বরিশাল বিআরটিসি বাস ডিপো : লং লিজের মাধ্যমে রাজস্ব বঞ্চিত হচ্ছে সরকার

রবিবার, ১১ আগস্ট ২০১৯

এম মিরাজ হোসাইন, বরিশাল : নানা অনিয়ম আর অব্যবস্থাপনায় এখন ডুবতে বসেছে বিআরটিসির বরিশাল বাস ডিপোটি। আসন্ন ঈদুল আজহায় বরিশাল বিআরটিসি স্পেশাল সার্ভিস নিয়ে বেকায়দায় পড়েছে। লক্কড়-ঝক্কড় মার্কা বাস আর ঠিকাদারের কাছে লং লিজ দেয়ায় যাচ্ছেতাই অবস্থায় পরিণত হয়েছে বরিশাল ডিপো। এখানকার ৫৪টি বাস ১৮ রুটে নিয়মিত চলাচলের কথা থাকলেও মেরামত আর সঠিক পরিচর্যার অভাবে ১২টি বাস এখন পুরোপুরি অকেজো হয়ে পড়ে রয়েছে। ফলে ৪২টি বাসে জোড়াতালি দিয়ে চলছে এসব রুটের যাত্রীসেবা। আর এসব রুটে যাত্রীসেবার মান নিয়ে রয়েছে নানান অভিযোগ।

বরিশাল বিআরটিসি বাস ডিপোর একাধিক সূত্রে জানা গেছে, এখানকার ম্যানেজার জামসেদ আলী এই প্রতিষ্ঠানকে এখন লিজিং প্রতিষ্ঠানে রূপ দিতে চলেছেন। সরকারি এই প্রতিষ্ঠানের বাস লিজ দিয়ে নিজের পকেট ভারী করে সরকারকে বিপুল অঙ্কের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত করে চলেছেন তিনি। আর এবারের ঈদে ম্যানেজার বিশেষ সার্ভিসের নামে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের মাওয়া রুটে নিয়মিত চলাচলকারী ৪টি বাস বন্ধ করে দিয়ে তা স্পেশাল সার্ভিস হিসেবে রংপুর রুটে চলাচলের শিডিউল তৈরি করেছেন। ফলে ঢাকা থেকে বরিশালে যাতায়াতকারী যাত্রীরা বিআরটিসির সেবা থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত হবেন।

বরিশাল ডিপোর ১৮টি রুট হচ্ছে বরিশাল-আমুয়া, বরিশাল-বরগুনা, বরিশাল-বেনাপোল, বরিশাল-পাথরঘাটা, বরিশাল-পাথরঘাটা-খুলনা, বরিশাল-খুলনা-পাথরঘাটা, বরিশাল-খুলনা ১, বরিশাল-খুলনা ২, কুয়াকাটা-খুলনা, চরফ্যাশন-বরিশাল-যশোর, বরিশাল-মাওয়া (কাঁঠালবাড়ী), বরিশাল-কুয়াকাটা, বরিশাল-শ্যামনগর-মুন্সীগঞ্জ, বরিশাল-চাঁপাইনবাবগঞ্জ, বরিশাল-রংপুর, বরিশাল-আগৈলঝাড়া-খুলনা, মঠবাড়িয়া-বরিশাল-চিটাগাং, কুয়াকাটা-বরিশাল-মাওয়া

(কাঁঠালবাড়ী)। এই ১৮টি রুটে চলাচলকারী বাসগুলো লং লিজে দিয়ে চালাচ্ছে বরিশাল ডিপো

কর্তৃপক্ষ। যার ফলে এই ডিপো থেকে সরকার মোটা অঙ্কের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

বিআরটিসি কর্তৃপক্ষ নিজে বাস পরিচালনা করলে প্রতি মাসে বরিশাল-আমুয়া রুটেই দুটি বাসে সরকারের আয় হতো ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা। সেখানে এখন লং লিজে আয় হচ্ছে মাত্র ১৫ হাজার টাকা। একইভাবে বরিশাল-কুয়াকাটা রুটে দুটি বাসে সরকারের আয় হতো ৪ লাখ টাকা আর সেখানে এখন পাচ্ছে ১১ হাজার ৫০০ টাকা। বরিশাল-পাথরঘাটা রুটের বাস থেকে রাজস্ব জমা দেয়া হয় ৪৫ হাজার টাকা, বরিশাল-পাথরঘাটা-খুলনা রুটে দুটি বাস থেকে রাজস্ব জমা হয় মাত্র ৬০ হাজার টাকা। একইভাবে এখানকার সবকটি রুটে মাসিক চুক্তিতে লং লিজ দিয়ে রাজস্ব বঞ্চিত করা হচ্ছে সরকারকে। আর এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে প্রতি মাসে এই হারে ১২ লাখ টাকার বেশি পকেটে পুরছেন ম্যানেজার জামসেদ। অভিযোগ রয়েছে, সাবেক ম্যানেজার জামিল এই লং লিজের সিস্টেম চালু করে গেলেও বর্তমান ম্যানেজার তারই দেখানো পথে হাঁটছে।

গাড়ির মেরামত আর ম্যান্টেনেন্সের নামে লাখ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে এখানকার ম্যানেজারের বিরুদ্ধে। খোদ ডিপোর সরকারি চালক ও কন্ডাক্টররা এসব অভিযোগ করে বলেন, ম্যানেজার নিজেকে গোপালগঞ্জের লোক বলে পরিচয় দেন এবং সবাইকে হুমকি দিয়ে এসব অনিয়ম করে আসছেন।

অভিযোগ রয়েছে, এই ডিপোর উন্নয়ন খাতের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও চালকসহ ১৬৭ জন স্টাফ বেতন পান না ১০ মাস। বেতন বন্ধ থাকায় এসব স্টাফের পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবন কাটছে। আসন্ন ঈদুল আজহায় বেতন বোনাস না দেয়ায় তাদের ঈদ আনন্দ থেকে বঞ্চিত থাকতে হবে পরিবার নিয়ে।

সূত্রে আরো জানা গেছে, শত বিড়ম্বনার পরও দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের কাছে বিআরটিসি বাসের গ্রহণযোগ্যতা এখনো রয়েছে। এখনো সংস্থাটির বরিশাল বাস ডিপোর ৪২টি গাড়ি দৈনিক প্রায় ১২ হাজার কিলোমিটার সড়কপথে অন্তত পাঁচ হাজার যাত্রী পরিবহন করে আসছে। একসময় প্রতি মাসে ডিপোটি দেড় কোটি টাকারও বেশি যাত্রী ভাড়া আয় করলেও এখন তা অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে লং লিজের কারণে। তারওপর পুরনো গাড়ির অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যয়, ফেরি ভাড়া ও সেতুর মাত্রাতিরিক্ত টোল পরিশোধের সঙ্গে অতিরিক্ত প্রশাসনিক ব্যয় এ বাস ডিপোর লাভের পথ রুদ্ধ করছে। ফলে একসময়ের লাভজনক বরিশাল বাস ডিপোটি এখন অনেকটাই লোকসানের মুখে পড়েছে।

বিশেষ অনুসন্ধানে জানা গেছে, ১৯৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত বিআরটিসি বাস ডিপোটি ১৯৮২ সালে সামরিক সরকার বন্ধ করে দেয়। ১৯৮৭ সালে পুনরায় চালু করার প্রতিটি স্তরেই পুরনো বাসই ছিল একমাত্র ভরসা। এর মধ্যে প্রায় তিন বছর আগে ১০টি নতুন ভারতীয় এসি বাস দিয়ে বরিশাল-মাওয়া রুটে বিশেষ একটি সার্ভিস চালু করা হয়। প্রথমে এ সার্ভিসটি যথেষ্ট জনপ্রিয়তা অর্জন করলেও নি¤œমানের গাড়ির কারণে এখন তা যাত্রী বিড়ম্বনায় পরিণত হয়েছে। পর্যায়ক্রমে বরিশালে অনুরূপ ১৬টি বাস প্রদান করা হলেও তার সবই এখন এ ডিপোর বোঝায় পরিণত হয়েছে।

এদিকে ডিপোতে দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা ১২টি বাস এখন সম্পূর্ণ চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এসব গাড়ি মেরামতের কোনো উদ্যোগ নেই ডিপো কর্তৃপক্ষের। তাদের মতে, এসব গাড়ির ইঞ্জিন ও বডি এখন সড়কে চলাচলের উপযুক্ত নেই। তাই এগুলোর ভবিষ্যৎ এখন পরিত্যক্ত।

বরিশাল ডিপোর মাওয়া (কাঁঠালবাড়ী) রুটের যাত্রী আনিচুর রহমান জানান, লক্কড়-ঝক্কড় মার্কা বাস দিয়ে এই রুটে যাত্রী পরিবহন করলেও তা দেখার কেউ নেই। মাঝেমধ্যে এসব গাড়ি মাঝ পথে ইঞ্জিন বিকল হয়ে দু-তিন ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকে। ঠিকাদারে মাধ্যমে কোনো রকম জোড়াতালি দিয়ে এই বাসগুলো লং লিজে চালানোর ফলে কারো কাছে কোনো অভিযোগ করেও ফল পাই না। একই কথা বলেন বরিশাল-খুলনা রুটের নিয়মিত যাত্রী আবুল হোসেন। তিনি বলেন, ঠিকাদারের লোকজন যাত্রীদের সঙ্গে যাচ্ছেতাই ব্যবহার করে এলেও তার বিচার দিয়ে কোনো প্রতিকার মেলে না। তার ওপর বাসের মান তো লক্কড়- ঝক্কড়।

এসব বিষয়ে আলাপকালে বরিশাল ডিপোর ম্যানেজার মো. জামশেদ আলী বলেন, লং লিজের বিষয়টি হেড অফিস ডিল করে। আর ঠিকাদাররা আমার কাছে শুধু রাজস্বের টাকাটা দিয়ে যায়। যে টাকা সরকারি কোষাগারে জমা হয়। এখানে আমার কোনো হাত নেই। এর বাইরে তিনি অনিয়ম, ঈদ সার্ভিস, যান্ত্রিক ত্রুটি মেরামত নিয়ে অনিয়মের বিষয়ে কোনো কথা বলতে রাজি হননি।

শেষ পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj