পনেরো আগস্ট এবং আমার বাবা : গৌতম চট্টোপাধ্যায়

বৃহস্পতিবার, ১৫ আগস্ট ২০১৯

কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ থেকে

দিনটা ছিল ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। মাত্র চার বছর আগের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের দগদগে ঘা পশ্চিমবঙ্গের সারা শরীরজুড়ে। আমাদের বাড়ি ছিল বনগাঁ রেলস্টেশনের গা ঘেঁষে। তখনও ঠিক যুদ্ধ জিনিসটা যে কী, সেটা বোঝার বয়স হয়নি। তবে অনির্দিষ্টকালের জন্য আমাদের স্কুল ছুটি হয়ে গেল। শুনলাম, পাকিস্তানের সঙ্গে নাকি আমাদের যুদ্ধ বেধেছে। সন্ধ্যা হলেই আমাদের নারকেল গাছের ঠিক মাথার উপর দিয়ে তীব্র শব্দে উড়ে যেত বোমারু বিমান। ভয়ে কাঁটা হয়ে থাকতাম। এরপর শুরু হলো সীমান্ত পেরিয়ে দলে দলে শরণার্থী আসা। বনগাঁ শহরের মাঠ, ঘাট, রাস্তা, রেলস্টেশন, সব ভরে গেল শরণার্থীর ভিড়ে। কাতারে কাতারে মানুষ আসছে, রোজ। তাদের যে কী অবর্ণনীয় কষ্ট, সে যে চোখে না দেখেছে, বিশ্বাস করতে পারবে না।

অন্যান্য বাড়ির মতো আমাদের বাড়ির সামনেও ম্যারাপ বাঁধা হলো। সেখানে থাকার ব্যবস্থা হলো আশিজনের মতো। আমার ঠাকুরদা ডাক্তার বিষ্ণুপদ চট্টোপাধ্যায় ছিলেন ওখানকার একমাত্র পাস করা ডাক্তার। তাকে দেখেছি কী অমানুষিক পরিশ্রম করে চলেছেন চব্বিশ ঘণ্টা। সারাদিন অক্লান্তভাবে রোগী দেখে চলেছেন, তাদের নিজের পয়সায় ওষুধ এবং পথ্য কিনে খাওয়াচ্ছেন, এসডিএমওর সঙ্গে ঝগড়া করে হাসপাতাল থেকে জীবনদায়ী ইঞ্জেকশন আনাচ্ছেন। এর মধ্যেই আমাদের বাড়ির একটা ঘর হয়ে গেল স্থায়ী সূতিকাগার। কাতারে কাতারে মহিলা আসছেন প্রসব বেদনা নিয়ে, আর ঠাকুরদা আমার পিসিদের নিয়ে একা সামলাচ্ছেন সেই সূতিকাগার।

তখনো শরণার্থীদের জন্য ভারতের সরকারি রেশন চালু হয়নি। মনে আছে, আমরা পাড়ার সব মানুষ খোল-করতাল নিয়ে ভিক্ষে করতে বেড়াতাম, রোজ। মানুষকে দেখেছি দু’হাত ভরে আমাদের ব্যাগ ভরিয়ে দিতে। শিকড় ছেঁড়া মানুষগুলোর হাহাকার কিভাবে এপার বাংলার মানুষকে নাড়া দিয়েছিল, তা সেই বয়সেই বুঝেছিলাম। মুক্তিযুদ্ধ যেন হঠাৎ করেই আমাদের অনেক বড় করে দিয়েছিল।

জীবনে প্রথম গান গাইতে শিখলাম, ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’।

ঠাকুরদা, ঠাকুমার কাছে গল্প শুনেছি। আমাদের বাড়ি ছিল নড়াইলের চণ্ডীবরপুর গ্রামে। পরে আমার ঠাকুরদা নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজ (তখন ক্যাম্পবেল মেডিক্যাল স্কুল) থেকে ডাক্তারি পাস করে গ্রামে ফিরে যান এবং পরে যশোর শহরে বাড়ি তৈরি করে সেখানেই থাকতেন। এরপরে ঠাকুরদা সরকারি চাকরি নিয়ে এপারে চলে আসেন চিরদিনের মতো। আমার বাবা বিনয় চট্টোপাধ্যায় খুলনার দৌলতপুর কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে এপারে বাবার কাছে এসে বিদ্যাসাগর কলেজে বিএসসিতে ভর্তি হন। কিন্তু নিজভূমি ছেড়ে চিরদিনের জন্য চলে আসার ব্যথায় তাদের আজীবন কষ্ট পেতে দেখেছি।

এবার আসি ১৯৭৫ সালের নির্মম ঘটনায়। তখন আমি কিছুটা বড় হয়েছি, বাবা-মার কাছেই থাকি, কলকাতার বিখ্যাত টালা ট্যাঙ্কের পাশে বাবার সরকারি আবাসনে। ১৪ আগস্ট রাত প্রায় দুটো পর্যন্ত আমরা চেন ফ্ল্যাগ বানিয়েছি, শহীদ বেদি করে ফুল দিয়ে সাজিয়ে তাতে নেতাজির ছবি রেখে সব রেডি করে রেখেছি, যাতে পরদিন সকাল সকাল জাতীয় পতাকা তুলতে পারি। সব শেষ করে ঘরে ঢোকার সময় দেখলাম বাবা গাড়ি থেকে নামছেন। খুব ভয় পেতাম বাবাকে, দৌড়ে গিয়ে পা ধুয়েই শুয়ে পড়লাম।

তখন বোধহয় ভোর পাঁচটা সাড়ে পাঁচটা। ঘরে আলো জ্বলছে, ঘুম ভেঙে গেল। দেখি শার্ট প্যান্ট পড়ে বাবা বেরোনোর জন্য রেডি। আলমারির লকার থেকে রিভলভার বের করে কোমরে গুঁজে বাইরের ঘরে গেল জুতো পরতে। একটু অবাক হলাম। এইতো রাত দুটোরও পরে বাবা ফিরলেন। ফিসফিস করে মাকে জিজ্ঞাসা করলাম, মা, বাপুন কোথায় যাচ্ছে গো ? মা যা বলল, তা শুনে সারা শরীরের রক্ত হিম হয়ে গেল। ধড়াস ধড়াস করতে লাগল বুকের ভেতর। আমাদের প্রিয় বঙ্গবন্ধুকে নাকি ডালিম বলে একটা মিলিটারি অফিসার গুলি করে মেরেছে! দুচোখ ছলছলিয়ে উঠল। হে ভগবান ! এরা মানুষ নাকি পিশাচ ! মনে পড়ল, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরে বেলগাছিয়া ইউনাইটেড ক্লাবের মাঠে বঙ্গবন্ধুকে সংবর্ধনা দেয়া হয়েছিল, তাতে যে দুজনকে বাছা হয়েছিল বঙ্গবন্ধুকে মালা পরিয়ে বরণ করে নেয়ার জন্য, তার একজন ছিলাম আমি। বঙ্গবন্ধুকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল আমার।

৩.

ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কাছে দুঃসংবাদটা প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই এসেছিল। তিনি এক মুহূর্তও নষ্ট না করে পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়কে বলেছিলেন, যেকোনোভাবেই হোক মেজর ডালিমকে ধরতেই হবে, কারণ খবর এসেছিল, মেজর ডালিমই নাকি এই হত্যালীলার মূল চক্রান্তকারী।

সকাল ছটা, চারটে সাধারণ গাড়িতে ঢাকা রওনা হয়ে গেলেন কলকাতা পুলিশের পনেরো জন অকুতোভয় দুঁদে গোয়েন্দা অফিসার। সেবার আমাদের আর জাতীয় পতাকা তোলা হয়নি। দিন সাতেক পরে বাবারাও ফিরে এলো, খালি হাতেই।

বাবা মারা যান ২০০৭ সালে। ২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর খুনিদের কয়েকজনকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে রায় কার্যকর করা হয়। অনেক নামিদামি আসামিকে অনায়াসে বাগে আনতে দেখেছি বাবাকে। কিন্তু সেদিন মেজর ডালিমকে ধরতে না পারার কষ্টটা বাবাকে শেষদিন পর্যন্ত কুরে কুরে খেয়েছে।

গৌতম চট্টোপাধ্যায়, উন্নয়নকর্মী। কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ।

প্রথম পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj