তোমাদের জন্য বিশ্বকবির লেখা

বুধবার, ৭ আগস্ট ২০১৯

তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে

সব গাছ ছাড়িয়ে

উঁকি মারে আকাশে।

মনে সাধ, কালো মেঘ ফুঁড়ে যায়

একেবারে উড়ে যায়;

কোথা পাবে পাখা সে?…

এই কবিতাটি শোনেনি বা পড়েনি এমন মানুষ আমাদের দেশে খুঁজে পাওয়া কঠিন। এটি লিখেছেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, তাও আমাদের জানা। মাত্র আট বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথের লেখালেখির শুরু। শিশুদের জন্য তিনি শুধু এই কবিতাটিই নয়, লিখেছেন আরো অনেক ছড়া, কবিতা। সবার ভালোলাগার আরেকটি কবিতা এমন :

মনে করো যেন বিদেশ ঘুরে

মাকে নিয়ে যাচ্ছি অনেক দূরে।

তুমি যাচ্ছো পালকিতে মা চড়ে

দরজা দুটো একটুকু ফাঁক করে,

আমি যাচ্ছি রাঙা ঘোড়ার ’পরে

টগ্বগিয়ে তোমার পাশে পাশে।

রাস্তা থেকে ঘোড়ার খুরে খুরে

রাঙা ধুলোয় মেঘ উড়িয়ে আসে।…

শিশুমনের কল্পনাকে যিনি ছন্দে ছন্দে এমনভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারেন তিনিই তো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন পিতামাতার চতুর্দশ সন্তান। আর মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে তার মায়ের মৃত্যু হয়। মাকে নিয়েও লিখেছেন তিনি অনেক অনেক ছড়া-কবিতা। যেমন :

আমার মা না হয়ে তুমি

আর-কারো মা হলে

ভাবছ তোমায় চিনতেম না,

যেতেম না ঐ কোলে?

মজা আরো হত ভারি,

দুই জায়গায় থাকত বাড়ি,

আমি থাকতেম এই গাঁয়েতে,

তুমি পারের গাঁয়ে।…

মাকে নিয়ে তার আরেকটি কবিতা এমন :

আমি যদি দুষ্টুমি করে

চাঁপার গাছে চাঁপা হয়ে ফুটি,

ভোরের বেলা মা গো, ডালের ’পরে

কচি পাতায় করি লুটোপুটি,

তবে তুমি আমার কাছে হারো,

তখন কি মা চিনতে আমায় পারো।…

শৈশবে রবীন্দ্রনাথ বিভিন্ন স্কুলে কিছুদিন করে পড়াশোনা করেছেন। কিন্তু বিদ্যালয়ের শিক্ষার প্রতি তার কোনো আগ্রহই ছিল না। কেন জানো? তার ছিল বিচিত্র সব সাধ। তার হতে ইচ্ছে করত অনেক কিছু। নিচের কবিতাটি পড়লেই জানতে পারবে ছোটবেলায় তার কত কিছু হওয়ার সাধ জাগত :

আমি যখন পাঠশালাতে যাই

আমাদের এই বাড়ির গলি দিয়ে,

দশটা বেলায় রোজ দেখতে পাই

ফেরিওলা যাচ্ছে ফেরি নিয়ে।

‘চুড়ি চা-ই, চুড়ি চাই’ সে হাঁকে,

চীনের পুতুল ঝুড়িতে তার থাকে,

যায় সে চলে যে পথে তার খুশি,

যখন খুশি খায় সে বাড়ি গিয়ে।…

চুড়িওয়ালার এমন স্বাধীন জীবন দেখে রবীন্দ্রনাথেরও ইচ্ছে করত চুড়িওয়ালা হতে। শুধু কি চুড়িওয়ালা? আরো কত কী? আমি আর না বলি। এই কবিতাটি পুরোটা পড়লেই তোমরা জানতে পারবে তার কত কী যে হতে ইচ্ছে করত।

রবীন্দ্রনাথ বিদ্যালয়ে যেতে চাইত না বলে বাড়িতে শিক্ষক রেখেই তার পড়াশোনার ব্যবস্থা করা হয়। তার ‘মাষ্টারবাবু’ কবিতাটি তোমরা নিশ্চয় পড়ে থাকবে। না পড়ে থাকলে পড়ে নিও। নিচে কিছু অংশ দেয়া হলো :

আমি আজ কানাই মাস্টার,

পোড়ো মোর বেড়ালছানাটি।

আমি ওকে মারি নে মা, বেত,

মিছিমিছি বসি নিয়ে কাঠি।

রোজ রোজ দেরি করে আসে,

পড়াতে দেয় না ও তো মন,

ডান পা তুলিয়ে তোলে হাই

যত আমি বলি ‘শোন্ শোন্’।

দিনরাত খেলা খেলা খেলা,

লেখায় পড়ায় ভারি হেলা।

আমি বলি ‘চ ছ জ ঝ ঞ’,

ও কেবল বলে ‘মিয়োঁ মিয়োঁ’।…

জমিদার পরিবারের সন্তান হয়েও রবীন্দ্রনাথের ছেলেবেলা কেটেছিল ভৃত্যদের (চাকরদের) অনুশাসনে। ছোটবেলায় জোড়াসাঁকোর বাড়িতে অথবা বোলপুর ও পানিহাটির বাগানবাড়িতে প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে প্রকৃতিকে ভালোবাসতে শিখেছিলেন তিনি। তাইতো তিনি লিখতে পেরেছেন এমন কবিতা :

আমার যেতে ইচ্ছে করে

নদীটির ওই পারে-

যেথায় ধারে ধারে

বাঁশের খোঁটায় ডিঙি নৌকো

বাঁধা সারে সারে।

কৃষাণেরা পার হয়ে যায়

লাঙল কাঁধে ফেলে;

জাল টেনে নেয় জেলে,

গোরু মহিষ সাঁতরে নিয়ে

যায় রাখালের ছেলে।…

প্রকৃতি নিয়ে ছোটদের জন্য তার আরো একটি কবিতা :

দিনের আলো নিবে এল,

সুয্যি ডোবে-ডোবে।

আকাশ ঘিরে মেঘ জুটেছে

চাঁদের লোভে লোভে।

মেঘের উপর মেঘ করেছে-

রঙের উপর রঙ,

মন্দিরেতে কাঁসর ঘণ্টা।

বাজল ঠঙ ঠঙ।…

রবীন্দ্রনাথের একটি বিখ্যাত কবিতার নাম সোনার তরী। তোমরা কিন্তু অবশ্যই পড়বে কবিতাটি। নিচে তার কয়েকটি লাইন দেয়া হলো :

গগনে গরজে মেঘ, ঘন বরষা।

ক‚লে একা বসে আছি, নাহি ভরসা।

রাশি রাশি ভারা ভারা

ধান কাটা হল সারা,

ভরা নদী ক্ষুরধারা

খরপরশা।

কাটিতে কাটিতে ধান এল বরষা।…

নিচের কবিতাটি তোমরা পড়েছো না? পড়ে দেখো তো :

ক্ষান্তবুড়ির দিদিশাশুড়ির

পাঁচ বোন থাকে কাল্নায়-

শাড়িগুলো তারা উনুনে বিছায়,

হাঁড়িগুলো রাখে আলনায়।…

এই ছড়াটির মতো আরো অনেক মজার মজার ছড়া-কবিতা পাবে রবীন্দ্রনাথের খাপছাড়া বইটিতে।

আমরা তো জানি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বড়দের জন্য অনেক অনেক গল্প, কবিতা, গান, নাটক, প্রবন্ধ লিখেছেন। ছোটদের জন্য তার ছড়া-কবিতার কথাও জানলাম। কিন্তু তিনি কি ছোটদের জন্য গল্প লেখেননি?

অবশ্যই লিখেছেন। বিজ্ঞানী, রাজার বাড়ি, বড়ো খবর, চণ্ডী, রাজরানী, মুনশি, ম্যাজিশিয়ান, পরী, ম্যানেজারবাবু, পান্নালাল, চন্দনী, ভালোমানুষ, মুক্তকুন্তলা, ডাকাতের গল্প, কর্তার ভূত, নতুন পুতুল, তোতাকাহিনী, সুয়োরানীর সাধ নামের গল্পগুলো ছাড়াও আরো কিছু ছোটদের গল্প তিনি লিখেছেন। এর বাইরে রয়েছে তার কিছু কিশোর গল্পও। যেমন : ছুটি, বলাই, পোস্টমাস্টার, কাবুলিওয়ালা, মাস্টারমশায়, যজ্ঞেশ্বরের যজ্ঞ, রামকানাইয়ের নির্বুদ্ধিতা, গুপ্তধন ইত্যাদি। রবীন্দ্রনাথের এসব লেখা পড়লে বোঝা যাবে, তিনি শিশুদের নিয়ে কতটা ভাবতেন আর তার মধ্যে কেমন সুন্দর একটা শিশুমন ছিল।

সবশেষে বাংলা সাহিত্যে একমাত্র নোবেল বিজয়ীর জীবনের একটা মজার কাহিনী বলে লেখাটা শেষ করছি। জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে রবীন্দ্রনাথের লেখা ‘বিসর্জন’ নাটকের মহড়া চলছিল। নাটকে রঘুপতি সেজেছিলেন দীনেন্দ্রনাথ ঠাকুর, আর জয়সিংহের ভূমিকায় স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। একটা দৃশ্য ছিল এমন, জয়সিংহের মৃতদেহের ওপর আছড়ে পড়বে শোকবিহŸল রঘুপতি। বারবার দৃশ্যটার মহড়া চলছিল। দীনেন্দ্রনাথ ছিলেন কিছুটা মোটাসোটা। বারবার তার ভার বহন করা কবিগুরুর জন্য কঠিন হয়ে পড়ছিল। একবার দীনেন্দ্রনাথ একটু বেকায়দায় রবি ঠাকুরের ওপর আছড়ে পড়লেন। রবীন্দ্রনাথ কঁকিয়ে উঠে বললেন, ওহে দিনু, মনে করিস নে আমি সত্যি সত্যিই মারা গেছি।

য় জহিরুল ইসলাম

ইষ্টিকুটুম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj