কাঁদো বাঙালি কাঁদো

বৃহস্পতিবার, ১৫ আগস্ট ২০১৯

বাঙালি জাতির জীবনে যে অল্প কয়েকজন মানুষ ইতিহাস সৃষ্টি করতে পেরেছেন তাদের মধ্যে অন্যতম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। পৃথিবীর খুব কম রাজনৈতিক নেতা এত ঈর্ষণীয় জনপ্রিয়তা লাভ করেছেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের লক্ষ্যে তিনি গ্রহণ করেছিল বহু কার্যক্রম, উল্লেখযোগ্যভাবে বলতে হয় ভারতীয় সেনাবাহিনীর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন, প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা গ্রহণ, বিধ্বস্ত যোগাযোগ ব্যবস্থার পুনর্গঠন, অর্থনৈতিক দুরবস্থা নিয়ন্ত্রণ, জাতীয়করণ নীতি, শিক্ষা সংস্কার, পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড গঠন, সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠান, সংবিধান প্রণয়ন ও সাফল্যমণ্ডিত পররাষ্ট্রনীতি।

১৫ আগস্ট ১৯৭৫, বাংলাদেশ তথা বিশ্বের বাঙালিদের সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিন। এইদিন রাতে সেনাবাহিনীর একটি ক্ষুদ্র দল ক্ষমতা অর্জনের আকাক্সক্ষায় ‘রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের’ নামে সপরিবারে হত্যা করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে। প্রধান সেনাপতি শফিউল্লাহ ও তার অধীন কোনো সেনাপতি বা কর্মকর্তা তাদের অধীন বাহিনী নিয়ে দেশের প্রসিডেন্ট শেখ মুজিবকে রক্ষার জন্য এগিয়ে আসেননি। প্রমাণ আছে শেখ সাহেব তাঁর বাড়ি আক্রমণের সময় এদের অনেককেই টেলিফোন করেছিলেন। এমনকি তার নির্দেশে গঠিত রক্ষাবাহিনী শেরেবাংলা এবং তার পার্টির কোনো ক্যাডারও সেদিন এগিয়ে আসেননি। তারা এখন নিজেদের অপরাধ ও অযোগ্যতার অভিযোগ থেকে রক্ষা করার জন্য নানা রচনা ও বক্তৃতার ইতিহাস বিকৃতির চেষ্টা করেছেন।

১৬ আগস্ট জল্লাদ বাহিনীর কমান্ডারের নির্দেশে বনানী গোরস্তানে ১৪টি কবর খনন করে শুইয়ে দেয়া হয় যথাক্রমে বেগম মুজিব, শেখ নাসের, শেখ কামাল, বেগম কামাল, শেখ জামাল, শিশু রাসেল ও অন্যদের। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর লাশ তাঁর গ্রামের বাড়ি টুঙ্গিপাড়ায় পাঠিয়ে দেয়া হয়। কড়া সশস্ত্র পাহারায় কোনো রকম জানাজা পড়িয়ে দাফনের ব্যবস্থা করা হয়, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান- যে মানুষ তিলতিল করে বাঙালির স্বাধীনতার অর্জনের জন্য লড়াই করেছেন, জাতির মুখ থুবড়ানো স্বপ্ন বাস্তবায়ন করেছেন, তাঁকে চরম অবহেলায় টুঙ্গিপাড়ায় দাফন করা হয়। আজ সেই টুঙ্গিপাড়া স্বাধীনতাকামী বাঙালির পরম তীর্থস্থান হয়ে উঠেছে।

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ষাটের দশকের শেষদিকে লন্ডনের গার্ডিয়ান পত্রিকায় লিখেছিল, ‘তিনি ছিলেন বাংলার’ ‘মুকুটহীন সম্রাট’। যুদ্ধ সংকটে জর্জরিত ব্রিটেনবাসীর কাছে উইন্সটন চার্চিল, নায়কহীন ফরাসিদের কাছে দ্য গলে, ইন্দোনেশিয়ার কাছে সুকর্ণ যা ছিলেন- দুর্ভাগা বাংলার শোষিত বঞ্চিত মানুষের কাছে শেখ মুজিবও তাই।

পৃথিবীর ইতিহাসে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের আততায়ীর হাতে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপতি বা রাষ্ট্রনেতা নিহত হওয়ার দৃষ্টান্ত বিরল নয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যার বিচার আজ আদালতের কাঠগড়ায় ঠিকই হয়েছে কিন্তু যেদিন সারা জাতি তাকে বুঝতে পারবে এবং তার মতো একজন মহান নেতাকে হারানোর ব্যথায় অশ্রæপাত করবে সেদিনেই তার হত্যার প্রকৃত বিচার হবে। বঙ্গবন্ধু এবং বাংলাদেশ অবিচ্ছেদ্য। সুদীর্ঘ জীবন সংগ্রাম, ত্যাগ-বাঙালির প্রতি গভীর মমত্ববোধ দিয়ে যে মহান কীর্তি বঙ্গবন্ধু গড়েছেন, সামান্য সিসার বুলেটে সে স্মৃতি কখনো মুছে দেয়া যাবে না।

মজলুম জনতার নেতা মাওলানা ভাসানী তার প্রশস্ত বুকে জড়িয়ে ধরে শিশুর মতো কেঁদে বলেছিলেন ‘মুজিব তুমি আমার ছেলের মতো, আমি জানি আমার পর একমাত্র তুমি ছাড়া এই হতভাগা বাংলার মানুষের জন্য কাঁদার কেউ নেই’। ভাসানীর চোখের পানি নিজ হাতে মুছে দিয়ে বলেছিলেন, ‘দুঃখের রজনী শেষ হয়েছে, এবার আপনি দোয়া করলে দেখবেন আমি এই সোনার বাংলার মানুষের মুখে হাসি ফোটাবো’। কিন্তু পৃথিবীতে বাঙালিই একমাত্র জাতি, যাদের স্বাধীনতার ৪৮ বছর পার করেও ¯েøাগানে চিৎকার করে জানাতে হয়- বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

মো. এনায়েত কবির
লেখক, ঢাকা।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
মুহম্মদ জাফর ইকবাল

ডিসেম্বরের স্মৃতি

ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন

শেখ মুজিব থেকে বঙ্গবন্ধু

Bhorerkagoj