বঙ্গবন্ধু হত্যা রহস্য উদঘাটনে করণীয়

বৃহস্পতিবার, ১৫ আগস্ট ২০১৯

ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী

বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে আমি ১৯৭৩ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য প্রথমবারের মতো বিদেশ গমন করি। সে সময়ে চিলির প্রেসিডেন্ট আলেন্দেকে হত্যা করা হয়। আলেন্দে বাম ঘেঁষা ছিলেন এবং সে মোতাবেক তিনি তার মতাদর্শের বেশকিছু বুদ্ধিজীবী সৃষ্টি করেছিলেন। আলেন্দের মৃত্যুর পর তার অনুসারী বেশকিছু বুদ্ধিজীবীকে স্মাগল করে ব্রিটেনে নিয়ে আসা আমার এক শিক্ষক আমাকে বলেছিলেন যে তোমাদের ‘বঙ্গবন্ধুর পরিণামও চিলির আলেন্দের মতো হতে পারে। আশপাশে কিছু আলামতও দেখছিলাম। বিলাতে অধ্যয়নরত কতিপয় বৃদ্ধ-ছাত্র তার বিরুদ্ধে কোমর বেঁধে নেমেছিল। তার বেশকিছু দিন পর বঙ্গবন্ধুর একটা উক্তির সাথে বিলেতে বসেই পরিচিত হলাম। বঙ্গবন্ধু বললেন ‘আমার ভাগ্য যদি চিলির আলেন্দের মতো হয় তবুও সাম্রাজ্যবাদের কাছে আমি মাথানত করব না। বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর তাকে হত্যার কারণ নিয়ে কত গবেষণা, জল্পনা-কল্পনা, মিথ্যাচারিতা বা মিথ জন্ম হয়েছে, কিন্তু আমরা দেখিনি হয়তো বা বুঝিনি যে বঙ্গবন্ধুকে কেন হত্যা করা হয়েছে তার কারণ জীবিত বঙ্গবন্ধু নিজেই বলে গেছেন। তার আর একটি উক্তি প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন বিশ^ আজ দুভাগে বিভক্ত। একদিকে শোষক অপরদিকে শোষিত। আমি শোষিতের পক্ষে। এই শোষিতের পক্ষে থেকে বিশে^ কেউ টিকে থাকতে পারেননি।

তাকে কেন হত্যা করা হলো তা স্পষ্ট হলেও তাকে কারা হত্যা করল তা অস্পষ্ট রয়ে গেল। ধারণা করেছিলাম যে অবমুক্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দলিল দস্তাবেজে এসব কিছু থাকবে। আমাদের গবেষকরা তন্নতন্ন করে খুঁজেও সরাসরি হুকুমের আসামিদের খুঁজে পাচ্ছেন না। এমতাবস্থায় তল্পীবাহক বা ঘাতকদের ছাড়াও হুকুমদাতাদের খুঁজে বের করা প্রয়োজন। সে কারণে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি তদন্ত কমিটি গঠন অপরিহার্য। স্যার টমাস উইলিয়ামের নেতৃত্বে একটি কমিশন গঠন করা হয়েছিল যার শিরোনাম ছিল ‘শেখ মুজিব মার্ডার ইনকোয়ারি বা শেখ মুজিব হত্যা তদন্ত।’ এই কমিশনের অপর দুই সদস্য ছিলেন নোবেল পুরস্কার বিজয়ী আইরিশ কৌঁসুলি ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সাবেক মহাসচিব জেফ্রি টমাস ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সাবেক সভাপতি ও ত্রিটিশ পার্লামেন্টের তদানিন্তন সদস্য সন ম্যাকব্রাইড এবং সচিবের দায়িত্বে ছিলেন ত্রিটিশ আইনজীবী অব্রে রোজ। এই কমিশন গঠনের পেছনে শেখ হাসিনার সক্রিয় অবদান ছিল। তদানিন্তন বিএনপি সরকার টমাস উইলিয়ামকে বাংলাদেশে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে এবং জেফ্রি টমাস ও অব্রে রোজের ভিসা আবেদন নাচক করে দেয়।

তারপরও ১৯৮২ সালে অসম্পূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে তারা যে রিপোর্ট পেশ করে তা রেকর্ড আছে। তাদের ইচ্ছে ছিল ১৫ আগস্ট ও ৩ নভেম্বর সংক্রান্ত সব কাগজপত্র বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞ নিয়ে পরীক্ষা করা কিন্তু তা সম্ভব হয়নি। তার অর্থ দাঁড়াচ্ছে বঙ্গবন্ধু হত্যারহস্য এখনো রহস্যাকৃত। সেদিন জানলাম শেখ রেহানার উদ্যোগ ব্রিটেনে একটি তদন্ত কমিশন গঠিত হয়েছিল যার তথ্যাদি পরবর্তীতে আলোর মুখ দেখেনি। এই কমিশনের বিস্তারিত কিছু আমার জানা নেই। তবে ব্রিটেনে পড়াশুনা করে এটুকু জেনেছি যে অন্তত ব্রিটিশরা কিছুই হারিয়ে ফেলে না। তাই এদেশে কোনো তদন্ত কমিটি বা কমিশন হলে তার কর্তা-ব্যক্তিরা অবশ্যই ব্রিটিশ কমিটির উদঘাটিতব্য তথ্য বা রহস্যের সাথে তাদের প্রাপ্ত তথ্যাদি মিলিয়ে দেখতে পারবেন। হয়তো একথাও উদঘাটিত হবে যে ‘ঘরের ইঁদুর বেড়া কেটেছিল বলেই বেড়া ও ঘর দুটিই রক্ষা পায়নি। প্রস্তাবিত কমিটি যদি আমার জীবদ্দশায় কাজ শুরু করে তাহলে আমার কিছু কথা আছে। আমি ১৫ আগস্ট দেশে ছিলাম। প্রতি বছর ১৫ আগস্ট এলেই ঘাতকদের বিচার নিয়ে তোড়জোড় শুরু হয়, তারপর তা মিলিয়ে যায়।

দ্বিতীয় সংস্করন'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj