সাক্ষাৎকার > রাশেদ খান মেনন : আমেরিকার সঙ্গে যোগাযোগ ছিল মোশতাকের

বৃহস্পতিবার, ১৫ আগস্ট ২০১৯

মুহাম্মদ রুহুল আমিন : বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের অনেক আগে থেকেই সামরিক অভ্যুত্থানের গুঞ্জন ছিল। মুক্তিযুদ্ধপরবর্তী সেনাবাহিনীর মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা ও পাকিস্তান ফেরতদের মধ্যে বিরোধ দানা বাঁধছিল। বঙ্গবন্ধু তা জানলেও আমলে নেননি। এ বিষয়ে কাদের সিদ্দিকী তাকে অবহিত করলেও তিনি সেটা উড়িয়ে দিয়েছিলেন। ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ও তাকে সতর্ক করেছিল। তখন তার মন্তব্য ছিল, ‘বাঙালিরা আমাকে মারতে পারে না’- এটাই ছিল তার দৃঢ় বিশ^াস।

সম্প্রতি ইস্কাটনের নিজ বাসায় ভোরের কাগজের সঙ্গে ‘পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট ও বঙ্গবন্ধু’ সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে এসব কথা বলেন ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি ও ঢাকা-৮ আসনের সংসদ সদস্য রাশেদ খান মেনন। বাকশালের বিরোধিতা করলেও বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তার ছিল ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। তার মতে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের ছিল আন্তর্জাতিক যোগাযোগ।

হত্যাকাণ্ডের পূর্বের অবস্থা বর্ণনা করে রাশেদ খান মেনন বলেন, তখন দেশে একটা অস্থিরতা ভর করছিল। ২৫ জানুয়ারি সংবিধানে চতুর্থ সংশোধনীতে একটিমাত্র জাতীয় দল করা হয়। ওই দলে যোগ না দিলে অন্যান্য সব রাজনৈতিক দল ও সংসদ সদস্যদের পদ বিলুপ্ত হয়ে যাবে। তবে জাসদ ও সিরাজ শিকদারের সর্বহারা পার্টি এর বিরুদ্ধে সক্রিয় ছিল। চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষের কারণে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ-বিক্ষোভও ছিল। সব মিলিয়ে একটা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল। যেটাকে মোকাবেলা করতে বঙ্গবন্ধু অবশ্য পদক্ষেপও নিয়েছিলেন।

ঘটনাবহুল ১৫ আগস্টের ভয়াল অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে মেনন বলেন, আমি ঘুমিয়ে ছিলাম। খুব ভোরে আমার শ^শুর বিবিসি শুনে বাসায় এসে আমাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে বললেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছে! এটা শুনে একটা বিমূঢ় ভাব সৃষ্টি হলো! আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম! এরপর রেডিওতে শুনলাম খুনি মেজর ডালিমের সেই কণ্ঠস্বর, ‘শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে, সারা দেশে মার্শাল ‘ল’ জারি হয়েছে’। এরপর খোন্দকার মোশতাক রেডিওতে এসে বললেন, তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। তখন বুঝে নিলাম ঘটনা সত্য। এরপর বেলা যতই বাড়ছে সেনাবাহিনী প্রধানসহ একের পর এক বাহিনীপ্রধান মোশতাকের কাছে আত্মসমর্পণ করা শুরু করল। বাকশাল হওয়ার সময় যারা দলে দলে গিয়ে যোগ দিয়েছিল, মিছিল-¯েøাগানে মুখর ছিল, অতি উৎসাহী ছিল, তাদের কোনো প্রতিবাদ-প্রতিরোধ দেখলাম না। যারা আওয়ামী লীগ বা বাকশালের মন্ত্রিসভায় ছিলেন, তাদের কয়েকজন (সৈয়দ নজরুল, তাজউদ্দিন আহমেদ, মনসুর আলী, কামরুজ্জামান, আবদুস সামাদ আজাদসহ আরো দুয়েকজন) বাদে বাকি সবাই যেমন, তাহের ঠাকুর, শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, কে এম ওবায়দুর রহমান, আবদুল মান্নান (স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন), মোমেনসহ (খাদ্যমন্ত্রী) অনেকেরই প্রতিবাদ প্রতিরোধ ছিল না। তারা সবাই একে একে মোস্তাকের মন্ত্রিসভায় যোগ দিলেন।

বিদেশি শক্তির জড়িত থাকার কথা তুলে ধরে মেনন বলেন, সমস্ত ঘটনার পরম্পরায় দেখলাম এ ঘটনার সঙ্গে শুধুমাত্র অভ্যন্তরীণ শক্তিই ছিল না, ছিল বিদেশি শক্তিও। এই শক্তির উৎস ছিল আমেরিকা। তখন সিআইয়ের স্টেশন অফিসার ছিলেন চেরি। তিনি এ ঘটনার সঙ্গে অর্থাৎ ওই সময় যে বার্তাগুলো এখান থেকে আদান-প্রদান হয়েছে, সেসব থেকে দেখা যায় যে, ১৯৭৪ সালের প্রথম দিকে খুনি কর্নেল ফারুক আমেরিকার কাছ থেকে অস্ত্র কিনে নিয়েছিলেন। যদিও সেই অস্ত্রের তালিকা নেই। তেমনিভাবে মোশতাকের সঙ্গে আমেরিকার যোগাযোগ ছিল। মোস্তাকের মুখ্য সচিব মাহবুব আলম চাষীর সঙ্গেও পূর্বে থেকে আমেরিকান অ্যাম্বাসির যোগাযোগ ছিল। আমার বন্ধু রনোর (হায়দার আকবর খান রনো) বাসা ছিল ধানমন্ডি-৮ নম্বরে। সেখানে তার খালার বাসার ঠিক উল্টো দিকে তখন আমেরিকান অ্যাম্বাসেডর অথবা সিআইয়ের চেরি যে কেউ একজন থাকতেন। ১৫ আগস্ট ধানমন্ডির ওই বাসাতে স্থানীয় বাসিন্দারা সারারাত বাতি জ¦ালানো দেখেছিল। সেই সঙ্গে গাড়ির আসা-যাওয়াও দেখেছিল। আরেকটি ঘটনা যখন কিসিঞ্জারকে জানানো হয় যে, শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে, তখন তার প্রতিক্রিয়াটা ছিল অত্যন্ত স্বাভাবিক। এতেই বোঝা যায় এ ঘটনার সঙ্গে আমেরিকা পুরোপুরি জড়িত ছিল।

তিনি বলেন, এই ধরনের পরিস্থিতিতে আমাদের প্রথম কাজ ছিল নিজেদের সাবধান হওয়া। যেন হুট করে কোনো কিছুর মধ্যে জড়িয়ে না পড়ি। আমরা আমাদের পার্টির সবাই বসার চেষ্টা করলাম। এর আগে বাকশাল গঠনের বিরুদ্ধাচারণ করে আমাদের একটা অবস্থান নেয়া হয়েছিল। আমরা, জাসদ ও পূর্ব বাংলা সর্বহারা পার্টির একটা অংশ মিলে বাকশালবিরোধী আন্দোলন করার কথা আগে থেকেই ভাবছিলাম। ১৫ আগস্ট একটা বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। এরই মধ্যে জাসদ বাকশালের বিরুদ্ধে একটা লিফলেট বের করে দিয়েছে। তখন আমরা আর কোথাও না গিয়ে নিজেরা ভাবলাম।

নিজের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর সর্বশেষ স্মৃতির কথা বলতে গিয়ে ওয়ার্কার্স পার্টির এই নেতা বলেন, সর্বশেষ ১৯৭৫ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি। তখন বাকশাল গঠনের পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। বঙ্গবন্ধু আমাকে খুব ভালোবাসতেন। তার একটা অপার গুণ ছিল তিনি অন্য রাজনৈতিক দলের কর্মীদেরও খুব ভালো বাসতেন। তিনি আমাকে ডেকে নিয়ে বলেছিলেন ‘তোরা বাকশালে যোগদান কর’। আমি বিনয়ের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুকে বলেছিলাম আমরা বাকশালে যোগদান করব না। তখন দল হিসেবে আমাদেরও বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা। আমাদের দল ছিল বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি লেলিনবাদী নামে পরিচিত। দলের মধ্যেও এক ধরনের বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয় যে, বাকশাল হলে আমরা কি করব।

জিয়াউর রহমান ও কে এম শফিউল্লার ভূমিকা প্রসঙ্গে মেনন বলেন, ১৫ আগস্টের বেস্ট বেনিফিশিয়ারি জিয়াউর রহমান। তাকে যখন বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের খবর পৌঁছে দেয়া হয়, তখন তার উক্তি ছিল ‘সো হোয়াট’? তিনি এই হত্যাকাণ্ডে খুব একটা আশ্চর্য হননি এবং তিনি এটা জানতেন বলেই বোঝা যায়। ওইদিন খুনি মেজর ডালিম যখন সশস্ত্র অবস্থায় শফিউল্লাহর ঘরে প্রবেশ করে, তখন সেখানে জিয়াউর রহমান, মেজর নাসিমসহ (পরবর্তীতে ডিজিএফআইয়ের চিফ) আরো কয়েকজন সিনিয়র অফিসার ছিলেন, তারা কোনো শব্দ উচ্চারণ করেননি। অথচ তারা যদি ইশারা করত তাহলে নিশ্চয়ই, বিষয়টা অন্যরকম হতে পারত। ৩ নভেম্বরও শফিউল্লাহ সাহেব মুভ করেননি।

বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার হলেও এ ঘটনাগুলো অনুসন্ধান হয়নি জানিয়ে মেনন বলেন, কয়েকজন খুনির রায় কার্যকর হয়েছে, অন্যদের আনার চেষ্টা হচ্ছে। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা যখন প্রবাসে ছিলেন, তখন যে তদন্ত কমিশনগুলো করা হয়েছিল, সেগুলোকে আরো কেন এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়নি, কেন উচ্চ লেভেলের কমিশন করে এর পেছনের কারণগুলো বের করা হয়নি- এটা বুঝতে পারি না। যদি ইতিহাসকে কলঙ্কমুক্ত, হত্যার পেছনের মূল উদ্দেশ্য এবং কারা জড়িত, তা যদি বের করতে হয়, তাহলে অবশ্যই রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে একটা উচ্চ লেভেলের কমিশন করা উচিত। যদিও ইতোমধ্যে ৪৪ বছর পেরিয়ে গেছে। এরপরে তো হত্যাকাণ্ডের আর কোনো আলামত খুঁজে পাওয়া যাবে না। এখন সুবিধা হচ্ছে মার্কিনি যেসব দলিল বেরিয়ে এসেছে, সেগুলোতে ওই সময়ের বহু ঘটনাবলি রেকর্ড আছে। সব মিলিয়ে রাষ্ট্রীয় উচ্চ পর্যায়ের একটা তদন্ত কমিশন করে আসল ঘটনা বের করা উচিত।

প্রথম পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj