খুলনায় ওসিসহ ৫ পুলিশের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ : নাটোরে ধর্ষক চাচা ও কুষ্টিয়ায় প্রধান শিক্ষক কারাগারে

মঙ্গলবার, ৬ আগস্ট ২০১৯

কাগজ ডেস্ক : খুলনা রেলওয়ে থানায় ওসিসহ ৫ পুলিশের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ঘটনা তদন্তে গঠন করা হয়েছে ৩ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি। নাটোরে ভাতিজিকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যায় চাচা এবং কুষ্টিয়ায় ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে প্রধান শিক্ষককে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। যশোরে বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। বরগুনায় গার্মেন্টস কর্মীকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ৩ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। নিচে এ সম্পর্কে আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-

খুলনা : খুলনা রেলওয়ে থানায় এক নারীকে গণধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। রবিবার আদালতে থানার ওসি ওসমান গণি পাঠানসহ ৫ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে ওই নারী নিজেই এ অভিযোগ করেন। আদালতের নির্দেশে গতকাল সোমবার দুপুরে ধর্ষণের শিকার ওই নারীর ডাক্তারি পরীক্ষা-নিরীক্ষা খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগে সম্পন্ন হয়েছে। এদিকে ধর্ষণের ঘটনায় পাকশী রেলওয়ে জেলা পুলিশ সুপার নির্দেশে ৩ সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

ধর্ষিতার বোন জানান, তার বোনের শ্বশুরবাড়ি সিলেটে। বাবার বাড়ি ফুলবাড়ী গেট এলাকায়। তাদের মা খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি থাকায় তাকে দেখতে ছোট বোন খুলনায় আসে। বোন নিজে অসুস্থ থাকায় বৃহস্পতিবার যশোরে ডাক্তার দেখাতে যায়। শুক্রবার আসার সময় ফুলতলা এলাকায় জিআরপি পুলিশ প্রথমে তাকে মোবাইল ফোন চুরির অপরাধে থানায় ধরে নিয়ে যায়। পরে গভীর রাতে খুলনার জিআরপি পুলিশের ওসি ওসমান গণি পাঠান তাকে ধর্ষণ করে। এরপর আরো ৪ জন পুলিশ ধর্ষণ করে। পরদিন শনিবার ৫ বোতল ফেনসিডিলসহ ওকে মামলা দিয়ে আদালতে সোপর্দ করে। তিনি আরো জানান, আদালতে বিচারকের সামনে নেয়ার পর তার বোন জিআরপি থানায় তাকে গণধর্ষণের বিষয়টি আদালতের সামনে তুলে ধরে। সে আদালতে অভিযোগ করে, গত ২ আগস্ট ঘটনার রাতে খুলনা রেলওয়ে জিআরপি থানার ওসি ওসমান গণি পাঠান, এসআই গৌতম কুমার পাল, নাজমুল হাসান, কনস্টেবল মিজান, হারুন, মফিজ, আব্দুল কুদ্দুস, আলাউদ্দিন, কাজলসহ বেশ কয়েকজন উপস্থিত ছিল।

তবে ওই নারী ওসি ওসমান গণিসহ ৫ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে তাকে ধর্ষণ ও মারধরের অভিযোগ করেছেন। তখন আদালতের বিচারক জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তার ডাক্তারি পরীক্ষার নির্দেশ দেন। সোমবার দুপুরে ধর্ষিতার ডাক্তারি পরীক্ষা-নিরীক্ষা খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগে সম্পন্ন হয়। পরীক্ষা শেষে ওই নারীকে আদালতে পাঠানো হয়েছে।

খুমেক হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. অঞ্জন কুমার চক্রবর্তী জানান, ওই নারীর ডাক্তারি পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের গাইনি চিকিৎসকরা পরীক্ষা সম্পন্ন করেছেন। তার বিভিন্ন আলামত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে। তবে প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো কিছু বলা সম্ভব হচ্ছে না বলেও জানান তিনি।

এদিকে ৩ সন্তানের জননীকে গণধর্ষণের ঘটনায় সোমবার দুপুরে ৩ সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটিকে আগামী ৭ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। পাকশী রেলওয়ে জেলা পুলিশের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ নজরুল ইসলামের নির্দেশে এ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কুষ্টিয়া রেলওয়ে সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার ফিরোজ আহমেদকে তদন্ত কমিটির প্রধান করা হয়েছে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন- কুষ্টিয়া রেলওয়ে সার্কেলের ডিআইও-১ পুলিশ পরিদর্শক (নিরস্ত্র) শ ম কামাল হোসেইন ও দর্শনা রেলওয়ে ইমিগ্রেশন ক্যাম্পের পুলিশ পরিদর্শক (নিরস্ত্র) মো. বাহারুল ইসলাম।

এদিকে এই ঘটনায় ওসি ওসমান গণি বলেন, ধর্ষণের ঘটনা আদৌ সত্য নয়। শুনেছি ওই মহিলাকে ধর্ষণ করা হয়েছে বলে আদালতে অভিযোগ করেছে। কিন্তু তাকে মহিলা এসআই এবং মহিলা কনস্টেবল ৫ বোতল ফেনসিডিলসহ আটক করে। আর থানায় রাতে ৮ জন পাহারায় থাকে। সেখানে তাকে ধর্ষণের কোনো সুযোগ নেই বলেও জানান ওসি ওসমান গণি।

নাটোর : নাটোরের সিংড়ায় ভাতিজি রেশমি খাতুন নামে এক কলেজছাত্রীকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যার অভিযোগে চাচা শাহাদাৎ হোসেনকে অভিযুক্ত করে মামলা দায়ের করা হয়েছে। নিহত রেশমি খাতুনের মা সোনাভান বিবি বাদী হয়ে মামলা দায়েরের পর শাহাদাৎ হোসেনকে আদালতের মাধ্যমে জেলা কারাগারে পাঠানো হয়। শাহাদাৎ হোসেন মসলেম উদ্দিনের ছেলে।

জানা যায়, উপজেলার পাকুরিয়া গ্রামে রেশমি খাতুনের দাদা মারা যান। বাড়ির সবাই সেই জানাজায় যান। এ সময় রেশমি খাতুন বাড়িতে একাই ছিল। এই সুযোগে তার আপন চাচা শাহাদাৎ হোসেন ভাতিজি রেশমি খাতুনকে ধর্ষণ করে ঘরের মধ্যে শ্বাসরোধে হত্যা করে। পরে এলাকাবাসী জানাজা থেকে ফিরে এলে চাচা শাহাদাৎ হোসেন দৌড়ে পালাতে গেলে এলাকাবাসীর সন্দেহ হয়। পরে এলাকাবাসী তাকে আটক করে পুলিশে খবর দেন। এ ঘটনায় নিহতের মা সোনাভান বিবি বাদী হয়ে চাচা শাহাদাৎ হোসেনকে অভিযুক্ত করে মামলা দায়ের করেন। সোমবার শাহাদাৎ হোসেনকে আদালতের মাধ্যমে জেলা কারাগারে পাঠানো হয়। এদিকে ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেছেন সিংড়া থানার ওসি মনিরুল ইসলাম।

কুষ্টিয়া : স্কুলছাত্রীকে (১৫) ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে জেলার দৌলতপুর উপজেলার গড়–রা নি¤œ মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জামাল উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ভুক্তভোগীর স্বজনরা জানান, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জামাল উদ্দিন ওই ছাত্রীকে দীর্ঘদিন ধরে কুপ্রস্তাব দিয়ে আসছিল। গত বৃহস্পতিবার ওই ছাত্রী বাড়িতে একা থাকার সুযোগে প্রধান শিক্ষক জামাল উদ্দিন তাকে ধর্ষণের চেষ্টা চালায়। এ সময় ওই ছাত্রী চিৎকার করলে সে পালিয়ে যায়। ঘটনার দুদিন পর বিষয়টি ওই ছাত্রী তার স্বজনদের জানায়। রবিবার রাতে এ ব্যাপারে দৌলতপুর থানায় মামলা দায়ের করা হয়। পুলিশ প্রধান শিক্ষক জামাল উদ্দিনকে রাতেই গ্রেপ্তার করে। সোমবার আদালতের মাধ্যমে তাকে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে।

পুলিশ জানায়, প্রাথমিক তদন্তে ঘটনার সত্যতা পাওয়ায় মামলা করে অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করে সোমবার সকালে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে।

যশোর : বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী এক শিশুকে (৯) ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে শাহিনুর রহমান (৪৫) নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে যশোর কোতোয়ালি থানায় ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা হয়েছে। গতকাল সোমবার ভোরে যশোর শহরের রেলস্টেশন এলাকা থেকে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারকৃত শাহিনুর রহমান শহরতলী শেখহাটি এলাকার মৃত মসলেম বিশ্বাসের ছেলে। সে মুদি দোকানি। শিশুটি প্রায়ই তার দোকানের সামনে খেলা করত।

পুলিশ জানায়, শাহিনুর রহমান রবিবার দুপুরে ওই শিশুটিকে মিথ্যা কথা বলে তরফ নওয়াপাড়া এলাকার আমিনুরের কলাবাগানে নিয়ে যায়। সেখানে নিয়ে সে ওই শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টা করে। এ সময় শিশুটির চিৎকারে লোকজন ছুটে এলে শাহিনুর পালিয়ে যায়। সোমবার ভোরে সোর্সের মাধ্যমে পুলিশ খবর পায় শাহিনুর যশোর থেকে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। পরে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে তাকে যশোর রেলস্টেশন এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ আরো জানায়, শাহিনুরের বিরুদ্ধে শিশুটির বাবা মামলা দায়ের করেছেন। মেয়েটি এখন পুলিশের জিম্মায় আছে।

বরগুনা : গার্মেন্টস কর্মীকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ৩ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। আসামিদের মধ্যে দণ্ডপ্রাপ্ত হাসিবকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড ও ২০ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরো এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং তার সহযোগী আসামি ইদ্রিস ও হায়দারকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেয়া হয়েছে। গতকাল সোমবার দুপুরে বরগুনার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক এবং জেলা ও দায়রা জজ মো. হাফিজুর রহমান এ রায় ঘোষণা করেন। আসামিরা হলো- বরগুনা জেলার পাথরঘাটা উপজেলার মানিকখালী গ্রামের মো. এনছের আলীর ছেলে হাসিব। তার সহযোগী একই গ্রামের হায়াত আলীর ছেলে ইদ্রিস এবং সোনা মিয়ার ছেলে হায়দার। রায় ঘোষণার সময় আসামি হাসিব ও ইদ্রিস আদালতে উপস্থিত ছিল। অপর আসামি হায়দার পলাতক রয়েছে।

আদালত সূত্রে জানা যায়, দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের বাড়ির পাশে ১৭ বছরের নাবালিকা এক গার্মেন্টস কর্মী চট্টগ্রামে কাজ করত। আসামি হাসিবের সঙ্গে তার মোবাইল ফোনের মাধ্যমে পরিচয় হয়। হাসিব তাকে বিয়ে করার প্রস্তাব দেয়। একই সঙ্গে আসামি ইদ্রিস ও হায়দারও ওই গার্মেন্টস কর্মীকে নিশ্চিত করে হায়দার তাকে বিয়ে করবে। আসামিদের আশ্বাসে ওই নাবালিকা তার বাড়িতে আসে। ২০০৭ সালের ১০ জুলাই রাত ১১টার দিকে আসামি হাসিবের সঙ্গে বিয়ের আয়োজন করা হয়। ওই রাতে ইদ্রিস ও হায়দার নাবালিকাকে ঘরের বাইরে আসতে বলে। তাদের কথা মতো মেয়েটি বাইরে গেলে ইদ্রিস ও হায়দারের সহযোগিতায় হাসিব ঘরের পেছনে নিয়ে তাকে ধর্ষণ করে। অন্য দুই আসামি ইদ্রিস ও হায়দার পাহারা দেয়। মেয়েটি বাদী হয়ে ৫ দিন পর ১৫ জুলাই ট্রাইব্যুনালে মামলা করে। তদন্ত করে পুলিশ দণ্ডপ্রাপ্ত ৩ জনের বিরুদ্ধে ২০০৭ সালের ২৮ নভেম্বর আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। দীর্ঘ শুনানি শেষে আদালত সোমবার এ রায় ঘোষণা করেন।

শেষ পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj