মিন্নিতেই যেন আটকে না থাকি

সোমবার, ২২ জুলাই ২০১৯

লিপিকা তাপসী

অপরাধীর কোনো লিঙ্গ নেই। অপরাধ যে কেউই করতে পারে। অপরাধী নারী বলেই তাকে সমর্থন দিতে হবে আবার নারী বলেই তাকে শূলে চড়াতে হবে কিংবা তাকে নানান অপবাদ দিয়ে তার গুষ্টি উদ্ধার করতে হবে সেটা তো ঠিক নয়।

সম্প্রতি রিফাত হত্যাকাণ্ড দেশজুড়ে আলোচনার ঝড় উঠেছে। এই হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনায় রিফাতের স্ত্রী মিন্নি জড়িত ছিল কিনা তা প্রমাণসাপেক্ষ। মিন্নি এই খুনের ঘটনায় সম্পৃক্ত থাকলে তার যথাযথ তদন্ত হোক, বিচারও হোক। কিন্তু সব ছাপিয়ে তার বিয়ে, প্রেম, সেই মূল পরিকল্পনাকারী ধরে নিয়ে আমরা বিচার করে দিলে কিংবা এই হত্যাকাণ্ডকে শুধুমাত্র ত্রিভুজ প্রেমের গল্প হিসেবে ধরে নিলে নয়ন গ্যাং আর তার গডফাদারদেরই ফায়দা হয়।

ধরে নিলাম মিন্নি নয়ন বন্ডকে ছেড়ে রিফাতকে বিয়ে করেছে। তাহলে নয়নের রাগ মিন্নির ওপর হওয়ার কথা ছিল, মিন্নির ওপর হামলাটা হওয়ার কথা। হামলাটা রিফাতের ওপর হলো কেন? প্রেমে ব্যর্থ হলেই কেউ দা নিয়ে কোপাকুপি করবে? নারীও তো প্রেমে ব্যর্থ হয়, তার স্বামীও তো একাধিক সম্পর্কে জড়ায়। কই সে তো চাপাতি নিয়ে, দা দিয়ে কুপিয়ে রেখে আসে না। নারীরা কোপাকুপি শুরু করলে তো দা ব্যবসা নির্ঘাত একটা ভালো ব্যবসা হবে। কিংবা অনেক পুরুষেরও প্রেমে ব্যর্থ হওয়ার ঘটনা ঘটে কিন্তু প্রকাশ্যে কোপাকুপি করার সাহস কারা করে? যে জানে প্রকাশ্যে কোপাকুপিতে তার কিছুই হবে না, সে পার পেয়ে যাবে। নয়নও তাই ভেবেছিল অন্যবারের মতো বের হয়ে আসবে। কাদের রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে সে এরকম বেপরোয়া হলো, এই সাহস পেল? এরকম সন্ত্রাসী বলেই এই সাহস পেল কিনা? আর যারা তাকে সন্ত্রাসী হতে সাহায্য করল তারাও দায়ী কিনা?

একটি সংবাদপত্রে রিপোর্ট অনুযায়ী নয়ন এবং রিফাত ঘনিষ্ঠ বন্ধু, পরে তারা ভিন্ন ভিন্ন গ্রুপে যোগ দেয় সেখান থেকেই তাদের মধ্যে ফাটল ধরে, শত্রুতা শুরু। তাহলে নয়নই তার স্ত্রীকে রিফাতের সঙ্গে বিয়ে করতে বাধ্য করেছে কিনা? যাতে রিফাতদের গোপন সংবাদ নয়ন পেতে পারে। নয়ন মিন্নিকে ব্লু্যাকমেইল করে আসছিল কিনা এই ঘটনায় সাহায্য করার জন্য? রিফাত শেষ হলে কার লাভ বেশি? রিফাত না মিন্নির?

মিডিয়ার রিপোর্ট অনুযায়ী ছোট্ট শহরে নয়নের ০০৭ গ্রুপ ছিল। নয়ন আর তার দলবল শহর দাপিয়ে বেড়াত। চুরি, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, কলেজগামী ছাত্রদের মাদকাসক্ত করা, তাদের দিয়ে মাদক বিক্রি সবই ছিল তার নিত্যদিনের কাজ। শহরে একটি সুড়ঙ্গ তৈরি করেছিল কলেজে যাওয়ার জন্য। এই যে শহর দাপিয়ে বেড়াত কারা কারা এদের পেছনে ছিল? এদের দুধ ফি মাখন খাইয়ে পেলে পুষে হৃষ্টপুষ্ট করেছে কারা? রাজনৈতিক দল আর পুলিশের সহায়তা ছাড়া এরকম একটি দল কীভাবে শহর কাঁপিয়ে বেড়ায়?

মিন্নিই যদি মূল হত্যাকারী হয় তাহলে নয়নকে ক্রসফায়ারে দেয়া হলো কাদের বাঁচাতে? নয়ন বেঁচে থাকলে কারা কারা ভয়ে থাকত? মিন্নিকে মূল দোষী দেখাতে পারলে নয়নের গডফাদারের বিষয়ে প্রশ্ন আসবে না। তাতে কাদের লাভ বেশি? কারা মিন্নি যাতে আইনজীবী না পায় তার জন্য চেষ্টা করছে, কেন করছে, কাদের ভয়ে মিন্নির আইনজীবী হতে কেউ রাজি হয়নি? মিন্নির ভালো আইনজীবী পেলে কাদের থলের বিড়াল বেরিয়ে আসতে পারে? তাদের লাভ কি শুধু তারা অপরাধীর শাস্তি চায়? তাহলে অন্য যারা ধরা পড়েনি তাদের নিয়ে কথা বলছে না কেন? অন্য আসামিদের যেন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয় সেটা নিয়ে কথা বলছে না?

রিফাতের আগেও নয়ন বন্ডের দল এরকম কয়েকজনকে কুপিয়েছে। তারা ভাগ্যগুণে বেঁচে গেছে। নয়ন ও তার দলকে পুলিশ ধরলেও ছেড়ে দিয়েছে। তারা বাইরে এসে আরো ক্ষমতাবান হয়েছে। এদের প্রথম দফায় শাস্তি দিলে এই খুনের ঘটনা হয়তো এড়ানো যেত।

মিন্নিকে নিয়ে মাতামাতি করলে আমাদের পিতৃতান্ত্রিক মনের সুখ মিটবে বটে কিন্তু এই ঘটনার মূল হোতা নয়নকে যারা তৈরি করেছে, নয়নদের পেলেছে, বাঁচিয়ে রেখেছে, তাদের কুকীর্তি নিয়ে কেউ আর কথা বলবে না? তাদের এই কুকীর্তি চাপা পড়ে থাকলে ক্ষতিটা আপনার আমারই। আমরা চুপ থাকলে আরেক নয়ন চলে আসবে আগের নয়নের জায়গায়, এরা মুক্ত আলো বাতাসে আবার বিষবৃক্ষ হবে আর আমাদের কলেজগামী ছেলেমেয়ে মাদক নেবে, টাকার জন্য মারধর করবে, চুরি করবে, কোন মেয়ের ওড়না ধরে টান দেবে, আর কোনো দিন হয়তো রিফাত বা নয়ন বন্ডদের মতো অবস্থা হবে। তাই যারা নয়ন, রিফাতকে তৈরি করেছে তাদের বিচারও চাইতে হবে। তাদের রাজনীতি শেষ হোক এই দাবিও করতে হবে।

অন্যপক্ষ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj