আদিবাসী দিবস আয়োজনে সন্তু লারমা : পার্বত্য চট্টগ্রামে অশান্ত পরিবেশ বিরাজ করছে

মঙ্গলবার, ৬ আগস্ট ২০১৯

কাগজ প্রতিবেদক : ‘ভাষাকেন্দ্রিক, আদিবাসী ভাষাচর্চা ও সংরক্ষণ’ এই প্রতিপাদ্যে রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পাদদেশে গতকাল সোমবার সকালে হলো ‘আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসের’ কেন্দ্রীয় আয়োজন। তবে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের ভাষা ও সম্পদ সুরক্ষিত নয়, এ কথা উচ্চারিত হলো অনুষ্ঠানের সভাপতি পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় সন্তু লারমার কণ্ঠে। তিনি বলেন, সমতলে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ অস্থিরতার মধ্যে আছে। আর পার্বত্য চট্টগ্রামে এক অশান্ত পরিবেশ বিরাজ করছে।

ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষের ভবিতব্য কী, তা অজানা এমন মন্তব্য করে এসব জাতিগোষ্ঠীর মানুষের আন্দোলনের পথিকৃৎ সন্তু লারমা বলেন, বাংলাদেশের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষের জীবনে কোন বাস্তবতা অপেক্ষা করছে, তা জানি না।

আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস ৯ আগস্ট। এর কদিন পরেই এবার ঈদুল আজহা। তাই এ বছর দিবসটির কেন্দ্রীয় আয়োজন হলো চার দিন আগেই। বরাবরের মতো নিজ নিজ জাতিগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে নানা বয়সী নারী-পুরুষ এসেছিলেন শহীদ মিনারের এ আয়োজনে। বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর ছাত্র, যুব ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড নিয়ে হাজির হয়েছিলেন। সেখানে নৃগোষ্ঠীর মানুষের সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবি ছিল, ছিল তাদের ভূমি-ভাষা-সম্পদের সুরক্ষা দাবি। সেই দাবি উচ্চারিত হলো সন্তু লারমার মুখেও। তিনি অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক শক্তির একতা চাইলেন।

পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সভাপতি সন্তু লারমা আরো বলেন, সাম্প্রদায়িকতা, জাতি-বিদ্বেষ ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষের জীবনকে গ্রাস করে ফেলছে।

অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বলেন, পাহাড়ে কী সমতলে, নৃগোষ্ঠীর মানুষের মধ্যে সার্বক্ষণিক ভীতির আবহ বিরাজ করছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির বাস্তবায়ন অনেকাংশে হলেও এর পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়নি। এ চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন না হলে পাহাড়ে শান্তি আসবে না।

তিনি আরো বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন নিরাপত্তার জন্য হুমকি এমনটাই শাসক চক্রকে বুঝিয়েছে আমলাতন্ত্র। এ ধারণা অমূলক, বিভ্রান্তিকর, অযৌক্তিক। তবে এখন বাংলাদেশে আর কোনো যুক্তি খাটে না।

অনুষ্ঠানের অন্যতম আলোচক সাবেক মন্ত্রী ও ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেন, ২৫ বছরের সংঘাতের পর পার্বত্য চুক্তি শেখ হাসিনার দূরদর্শিতার নিদর্শন। কিন্তু এর পূর্ণ বাস্তবায়ন না হওয়াটা লজ্জার বিষয়।

তিনি বলেন, সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান চর থেকে নদীভাঙা মানুষকে পার্বত্য চট্টগ্রামে পুনর্বাসিত করেছিলেন। এইচ এম এরশাদের সময় এ ধারাবাহিকতা ছিল। এরা এসব মানুষকে পাহাড়িদের বিরুদ্ধে সংঘাতে ঠেলে দিয়েছেন। তবে আজও পার্বত্য চট্টগ্রামে জিয়া ও এরশাদের দৃষ্টিভঙ্গিই বলবৎ আছে।

‘আদিবাসী দিবস’ জাতীয়ভাবে পালন না করার জন্য সমালোচনা করে মেনন আরো বলেন, এখন দিনটি পালনে নানা বাধা আসে। ফোন করে, সার্কুলার দিয়ে দিবস পালনে বাধা দেয়া হয়।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ ছিল এটাই যে, কোনো জাতি অন্য জাতির ওপর শোষণ করবে না, নিপীড়ন করবে না। কিন্তু সেই আদর্শ আজ বিচ্যুত।

শুরু হয় জাতীয় সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে। ছিল নৃগোষ্ঠীর তরুণদের ব্যান্ড ‘মাদল’-এর পরিবেশনা। এরপর বেলুন উড়িয়ে দিবসের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে স্বাগত বক্তব্য দেন আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং। স্বাগত বক্তব্যে তিনি বলেন, একটি রাষ্ট্রের রাজা-বাদশারা কতটা ভালো আছে তা দিয়ে কোনো দেশের অবস্থা বিবেচিত হয়। সেই দেশটিই সত্যিকারের গণতান্ত্রিক, যেখানে প্রান্তিক মানুষ ভালো থাকে, নিরাপদে থাকে।

অন্যদের মধ্যে আরো বক্তব্য দেন হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট রানা দাশগুপ্ত, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডালেম চন্দ্র বর্মণ, বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন সাদেকা হালিম প্রমুখ।

শেষ পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj