে যাচ্ছে।

সে ঘটনার জন্যে যেন আজকের দেবু দায়ী। কিন্তু ঘটনা আজ সামনে এসেছে সঞ্জয়ের কারণে। কিন্তু ঘটনাটা দেবুর জেঠামশাইয়ের। দেবু কিংবা সঞ্জয়ের তা জানার কোনো কারণ নেই। দেবুর সেই জেঠামশাই দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার পরে তাদের জন্ম। সুনীল কিংবা স্বপন কিংবা লালমোহন তখন ছোট। সেই সময়ের ঘটনা।

দেবুর জেঠামশাই নাকি কবে কোনদিন রণজয়ের পিসিমার হাত ধরে টান দিয়েছিল। রণজয়ের পিসিমা বাল্যবিধবা, কেউ কেউ বলে না বাল্যবিধবা নয়, আরও পরে বিধবা হয়েছিল। কিন্তু সেদিনের ঘটনা তখন তার বয়েস অল্প। বাপের বাড়িতে বেড়াতে এসেছিল, আর মল্লিকদের পিছনের পুকুরে স্নান করে বাড়ি ফেরার সময়ে দেবুর জেঠামশাই তার হাত ধরে টেনে জঙ্গলের দিকে নিতে চেয়েছিল। সেই সময়ে রণজয়ের মা দেখে ফেলায় ঘটনার আর একটুও এগোয়নি। কিন্তু তা নিয়ে সেদিন দুই বাড়িতে সম্পর্কে পরিণতি কী হয়েছিল তা আজ আর কারও সেভাবে মনে নেই। তবে রণজয় কিংবা সুনীল কিংবা অবিনাশ কিংবা শ্রীধর নিশ্চয়ই মনে করতে পারে। আর বয়েসে একটু প্রবীণ রসিক কিংবা কেষ্ট মল্লিক অথবা ওদিকে জগৎ মণ্ডলের সামনে সবই মনে আছে।

রণজয় স্কুল থেকে ফিরে রসিকের দোকানের সামনে বসেছে। অন্যদিনে সে বাড়ি যায় আগে। আজও যেত। বটগাছতলা দিয়ে নেমে আসার সময়ে হবির বড়ো ছেলে অজিয়রের সঙ্গে দেখা, তখন সে বলেছে একটু রসিকের দোকানের সামনে অপেক্ষা করতে, এখনই আসবে, তার সঙ্গে কথা আছে। কথাটা কী তা রণজয় জানে। ওর ছোটভাই আজগর একটা সমস্যায় পড়েছে। সমস্যাটা কী তাও রণজয়ের জানা আছে। কিন্তু রণজয় এমন ভাব নিয়েছে যে সে জানে না কিছুই। এখন অজিয়র এলে তার কাছে থেকেই সব শুনবে। যদিও এই গ্রামের মানুষ হিসেবে সবাইর জানা, যে কনট্রাকটরই কাজ করুক তাদের বটগাছ তলার রাস্তার কাছে বিস্তর ফাঁকি দিয়েছে। এমনিতে এই রাস্তা করার ব্যাপারে রণজয় নিজেও একটু উদ্যোগী হয়েছিল। গোটাপাড়া স্কুলের হেডমাস্টার সে। এতখানি পথ তাকে কাঁচা রাস্তায় যেতে হয়, যদিও ভাসা থেকে গোটা পাড়ার রাস্তাটা ইটলাছা হয়েছিল আগে। কিছুদিন আগে ভাসা থেকে কচুয়ার দিকে দক্ষিণমুখী রাস্তার কাজও হয়েছে। যদিও কচুয়া থেকে মখিয়া ইউনিয়ন কাউন্সিল পর্যন্ত রাস্তা আগেই ইটলাছা। সে পর্যন্ত কাজ ভালোই হয়েছে। তাও যে কেন হয়েছে, তা রণজয় কিংবা এই গ্রামের সবাই যেমন বুঝতে পারে। যারা এই কাজের সঙ্গে যুক্ত তারাও জানে। বরং তারাই ভালো জানে। কর্নেল সাহেবের ভোট যদি এখানে কিছু থাকে তা ওই কাউন্সিল পর্যন্ত। এদিকে হিন্দুপাড়ায় তাকে কে ভোট দেবে? যদি দেয় এই আজগরের মতন দুই একজন। কিন্তু আজগরের বাপ হবি তো কোনোদিন বিএনপির রাজনীতি করেনি। সে অত কিছু বোঝে না। কিন্তু উত্তরের টুঙ্গিপাড়ার শেখ সাহেবের দলকেই সে একমাত্র দল মনে করে। এ নিয়ে ছোট ছেলে আজগরের সঙ্গে তার ঝগড়াও হয়েছে। ছেলেকে বোঝাতে পারিনি। হবি ছেলেকে বলেছে, ‘এরশাদের দলে বাতাস দিচিস্ দিচিস্, আইজকাল আবার জিয়ার দলরেও তই বাসাত দিতিচিস্?’ এর পিছনের গূঢ়কথা ভিন্ন। সৈয়দ হিরুর বড়োভাই কামালের সঙ্গে দেখা হলে সে যদি হবির কাছে ছেলেকে কেন সামলাতে পারছে না, এ কথা জানতে চায় তাহলে কী উত্তর দেবে সে।

এসব ভিতরের কথা। একেবারেই হবির পারিবারিক কথা। এই হিন্দুপ্রধান বড়পুকুরিয়ার উত্তর কোনায় তাদের বাড়ি বলেই এমন কথা উঠেছে, ভিতরে ভিতরে একটু সংকোচেই আছে হবি আর তার বড়ো ছেলে অজিয়র। যদি তাদের বাড়ি উত্তর মঘিয়া কি কাউন্সিলের কাছাকাছি হতো তাহলে সমস্যা ছিল না। সে দিকের গ্রামগুলো সবই মুসলমানপ্রধান। সেখানে অনেকেই বিএনপি জাতীয় পার্টি করে। কেউ কেউ একাত্তর সালে রাজাকারিও করেছে। এমনকি সেই সময়ে হবিকে এ কথাও বলতেও অনেকে বাদ রাখেনি, ‘এ শালা, তুই মালাউন গো মদ্যি থাকতি থাকতি নিজেও দিনকে দিন প্রায় মালাউন হইয়ে যাতিচিস।’ তার এক মামাতো ভাই মুক্তিযোদ্ধা, তার জন্যে হবির আশঙ্কারও শেষ ছিল না। আর মঘিয়ার রাস্তাখালের গোড়ায় রাজাকাররা অনেক হিন্দু ও মুসলমানকে একই সঙ্গে গুলি ও জবাই করলে, এ পাড়ার ও পাড়ার এ গ্রামের কি বলেশ্বরের কুলের মুসলমানরা বুঝেছিল দিন আসলে কারও জন্যেই মোটেও সুবিধার নয়। সে সবদিন অনেক আগে গেছে। অজিয়েরই প্রায় কিছুই মনে নেই, আজগরের তো মনে থাকার প্রশ্নই ওঠে না।

কিন্তু অজিয়র জানে, আজগর গোটাপাড়ার মাহফুজ চেয়ারম্যানের বুদ্ধিতে অথবা জহিরুলের বুদ্ধিতে এই রাস্তার কাজে যুক্ত হয়ে কাজটা ভালো করেনি। আজ যাদের জোরে সে নাচল দুইদিন পরে তারা কোথায় থাকবে?

পিছনের এ কথা রণজয় মনে করতে পারে। অন্তত বটগাছতলায় অমলের সঙ্গে তার এমন কথা হয়েছিল, তখন ভাসার হাটখোলা থেকে ফিরছিল হবি। তাদের কাছে দাঁড়িয়ে শুনেছে। এই রাস্তা যে অন্য জায়গার রাস্তার চেয়ে খারাপভাবে বানানো হয়েছে, তা বুঝতে তো তার রণজয়ের মতন বিএ বিএড এমন পাস করার দরকার নেই। শুধু সে ভাবেছে সামনের কথা।

হয়তো, এ নিয়ে কী করা যায়- রণজয়ের সঙ্গে সে কথা বলতে চায় অজিয়র। কেন আজ ইস্কুল থেকে ফেরার পথে এভাবে তার পথ আগলে দাঁড়িয়েছিল অজিয়র, সে কারণও তার জানা আছে। আওয়ামী লীগ অবরোধের ডাক দিতে পারে। ঘন ঘন হরতাল দিয়েছে, এখন যে কোনো সময়ে অবরোধের ডাক দিলে, তারপর যদি এই সরকার না জেতে তখন আজগর সমস্যায় পড়বে। মাহাতাবউদ্দিন আর চেয়ারম্যান নেই। এখন চেয়ারম্যান কুচিবগার রমেন বৈদ্য। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে সে তার ইউনিয়নে রাস্তার কাজ এমন দায়সারাভাবে সারার জন্যে আজগরকে শায়েস্তা করবে। তখন এমপি সৈয়দ হিরুর কাছেও এ নিয়ে কথা বলতে গেলে পাত্তা পাবে না অজিয়র। কর্নেল সাহেব বিএনপির বড়ো নেতা, আজকে বাগেরহাট শহরে আছে কাল ঢাকা চলে যাবে। কিন্তু সৈয়দ হিরু তো কচুয়ার মানুষ! তার কাছ থেকে দূরে সরা সম্ভব হবে না। এদিকে অজিয়রও তো চায় কচুয়ায় একটা কাজ শুরু করতে, তাতে ছোটভাইয়ের জন্যে সে না-জানি কোন সমস্যায় পড়ে।

অজিয়রের অপেক্ষায় রণজয় এক দণ্ড বসে থাকতে না থাকতেই, দোকানের সামনে পরিতোষ আসে। একটু আগে থেকেই এখানে কৃপাসিন্ধু বসেছিল। পরিতোষের সঙ্গে কথা বলছিল। রণজয় এখানে আসার পরে তাদের কথা থেমেছে। নিশ্চয়ই মেয়েমানুষ ন্যাংটা করার গল্প করছিল। রণজয় তাদের চেয়ে বয়সে বড়ো, হেডমাস্টার মানুষ আর সম্পর্কে একজনের খুড়া অন্যজনের ভাইপো। পরিতোষের সম্পর্কে কাকা হলেও বয়সে বড়ো হওয়ায় সে-ই রণজয়ের ভাইপো। রণজয় তাদের গুষ্টির প্রদীপ। কিন্তু রচনার ঘটনাটার পর থেকে ওই মুখখানার দিকে আজকাল আর চাওয়া যায় না। সঞ্জয় গ্রামে থাকলে বিষয়টা একরকম হতো, কিন্তু সে এখানে না-থাকায় বিষয়টা দাঁড়ায় এই- তার মেয়েকে নিয়ে সারারাত কাটিয়ে তারপর ছেড়ে দিয়েছে। তাতে মেয়ের যত সম্মতিই থাকুক, গ্রামের মানুষ যতই তারা তাদের ভাব-ভালোবাসার কথা জানুক, অন্য গ্রামের মানুষ জানলে ঘটনাটার অর্থ তো দাঁড়ায় অন্য। এমনকি মেয়ের স্কুলেও এ কথা আলোচনা হয়েছে। যদিও রচনা আজকাল স্কুলে যায় না, কিন্তু এসএসসি পরীক্ষার কোচিং ক্লাসে তো তাকে যেতে হয়!

রণজয়ের মুখে রচনাকে নিয়ে এমন দুশ্চিন্তার ছায়া দেখতে দেখতে তবে কৃপাসিন্ধু আর পরিতোষ নিজেদের ভিতরে গুটিয়ে গেল? কিন্তু সে রসিকের বোঝার কথা নয়। বয়সে বেশ বড়ো রসিক ভাইপো রণজয়কে বাড়ি না-গিয়ে হঠাৎ এই দোকানের সামনে বসে পড়তে দেখে বলে, ‘কী, ও বাবা রণ? বাড়িঘরে না যাইয়ে এই জায়গায় বইসে রইচো কী জন্যি। বাড়ি যা- জামা প্যান্ট ছাড়। নাহেমুখে এট্টু জলটল দে-’

‘যাই, ও কা-। ওই অজিয়র আসার সময় ক’ল এট্টা কথা আছে, শুইনে বাড়ির ভিতর ঢুকতি। ও আমার সাথে কথা কইয়ে আবার এই পথে কচুয়ার দিক যাবে।’

পরিতোষ আর কৃপাসিন্ধু এতে পরস্পরের মুখ চাওয়া চাইয়ি করে। কৃপাসিন্ধু না বুঝলেও পরিতোষের বোঝা সারা অজিয়র কী বলার জন্যে আসবে। সে একবার ভাবে, রণজয়ের কাছে জানতে চায়, কী বলতে আসবে সে কিছু বুঝেছে কিনা? আবার কী ভেবে কিছুই বলে না। রণজয়ের মুখের দিকে তাকায়। সে মুখে ক্লান্তি। সারাদিন স্কুলে কাটিয়ে তারপর প্রায় মাইল তিনেক সাইকেল চালিয়ে এসেছে। দেপাড়া থেকে ভাসা পর্যন্ত রাস্তা ভালো, তার পরের রাস্তা এই এক বর্ষায় প্রায় দফারফা। এইটকু আসতেই যেন কাহিল রণজয়ের। প্রতিদিন দুইবার তাকে এই পথে সাইকেল চালিয়ে যেতে আসতে হয়। অথচ বছরখানেক আগে এই রাস্তায় যখন সুড়কি লাছা হচ্ছিল সেই সময়ে মুখে আর কথায় সবচেয়ে উৎসাহ ছিল এই রণজয়েরই। তয় নিয়ে পিছনে পিছনে পরিতোষ কিংবা শ্রীধর আর গুষ্টির বাইরে সুনীল স্বপন আর পুলক কিংবা ধীরাজ ও দিকের হরষিত কত কথা বলেছে। জিয়ার দলের কাজ, রণজয়ের ভিতরে একটু হলেও খুশি। সেই খুশি তাদের চোখে রণজয় হতেই পারে। সেই জিয়ার আমলে রণজয় গ্রাম সরকার হয়েছিল অথবা তাকে তখন গ্রামের মানুষ মিলে গ্রাম সরকার বানিয়ে ছিল উপরের নির্দেশে। ওই একবারই রণজয়ের ছোট হোক খাটো হোক যা কিছু ক্ষমতা পাওয়া। সেই কারণে ওই রাস্তার কাজ শুরু হলে রণজয়ের উৎসাহিত হওয়া স্বাভাবিক।

তখন পরিতোষই তো বলেছিল, ‘যাক ব্যাডা, তবু একটা রাস্তার কাজ হইতেছে।’ এ কথার ভিতরে চিরদিনের অপ্রাপ্তি। এরশাদ জামানায় তাদের এদিকে কোনো কাজ হয়নি।

রণজয় তাতে সায়ও দিয়েছিল। কিন্তু ভিতরে তার এই আশঙ্কাও ছিল- মাহফুজ চেয়ারম্যানকে ধরে এখানে কাজের কথা এমপির কানে সে-ই তুলেছিল, যদি কাজ ভালো না-হয় তাহলে একসময় তাকেই কথা শুনতে হবে। তলে তলে গ্রামের অনেকেই আজও তাকে সেই গ্রাম সরকারের মতো বিএনপির লোকই ভাবে। হয়তো সেজন্যে আজ অজিয়র এভাবে তার কাছে ছুটে আসা।

কিন্তু অজিয়র আসছে না কেন? রণজয় ভাবে ঘরে যায়। আবার ভাবে, পথে দেখা হওয়ার পরে যেভাবে অজিয়র বলল, তাতে আর একটু অপেক্ষা করা যাক। ওই বটগাছের গোড়ায় নাকি অনেকক্ষণ বসেছিল, তারপরও সে আসছে না দেখে নিজেদের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থেকেছে আর অমলকেও বলে রেখেছিল। অমল দোকান খুললে যদি রণজয়ের সঙ্গে দেখা হয়, তাহলে যেন তাকে জানায়। তাছাড়া এখন এসে রণজয়কে না-পেলে অজিয়র এখন তাদের ঘরে ঢুকবে না। জানে, স্কুল থেকে ফেরার পরে কোনোদিন এ সময় রণজয় স্নান করতে দক্ষিণের দিকে পুকুরে যায়। কয়টা খায় কোনোদিন, কোনোদিন খায় না, বেলা বড়ো থাকলে গড়াগড়ি দেয়। তারপর বারান্দায় বসে থাকে। কোনোদিন সন্ধ্যার পরে রসিকের দোকানের সামনে আসে। অজিয়র তো প্রায়ই এখানে আসে, রণজয় সম্পর্কে এসব তার জানা আছে। তাই পথে দেখা হলে বলেছিল, ‘ও কা (ও কাকা), রসিক ভাইর দোকানের ধারে এট্টু থাইয়েন, আমি আসতিছি।’

কিন্তু এখনও আসে না।

পরিতোষ রণজয়কে বলে, ‘ও কা, তোমারে কবে কী বোজছো কিছু?’

রণজয় বলে, ‘এট্টু, এট্টু!’

পরিতোষ তার কালো শরীরের ঘাড়ের কাছে ডান হাত বুলিয়ে জোরে হাসে। এভাবে হাসলে উপরের পাটির দাঁতগুলো সামনের দিকে একটু বেরিয়ে আসে। সেই হাসিটা মুখ থেকে মুছে যেতে না দিয়ে সে আরও জানতে চায়, ‘সেই এট্টুডা কতটুক?’

রণজয় জানে পরিতোষ হঠাৎ কেন এভাবে অজিয়রের কথা জানতে চাইছে। পরিতোষের পাশে বসা কৃপাসিন্ধু। সে কিছুই বুঝছে না তা রণজয় তার মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারছে। তবে দোকানদার রসিক খুড়োর বোঝার হিসেব টনটনে। দোকানের দরকারে হাটে বাজারে যায়। ওই ভাসার হাটখোলায় কি তালেশ্বরে কিংবা কচুয়া বাজারে তাকে মালপত্তর কিনতে যেতে হয়, সেখানে নানান কথা সে শোনে। যা বোঝে তা বোঝে, যা বোঝে না পরিতোষ কিংবা শ্রীধর অথবা সুযোগ পেলে রণজয়ের কাছেও জানতে চায়। গোড়াখালের কিংবা খালের ওপার থেকে ভাসার দিকে এগিয়ে যে সানপুকুরিয়া গ্রাম- সেখানকার কেউ দোকান আসলে জিজ্ঞাসা করে, তাদের আলোচনা শোনে।

কিন্তু পরিতোষের জানতে চাওয়ার কারণটা রণজয় নিজের হিসেবের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলতে পারল এই জন্যে যে, রণজয় জানে আজগর ওই রাস্তার কাজে সুযোগ পাওয়ায় পরিতোষের হাত আছে। ভাসার ফিরোজ গাজির সঙ্গে পরিতোষের খায় খাতির ভালো, তার ভাইপোকে মেট্রিক পাস করিয়েছিল পরিতোষ। সে ছেলের সঙ্গে রাজাপুর পর্যন্ত পরীক্ষার সময়ে পরিতোষের যাওয়ার কথা এখনও অনেকের মনে আছে। ফলে এই রাস্তার কাজেরও আগে ফিরোজ গাজির সঙ্গে সম্পর্কের কারণে পরিতোষের জিয়ার দলে যোগ দেয়ার কথা শোনা গেছে। হতে পারে যোগ সে দেয়নি, কমিটিতে বড়পুকুরিয়া থেকে একজনের নাম থাকা লাগে, পরিতোষ নিজের নাম না দিয়ে আজগরকে রাজি করিয়েছিল। আজগর তখন বেকার। এখানে রাস্তার কাজে কন্ট্রাক্ট পাবে ফিরোজের বেয়াইর ছেলে, অর্থাৎ পুতরা, সেই কাজে যেন আজগরকে নেয়। এই গ্রামের সামনের রাস্তার কাজ। এখানকার একজনকে এই কাজে নেওয়া যেতে পারে, ফিরোজ গাজি তার পুতরাকে তা বুঝিয়েছিল।

তবে পরিতোষের গায়ে ওই যে বিএনপির সিল পড়েছিল সেটা এখন আছে।

ভাসার হাটখোলায় হওয়া কমিটিতে কিংবা উপজেলার কমিটির লোকজন কিংবা উত্তর মঘিয়ার বিএনপির লোকজন পরিতোষকে তাদের গোনায় না ধরলেও বড়পুকুরিয়ার যারা জানে তারা পরিতোষকে ওই কাতারেই রাখে। এখন শোনে হাসিনার দল খালেদার সরকারকে প্রায় বেকায়দায় ফেলছে। মাগুরা না কোথায় এক নির্বাচনের পরে এই ঘটনা, দেশে সামনে অবরোধ আসতে পারে। কিছুদিন আগে গোড়াখালের মলঙ্গি বাড়িতে হরিসভা মন্দির নিয়ে যে মিটিং হয়েছিল, সেখানে আসার কথা থাকলেও আসতে পারেনি অনিমেশ মলঙ্গি। এত বড়ো অফিসার, সেও নাকি অবরোধ না হরতালের জন্যে খুলনায় মিটিং বাতিল করেছিল। সেদিনই অনেকেই বুুঝতে পেরেছে সামরে দেশ অচল হয়ে যাবে।

এই সমস্ত ঘটনা আগে পাছে মিলিয়ে এই রসিকের দোকানের সামনে আগেও তো এসব কথা আলোচনা হয়েছে। দাঁত কেলিয়ে হেসে পরিতোষ যতই নিজেকে সে জায়গা থেকে সরিয়ে আনুক, অনেকেই পরিতোষের বিষয়টা খারিজ করে দেয় না। কিন্তু এখন অজিয়র না-এলে বোঝাও যাবে না, আসলে কী নিয়ে কথা বলতে আসবে। যদি এই-ই বিষয় হয় তাহলে রণজয় মনে সাজিয়ে রেখেছ কী বলবে। তবে এখন রসিক খুড়াই পরিতোষকে খোঁচাটা দেয়, ‘ভাইপো রণ যা বোজজে বোজজে, তুই কী বুজিচিস সেইয়ে ক’ দেই (বল দেখি)?’

পরিতোষ হঠাৎ রসিকের এই প্রশ্নে ভ্যাবাচ্যাকা খায়। বিকাল ধীরে ধীরে ¤øান হয়ে আসছে। কোনো গাছের মাথায় এখন আর পশ্চিমে ডুবে যাওয়া সূর্যের আলোর আভা নেই। সন্ধ্যা হওয়ার আগের এই ঘণ্টাখানেক আগে চারধারে এক ধরনের স্তব্ধতা ভর করে। রসিকের দোকানের সামনে রাস্তা তারপরই খাল। সে জলে ভাটার টান। সেখানেও অতি ধীরে গোড়াখালের দিকে জলের স্রোত প্রবাহিত হচ্ছে। এ বাড়ির বিভিন্ন শরিকের হাঁসগুলো সব প্রায় এক জায়গায়। মাঠে এখন ধান আর মাসখানেক বাদে বতি হবে। এখন হাঁসদের মাঠে যাওয়ারও কোনো সুযোগ নেই। এই প্রায় স্থির সময়ে রসিকের মতন ধীরস্থির মানুষের কথায় পরিতোষ যে খাবি খাবে তাই স্বাভাবিক। কারণ এ সময়ে এখানে যারা আছে সবাই তাদের গুষ্টির মানুষ। এদের সামনে পরিতোষের গলা উঁচু হবে না। তা হলো না। সে হাসে। তারপর বলে, ‘আমি আর কী বোঝবো, ও রসিক ভাই?’

‘তা’লি রণজয়রে জিগাইলি কী?’

‘না, এমনি-’

‘না এমনি না। তুইও তো বিএনপি করতে গেলি। ভাসায় যাইয়ে নাম লেহালি। ফিরোজ আমারে কই নি? কী লেহাইলি না?’

‘ওই। হইচে-’

‘ওই হইচে না। মোস্তাফিজুর রহমান সাহেব যখন আন্দারমানিক আসল সেইয়ের পর পর, মনে নেই তোর?’

‘না।’ রণজয় হাসে। ‘না ও খুড়ো, নাটাইখালি আসলি পর-’

‘হয়, নাটাইখালি আসলি পর। সেদিন সেই অনুষ্ঠানে রণজয়ও ছেল। সেই সময় নাম লেখাইসনি, ও পরি?’

পরিতোষ বলে, ‘হয়, লেহাইলাম নাকি মনে নেই। তয় ও দলের মিটিং-টিটিংয়ে সেরাম যাইটাই নেই কিন্তু। সেয়া তো তোমরা জানো।’

রণজয়ের এসব কথা এখন আর ভালো লাগছে না। এমন ঘটনা এ গ্রামে ঘটেছে বলে এত কথা! পরিতোষ ঘটিয়েছে কি আজগর ঘটিয়েছে, আজগর একটু বেশি বেশি। কিন্তু শহরে নেতারা এমন কত ঘটায়! আজ জাতীয় পার্টি, কয়দিন বাদে এরশাদ জেলে যাওয়ার পর যে-ই খালেদা ক্ষমতায় সব বিএনপি। এহোন নেতারা বদল না হলেও হাসিনা ক্ষমতায় আসলে গ্রামকে গ্রাম কত আওয়ামী লীগ হবে। তবে অন্যদের দোষ না হলেও, এই গ্রামের কেউ কখনও প্রায় বিএনপি করেনি, যা করেছে তা ওই উত্তর মঘিয়ার মুসলমানরা, তাদের ঘাড়ে দোষ আসা স্বাভাবিক। উত্তর মঘিয়ার ওরা আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলেও বিএনপিই থাকবে। কিন্তু কোনোদিন কচুয়ায় সুনীল কিংবা শ্রীধরকে হিরুভাই যদি জিজ্ঞাসা করে বসে তারা থাকতে তাদের গ্রামের পরিতোষ কিংবা হবির ছেলে আজগর কীভাবে কার বুদ্ধিতে ওই দলে গেছিল- এর কোনো উত্তর রণজয়ের জানা নেই। আচ্ছা, রণজয় ভাবে, এবারের ইলেকশনে হিরুভাই জিততে পারবে তো? রণজয়ের সন্দেহ হয়। আগের বার কয়েক ভোটে হেরেছে। এবার কর্নেল সাহেব অনেক বড়ো ক্যানডিডেট। পররাষ্ট্রমন্ত্রী। সোজা কথা?

তার এই ভাবনার ভিতরে আর পরিতোষের জায়গা কোথায়? কিন্তু জায়গাটা আবার পারিতোষই নেয়। স্বপন কোথাকে এসে হাজির। হালদারবাড়ির দিক থেকে আসেনি, সেদিকে রণজয়ের মুখে। এসেছে ভাসার দিক থেকে। স্বপনকে দেখেই রণজয়ের ভুরুতে একটু গিঁট পড়ে। সঞ্জয় আর রচনার ঘটনার পর থেকে এটা ঘটছে। যদিও রণজয় চায় সব সময়ই স্বাভাবিক থাকতে। দোষ তার মেয়েও করেছে। যদিও সঞ্জয় বুঝমান, রচনার চেয়ে বয়েসে কয়েক বছরের বড়ো আর কচুয়ায় থাকে। গ্রামে একটা কাণ্ড ঘটিয়ে আবার সেখানে চলেও গেছে। আর তার মেয়েটা ঘরে বাইরে বেরুলেই সংকোচে জড়োসড়ো হয়ে থাকে। রণজয়েরই সেদিন অত মাথা গরম করা উচিত হয়নি। এত লোক জানাজানি না হওয়াই ভালো ছিল। মেয়েটার কথা ভাবলে, আর ওই ঘটনার জন্যে এখন স্বপনকে দেখে রণজয় ভাবে ঘরে চলে যায়। কিন্তু অজিয়র ছোড়া আসছে না কেন?

এদিকে পরিতোষ যেন নিজেকে উদ্ধারের সুযোগ পায় স্বপনকে দেখে। সে জানতে চায়, ‘আসলি কোয়ানদে?’

‘এই এট্টু ভাসার দিক গেছেলাম।’

‘কোন কাজে, না এমনে?’

‘আরে আছে এক কাজ, হইল না। বড়দা কইল সের এট্টা দরকার। দেহি এখন বাড়ির দিক যাই। তুমি কচুয়া যাবা নাকি আইজ কাইল?’

‘আইজ আর যাব কহোন?’

‘এ কৃপা, তুই যাবি?’

এই প্রথম কৃপাসিন্ধুকে এতক্ষণের ভিতরে কেউ কিছু জিজ্ঞাসা করল। সে দোকানের ছোট দরজায় বসেছে, তা যেন পরিতোষ রণজয় কি দোকানদার রসিক কেউ খেয়ালই করেনি। অথবা আজকাল কৃপাসিন্ধু এইভাবেই বসে থাকে। অথবা এটাই তার ধরন। মানুষের ভিতরে থাকলেও সে যেন নেই। কৃপাসিন্ধু স্বপনের কথায় উত্তর দেয় না। তার আপাতত কচুয়া যাওয়ার কোনো কারণ নেই। স্বপনের দরকারটা জরুরি। তা বুঝে পরিতোষ, অজিয়র আসবে এখনই, রণজয় তাদের বলেছে অজিয়র কচুয়া যাবে- এই কথা বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু তার আগেই কৃপাসিন্ধু হঠাৎই স্বপনের কাছে জানতে চায়, ‘কেন, সঞ্জয় আসপে না আইজ কাইল?’

হঠাৎ সঞ্জয়ের প্রসঙ্গ আসায় স্বপন খানিকটা বিব্রত। রণজয় সামনে। তাছাড়া সঞ্জয় কবে আসবে তা তো জানে না।

রণজয় এর ভিতরে বলে, ‘স্বপন, সঞ্জয়রে এট্টু কম আসতে কইস-’

‘কেন, ও রণদা? ওয়ার বাড়ি ও আসপে তাতে কোম আর বেশি কী?’

‘না, কথাডা কইচি শুনিস।’

গোঁয়ার হিসেবে স্বপনকে সবাই জানে। সে গোঁয়ার্তুমির জন্যেই তার জীবনটা এমন। সেই জেদ যেন এখন আরও বাড়ে। পাতলা শরীরে সে তার একটু ভিতরে ঢোকা বড়ো চোখ দুটো আরও একটু বড়ো করে বলে, ‘কইলি আসতে ক’বানে, দেহি আপনে পারলে ঠেকাইয়েন।’

রণজয় উঠে দাঁড়ায়। রাস্তার উল্টো দিকে জিয়ল গাছের সঙ্গে রাখা সাইকেলটা হাতে নেয়। তারপর বলে, ‘গলা বাড়াইস না, গলা বাড়াইস না। যাই কইচি শোন।’

কিন্তু স্বপনের গলা সব সময়ই বাড়ানো। সে ফিসফিসিয়ে কথা বললে অনায়াসের পাশের লোক শোনে। এখন তার গায়ে লেগেছে। কথা সে বাড়াবেই। কিন্তু রণজয় তখন হেঁটে তার ঘরের দিকে যেতে লাগলে স্বপন তাবুও গজরায়, কোনোভাবেই বোঝে না রণজয় তার সঙ্গে কথা কইতে চাইছে না।

রণজয় রসিককে বলে, ‘খুড়া, হবির ছওয়ালডা আসলি কইয়ো আমি ঘরে আছি।’ এ কথাটারও এমনভাবে বলল যেন ওই স্বপনের জন্যে এখানে বসা গেল না।

রণজয় একই সামনে এগিয়ে রাস্তা থেকে নিজের উঠোনে ঢুকতেই স্বপন, রসিক পরিতোষ আর কৃপাসিন্ধুকে বলতে থাকে, ‘কইলেই হইল, হালদাররা এই গ্রামে ভাইসে আসেনি। আমার ভাইরে কয় কোম আসতি। কয়দিন বাদে কবে আমার বাড়ির সামনে রাস্তা দিয়ে তোরা হাঁটপি না।’

পরিতোষ বলে, ‘না ও বাবাজি, রণজয় খুড়া ওই কথা কবেনানে। কোহানদে আইচিস্ এহোন বাড়ির দিক যা। যাইয়া মা ঠাইরেনের হাত দিয়ে এক গেলাস জল নিয়ে খাইয়ে ঠাণ্ডা হইয়ে এক জায়গায় বয়।’

স্বপনের মনে হয়, এরাও তো মল্লিক গুষ্টির। এদের সামনে সে এভাবে কথা বলে সুবিধা করতে পারবে না। স্বপনও রণজয়ের পিছন পিছন নিজেদের বাড়ির দিকে হাঁটে। যাওয়ার আগে একই কথা বলে। একটু গজরায়।

স্বপন এগোতেই রসিক পরিতোষ আর কৃপাসিন্ধুকে সেই কথাটা বলে। বয়েসে প্রবীণ রসিকেরই তা ভালো মনে থাকার কথা। সেই কতদিন আগে রসিকের সেই জ্ঞাতি বোনটার হাত ধরে টেনেছিল স্বপনের জ্ঞাতি জেঠা। হালদার গুষ্টির পুরুষে ওই দোষ গেল না। আবার গলার জোরও আছে।

পরিতোষ আর কৃপাসিন্ধু পরস্পরের দিকে তাকায়। তারাও একদিন শুনেছিল এমন কথা। কবে কোন কালে। সে ঘটনা তো তাদের জন্মেরও আগে। সেই মুছে যাওয়া ঘটনাই আবার সামনে আনল ওই সঞ্জয় আর রচনা!

২.

কয়েক দিন ধরে খুদি সব সময়ে মুখখানা কেমন ভার হয়ে থাকে। তাকালে হয়তো তা বোঝাও যায়, কিন্তু পুরুষরা তা ঠিকঠাক বুঝতে পারে কই? আবার সম্পর্কে তার ছেলের বয়েসী কৃপাসিন্ধু কিংবা শ্রীধর যদি তা বুঝতেও পারে, কিছু বলবেও না। অথচ খুদি জানে পিছনে তাকে নিয়ে রসিকতাও করে তারা। এমনিতে তার আর রসিকের সম্পর্ক নিয়ে রসিকতার শেষও নেই। খুদির ভাষায়, রঙ্গ করা। খুদি জানে তেমন রঙ্গ তারা করতেই পারে। বিপতœীক ভগ্নিপতি আর বিধবা শালি একসঙ্গে থাকে, তা নিয়ে জোয়ান ছেলেরা একটু আধটু রঙ্গ করবে তাই স্বাভাবিক। যদিও আগে ঠারে ঠারে অর্থাৎ আকার ইঙ্গিতে সামনেই বলত, এখন বড়ো হয়েছে, ওদের ছেলেমেয়েরাও দিনকে দিন বুঝমান হচ্ছে তাই সামনে প্রায় কিছু বলেই না। তবে পিছনে বলে। আগে সামনেই বলত, ‘ও খুড়ি? থুড়ি, ও মাসি, তোমার মুখ কালা কেন? খুড়োর সাথে বাধিচে নাই (নাকি)?’ অথবা, সম্পর্কে নাতি পরিতোষ ওদের সামনেই উঁচুগলায় বলত, ‘ও দি, ঘটনা কী? রসিক ভাইর মনে কয় আর তোমারে দরকার নেই। কী সেইয়ে না? বুড়োর মনে কয় রস কুইমে গেইচে?’ কিন্তু এখন সামনে না-বললেও, পিছনে পিছনে তারা একে অন্যের সঙ্গে এ নিয়ে যে কথা বলে তা বুঝতে পারে। সামনে হয়তো বলে অন্য কথা, ‘ও মাসি, আইজকাল খুড়ো তোমারে আর মহাভারত কি ভাবগৎ পইড়ে শুনোয় না?’

এ কথা সত্যি, সারা গ্রাম কি ইউনিয়নের প্রায় সবাই জানে রসিক ভাগবৎ পড়ে অসাধারণ! লোকটার জীবনে যাই ঘটুক, পরম বৈষ্ণব ভাব তার আছে। কৃপাসিন্ধুর বাপ কেষ্ট মল্লিকের মতন তিলকের ফোঁটা কেটে, গলায় গেরুয়া রঙের উত্তরীয় পরে গ্রামময় নিজের বৈষ্ণবভাব রসিক জানিয়ে বেড়ায় না বটে, কিন্তু নিজে নিজে সে চৈতন্যচরিতামৃত পড়ে, কাউকে পড়ে শোনায়, সে পাঠ শোনার মতো! যদিও সাধারণত তার সে পাঠের শ্রোতা থাকে একজনই, সে খুদি। দোকানের সামনের ঝাপ খোলা কি ফেলানো, পিছনে তাদের ঘরে দিক থেকে তাকালে কিংবা পাশের ছোট দরজা থেকে দেখা যায়, খুব সকালে কিংবা অলস দুপুরে রসিকলাল মল্লিক তার শালিকা খুদিরানি পাঁড়েকে ভাগবৎ পড়ে শোনাচ্ছে।

খুদি ভাবে, সেদিন গেছে। যদিও তার এই মন খারাপ কিংবা গাল ফোলা নিয়ে ছেলেরা কিছু না বললেও কৃপাসিন্ধুর বউ পার্বতী ঠিকই বুঝতে পারে। এমনিতে বউটাকে দজ্জাল বলো আর অসাইল্যর ভাণ্ডো বলো কিংবা বলো এমনি মুখ যে সেখানে একগাছা নারকেলের বাইল ধরলে তা ফুৎ করে জ্বলে উঠবে! কিন্তু খুদির খোঁজ-খবর যা নেওয়ার সে-ই নেয়। ওই শ্রীধরের বউ ছবি তেমন তো নেয় না। তবে পার্বতী আর ছবির তফাৎটাও বোঝে খুদি। একজন খানে দজ্জাল। কথা-লাগানোয় ওস্তাদ। নিজের আগ্রহে খোঁজখবর নেয় ঠিকই, কিন্তু ভিতরে ভিতরে সুযোগে থাকে। অন্যজন একেবারেই চুপচাপ। কারও সঙ্গে নেই পাছে নেই। শ্রীধরেরই মতন ওর বউটাও একই পদের। তবু খুদির মনে হয়, ওই ছবিই যদি তার কাছে কখনও মনকষ্টের কথা জানতে চাইত, তাহলে সে তাকে অন্তত দুটো কথা মন খুলে বলতে পারত। অথচ গত কিছুদিনে একটিবারের জন্যে কখনওই কোনোদিন ছবি তাকে কিছু জিজ্ঞাসা করেনি। যা করেছে পার্বতী।

পার্বতীই একসকালে দোকানের সামনে এসে খুদির কাছে জানতে চায়, ‘ওদি, আইজকাল তোমার মুখকান ওইরাম কালো থাকে কী জন্যি?’

খুদি সবে দোকানের কাপ তুলেছে। রসিক কাছেপিঠে নেই। হয়তো হরিসভার দিকে গেছে। অথবা, একটু আগে পার্বতীর শ্বশুর কেষ্টর সঙ্গে কথা বলতে দেখছিল, তখন দুজনে হয়তো হাঁটতে হাঁটতে সামনের ঘরামিবাড়ির পোল পার হয়ে ওপারে গেছে। সেখানে কেষ্টর আর রসিকের একই দাগে জমি আছে। হতে পারে কেষ্টই বলেছে, ‘চলো খুড়ো, ওপার যাই এট্টু জমি দেইখে আসি।’ পান্তা খাওয়ার পরে দোকানে ভিতর গড়াগড়ি দেওয়ার চেয়ে হেঁটে আসা ভালো। রসিক আজকাল ফুলে যাচ্ছে। এমনিতেই একটা ভারী শরীরের মানুষ সে, তারপর যদি আরও মোটা হয়! তবে আশপাশের আট-দশজনের চেয়ে রসিক স্বাস্থ্যবান ও সুপুরুষ। তার যে অত বড়ো মেয়ে আর নাতি আছে দেখলে তা বিশ্বাস হবে না। রসিক তার মেয়েকে দেখে না কতদিন! খুদিও বোনঝিটার মুখখানা ভুলে গেছে।

এখন সেকথা বলবে খুদি পার্বতীকে? নাকি বলবে না? পার্বতী তার মুখ দেখে পড়ে নিয়েছে মনের ভিতর! খুদি পার্বতীর জনতে চাওয়ায় চট্ করে ওর মুখের দিকে দেখে, আর ভাবে তাহলে তার আর রসিকের ভিতরের বিষয়টা পার্বতী জেনে গেল নাকি। (চলবে)

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj