মিনি কক্সবাজার ও পতেঙ্গায় বাড়ছে ভ্রমণপিয়াসীদের ভিড় : বখাটেদের দৌরাত্ম্য রোধে নেই তৎপরতা

বৃহস্পতিবার, ১৫ আগস্ট ২০১৯

কামরুজ্জামান খান ও সাহীদুল হক খান ডাবলু, দোহারের মৈনট থেকে ফিরে : ঢাকা জেলার দোহারের পদ্মা নদী পাড়ের মৈনট ঘাট ভ্রমণ পিপাসুদের কাছে পরিচিতি পেয়েছে ‘মিনি কক্সবাজার’ হিসেবে। আর খানিকটা দূরের বাহ্রাঘাটের পরিচিতি এখন ‘মিনি পতেঙ্গা’। সারাবছরই দর্শনার্র্থীদের আনাগোনা থাকলেও যেকোনো ছুটির দিনে সেখানে ঢল নামে আবালবৃদ্ধবণিতার। বিশেষ করে ঈদের ছুটির সময় মৈনট ও বাহ্রাঘাটে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্তই থাকে উপচে পড়া ভিড়। চলে জম্পেশ আড্ডা, হৈ-হুল্লোড়, ঘোরাঘুরি। তবে এই নির্মল আনন্দের মাঝেও কখনো কখনো নিরানন্দের শঙ্কা জাগিয়ে তোলে বখাটেদের উৎপাত। যদিও এ ব্যাপারে স্থানীয় প্রশাসনের কোনো তৎপরতাই চোখে পড়ে না।

মৈনট ঘাট ও পদ্মার সৌন্দর্য উপভোগের জন্য দিনের দ্বিতীয়ভাগ ভালো। সেখানে দেখা যায়, সূর্যাস্তের অপরূপ দৃশ্য। পদ্মার এপাড়ে দোহার আর ওপাড়ে ফরিদপুর। পদ্মায় হঠাৎ করে ঢেউ বেড়ে গিয়ে পাড়ে আছড়ে পড়ে। তাতে পা ভিজিয়ে নেয় দর্শনার্থীরা। তবে বৃষ্টিতে জলকাদায় একাকার ওই এলাকায় প্রশাসনের তদারকির অভাবে দর্শনার্শীদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়। আবার পুলিশ ও প্রশাসনের নজরদারি না থাকায় বখাটে ও মাদকসেবীদের দৌরাত্ম্য বেড়েই চলেছে। ফলে বেড়াতে যাওয়া সাধারণ মানুষ নানাভাবে নাজেহাল ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর তরুণী ও মহিলারা মৈনট ও বাহ্রাঘাটে নদীর পাড় এড়িয়ে চলেন!

ঈদের ছুটিতে ঘুরতে যাওয়া দর্শনার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঢাকার গুলিস্তান থেকে বাসে সেখানে যেতে সময় লাগে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা। গোলাপশাহ মাজার থেকে দোহারের মৈনট ঘাটে সরাসরি বাসে যেতে জনপ্রতি ভাড়া ৯০ টাকা। ঢাকার বসিলা ব্রিজ পার হয়ে কেরানীগঞ্জের খোলামোড়া, আটিবাজার হয়ে নবাবগঞ্জ চৌরঙ্গী পেড়িয়ে দোহারের কার্তিকপুর বাজার থেকে বামে গেলে মৈনট, সোজা গেলে বাহ্রাঘাট। আবার বাবুবাজার ব্রিজ পার হয়েও পৌঁছা যায় একই গন্তব্যে।

রাজধানীর পাশে হওয়ায় পদ্মা নদীতে ঘুরে বেড়ানোর চমৎকার জায়গা হিসেবে মৈনট ঘাট জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এই ঘাটের আশপাশে বিশেষ করে পূর্ব পাশে বিশাল চর আর সামনে বিস্তীর্ণ পদ্মা। এখান থেকে পদ্মা নদীতে নৌকায় ঘুরে বেড়ানো যায় পাড় ধরে। অনেক সময় প্রচুর রংবেরংয়ের পালের নৌকাও দেখা যায় মৈনট ঘাটে। পদ্মায় ঘুরে বেড়ানোর জন্য আছে স্পিড বোট। ৮ জনের চড়ার উপযোগী একটি বোটের ভাড়া আধ ঘণ্টার জন্য দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা। রয়েছে ছোট বড় নানা আকারের ইঞ্জিন নৌকা। আড়াইশ থেকে ৮শ’ টাকা ঘণ্টায় এসব ইঞ্জিন নৌকায় চার থেকে ২০/২৫ জন একসঙ্গে ঘুরে বেড়ানো যায়। পদ্মাপাড়ে পাওয়া যায় তাজা ইলিশের স্বাদ। কিছুটা বেশি দামে হলেও জেলে নৌকা থেকে কেনা যায় টাটকা ইলিশ। তবে মনোমুগ্ধকর এসব আয়োজনের মধ্যেই মৈনট ঘাটে গোসলে নামা এবং শ্যালো ইঞ্জিনচালিত নৌকায় করে ঘুরতে যাওয়া তরুণ-যুবকদের উন্মাদনা সাধারণ দর্শনার্থীদের দারুণভাবে ভীত করে। গত মঙ্গলবার দুপুরে কয়েক গ্রুপে বিভক্ত যুবকদের মদ্যপ অবস্থায় নদীতে গোসলে নামতে দেখে ভড়কে গিয়েছিলেন অনেকেই।

সাভার থেকে মৈনট ঘাটে ঘুরতে যাওয়া দেলোয়ার হোসেন জানান, দলবেঁধে নদীতে গোসল করতে নামা অধিকাংশ যুবকের মুখ থেকে মদের বিশ্রি গন্ধ আসছিল। তাদের আচরণও ছিল বেসামাল। ফলে নারী ও শিশুরা বেশ ঘাবড়ে গিয়েছিল। আলোকুর রহমান নামে আরেক যুবক বলেন, পুলিশ ও প্রশাসনের কোনো তৎপরতা না থাকায় বখাটেরা এখানে দাবড়ে বেড়ায়। সড়কে নেই কোনো ধরনের শৃঙ্খলা, প্রায়ই মোটরসাইকেল ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে।

এদিকে কয়েক বছর ধরে বাহ্রাঘাট সেজেছে নতুন সাজে। নদীভাঙন ঠেকাতে পদ্মা নদীর পাড়ের দীর্ঘ এলাকাজুড়ে বসানো হয়েছে ব্লুক। এর মাঝ দিয়ে ঘুরে বেড়ান দর্শনার্থীরা। নিয়মিত বসছে হরেক রকম খাবার এবং বাচ্চাদের খেলনার দোকান। ঠাণ্ডা বাতাসে সেখানে মেলে চট্টগ্রামের সমুদ্র সৈকত পতেঙ্গার আবহ। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেখানে ভিড় বাড়তে থাকে। বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সব বয়সী মানুষ নিজেদের মতো করে আনন্দে মেতে উঠতে দেখা যায়। তবে সেখানেও রয়েছে বখাটেদের উৎপাত।

ঢাকার কলাবাগান থেকে বেড়াতে যাওয়া একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী টুম্পা আক্তার জানান, পুলিশ ও প্রশাসনের টহল না থাকায় মদ্যপান করে ও গাজা সেবন করে বখাটেরা মোটরসাইকেল নিয়ে সেখানে সাধারণ মানুষকে বাজে মন্তব্য করে থাকে। একই অভিযোগ করেছেন মোহাম্মদপুরের বছিলা থেকে ঘুরতে যাওয়া চঞ্চল নামের এক তরুণ। তার দাবি, এলাকা দুটি সুন্দর। তবে রক্ষণাবেক্ষণে সমস্যা এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি রয়েছে।

নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রসঙ্গে দোহার থানার ওসি (তদন্ত) মো. ইয়াছিন মুন্সী জানান, মৈনটের পাশে চর মোহাম্মদপুর পুলিশ ফাঁড়ি রয়েছে। তারা নিয়মিত টহল দেয়। তবে সন্ধ্যার পর মৈনট ও বাহ্রাঘাটে কাউকে থাকতে দেয়া হয় না। নানা রকম সমস্যা রয়েছে। তাছাড়া ঢাকা যাওয়ার পথেও বিড়ম্বনা রয়েছে।

এই জনপদ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj