কাশ্মির ভূ-স্বর্গ থেকে অগ্নিকুণ্ড

রবিবার, ১১ আগস্ট ২০১৯

ঝিলাম, শতদ্রু, জাঁসকার, বিতস্তা, বিপাশা, চন্দ্রভাগা, সিন্ধু, ইরাবতী নামের মনমোহিনী স্রোতস্বিনীর উন্মাতাল বয়েচলা প্রকৃতির এক অনিন্দ্য উপহার কাশ্মির। বৈশিষ্ট্যপূর্ণ অবস্থানের কারণেই চমৎকার সৌন্দর্যের অনবদ্য এই উপত্যকা সবার নজরে সেই ১৯৪৭ সাল থেকেই। ১৯৪৭-এ দেশভাগের সময়ে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ কাশ্মিরের হিন্দু রাজা হরি সিং ভারত ও পাকিস্তান কারো সঙ্গেই থাকতে রাজি না হয়ে আলাদা সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবেই আত্মপ্রকাশ করতে চেয়েছিল। পাকিস্তান অবশ্যই বিষয়টি ভালোভাবে নেয়নি। তাই জন্মের দুই বছরের মাথায় পাকিস্তানি আদিবাসীদের হামলায় বিপদগ্রস্ত কাশ্মির ভারতের সাহায্যে পরিস্থিতি সামাল দিলেও ভারতের কাছে কাশ্মির তার স্বাধীন স্বকীয়তা হারায়। ৩৭০ ধারার বিশেষ মর্যাদার মাধ্যমে কাশ্মিরের সংবিধান, জাতীয় পতাকা, জাতীয় সঙ্গীত, প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি সবই ছিল। যদিও পরবর্তী সময়ে প্রধানমন্ত্রী মুখ্যমন্ত্রী হয়, রাষ্ট্রপতি পদ বাতিল হয়। শুধু পররাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা, অর্থ ও যোগাযোগ ছাড়া সব বিষয়ের সিদ্ধান্ত নেয়ার এখতিয়ার ছিল কাশ্মিরের। আর ছিল সংবিধানের ৩৫ এ ধারা। এই ধারাবলেই বাইরের কারো জমি কেনার, ব্যবসা করার, সম্পদ অর্জনের সুযোগ ছিল না। এমনকি কাশ্মিরের কোনো নারী বাইরের কাউকে বিয়ে করলে তিনি সম্পত্তির উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হতেন। বাইরের কারো সেখানে চাকরি করারও সুযোগ ছিল না। ফলে ৭০ বছর ভারতের সঙ্গে থাকলেও আলাদা স্বতন্ত্র এক অবস্থান ছিল জম্মু-কাশ্মিরের।

সম্প্রতি রাজ্যসভা ও লোকসভায় ৩৭০ ধারা বাতিল হওয়ায় কাশ্মিরিরা যে বিশেষ সুবিধা ভোগ করত কার্যত তা বাতিল হয়ে যায়। আবার জম্মু ও কাশ্মির থেকে লাদাখকে আলাদা করে কেন্দ্রের শাসন জারি করা হয়। কাশ্মিরে বিধানসভা থাকলেও লাদাখ সরাসরি কেন্দ্র থেকে পরিচালিত হবে। এই মুহূর্তে কাশ্মিরে ইন্টারনেট, টেলিফোনসহ সব ধরনের সুবিধা বন্ধ করে জারি করা হয়েছে ১৪৪ ধারা।

পৃথিবীতে যুগে যুগে জটিল এবং কুটিল রাজনীতির মারপ্যাঁচের শিকার হয়েছে সাধারণ জনগণ। পৃথিবীর সব দেশেই সংখ্যালঘুদের চাপে রাখার, অধিকার কেড়ে নেয়ার, দমন নিপীড়নের মাধ্যমে সব সুযোগ-সুবিধা বঞ্চিত করার ইতিহাস আছে। নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহ জুটির নেতৃত্বে অতিমাত্রায় উগ্র সাম্প্রদায়িক হিন্দুত্ববাদী বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর বোঝা গিয়েছিল, এটা অবশ্যম্ভাবী। কারণ তাদের নির্বাচনী অঙ্গীকার ছিল ৩৭০ ধারা বাতিলের মাধ্যমে জম্মু-কাশ্মিরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল করা, সম্প্রতি যা শুরু হয়েছে।

বিজেপি মনে করেছে, নানা ধর্মের, নানা বর্ণের, নানা ভাষার, নানা সংস্কৃতির ভারতের অখণ্ডতা বজায় রাখার জন্য জম্মু-কাশ্মিরের এই বিশেষ সুবিধা বাতিল জরুরি। কারণ এই মর্যাদার কারণে কাশ্মিরিরা নিজেদের স্বতন্ত্র ভাবত… যা ভারত সরকারের ভয়ের কারণ। আর এটা অন্য বিচ্ছিন্নতাবাদীদের জন্যও সুস্পষ্ট মেসেজ যে, ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষায় ভারত চুল পরিমাণও ছাড় দেবে না। আরো মনে করা হচ্ছে যে, ৩৫ এ ধারা বাতিলের মাধ্যমে হিন্দু উগ্রবাদের প্রবেশ ঘটবে জম্মু-কাশ্মিরে। বিজেপি সরকার ভৌগোলিক অখণ্ডতার বিষয়টি নিয়ে যতই শক্ত অবস্থানে থাকুক না কেন, ভারত নিশ্চিতভাবেই বিভক্তির দিকে এগিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশাল সোভিয়েত ইউনিয়নও ভাবেনি একদিন টুকরো টুকরো হবে। সামাজিক বিনির্মাণে সময়ের দাবি এখন নিউক্লিয়াস রাষ্ট্র। নিপীড়িত নির্যাতিত নিগৃহীত মানুষের আর্তনাদে বৃহৎ রাষ্ট্রের ক্ষয়িষ্ণু কাঠামো আস্তে আস্তে ভেঙে পড়বে। নতুন করে অসীম শক্তি নিয়ে জেগে উঠবে মানুষ। বৃহৎ দানবের দাম্ভিকতায় ওপর তৈরি হবে নতুন স্বপ্ন, নতুন রাষ্ট্র, সৃষ্টি হবে নতুন প্রাণ। জয় হবে জম্মু-কাশ্মির-লাদাখের নিপীড়িত মানুষের, জয় হবে পৃথিবীর আনাচে-কানাচে জেগে ওঠা স্বাধীনতাকামী মেহনতি মানুষের। পৃথিবীর সর্বোচ্চ যুদ্ধক্ষেত্র সিয়াচেন হিমবাহের বরফ গলা পানি দিয়ে সুশীতল হোক শাসকের হৃদয়, এ অঞ্চলের ভূখণ্ড।

লাভা মাহমুদা

শিক্ষক ও লেখক, ঢাকা।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj