ঢাকা-বরিশাল নৌরুট : বরিশালে ঈদের বিশেষ প্রস্তুতি, কেবিন সংকটে যাত্রীরা

মঙ্গলবার, ৬ আগস্ট ২০১৯

এম মিরাজ হোসাইন, বরিশাল থেকে : দক্ষিণাঞ্চলের নদীপথগুলো ঘিরে একের পর এক বিলাসবহুল ও আধুনিক নৌযান (লঞ্চ) যুক্ত হচ্ছে অভ্যন্তরীণ যাত্রীবাহী নৌপরিবহন বহরে। যাত্রীর সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে লঞ্চের সংখ্যাও। তারপরও কেবিন সংকটে ভোগেন সব নৌপথের যাত্রীরা। বিশেষ করে বরিশাল-ঢাকা রুটে সাধারণ সময়ে ৪-৫ দিন আগে না চাইলে কেবনিই পাওয়া মুশকিল হয়ে দাঁড়ায়। আর বিভিন্ন উৎসব-পার্বন, ছুটিছাটা ঘিরে কেবিনের বিষয়টি হয়ে দাঁড়ায় সোনার হরিণের মতো। আর এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে তৎপর থাকে কালোবাজারিরা। তারা যেমন চড়া দামে কেবিন বিক্রি করে, তেমনি আবার স্টাফরাও লঞ্চে তাদের থাকার জন্য তৈরি কেবিনগুলো বিক্রি করছেন যাত্রীদের কাছে। যদিও বিআইডব্লিউটিএ বলছে, স্টাফদের কেবিন যাত্রী বা ভোক্তা পর্যায়ে ভাড়া দেয়ার কোনো নিয়ম নেই। তবে স্টাফ কেবিন ভাড়া প্রতিরোধে কঠোর কোনো পদক্ষেপও নিচ্ছে না কর্তৃপক্ষ। তথ্যানুযায়ী, ২০১২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি বরিশাল নদীবন্দরে ঢাকা থেকে আসা বিলাসবহুল যাত্রীবাহী লঞ্চ পারাবত-৭ এর স্টাফ কেবিন থেকে ৩৫ বছর বয়সী এক নারীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তবে তার সঙ্গে ঢাকা থেকে আসা পুরুষসঙ্গী লাশ উদ্ধারের আগ থেকেই ছিল নিরুদ্দেশ। ২০১৬ সালের ২৪ নভেম্বর ঝালকাঠি লঞ্চঘাটে ঢাকা থেকে আসা সুন্দরবন-৬ লঞ্চের মাস্টার (স্টাফ) কেবিন থেকে গলায় ফাঁস লাগানো অবস্থায় অজ্ঞাত এক নারীর (৩৫) লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। আর চলতি বছরের ২০ জুলাই আবারো বরিশাল নদীবন্দরে ঢাকা থেকে আসা বিলাসবহুল যাত্রীবাহী সুরভী-৮ লঞ্চের ইঞ্জিন রুমের কাছের একটি স্টাফ কেবিন থেকে গার্মেন্টস কর্মী আঁখি আক্তারের লাশ উদ্ধার করা হয়। তার লাশটিও উদ্ধারের সময় ঢাকা থেকে তার সঙ্গে আসা যুবক ছিল নিরুদ্দেশ। পরে যদিও নিরুদ্দেশ যুবককে গ্রেপ্তার করা হলে জানা যায়, আঁখি আক্তারকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে। ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০১৯ সালের জুলাই মাসের ঘটনাপ্রবাহ প্রায় কাছাকাছি। এত দিনে গল্পের চরিত্রের নাম বদলালেও ঘটনা প্রায় একই ধরনের। এর মধ্যে কেটে গেছে অনেক দিন, বদলেছে অনেক প্রেক্ষাপট। বেড়েছে লঞ্চ, বেড়েছে স্টাফ কেবিনের সংখ্যাও। হিসাব বলছে, কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত কেবিন ছাড়া স্টাফ কেবিনগুলোতেই ঘটছে চুরি, খুনসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড। যদিও প্রতিটি ঘটনার পর লঞ্চ মালিক ও প্রশাসন কয়েক দিনের জন্য কড়াকড়ি আরোপ করে। হত্যাকাণ্ডসহ যে কোনো অপরাধ সংঘটিত করে স্টাফ কেবিন থেকে সহজেই চলে যেতে পারে অপরাধীরা। তাই এদিকেই আগ্রহ রয়েছে মুখোশধারী যাত্রীদের। যারা মূলত অপরাধ সংঘটিত করার জন্যই লঞ্চে ওঠে, কারণ লঞ্চ কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত কেবিনগুলো যাত্রীদের কোনো না কোনো তথ্য বা কারো রেফারেন্স দিয়ে নিতে হয়। আর স্টাফ কেবিনগুলো ওই সব ঝামেলা ছাড়াই ভাড়া নেয়া যায়। ভাড়াও

অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ কেবিনের থেকে কম পড়ে।

লঞ্চ মালিকরা বলছেন, সাধারণত লঞ্চের সিঙ্গেল, ডাবল, সেমি ভিআইপি কেবিনগুলো ভাড়া দেয়ার সময় যাত্রীর পরিচয় নয়তো মোবাইল নম্বর রেখে দেয়া হয়। কিছু দিন আগে জাতীয় পরিচয়পত্রের আইডি কার্ডের ফটোকপি রাখা হতো। এতে কিন্তু অপরাধ করলেও দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হয়। অথচ স্টাফ কেবিনে কিছু ঘটলে ক্লু খুঁজে পেতেই কষ্ট হয় পুলিশের।

লঞ্চ স্টাফরা বলছেন, ঠিকমতো বেতন-ভাতা ও বোনাস না দেয়ায় পেট চালাতে গিয়ে হিমশিত খেতে হয় তাদের। তাই নিজের জন্য বরাদ্দ কেবিনটি ভাড়া দিতে হয় তাদের।

বিআইডব্লিউটিএ বরিশাল অফিস জানায়, দুটি ঈদ সার্ভিস ছাড়া বরিশাল-ঢাকা নৌরুটে ১৭টি লঞ্চ চলাচল করে। এই ১৭টি লঞ্চের মধ্যে ১০টি লঞ্চের সার্ভে জরিপ বলছে ১৮০ জন স্টাফের জন্য নির্ধারিত কেবিন বরাদ্দ দেয়া আছে। আর বাকি ১০ লঞ্চে মোট হিসাবে ২০০টির মতো স্টাফ কেবিন রয়েছে। যেগুলোর বেশির ভাগই রাতের যাত্রায় ভাড়া দেয়া হয়।

সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, নোঙর করা লঞ্চের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে স্টাফ কেবিন বিক্রির জন্য সংঘবদ্ধ হয়ে যাত্রী ডাকেন প্রত্যেকটি লঞ্চের স্টাফ। এদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বছরের পর বছর ধরে চলে আসছে এ সিস্টেম। শুধু স্টাফ কেবিন নয়, চালনার কক্ষের বিভিন্ন স্থানে সিট পেতে বিভিন্ন দামে ভাড়া দিয়ে দেয়া হয়।

এ বিষয়ে বরিশাল নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি শেখ আবুল হাশেম বলেন, স্টাফ কেবিন ভাড়া দেয়া যাবে না এমন কোনো আইন নেই। বিষয়টি নিয়ে গত রবিবার জেলা প্রশাসনের কার্যালয়ে আলোচনা হয়েছে। আমি বলেছি, স্টাফদের বেতন-বোনাস ঠিকমতো পরিশোধ করুন। দেখবেন স্টাফ কেবিন ভাড়া দেবেন না। তার মতে, সবাইকে বুঝতে হবে নিজের ঘুমানোর জায়গাটি মানুষ কখন অন্যের কাছে ছেড়ে দিয়ে রাত জাগে! অপরদিকে নৌ নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের উপপরিচালক আজমল হুদা মিঠু সরকার জানান, স্টাফ কেবিন যাত্রীদের কাছে ভাড়া দেয়ার বিধান নেই। কেউ স্টাফ কেবিন ভাড়া দিলে তিনি আইন ভঙ্গ করছেন।

তিনি বলেন, লঞ্চ মালিক-স্টাফ ও যাত্রীদের সচেতন হওয়া উচিত। খুনের ঘটনা শুধু স্টাফ কেবিনেই হতে পারে তা কিন্তু নয়, অন্য কেবিনেও হতে পারে। তখন কর্তৃপক্ষের কিছুই করার থাকে না। কারণ আপনি কার সঙ্গে চলছেন তা তো আপনি জানেন, কেবিনওয়ালা জানবেন না।

ঈদ ঘিরে বরিশাল নদীবন্দরে প্রস্তুতি : প্রতি বছরের মতো এবারো দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জন্য সড়ক, নৌ ও আকাশপথে স্পেশাল সার্ভিস ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে। বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলের সব থেকে বেশি মানুষ নৌপথে যাতায়াত করায় আগামী ৮ আগস্ট থেকে লঞ্চগুলো ঢাকার সদরঘাট থেকে দক্ষিণাঞ্চলমুখী স্পেশাল সার্ভিস দিতে শুরু করবে। যে সার্ভিস প্রয়োজনের তাগিদে আবার রাজধানীমুখী মানুষের জন্য ঈদের পর ২০ আগস্ট পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে বলে জানা গেছে। আর এ স্পেশাল সার্ভিসকে ঘিরে এরই মধ্যে দক্ষিণের নদীবন্দর ও লঞ্চঘাট কর্তৃপক্ষ আগাম প্রস্তুতিমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। যাত্রীদের নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্যেই করা হচ্ছে নানা পরিকল্পনা। নেয়া হচ্ছে নানা উদ্যোগ। বিশেষ করে বিভাগের ব্যস্ততম ও জনবহুল বরিশাল নদীবন্দরকেন্দ্রিক সেবার মান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কর্তৃপক্ষ হাতে নিয়েছে নানা উদ্যোগ। ধারাবাহিকতায় এরই মধ্যে বিআইডব্লিউটিএর সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর ছুটি বাতিল করা হয়েছে।

বরিশাল নদীবন্দর সূত্রে জানা গেছে, নানা উদ্যোগের মধ্যে যাত্রীদের সেবার কথা মাথায় রেখে এবারো স্বেচ্ছাসেবকদের মধ্যে ২৫ জন মেরিন (ডিপিইটিসি) ক্যাডেট, ৩০ জন আনসার, ২০ জন স্কাউট সদস্য বরিশাল নদীবন্দরে দায়িত্ব পালন করবেন। আর নিরাপত্তার কাজে নৌপুলিশ, মহানগর পুলিশ, কোস্ট গার্ড ও র‌্যাব সদস্যরা দায়িত্বে থাকবেন। পাশাপাশি বন্দর ভবনের আশপাশের সড়কে যানবাহন চলাচল ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার দায়িত্বে বরিশাল মহানগর পুলিশের (বিএমপি) ট্রাফিক বিভাগের সদস্যরা নিয়োজিত থাকবেন। এর বাইরে অসুস্থ রোগী এবং যে কোনো দুর্ঘটনায় উদ্ধার কাজের জন্য ফায়ার সার্ভিসের সদস্য ও মেডিকেল টিম বন্দর এলাকায় নিয়োজিত রাখা হবে। তবে এত আয়োজনের মধ্যেও বরিশাল নদীবন্দর এলাকায় পন্টুন সংকট থাকায় একসঙ্গে স্পেশাল সার্ভিসের সব লঞ্চের বার্দিং জায়গা দেয়া সম্ভব হবে না বলে জানিয়েছেন মাস্টাররা। এ ক্ষেত্রে একতলা ঘাটের জায়গা সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি বেশ কিছু লঞ্চকে অন্য লঞ্চের পেছনে মাঝ নদীতে নোঙর করে ঝুঁকি নিয়ে যাত্রী তুলতে হবে। যদিও পন্টুন বাড়নোর বিষয়ে কাজ চলমান রয়েছে বলে জানিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। তবে তা আসন্ন ঈদের আগে সম্ভব হবে না।

শেষ পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj