টেবিলের ড্রয়ারে স্ত্রীর লাশের ৫ টুকরা, স্বামী গ্রেপ্তার

বৃহস্পতিবার, ১৫ আগস্ট ২০১৯

নাসির উদ্দিন জর্জ, শ্রীপুর (গাজীপুর) থেকে : শ্রীপুর পৌরসভার গিলারচালা (আসপাড়া মোড়) এলাকায় স্ত্রীকে শ্বাসরোধে হত্যার পর লাশ কেটে টুকরো করে পলিথিনে ভরে নদীতে ফেলে দিয়েছেন স্বামী মামুন। ঘাতক মামুনকে গত মঙ্গলবার রাত ২টার দিকে ঢাকা জেলার আশুলিয়া থানার কবিরপুর এলাকায় ফুপাতো ভাইয়ের বাসা থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

গতকাল বুধবার বিকেল ৩টার দিকে গাজীপুরের পুলিশ সুপারের সভাকক্ষে সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান পুলিশ সুপার (এসপি) শাসুন্নাহার। তিনি জানান, গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মামুন জানিয়েছে, দাম্পত্য কলহের জেরেই মূলত সুমিকে খুন করা হয়েছে। সম্প্রতি নারীঘটিত বিষয় নিয়ে স্বামী মামুনের প্রতি সুমির চরম অবিশ্বাস দেখা দেয়। এ নিয়ে প্রায়ই তাদের মধ্যে ঝগড়া হতো। পারিবারিক কলহ ও স্ত্রীর জমানো ৪০ হাজার টাকা ভোগ করার জন্য স্ত্রী সুমি আক্তারকে সে হত্যা করে।

হত্যার বর্ণনায় অভিযুক্ত স্বামী মামুনের বরাত দিয়ে পুলিশ সুপার জানান, গত ৮ আগস্ট স্ত্রী সুমি আক্তারকে হত্যার পরিকল্পনা করে মামুন। সে অনুযায়ী ৫ কেজি ধারণক্ষমতাসম্পন্ন ২৫০ গ্রাম পলিথিন ব্যাগ, একটি চাকু, তিনটি ট্র্যাভেল ব্যাগ ও ঘুমের ওষুধ ক্রয় করে এনে বাসায় রাখে মামুন। গত বৃহস্পতিবার রাত ১টার দিকে শ্বাসরোধে সুমিকে হত্যা করে মামুন। পরে তার মরদেহ গোসলখানায় নিয়ে যায় এবং বাজার থেকে কিনে আনা ধারালো ছুরি দিয়ে প্রথমে মাথা, পরে লাশের হাত ও দুই পা ৮ টুকরো, নিতম্ব ও উরু থেকে ৫ এবং বুক থেকে পেট পর্যন্ত একটিসহ মোট ১৫টি টুকরো করে। ৯ আগস্ট ভোর ৬টার দিকে লাশের কিছু অংশ ট্র্যাভেল ব্যাগে ভর্তি করে গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার সিংহশ্রী সেতুর ওপর থেকে শীতলক্ষ্যা নদীতে ফেলে দেয়। একই দিন রাতে দেহের অন্যান্য অংশের ৫টি টুকরো ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ারে পলিথিনে পেঁচিয়ে রেখে হাত, পায়ের টুকরো ও মাথা আরেকটি ট্র্যাভেল ব্যাগে নিয়ে একই স্থানে ফেলে দেয়। এদিকে তাদের ভাড়া বাসায় এসে সুমি আক্তারের স্বজনরা কোনো খোঁজ না পেয়ে বাসার তালা ভেঙে নতুন তালা লাগিয়ে যাওয়ায় ওই ৫টি টুকরো নিতে না পেরে মামুন পালিয়ে যায়।

নিহত সুমি আক্তার (২২) নেত্রকোনা জেলার পূর্বধলা উপজেলার দেবকান্দা গ্রামের নিজাম উদ্দিনের মেয়ে ও গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার বড়বাড়ি গ্রামের ফজলুল হকের ছেলে মামুনের স্ত্রী। গত দেড় বছর আগে তাদের বিয়ে হয়। এটি উভয়েরই দ্বিতীয় বিয়ে।

সুমি স্থানীয় গিলারচালা এলাকার সাবলাইন গ্রিনটেক গার্মেন্টস লিমিটেডের শ্রমিক ও মামুন পেশায় ইলেক্ট্রিশিয়ান। তারা গিলারচালা গ্রামের সফিকুল ইসলাম বিপুলের বাড়ির ভাড়াটিয়া। দেড় মাস আগে তারা ওই বাড়িতে ভাড়ায় উঠেন।

গত সোমবার রাত ৯টার দিকে শ্রীপুর থানার পুলিশ পলিথিনে মোড়ানো মাংসের পুঁটলি উদ্ধার করে। এ ঘটনার পর থেকে গৃহবধূর স্বামী মামুন পলাতক রয়েছে বলে অভিযোগ করেন নিখোঁজ সুমি আক্তারের ছোট বোন বৃষ্টি আক্তার।

বৃষ্টি আক্তার বলেন, বৃহস্পতিবার কারখানা ছুটির পর ওই রাতেই নেত্রকোনা বাবার বাড়ি যাওয়ার কথা ছিল সুমির। শুক্রবার রাতে মামুন তার শাশুড়িকে মোবাইলে জানায় সুমিকে বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছি। সুমি বাড়িতে পৌঁছেছে কিনা শাশুড়ির কাছে জানতে চায় মামুন। খোঁজ নিতে শুক্রবার স্বামী মামুনের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে সে (স্বামী মামুন) জানায় সুমি বাড়ির উদ্দেশে রওনা হয়েছে। ঈদের ছুটিতে গ্রামের বাড়িতে গিয়ে টিউবওয়েল স্থাপনের জন্য টাকা নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। শুক্রবার সকালে বাড়ি যাওয়ার সময় সুমির মোবাইলে একাধিকবার যোগাযোগ করেও না পেয়ে ছোট বোন বৃষ্টি ও তার স্বামী নবী হোসেন তাদের গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহের উদ্দেশে রওনা হন। তারা বাড়ি পৌঁছে একাধিকবার বড় বোন ও ভগ্নিপতির মোবাইলে যোগাযোগ করে ফোন নম্বর বন্ধ পান। শনিবার বৃষ্টি ও তার স্বামী গিলারচালা (আসপাড়া মোড়) এলাকায় বোনের ভাড়া বাসায় যান। সেখানে কাউকে না পেয়ে ঘরের দরজার তালা ভেঙে ভেতরে ঢোকেন। বাসায় কাউকে না পেয়ে ফিরে যান তারা। ফেরার পথে আসপাড়া মোড় এলাকায় মামুনের সন্ধান পান এবং তাকে নিয়ে বাসার দিকে রওনা দেন তারা।

এক পর্যায়ে মামুন তাদের বাসায় যেতে বলে কৌশলে পালিয়ে যায়। এর পর বৃষ্টি ও তার স্বামী গ্রামের বাড়ি ফিরে যান। বাড়ি গিয়ে বোনকে না পেয়ে আবার মোবাইলে যোগাযোগের চেষ্টা করেন তারা। কিন্তু বোন-ভগ্নিপতির সন্ধান পাননি ছোট বোন বৃষ্টি। পরে সোমবার সন্ধ্যায় আবার খোঁজ নিতে এসে ঘর থেকে পচা মাংসের গন্ধ পেয়ে আশপাশের লোকদের ডেকে আনেন। এতে স্থানীয় লোকদের সন্দেহ হলে তালা ভেঙে তারা ঘরে ঢোকেন।

বৃষ্টি আক্তার দাবি করেন তার বোন সুমি আক্তারকে স্বামী মামুন হত্যার পর মরদেহ টুকরো টুকরো করে পালিয়েছে।

শ্রীপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) রাজীব কুমার সাহা জানান, নিহত সুমি আক্তারের স্বজনদের খবরে পলিথিনে মোড়ানো মাংস উদ্ধার করা হয়। নিহতের বাবা মামুনকে চিহ্নিত এবং কয়েকজন অজ্ঞাতকে অভিযুক্ত করে মঙ্গলবার শ্রীপুর থানায় একটি মামলা রুজু করেন।

শেষ পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj