মুনাফা চক্রের কারসাজি

বৃহস্পতিবার, ১৫ আগস্ট ২০১৯

মরিয়ম সেঁজুতি : বিগত ৩১ বছরের মধ্যে এবারই সবচেয়ে কমদামে বিক্রি হয়েছে কুরবানির পশুর চামড়া। ন্যায্য দাম না পেয়ে ক্ষোভে-দুঃখে চামড়া সড়কে ছড়িয়ে, পানিতে ভাসিয়ে ও মাটিতে পুঁতে ফেলার ঘটনা ঘটেছে দেশের বিভিন্ন স্থানে। গরিব-মিসকিনদের প্রতিষ্ঠনগুলো এবারো বঞ্চিত হয়েছে চরমভাবে। গত কয়েক বছর ধরেই ব্যবসায়ীদের একাধিক সিন্ডিকেটের কারণে চামড়ার বাজারে এ নৈরাজ্য বিরাজ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এবার শেষ মুহূর্তে সেসব সিন্ডিকেট ভাঙতে উদ্যোগী হয়েছে সরকার। উপযুক্ত মূল্য নিশ্চিত করতে গত মঙ্গলবার কাঁচা চামড়া বিদেশে রপ্তানির এক সিদ্ধান্তের কথা জানায় সরকার। পাশাপাশি কাঁচা চামড়া সংরক্ষণের জন্য সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতা দিতে বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেয়া হয়। একইসঙ্গে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় নির্ধারিত মূল্যে কাঁচা চামড়া ক্রয়-বিক্রয় নিশ্চিত করতে ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা চাওয়া হয়। এমন পরিস্থিতিতে গতকাল বুধবার পূর্ব নির্ধারিতসময়ের আগেই চামড়া কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ট্যানারি মালিকরা।

তবে সরকারের এ সিদ্ধান্ত আরো আগে নেয়া উচিত ছিল বলে মনে করেন অনেকেই। তাদের মতে, কুরবানির কমপক্ষে ৩৬ ঘণ্টা পর সরকার কাঁচা চামড়া রপ্তানির সিদ্ধান্তের কথা জানাল। অথচ ততক্ষণে যা ক্ষতি হওয়ার সেটা হয়েই গেছে। কমপক্ষে ৪/৫ মাস আগে থেকে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রচারণা চালালে লোকসানের হাত থেকে বেঁচে যেতেন সংশ্লিষ্টরা। গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আগের বছরের অনেক চামড়া ট্যানারি মালিকদের উদ্বৃত্ত রয়েছে। সুতরাং চাহিদা এবং সরবরাহের প্রেক্ষাপটে বাজারে এমন একটি অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে এমনটি আগেই অনুমান করা উচিত ছিল। পরিকল্পনার দিক থেকে সরকার আরো অগ্রাভিমুখী হলে এ সমস্যা কিছুটা হলেও মোকাবেলা করা যেত। যারা ইতোমধ্যে লোকসান দিয়ে বিক্রি করেছেন তারা তো আর ভালো দাম পাবেন না।

বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কাঁচা চামড়ার দামে এমন মহাবিপর্যয় হলেও চামড়া ব্যবসায়ীদের কোনো লোকসান হয়নি। এমনকি ট্যানারি পর্যন্ত চামড়া পৌঁছাতে চার স্তরের মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতবদলে যে চক্রটি কাজ করে তাদেরও কারো লোকসান হয়নি। কেবল ক্ষতির মুখে পড়েছে গরিব-মিসকিন ও এতিমরা। রেওয়াজ অনুযায়ী, কাঁচা চামড়া বিক্রির টাকা কুরবানিদাতারা গরিব-মিসকিন ও এতিমদের মধ্যে দান করে থাকেন। কিন্তু, আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়া ও চামড়া জাতীয় পণ্যের বাজার চড়া থাকলেও এ বছর সরকারিভাবে কাঁচা চামড়ার দাম গতবছরের দরেই নির্ধারিত হয়েছে। এরপর কাঁচা চামড়া কেনার পাইকার ও ব্যবসায়ীরা আগে থেকেই ‘টাকা নেই’, ‘সংরক্ষণ করার প্রস্তুতি রাখুন’, ‘চামড়া পচে যেতে পারে’ প্রভৃতি হুজুগ তোলায় মৌসুমি ব্যবসায়ীরা চামড়া কিনেছেন পানির দরে। চামড়ার দাম একেবারেই পড়ে যাওয়ায় কুরবানিদাতার দানের টাকার পরিমাণ কমে গেছে। ফলে চামড়া ব্যবসায়ে জড়িত সবাই লাভবান হলেও বঞ্চিত হয়েছেন কেবল এতিম ও দুস্থরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর বাইরে সবচেয়ে ভালো মানের কাঁচা চামড়া বিক্রি হয়েছে ৬০০ টাকায়। আর মাঝারি মানের চামড়া বিক্রি হেেয়ছে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকার মধ্যে। যা গত বছরও ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল। সংশ্লিষ্টদের মতে, মৌসুমি ব্যবসায়ীরা ৮০ হাজার টাকার গরুর চামড়ার দাম দিচ্ছেন ২০০ টাকারও কম। এক লাখ টাকার গরুর চামড়া বিক্রি হচ্ছে ৩০০ টাকায়। অথচ সরকারের নির্ধারণ করে দেয়া দাম অনুযায়ী, ঢাকায় কুরবানির গরুর প্রতিটি ২০ থেকে ৩৫ বর্গফুট চামড়া লবণ দেয়ার পরে ৯০০ থেকে এক হাজার ৭৫০ টাকায় কেনার কথা ট্যানারি মালিকদের। কিন্তু, রাজধানীতে এবার ফড়িয়া বা মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীদের দেখা যায়নি বললেই চলে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এবার চামড়ার দামে মহাবিপর্যয় নেমে এসেছে।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, গরিব-মিসকিনদের ঠকাতে একাট্টা হয়েছে মুনাফালোভী সব পক্ষ। মূলত, দেশের অসংখ্য মক্তব, মাদ্রাসা, এতিমখানার আয়ের অন্যতম উৎস এই কুরবানির চামড়া থেকে আসা অর্থ। এই বাস্তবতায় পাচার ঠেকাতে গতকাল বুধবার বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুন্সি বৈধভাবেই কাঁচা চামড়া রপ্তানির অনুমতি দেয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানান। পাশাপাশি ট্যানার্স এসোসিয়েশনের সঙ্গে জরুরি বৈঠকে বসেন মন্ত্রী। এদিকে চামড়ার বাজারে দরপতনকে বিভিন্ন মহলের চক্রান্ত বলে দাবি করেছেন বাংলাদেশ ট্যানার্স এসোসিয়েশন (বিটিএ) সভাপতি শাহীন আহমেদ। তিনি বলেন, কোনো একটা কুচক্রী মহল সরকারকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলতেই পরিকল্পিতভাবেই এমন পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে। এমনকি এক ধরনের রাজনীতিও শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, একটি এলাকার মাদ্রাসার লোকজন মাটিতে ৯০০ চামড়া পুঁতে ফেলেছে। কেন? চামড়ার কী কোনো দামই নেই? লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করে রাখলেও তো এটার একটা দাম পাওয়া যেত। আমি মনে করি, এসবই সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। আগামী শনিবার থেকে সরকার নির্ধারিত মূল্যে ট্যানারি মালিকরা লবণযুক্ত চামড়া কিনবে বলে জানিয়েছেন শাহীন।

দেখা গেছে, বর্তমানে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি পণ্য হচ্ছে চামড়া। অথচ সিন্ডিকেটের কারসাজিতে শিল্পটি ধ্বংসের পথে। কুরবানির ঈদের চামড়া বিক্রিতে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ন্যায্য মূল্য না পাওয়ার পেছনে সিন্ডিকেটের কারসাজি রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এর পাশাপাশি আরো কিছু উল্লেখযোগ্য কারণ চিহ্নিত করেছেন তারা। খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, সাভারে ট্যানারিপল্লীতে অবকাঠামোগত সুবিধা দেয়ার ক্ষেত্রে সরকারের প্রতিশ্রæতি বাস্তবায়ন না করা, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ ও গ্যাস সংযোগ দিতে না পারা, সড়ক যোগাযোগে অব্যবস্থাপনা, জমির দলিল হস্তান্তরসহ নানা বিষয় নিয়ে চামড়া ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সরকারের দূরত্ব, অবৈধ পথে চামড়া পাচার, টানা কয়েক বছর ধরে চামড়া রপ্তানি আয় কমে যাওয়া, পুঁজি সংকট, আগের বছরের সংগৃহীত কাঁচা চামড়ার গুণগত মান কমে যাওয়া, চীন-মার্কিন বাণিজ্য যুদ্ধ, বিশ্ববাজারে জুতাসহ চামড়াজাত পণ্যের পরিবর্তে সিনথেটিক বা কাপড় জাতীয় পণ্যের প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ বেড়ে যাওয়া, সর্বোপরি সঠিক পরিকল্পনার অভাবে দিন দিন চামড়ার বাজার খারাপ হচ্ছে।

একটি বিশ^স্ত সূত্রে জানা যায়, কুরবানির আগে সরকারি সংস্থা ট্যারিফ কমিশন আন্তর্জাতিক বাজার যাচাই বাছাই করে চামড়ার মূল্য নির্ধারণের জন্য একটি সুপারিশ তৈরি করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছিল। ওই সুপারিশে প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়া ঢাকায় ৫৫-৬০, ঢাকার বাইরে ৪৫-৫০, খাসির সারা দেশে ২৫-২৭ এবং বকরির চামড়ার দাম সারা দেশে ২০-২২ টাকা নির্ধারণ করার কথা বলা হয়। কিন্তু ট্যারিফ কমিশনের এই সুপারিশ প্রত্যাখ্যান করে ট্যানারি মালিকরা। অবশেষে ঢাকায় লবণযুক্ত প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়া ৪৫ থেকে ৫০ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৩৫ থেকে ৪০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। এ ছাড়া সারা দেশে খাসির চামড়া ১৮-২০ টাকা এবং বকরির চামড়া ১৩-১৫ টাকায় সংগ্রহ করার ঘোষণা দেয়া হয়। মূল্য কমানোর পরও দেশের কোথাও সরকার নির্ধারিত এই দামে চামড়া কেনাবেচা হয়নি। সরকার নির্ধারিত মূল্যের অর্ধেক দামও পায়নি কুরবানি দাতা, খুদে ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। ফলে চামড়ার দাম নিয়ে সব পক্ষের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। দাম এত কমানো হয়েছে, এতিম, অসহায়, মাদ্রাসা ও লিল্লাহ বোর্ডিংয়ের লোকজনও এবার চামড়া সংগ্রহ করেনি।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা বলেন, প্রতি বছরই চলে চামড়া নিয়ে কারসাজি। তবে এবারে যেন তা মাত্রা ছাড়িয়েছে। তিনি বলেন, চামড়ার বাজার পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। এটি আমাদের জাতীয় সম্পদ, কিন্তু দাম নিয়ে শেষ পর্যন্ত যা হলো তা অশোভনীয়। সরকার নির্ধারিত দাম দেশের কোথাও কার্যকর হচ্ছে না। আড়তমালিক, মৌসুমি ও খুদে ব্যবসায়ীরা ট্যানারি মালিকদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ছে। এমনকি যারা পশু কুরবানি দিছেন অথচ চামড়ার ভালো দাম পাননি তাদেরও এ নিয়ে অসন্তুষ্টি রয়েছে। এই বাস্তবতায় কাঁচা চামড়া রপ্তানির অনুমতির সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী। এতে একচেটিয়া ব্যবসার লাগাম কিছুটা হলেও টেনে ধরা সম্ভব। তিনি বলেন, আগে দেশ থেকে সরাসরি কাঁচা চামড়া রপ্তানি হতো। দেশীয় শিল্প বিকাশে সরকার ফিনিশড লেদার উৎপাদন ও রপ্তানিতে উৎসাহ দিয়ে আসছে।

চামড়ার দাম কম, ব্যবসায়ীদের দুষলেন মন্ত্রীরা : কুরবানির পশুর চামড়ার দাম কম হওয়ায় পেছনে ব্যবসায়ীদের দায়ী করেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি। তিনি বলেন, আমরা যখনই কোনো উদ্যোগ নেই, তখনই ব্যবসায়ীরা সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধাচরণ করেছে। এবার চামড়ার দাম নিয়ে যা হয়েছে, তা দুঃখজনক। এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ কারণেই আমরা কাঁচা চামড়া রপ্তানির সিদ্ধান্ত নিয়েছি। প্রায় একই কথা বললেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেন, চামড়া শিল্পের সঙ্গে কোনো সিন্ডিকেট জড়িত থাকলে আমরা তা খতিয়ে দেখব। সিন্ডিকেটের কারণে চামড়া শিল্পের কোনো সমস্যা হলে অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।

নির্ধারিত দামের আশ^াস বিটিএ : মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীদের যারা চামড়া বিক্রি করতে পারেননি, তাদের আশ্বস্ত করেছেন বাংলাদেশ ট্যানারি এসোসিয়েশনের সভাপতি শাহীন আহমেদ। পূর্ব নির্ধারিত সময়ের তিনদিন আগেই চামড়া কেনা শুরুর কথা জানিয়েছেন তিনি। গতকাল বুধবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে এক বৈঠকে ট্যানার্স নেতারা এ সিদ্ধান্ত নেন। শাহীন আহমেদ বলেন, পূর্ব নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী, ২০ আগস্ট থেকে কাঁচা চামড়া সংগ্রহের কথা ছিল। কিন্তু বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আমাদের দ্রুত সময়ের মধ্যে কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করতে অনুরোধ জানিয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুরোধে সাড়া দিয়ে আমরা তিনদিন আগে অর্থাৎ ২০ আগস্টের পরিবর্তে ১৭ আগস্ট থেকে কাঁচা চামড়া সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

প্রথম পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj