নীলনকশা প্রণয়নকারীদের বিষয়ে শ্বেতপত্র চাই

বৃহস্পতিবার, ১৫ আগস্ট ২০১৯


সে দিনটা ছিল না উজ্জ্বল আলোর। সকাল বেলার আকাশটা ছিল হালকা মেঘে ঢাকা। মধ্য আগস্টের সে দিনটি বাংলাদেশের রাজধানীতে নামিয়ে এনেছিল চাঁদের কলঙ্ক। হঠাৎ বেতারে ভেসে এলো আতঙ্কজনক অভাবিত একটি দুসংবাদ; জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর নিহত হওয়া আর দেশে সামরিক শাসন জারি হওয়ার খবর।

বেতারের খবর শোনামাত্রই হতভম্ব আমরা কয়েকজন বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলাম পশ্চিম রাজাবাজারের রাস্তায়। দেখি, অনেক লোকজনের ভীতসন্ত্রস্ত পদচারণা। এগিয়ে গেলাম শুক্রাবাদের দিকে। মিরপুর রোডে ওঠা মাত্রই চোখে পড়ে আর্মিবেষ্টিত ট্যাংকের বহর, ৩২ নম্বর রোডের মাথায়। বেরিকেড দিয়ে রেখেছে মূল রাস্তায়। চলে গেলাম পাশ দিয়ে হেঁটে কলাবাগানের দিকে, দাঁড়ালাম কলাবাগান স্টাফ কোয়ার্টারের সামনের রাস্তায়, মিরপুর রোডে, অনেক লোকের সঙ্গে। কাউকে চিনি না। হাজারো মানুষ সারা রাস্তায়। সবার চোখেমুখে আতঙ্ক, মেঘের ছায়া চেহারায়। টুঁ শব্দটি নেই কারো মুখে। এত লোকের সমাগম অথচ কোনো শব্দ নেই। ভাবা যায় না। কেউ কেউ ফিস ফিস করে পাশের জনের সঙ্গে কথা বলছে আবার আশপাশে ভীত নয়নে তাকিয়ে দেখছে। দুপুর বেলা পর্যন্ত থেকে চলে গেলাম বাসায়। আমার যাওয়ার কথা ছিল টিএসসিতে, যেখানে যাওয়ার কথা ছিল বঙ্গবন্ধুর। আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল তিনি আজ ৯টার দিকে টিএসসিতে ভাষণ দেবেন; বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়’ হিসেবে ঘোষণা দেবেন, দেবেন বিশেষ মর্যাদা। অথচ হঠাৎ আকাশ ভেঙে পড়ল ঢাকার বুকে। বিকেলের দিকে রাস্তায় নেমে পড়ল ট্যাংকবহর নিয়ে সেনারা।

বাসায় এসে ভাবছিলাম, কারা এ হত্যাকাণ্ডটি ঘটাল। কেন ঘটাল? কারা এত বড় বিশ্বাসঘাতকতা করল? যে মানুষটি মৃত্যুর গহŸর থেকে ফিরে এসে শক্ত হাতে দেশের বৈঠা ধরেছেন, তাকে কেন সপরিবার নিঃশেষ করে দিল? ক‚লকিনারা পাচ্ছিলাম না। বেশ কয়েক মাস ধরেই রাজনীতির মাঠে টালমাটাল একটা ভাব দেখা যাচ্ছিল। ১০ জানুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসার পর বঙ্গবন্ধু মাত্র সময় পেয়েছেন ১ হাজার ৩১৪ দিন। এরই মধ্যে আওয়ামী লীগ ভেঙে দুভাগ হয়ে গেল- একটি গ্রুপ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) নাম ধারণ করল। এ সেই জাসদ যার সক্রিয় উদ্যোক্তা-সদস্যরা সরাসরি বঙ্গবন্ধুর বিরোধিতা শুরু করে দিল। অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের চারু মজুমদারের কর্মকাণ্ডের আদলে সিরাজ শিকদারের নেতৃত্বে সারাদেশের উত্তর-পশ্চিম অংশে তথাকথিত সর্বহারা দলের নামে শুরু হয় অরাজকতা, নাশকতা, লুটপাট আর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড। বিদেশ থেকে প্রাপ্ত রিলিফের খাদ্যসামগ্রী গুদামজাত করে দেশবিরোধী অপশক্তি তৈরি করে কৃত্রিম আকাল। ফলে মারা যায় অনেক মানুষ। তারা চাচ্ছিল মানুষ মারা যাক, দুর্ভিক্ষ শিকড় গেড়ে বসুক, ছিন্নভিন্ন হয়ে যাক বঙ্গবন্ধুর প্রশাসনিক সা¤্রাজ্য। তখনকার খাদ্য সচিব আবদুল মোমেন খান (আগাগোড়া পাকিস্তান দরদি) কাজ করে নেপথ্যের নায়ক হিসেবে। শুনেছি তার চক্রান্তে আমেরিকা থেকে খাদ্যশস্য নিয়ে আসা জাহাজ মাঝপথে এসে ফিরে যায়। আমরা জানতাম, তখনো বেশির ভাগ রাষ্ট্রীয় সংস্থায় ও পাবলিক প্রশাসনের শীর্ষ পদগুলোতে আসীন ছিল পাকিস্তানের লেজুড়রা। তারা কেন পাকিস্তানের প্রধান শত্রু বঙ্গবন্ধুকে সাহায্য করবে? এমনিতরো বহু ধরনের চিন্তাভাবনা মাথায় খেলতে লাগল।

রাওয়ালপিন্ডির জল্লাদদের হাত থেকে মুক্তি পেয়ে নিজ ভূমে ফিরে এসে বঙ্গবন্ধু দায়িত্ব নিলেন একটা যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের, যে দেশের বুকের পাঁজরটা ভেঙে দিয়ে গেছে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। সমগ্র দেশে ভাঙাচোরা রাস্তাঘাট, তুলে ফেলা রেলপথ, পুড়িয়ে দেয়া জাহাজ-নৌকা-লঞ্চ, পাকিস্তানিদের স্থাপিত মাইনের কারণে ব্যবহারের অযোগ্য চট্টগ্রাম আর মোংলা সমুদ্রবন্দর, অকেজো ঢাকার কুর্মিটোলা বিমানবন্দর। ফিরে এসেছে ভারতে আশ্রয়গ্রহণকারী এক কোটি শরণার্থী যাদের পেটে আগ্রাসী ক্ষুধা আর পরনে ছেঁড়া পোশাক, যাদের নেই থাকার গৃহ, সব রাজাকার বাহিনীর আগুনে পুড়ে ছাই। নেই কৃষকের ঘরে ধান-পাট-শস্যের বীজ, গরু নিয়ে গেছে হানাদার আর রাজাকাররা, আছে শুধু অনাহারী ছেলেমেয়ে আর আশ্রয়হারা আপনজনরা। পাটকল, বস্ত্রকল, চিনিকলসহ সব কলকারখানা বিধ্বস্ত। হাজার হাজার শ্রমিক হত্যার শিকার হয়েছে, কত কত শ্রমিক কোথায় হারিয়ে গিয়েছে। কুটির শিল্পগুলোও আগুনে পুড়ে ছারখার। মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়া গ্রামীণ হাটবাজার। অর্থনীতির অবস্থা একেবারেই নাজুক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সব টাকা, স্বর্ণ আর রিজার্ভ বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ে গেছে পাকিস্তানি হানাদাররা। কোটির ওপর আশ্রয়হারা মানুষ আর স্বদেশে মাটি কামড়ে পড়ে থাকা মানুষগুলোকে পুনর্বাসন করাসহ অকল্পনীয় দায়িত্ব মাথায় নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার ভার কাঁধে তুলে নিলেন বঙ্গবন্ধু। আর তাকে কিনা শেষ করে দিল কাপুরুষরা। এরা কারা? তখনকার অবস্থায় বুঝে ওঠা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। বয়স কম।

পরে জেনেছি এর পেছনে ছিল গভীর আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র, যার সঙ্গে যোগ দিয়েছিল দেশীয় কতিপয় ক্ষমতালোভী পাকিস্তানিদের চর এবং স্বাধীনতাবিরোধী। একদিকে জামায়াত নেতা গোলাম আযমের লন্ডনে বসে চক্রান্তের জাল বোনা, আরেকদিকে আগে থেকেই স্বাধীনতার বিপক্ষে অবস্থানকারী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বঙ্গোপসাগরে পাঠানো যুদ্ধজাহাজ ‘সপ্তম নৌবহর’। জাতিসংঘে চীনের একাধিকবার ভেটো যাতে নবসৃষ্ট বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি সদস্যপদ না পায়। চারদিক থেকে হুমকি আর হুমকি। দেশের ভেতরেও ঘরের শত্রু বিভীষণরা সক্রিয়। মুজিবনগর সরকারের আমল থেকেই লোভী ধুরন্ধর মোশতাক গং প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীনসহ বঙ্গবন্ধুর কাছেরজনদের দূরে সরিয়ে দিয়ে চলে আসে বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্যে। সঙ্গে সহযোগী ছিল প্রশাসনে থাকা পাকিস্তানি ভাবধারায় বিধৌত উচ্চ পর্যায়ের আমলা-প্রশাসকরা। মেজর জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ আলী শিকদারের একটি নিবন্ধ থেকে জানতে পারি- ‘প্রশাসনে শতকরা নব্বই ভাগ কর্মকর্তা ছিলেন তারাই, যারা ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত ঢাকায় একই পদে বসে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর সব অপকর্মের সহযোগী হয়েছেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট যখন বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়, তখন রাষ্ট্রের প্রশাসনসহ প্রধান প্রধান গোয়েন্দা সংস্থার শীর্ষ পদে কর্মরত ছিলেন ওই সব কর্মকর্তা, যারা ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত ঢাকায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর দালালি করেছেন, আর নয়তো সেই সব কর্মকর্তা যারা পাকিস্তানে আটকা পড়েছিলেন। সুতরাং যা হওয়ার তা-ই হয়েছে।’

দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীরা যে নির্লজ্জ, জঘন্যতম হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে সারা ‘উপমহাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্র বদলের মহানায়ক’ আর মানবকেন্দ্রিক উন্নয়নের সারথিকে সরিয়ে দিয়ে কুলাঙ্গারের কাজটি করেছে, তা দেশকে বিশাল অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছিল। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা তাদের সৃষ্ট অনিশ্চয়তা থেকে দেশকে উদ্ধার করেছেন, দেশবাসীকে খাদের কিনারা থেকে সরিয়ে এনে উন্নয়নের রাস্তায় দাঁড় করিয়েছেন আর একটি উন্নত দেশের স্বপ্ন সৃষ্টি করে সবাইকে নিয়ে একযোগে এগিয়ে যাচ্ছেন। উন্নয়নকে টেকসই করার জন্য এবং এখনো সক্রিয় স্বাধীনতাবিরোধীদের অব্যাহত চক্রান্ত চিরতরে নির্মূল করার প্রয়োজনেই দরকার বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের খলনায়কদের, হত্যার নীলনকশা প্রণয়নকারীদের স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করা। তা করবে মহান মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তির সরকার। এ শ্বেতপত্রে থাকতে হবে- কারা এ নির্মম হত্যাকাণ্ডের কুশীলব ছিল; ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে হত্যাকাণ্ডের বিচার করার পথ কেন রুদ্ধ করা হয়েছিল এবং অধ্যাদেশ জারির পেছনে কারা মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিল; লন্ডনে স্যার টমাস উইলিয়ামসের (যিনি ১৯৬৮ সালের আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিশেষজ্ঞ আইনজীবী ছিলেন) নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের তদন্তের জন্য ‘শেখ মুজিব মার্ডার ইনকোয়ারি’ নামক যে তদন্ত কমিশন গঠিত হয়েছিল, সে কমিটির অগ্রগতি সম্পর্কিত তথ্যাদি; তৎকালীন সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের সঙ্গে উইলিয়ামস যখন দেখা করেছিলেন, তখন জিয়াউর রহমান তাকে ‘আইন নিজস্ব গতিতে চলবে’ বলার পরও আইন কেন নিজস্ব গতিতে চলতে পারেনি; দায়মুক্তি অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে বিচারের পথ কেন রুদ্ধ করে দেয়া হয়েছিল; জিয়ার আশ্বাস বাস্তবে পরিণত না হওয়ার পেছনের কারণ কী কী ছিল; হত্যাকাণ্ডের তদন্ত কমিশনের আরো দুজন সদস্য আইনজীবী অব্রে রোজ এবং জেফ্রি টমাসকে কেন ১৯৮১ সালে বাংলাদেশ সফর করার অনুমতি দেয়া হয়নি; কেন টমাস উইলিয়ামসকে বাংলাদেশ সরকার সে সময়ে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে; উক্ত তদন্ত কমিশন লন্ডনে বসেই যে প্রাথমিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে তাতে যে তিনটি বিষয় উল্লেখ করা হয়, যেমন- ‘আইন ও বিচারকে নিজস্ব গতিতে চলতে দেয়া হয়নি, আইনকে নিজস্ব গতিতে চলতে না দেয়ার জন্য সরকারই দায়ী এবং দায়মুক্তির বিধান তুলে নিয়ে বিচারের পথ উন্মুক্ত করতে হবে’- এ বিষয়গুলো সম্পর্কিত তথ্যাদি এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয়াদি।

সপরিবার বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পেছনে যারা নীলনকশা প্রণয়ন করেছিল তারা কেন এখনো অধরা, তাদের ব্যাপারে কেন দেশবাসী জানতে পারছে না, তাদের ব্যাপারে কেন সরকার শ্বেতপত্র তৈরি করে জনসমক্ষে প্রকাশ করছে না। এ বিষয়গুলোর সুরাহা করার সময় এসেছে। জনগণ হত্যাকাণ্ডের কুশীলবদের সম্পর্কে জানতে চায়। বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সঠিক ইতিহাস জানানোর জন্য, তাদের বঙ্গবন্ধুর আদর্শ, নেতৃত্ব, দেশপ্রেম, জাতির প্রতি ভালোবাসার বিষয়গুলো সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য দেয়ার লক্ষ্যে জাতি প্রত্যাশা করে একটি বিস্তারিত তথ্যসমৃদ্ধ শ্বেতপত্র। আমরা বঙ্গবন্ধুকন্যার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে পরিচালিত সরকারের কাছ থেকে একটি শ্বেতপত্রের প্রত্যাশায় থাকলাম।

ড. এম এ মাননান : উপাচার্য, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
বিভুরঞ্জন সরকার

আমরা তোমাদের ভুলবো না

এস এ এইচ ওয়ালিউল্লাহ

মুদ্রায় বিজয় দিবসের চেতনা

মুহম্মদ জাফর ইকবাল

ডিসেম্বরের স্মৃতি

ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন

শেখ মুজিব থেকে বঙ্গবন্ধু

Bhorerkagoj