সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও তার বিশ্বব্যাপী চ্যালেঞ্জ

রবিবার, ১১ আগস্ট ২০১৯

ফেসবুক, যারা ইনস্টাগ্রামেরও মালিক, বিবিসিকে জানিয়েছে, তাদের প্রতিষ্ঠানে নোংরামি, অশ্লীলতা ও আপত্তিকর উপাত্ত সরানোর কাজের জন্য আছে ৩০ হাজার লোক। তাদের দাবি, কেবল গত বছরের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যেই ফেসবুক ১ কোটি ৫৪ লাখ সহিংস কনটেন্ট সরিয়ে নিয়েছে তাদের সাইট থেকে। তাদের হিসাবে আগের তিন মাসের তুলনায় এটা প্রায় ৭৯ লাখ বেশি। ওদের দাবি, কিছু কনটেন্ট স্বয়ংক্রিয়ভাবেই শনাক্ত করা যায়, কেউ দেখে ফেলার আগেই। সন্ত্রাসবাদী প্রপাগান্ডার ক্ষেত্রে, ফেসবুক দাবি করছে, ৯৯ দশমিক ৫ শতাংশ কনটেন্টই স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি দিয়ে শনাক্ত করা হয়েছে, তারপর সেগুলো মুছে দেয়া হয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিশোধ নেয়ার জন্য কেউ যখন কারো নগ্ন ছবি বা ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেয় বা কোনো জঙ্গি মতাদর্শের কিছু শেয়ার করে, তখন এর জন্য সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিগুলোকে এতদিন দায়ী করা যেত না। এ জন্য আইনি ব্যবস্থা নেয়া যেত কেবল সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীর বিরুদ্ধে। কিন্তু সারা দুনিয়াতে এখন ফেসবুক-ইউটিউবের শুধু কথার চিঁড়া ভিজছে না। এমনকি তারা স্বনিয়ন্ত্রণের যেসব তথ্য দিচ্ছে তারও সত্যতা মিলছে না। ফলে অনেক দেশেই আইন বদলানোর চিন্তা-ভাবনা চলছে, অনেকে আইন করেও ফেলেছে। বিবিসি যে বিবরণগুলো প্রকাশ করেছে সেগুলো তুলে ধরলে অনুভব করা যাচ্ছে সারা বিশ্বের কাছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কতটা ভীতিকর অবস্থান তৈরি করেছে। আসুন একের পর এক দেখি কি হচ্ছে বিশ্বে।

ব্রিটেন : সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের জন্য সম্প্রতি ব্রিটিশ সরকার বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণের প্রস্তাব করেছে। এর উদ্দেশ্য, ক্ষতিকর কোনো কনটেন্ট কোনো সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ পেলে তার জন্য কোম্পানির কর্মকর্তাদেরও যেন দায়ী করা যায়। ব্রিটিশ সরকারের প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় নিয়ম ভঙ্গকারী সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে বিপুল অঙ্কের জরিমানা থেকে শুরু করে তাদের সেবা পুরোপুরি বন্ধ বা ব্লুক করে দেয়ার কথাও রয়েছে।

ফেসবুক, ইউটিউব, টুইটার থেকে শুরু করে নানা ধরনের সোশ্যাল মিডিয়া যারা ব্যবহার করেন, তাদের সুরক্ষা দেয়ার জন্য ব্রিটিশ সরকার একটি স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা গঠনের কথা ভাবছে। এর সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে এজন্যে আলোচনা-পরামর্শ গ্রহণ করার কথা ছিল ১ জুলাই পর্যন্ত। এটি প্রত্যাশিত যে তারা অচিরেই সেই ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। ব্রিটেনের বর্তমান আইনে সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া যায় না।

জার্মানি : জার্মানিতে ২০১৮ সালের শুরু থেকে সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যাপারে এক নতুন আইন কার্যকর হয়। জার্মানিতে যেসব সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মের বিশ লাখের বেশি ব্যবহারকারী আছে, তারা সবাই এই আইনের আওতায় পড়ে। জার্মানির এই নতুন আইনে বলা আছে, সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনো কনটেন্ট সম্পর্কে কোনো অভিযোগ আসার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তা তদন্ত এবং পর্যালোচনা করতে হবে। সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিগুলো এর ফলে বাধ্য হয়েছে সেই ব্যবস্থা করতে।

কেউ যদি সোশ্যাল মিডিয়ায় এমন কোনো কনটেন্ট শেয়ার করে যা এই আইনের বিরোধী, সে জন্য তাকে ৫০ লাখ ইউরো পর্যন্ত জরিমানা করা যাবে। অন্যদিকে সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিকে জরিমানা করা যাবে ৫ কোটি ইউরো পর্যন্ত। জার্মানিতে আইনটি কার্যকর হওযার পর প্রথম বছরে ব্যবহারকারীদের দিকে থেকে ৭১৪টি অভিযোগ আসে। অনলাইন প্ল্যাটফর্মের কাছে অভিযোগ করার পরও নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে আপত্তিকর পোস্ট সরিয়ে নেয়া হয়নি বা ব্লুক করা হয়নি বলে অভিযোগ করেছিলেন এরা। জার্মানির ফেডারেল বিচার মন্ত্রণালয় বিবিসিকে জানিয়েছে, আইনটি কার্যকর হওয়ার পর বছরের অন্তত ২৫ হাজার অভিযোগ আসবে বলে তারা ধারণা করেছিলেন। কিন্তু অভিযোগ এসেছিল একেবারেই কম। আর যেসব অভিযোগ এসেছে, তার কোনোটির ক্ষেত্রেই কাউকে জরিমানা দিতে হয়নি।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন : ইউরোপীয় ইউনিয়ন সোশ্যাল মিডিয়ায় আপত্তিকর কনটেন্টের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বিবেচনা করছে। বিশেষ করে জঙ্গিবাদে উৎসাহ জোগায় যেসব ভিডিও তার বিরুদ্ধে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নে জেনারেল ডাটা প্রোটেকশন রেগুলেশন (জিডিপিআর) নামে এক নতুন আইন কার্যকর হয়েছে গত বছর থেকে। বিভিন্ন কোম্পানি এবং প্রতিষ্ঠান কীভাবে মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য সংরক্ষণ করবে, সে বিষয়েই মূলত এই আইন। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন আরেকটি আইনের প্রস্তাব করেছে, যেটি নিয়ে ইন্টারনেট কোম্পানিগুলো দুশ্চিন্তায় আছে। কেউ যদি কোনো সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে কপিরাইট লঙ্ঘন করে কিছু পোস্ট করে, সে জন্য ওই ব্যক্তি তো বটেই, সেই সঙ্গে অনলাইন প্ল্যাটফর্মকেও দায়ী করা যাবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে আগের আইনে আপত্তিকর কনটেন্টের ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করার পর তা সরিয়ে নিলেই মামলা চুকে যেত। কিন্তু নতুন আইনে এ জন্য দায়িত্বটা এখন সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মের ঘাড়েই বর্তাবে। কপিরাইট আইনের লঙ্ঘন হচ্ছে কিনা, সেটা দেখার এবং নিশ্চিত করার দায়িত্ব¡ থাকবে তাদেরই।

অস্ট্রেলিয়া : গত ৫ এপ্রিল ১৯ অস্ট্রেলিয়ায় এক কঠোর আইন চালু করা হয়েছে যাতে সহিংস এবং জঘন্য কোনো কিছু অনলাইনে শেয়ার করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আইন লঙ্ঘন করলে সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানির কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ এনে জেল-জরিমানার বিধানও রাখা হয়েছে। জরিমানার অংকটি বেশ বড়। এই জরিমানার পরিমাণ কোনো সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানির গ্লোবাল টার্নওভারের দশ শতাংশ পর্যন্ত করা যাবে।

নিউজিল্যান্ডে দুটি মসজিদে সন্ত্রাসবাদী হামলা চালিয়ে ৫০ জনকে হত্যার ঘটনা হামলাকারী যেভাবে ফেসবুকে লাইভ স্ট্রিমিং করেছিল, তারপর অস্ট্রেলিয়া এই আইন চালু করল। এর আগে ২০১৫ সালে অস্ট্রেলিয়ায় অনলাইন সেফটি আইন নামে আরেকটি আইনে একজন ই-সেফটি কমিশনারের পদ তৈরি করা হয়। ই-সেফটি কমিশনার সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিগুলোকে বাধ্য করতে পারেন আপত্তিকর কনটেন্ট সরিয়ে নিতে। এ জন্য তিনি সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিকে ৪৮ ঘণ্টার নোটিশ দিতে পারেন। জরিমানা করতে পারেন পাঁচ লাখ ২৫ হাজার অস্ট্রেলিয়ান ডলার পর্যন্ত। অন্যদিকে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীর ক্ষেত্রে এই জরিমানা হতে পারে এক লাখ পাঁচ হাজার ডলার পর্যন্ত। অস্ট্রেলিয়ায় এই কঠোর আইন করা হয় শার্লট ডসন নামে এক টেলিভিশন উপস্থাপক অনলাইনে হয়রানির শিকার হয়ে আত্মহত্যা করার পর।

রাশিয়া : রাশিয়ায় ২০১৫ সালের ডাটা আইন অনুযায়ী সব সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিকেই রুশ নাগরিকদের সম্পর্কে যাবতীয় তথ্য রাশিয়াতেই কোনো সার্ভারে সংরক্ষণ করতে হয়। তবে ফেসবুক এবং টুইটার কীভাবে এই আইন মেনে চলবে সে সম্পর্কে কোনো স্পষ্ট ধারণা দিতে না পারায় রুশ কর্তৃপক্ষ তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে।

চীন : টুইটার, গুগল বা হোয়াটসঅ্যাপ চীনে নিষিদ্ধ। তবে সেখানে একই ধরনের কিছু চীনা অনলাইন প্ল্যাটফর্ম আছে। যেমন ওয়েইবো, বাইডু এবং উইচ্যাট। চীনে কিছু ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক আছে। কিন্তু চীনা কর্তৃপক্ষ সেগুলোর ব্যবহারও সীমিত করে দিতে সক্ষম হয়েছে। চীনের সাইবার স্পেস এডিমিনিস্ট্রেশন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এ বছরের জানুয়ারি থেকে আগের ৬ মাসে তারা ৭৩৩টি ওয়েবসাইট এবং ৯ হাজারের বেশি মোবাইল অ্যাপ বন্ধ করে দিয়েছে। তবে এগুলোর বেশিরভাগই আসলে জুয়া খেলার বেআইনি সাইট বা অ্যাপ।

চীনের হাজার হাজার সাইবার পুলিশ আছে। এরা ২৪ ঘণ্টাই নজরদারি চালায় সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মের ওপর। বিশেষ করে রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর কোনো তৎপরতা সেখানে চলছে কিনা, তার ওপর। কিছু কিছু শব্দ স্বয়ংক্রিয়ভাবেই সেন্সর করা হয়। যেমন ১৯৮৯ সালে তিয়ান আনমেন স্কোয়ারের ঘটনা। নিষিদ্ধ শব্দের তালিকায় চীনা কর্তৃপক্ষ আরো নতুন নতুন শব্দ যোগ করছে। এরকম শব্দ থাকে যেসব পোস্টে, সেগুলো হয় নিষিদ্ধ করা হয় অথবা ফিল্টার করে সোশ্যাল মিডিয়া থেকে বাদ দেয়া হয়।

চীন ছাড়া উল্লিখিত বাকি দেশগুলো গণতন্ত্রের নামে বাক ও মতপ্রকাশের পতাকা উড়িয়ে দুনিয়া কাবু করে রাখছেন। এদের আইনকানুন ও ব্যবস্থা গ্রহণ করার বিবরণগুলো পাঠ করে সম্ভবত এটি এখন মনে করা যেতে পারে যে, আমরা এখনো তাদের মতো কঠোর হইনি। বরং আমরা যখন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পাস করি তখন আমাদের সুশীল সমাজ যেসব শঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন তার কোনোটাই বাস্তবে ঘটেনি। অন্যদিকে সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে আমাদের ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবন চরম অনিরাপদ হয়ে পড়েছে। খুব সাম্প্রতিককালে পদ্মা সেতুর কল্লা কাটার গুজব অতীতের সব সীমা অতিক্রম করেছে। এটি অবশ্যই উদ্বেগের বিষয় যে ফেসবুক এসব ক্ষেত্রে অতি সামান্যই সহায়তা করতে পেরেছে কিংবা করেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সেক্সট্রেড বা পর্নোগ্রাফি ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হচ্ছে। ব্যক্তিগত তথ্য চুরি, আর্থিক প্রতারণা বা হয়রানিও অতীতের সব সীমা অতিক্রম করেছে। তাই কঠোর হওয়ার সময় এখন সমুপস্থিত। সারা দুনিয়াও সম্ভবত এটি উপলব্ধি করছে যে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, বাকস্বাধীনতা বা গণতান্ত্রিক অধিকারের চাইতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ছোবল অনেক বেশি ভয়াবহ। তারা একদিকে ব্যক্তিগত তথ্য চুরি করছে, নির্বাচনের ফলাফল বদলাচ্ছে এবং অন্যদিকে জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস, নৈরাজ্য তৈরি করছে। তারা অসুস্থ সংস্কৃতির বাহক হওয়ার পাশাপাশি বিশ্বের জাতিসমূহের নিজস্ব সংস্কৃতি ও জীবনধারার অপরূপান্তর করছে। আসুন সতর্ক হই। বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য আশাবাদের জায়গা হচ্ছে আমরা সবার আগে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পাস করেছি। সেই আইনের প্রয়োগ শুরু হয়েছে। আমাদের ডিজিটাল নিরাপত্তা বিধানের জন্য প্রযুক্তিগত সক্ষমতা আমরা অর্জন করছি। আগামীতে আমাদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা আরো বাড়বে এবং আইনের প্রয়োগও কঠিন হবে- সেটাই প্রত্যাশা। সম্ভবত এটিও প্রত্যাশা যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সম্পর্কে সবাইকেই আরো সতর্ক হতে হবে।

মোস্তাফা জব্বার : তথ্যপ্রযুক্তিবিদ ও কলাম লেখক।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj