কুরবানির সওয়াব ও বিভিন্ন বিধান

রবিবার, ১১ আগস্ট ২০১৯

মুসলমানদের সবচেয়ে বড় দুটি ধর্মীয় উৎসবের একটি হলো ঈদুল আজহা, যা কুরবানির ঈদ নামেও পরিচিত। আরবি বাক্যাংশ ‘ঈদুল আজহা’-এর আভিধানিক অর্থ হলো ত্যাগের উৎসব। হিজরি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী প্রতিবছর আরবি জিলহজ মাসের ১০ তারিখ ঈদুল আজহা পালিত হয়। ঈদুল আজহার দিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হলো আল্লাহর নামে কুরবানি করা। জিলহজ মাসের ১০ তারিখ থেকে ১২ জিলহজ সন্ধ্যা পর্যন্ত অর্থাৎ ১০, ১১ ও ১২ ইং জিলহজ এই তিন দিনের যে কোনো সময়ে যেসব প্রাপ্ত বয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্ক, মুকিম ব্যক্তির কাছে নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকে ওই সব সামর্থবান মুসলমানের পক্ষ থেকে উট, দুম্বা, ভেড়া, ছাগল, গরু, মহিষ ইত্যাদি প্রাণী মহান আল্লাহতায়ালার নামে জবাই করার আনুষ্ঠানিকতাই কুরবানি। প্রকৃত অর্থে বান্দার পক্ষ থেকে মহান মাবুদের নামে কোনো কিছু আত্মত্যাগ বা উৎসর্গ করাই কুরবানি। যা শরিয়তের বিধান হিসাবে ওয়াজিব। কুরবানির বিধান শুধু রাসুল (সা.) যুগেই নয় বরং পৃথিবীর প্রথম মানুষ হযরত আদম আ.-এর সময় থেকেই কুরবানির প্রচলন ছিল, সর্বপ্রথম কুরবানি করেন তাঁর ছেলে হাবিল।

পৃথিবী সৃষ্টি হতে অদ্যাবধি কুরবানির বিধান প্রচলিত। সুরা মায়িদার ২৭ নাম্বার আয়াতে পৃথিবীর সর্বপ্রথম হযরত আদম আ.-এর সন্তান হাবিল কাবিলের কুরবানির কথা উল্লেখ রয়েছে। তখনকার কুরবানির বিধিবিধান ছিল কিছুটা ভিন্ন। আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘আপনি তাদেরকে পড়ে শোনান আদমের দুই পুত্রের সত্য সংবাদ। যখন তারা উভয়ে এক একটা কুরবানি দিল। তখন তাদের একজনের থেকে (কুরবানি) কবুল করা হল, অন্যজন থেকে কবুল করা হলো না।’ (৫ : ২৭)

এ কুরবানি কেন, কীভাবে, পরিণতি কী হলো- এর বিবরণ তাফসিরের গ্রন্থাদিতে বিদ্যমান। হাবিল ও কাবিল নামক আদমের এ দুই পুত্রের ওই ঘটনাটির সারসংক্ষেপ হলো- আদম ও হাওয়া এ ধরাপৃষ্ঠের প্রথম মানব-মানবী। তাঁদের বংশবিস্তারের জন্য আল্লাহতায়ালার নির্দেশে মা হাওয়ার গর্ভ থেকে যমজ অর্থাৎ জোড়া সন্তান জন্ম নিত, একজন পুত্র ও একজন কন্যা- এ নিয়মে। একই সহোদর হিসাবে ভাইবোনের মধ্যে বিবাহ প্রকৃতিগতভাবেই অশোভনীয়। তখন থেকেই এ বিয়ে হারাম, কিন্তু সহোদর হলেও দুই গর্ভের সন্তানদের মধ্যে (এক গর্ভের পুত্র ও পরের গর্ভের কন্যার মধ্যে) বিবাহ হতো। এ ছাড়া বংশবিস্তারের ভিন্ন উপায় ছিল না। এমনটাই আল্লাহর অনুমোদন ছিল। অর্থাৎ সে প্রেক্ষাপটে তখনকার শরিয়তে ওই সম্পর্কের বিবাহ বৈধ ছিল।

কাবিলের সহজাত যে বোনটি জন্মে, সে ছিল পরমা সুন্দরী, নাম তার আকলিমা। পক্ষান্তরে হাবিলের সহজাত বোনটি হয় কুৎসিত। তার নাম লেওদা। দুই ভাইয়ের মধ্যে কাবিল ছিল অবাধ্য ও উদ্ধত, কিন্তু হাবিল খোদভীরু, বিনয়ী। কাবিল কিন্তু তারই সহজাত বোনটিকে পেতে চায়। কারণ আকলিমা সুন্দরী ছিল। আর নিয়মমাফিক হাবিলের সহজাত বোনটি বিশ্রী বলে তাকে সে বিয়ে করবে না। তখন আদম (আ.) মীমাংসার জন্য উভয়কে কুরবানি দিতে বললেন। যার কুরবানি কবুল হবে, সেই পাবে আকলিমাকে। তখনকার দিনে কুরবানি কবুল হলে আসমান থেকে অগ্নিপিণ্ড এসে তা ছেয়ে ফেলত। পরে আগুন উঠে যাওয়ার সময় কুরবানির সামগ্রীও অদৃশ্য হয়ে যেত। (এ প্রক্রিয়ার কথা সুরা আল ইমরানের ১৮৩তম আয়াতে আছে)। যা হোক, কথামতো উভয়ে কুরবানি দিলে হাবিলের কুরবানি কবুল হলো, আর কাবিলেরটা পরিত্যক্ত। এতে আক্রোশে কাবিল হাবিলকে হত্যা করতে উদ্যত হয়। তখন হাবিলের বক্তব্য ছিল, আল্লাহ তো তাকওয়াবানদের কুরবানিই কবুল করেন।

মুসলিম জাতির পিতা হযরত ইব্রাহীম (আ.)-এর নবুয়ত কাল। আল্লাহতায়ালা হযরত ইব্রাহীম (আ.)-কে আদেশ করলেন তার প্রিয় জিনিস আল্লাহর উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করার জন্য। হযরত ইব্রাহীম (আ.) তার প্রিয় অনেক জিনিস (উট) আল্লাহর উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করার পর যখন বুঝতে পারলেন যে আল্লাহতায়ালা তার সম্পদ কুরবানি চান না তিনি তার সবচেয়ে প্রিয় জিনিস সন্তানকে কুরবানি চান। হযরত ইব্রাহীম (আ.) তার বার্ধক্যের অবলম্বন হযরত ইসমাঈল (আ.)-কে আল্লাহর উদ্দেশ্যে কুরবানি দেয়ার জন্য নিয়ে চললেন। যখন হযরত ইসমাঈল (আ.)-কে হযরত ইব্রাহীম (আ.) কুরবানি করার উদ্দেশ্যে শোয়াল তখন পিতৃত্বের ¯েœহ তার মনে জেগে উঠতে পারে সেই ভয়ে হযরত ইসমাঈল (আ.) তার পিতার চোখে একখানা কাপড় বেঁধে নেয়ার পরামর্শ দেন। এভাবে যখন ইব্রাহীম (আ.) কুরবানি দিতে আরম্ভ করলেন তখন আল্লাহর নির্দেশে ফেরেশতারা জান্নাত থেকে একটি দুম্বা নিয়ে এসে ইসমাঈল (আ.)-কে উঠিয়ে সেখানে শুয়ায়ে দিল। আল্লাহর অপার মহিমায় সেটাই কুরবানি হয়ে গেল। আর সেদিন থেকেই শুরু হল কুরবানির ইতিহাস।

কুরবানি করা ওয়াজিব। তবে শর্তসাপেক্ষে। ঢালাওভাবে সবার ওপর ওয়াজিব নয়। যার কাছে মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর পর অতিরিক্ত সাড়ে বায়ান্ন তোলা রৌপ্য বা সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণ অথবা সমপরিমাণ অর্থ-সম্পদ আছে তার ওপরেই কুরবানি ওয়াজিব। জাকাতের ন্যায় কুরবানিতে সম্পদের বর্ষপূর্তি শর্ত নয়। বরং ফিতরার হুকুমের ন্যায়। ঈদের দিন যেমন কারো কাছে নেসাব পরিমাণ সম্পদ থাকলেই তার ওপর ঈদুল ফিতর আদায় করতে হয় তেমনি ঈদুল আজহার দিন কারো কাছে নেসাব পরিমাণ সম্পদ আসলেই তার ওপর কুরবানি ওয়াজিব। শরিয়ত যার ওপর কুরবানি ওয়াজিব করেনি, এমন কোনো ব্যক্তি যদি কুরবানির দিন জবেহ করার ইচ্ছায় পশু ক্রয় করে তবে তার ওপর কুরবানি ওয়াজিব হয়ে যায়। এ ছাড়া কুরবানি ওয়াজিব হওয়ার জন্য কুরবানিদাতার আরো কতিপয় শর্ত পূরণ হওয়া দরকার। সেগুলো হল সুস্থ মস্তিষ্কের অধিকারী হওয়া, প্রাপ্ত বয়স্ক এবং বাড়িতে অবস্থানকারী (মুকিম) হওয়া।

সব শর্ত পূর্ণ হয়ে কুরবানি ওয়াজিব হওয়া সত্ত্বেও যদি কোনো ব্যক্তি কুরবানি না দেয় তবে সে মারাত্মক অপরাধী হিসেবে সাব্যস্ত হবে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহর রাসুল (সা.) হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে কুরবানি করল না, সে যেন ঈদগাহের কাছেও না আসে। ঈদুল আজহার রাত্রিতে সওয়াবের উদ্দেশ্যে জেগে আল্লাহর ইবাদাত-বন্দেগি করা। যে ব্যক্তি কুরবানি করবে তার জন্য নামাজের পূর্বে কিছু পানাহার না করা এবং নামাজের পর কুরবানির গোশত খাওয়া সুন্নত; যে ব্যক্তি কুরবানি করবে তার জন্য জিলহজের চাঁদ দেখার পর থেকে কুরবানি না করা পর্যন্ত গোঁফ ও নখ না কাটা মুস্তাহাব; ঈদগাহে যাওয়ার সময় যে রাস্তা দিয়ে যাবে ফেরার সময় সে রাস্তা ব্যবহার না করা সুন্নত; যাওয়ার সময় তাকবিরে তাশরিক উচ্চস্বরে বলা সুন্নত; ঈদুল ফিতর অপেক্ষা ঈদুল আজহার নামাজ সকালে পড়া সুন্নত।

জিলহজ মাসের ৯ তারিখ ফজর থেকে ১৩ তারিখ আসর পর্যন্ত (মোট ২৩ ওয়াক্ত) সবার ওপর ফরজ নামাজের পরেই একবার তাকবিরে তাশরিক পাঠ করা ওয়াজিব। পুরুষরা উচ্চস্বরে ও স্ত্রীলোকরা নীরবে পাঠ করবে। তাকবিরে তাশরিক হলো- আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়া লিল্লাহিল হামদ।

ছাগল, ভেড়া, দুম্বা, গরু, মহিষ, উট এই ছয় প্রকার জন্তু দ্বারা কুরবানি দিতে হবে। ছাগল পূর্ণ এক বছর হতে হবে। ভেড়া ও দুম্বা যদি এতটুকু মোটাতাজা হয় যে এক বছর বয়সী ভেড়া দুম্বার মতো, তবে তা দিয়ে কুরবানি করা জায়েজ আছে। গরু ও মহিষ দুই বছর বয়সী এবং উট পাঁচ বছর বয়সী হতে হবে। কুরবানির পশু মোটাতাজা হওয়া বাঞ্ছনীয়। নিখুঁত পশু দ্বারা কুরবানি দেয়া উত্তম। যে ছয় ধরনের পশু দ্বারা কুরবানি করা জায়েজ আছে সেই সব পশুর মধ্যে যদি শরিয়ত নির্ধারিত কোনো ধরনের ত্রুটি পাওয়া যায় তবে সে পশুগুলো দ্বারা কুরবানি করা বৈধ নয়।

পবিত্র কুরআনে (সুরা আল হাজ্জ, আয়াত : ৩৬) তিন শ্রেণিকে কুরবানির গোশত খাওয়া বা খাওয়ানোর কথা বলা হয়েছে- কুরবানিদাতা, আত্মীয়-প্রতিবেশী এবং ফকির-মিসকিন। খিলাফতের দায়িত্ব দিয়ে মানুষকে পৃথিবীতে পাঠিয়ে মূলত মানুষের প্রতি করুণা করেছেন। তাঁর দেয়া জানমাল থেকে তাঁরই দেখানো, শিখানো পথে সামান্য কিছু বিলিয়ে দেয়ার সুযোগ দিয়ে মূলত আমাদের ধন্য করেছেন, আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন। তাই কুরবানি হবে শুধু তাঁর জন্য, তাঁর সন্তুষ্টি হাসিলের জন্য।

সাইফুল হক সিরাজী : ইসলামী চিন্তাবিদ ও কলাম লেখক।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj