মানবমুক্তির বারতা নিয়ে উদ্ভাসিত রবীন্দ্রনাথ

বুধবার, ৭ আগস্ট ২০১৯

কাগজ প্রতিবেদক : বাঙালির প্রাণের আনন্দ আর আত্মার মুক্তি হচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি শুধু বাঙালির নন, বাংলাদেশ ও ভারত দুদেশের মানুষের কাছেই মানবমুক্তির বারতা নিয়ে উদ্ভাসিত। দুদেশের মানুষের সম্পর্কে সেতুবন্ধন রচনায় রবীন্দ্রনাথ দেখিয়ে দিয়েছেন নতুনতর মহিমা।

৭৮তম প্রয়াণবার্ষিকীতে গতকাল দিনব্যাপী নানা আয়োজনে নানা আলোকে উদ্ভাসিত এবং উচ্চারিত হলো তার নাম। কথা আর সুরের পাশাপাশি সৃষ্টি গীতিনাট্য, কাব্যনাট্যে স্মরণ করা হলো এই তুলনাহীনকে। প্রয়াণবার্ষিকীতে কবিগুরুকে নিবেদিত অনুষ্ঠান আয়োজনের ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে বাংলা একাডেমি ও ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট। এ ছাড়া প্রাতিষ্ঠানিকতার বাইরে সংস্কৃতিবান বাঙালি প্রাত্যহিক জীবনাচারে সহজাতভাবেই স্মরণ করেছে কবিগুরুকে। রবীন্দ্র প্রয়াণবর্ষিকী উপলক্ষে গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে একাডেমির কবি শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষে একক বক্তৃতা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বাংলা একাডেমি। এতে ‘রবীন্দ্রজীবনে ১৯১৯ : তাৎপর্যপূর্ণ একটি বছর উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে স্পষ্ট ও সাহসী অবস্থান’ শীর্ষক একক বক্তৃতা করেন অধ্যাপক সৈয়দ আজিজুল হক। সভাপতিত্ব করেন একাডেমির সভাপতি জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। স্বাগত ভাষণ দেন একাডেমির মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজী।

অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ড. মালেকা বেগম, পশ্চিমবঙ্গের গবেষক শক্তিসাধন মুখোপাধ্যায়, কবি লিলি হক প্রমুখ।

একক বক্তৃতায় অধ্যাপক সৈয়দ আজিজুল হক বলেন, জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের শতবর্ষপূর্তি হলো এ বছর। ১৯১৯ সালে ভারতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনকালে চরম নৃশংস এই ঘটনা ঘটেছিল। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে রবীন্দ্রনাথের নাম। তিনি এই নৃশংসতার প্রতিবাদে ‘নাইট’ উপাধি পরিত্যাগ করেন। এ ঘটনাটি যেমন তার দুরন্ত সাহসের উদাহরণ, তেমনি মানবজাতির প্রতি অসামান্য দায়বোধেরও পরম দৃষ্টান্ত। আরো একটি অনন্য ঘটনার জন্য ওই বছরটি রবীন্দ্রজীবনে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সেটি হলো : শান্তিনিকেতনের ব্রাহ্মচর্য বিদ্যালয়কে বিশ্বভারতীতে রূপান্তরিত করার যাত্রা শুরু হয় আজ থেকে একশ বছর আগে, ১৯১৯ সালে। বিশ্বভারতীর মধ্য দিয়ে যে বিশ্বাত্মবোধ রবীন্দ্রনাথ সৃষ্টি করতে চেয়েছেন, সেখানে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের জ্ঞানচর্চার মিলনই ছিল তার একান্তভাবে কাম্য। অন্যদিকে বিশ্বব্যাপী শান্তি ও মানবিক মহত্ত্ব সৃষ্টিতে আকুল রবীন্দ্রনাথ জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে নিজের শানিত অবস্থান ব্যক্ত করে মূলত তার জীবনব্যাপী সাধনার শুভ পারম্পর্যকেই বজায় রেখেছেন।

সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে একাকি এবং সুদৃঢ় অবস্থান অন্যায়ের বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথের জীবনব্যাপী অঙ্গীকারেরই প্রমাণবহ। মনুষ্যত্বের অপমান নিজ দেশে কিংবা পৃথিবীর যেখানে সংঘটিত হয়েছে সেখানেই তিনি স্বাদেশিকতা-স্বাজাতিকতার ঊর্ধ্বে উঠে মানবিক আন্তর্জাতিকতাবাদের প্রেরণায় তার প্রতিবাদ করেছেন।

স্বাগত ভাষণে হাবীবুল্লাহ সিরাজী বলেন, রবীন্দ্রনাথের প্রয়াণ দিবসে তাকে স্মরণ করতে গিয়ে বলতে হয় জীবনের মতো মৃত্যুকেও তিনি আবিষ্কার করেছেন অমৃত করে। কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন মহৎ মানবাত্মার কোনো বিলয় নেই। তিনি বলেন, আমরা আনন্দিত যে রবীন্দ্রনাথের ৭৮তম মৃত্যুবার্ষিকীর প্রাক্কালে বাংলা একাডেমি কর্তৃক প্রকাশিত হলো আহমদ রফিক প্রণীত রবীন্দ্র-জীবন চতুর্থ খণ্ড।

সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে রবীন্দ্র-কবিতা আবৃত্তি করেন বাচিক শিল্পী ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়। রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশন করেন মহিউজ্জামান চৌধুরী ও অণিমা রায়।

ছায়ানটের ভিন্নরকম আয়োজন : শ্রাবণ সন্ধ্যায় রবীন্দ্রনাথকে স্মরণ করে ভিন্নরকম এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ছায়ানট। অনুষ্ঠানটি উপভোগে ধানমন্ডির ছায়ানট সংস্কৃতি ভবন মিলনায়তনে ভিড় জমিয়েছিলেন সংস্কৃতিপ্রেমীরা। সে আয়োজনে পঠিত হয়েছে রবীন্দ্রনাথের প্রবন্ধ। পরিবেশিত হয়েছে কাব্যনাট্য থেকে গীতিনাট্য। ছায়ানটের শিল্পীদের সঙ্গে কণ্ঠশীলনের শিল্পীদের সম্মিলনে পরিবেশনা পর্বও ছিল।

গদ্য-পদ্য ও সঙ্গীতের সমন্বয়ে দুটি পরিবেশনা উপস্থাপন করে কণ্ঠশীলন। পাঠ করা হয় ধর্ম ও দেশপ্রেম নিয়ে রবীন্দ্রনাথের প্রবন্ধ। শিল্পিত উচ্চারণের সঙ্গে সুরের আশ্রয়ে কবিতা ও সঙ্গীতের সংযোগে উপস্থাপিত হয় ‘আমি তোমায় ছাড়ব না মা’ শীর্ষক পরিবেশনা। এটি পরিবেশন করেন প্রদীপ আগরওয়ালা, ফারহানা নিশাত সেহেলী, নাফিসা কেয়া, সাহেরা, ইসরাত জাহান ও আসিফ চৌধুরী। এরপর ছিল কণ্ঠশীলন পরিবেশিত কাব্যনাট্য ‘কর্ণ-কুন্তী সংবাদ’। এতে অংশ নেন শামীমা নাজনীন ও জহিরুল হক খান। ছায়ানটের শিল্পীরা পরিবেশন করেন গীতিনাট্য শ্যামা।

শেষ পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj