একজন প্রিয়া সাহা এবং ‘ফান্ডামেন্টালিজমে’র লেভেলিং

সোমবার, ২২ জুলাই ২০১৯

একটু যদি পেছনে ফিরি, তাকাই ২০১৬ সালের ৩০ অক্টোবর নাসিরনগরে। ফেসবুকে ইসলাম ধর্ম অবমাননা করার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঘটেছিল তুলকালাম কাণ্ড। কিছু মন্দির ও ঘরবাড়িতে হামলা চালানো হয়েছিল। কে করেছিল এগুলো, কারা করেছিল এসব, সে ইতিহাস সবার জানা। নাসিরনগর উপজেলায় দীর্ঘকাল থেকে চলে আসা সব ধর্মের মানুষের শান্তি কিংবা সম্প্রীতির যে সহাবস্থান ছিল, তা নিমিষেই উধাও হয়ে গিয়েছিল। একটা সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা হয়েছিল তখন। মাত্র কয়েকটা দিন, অথচ দেশে-বিদেশে পরিচয় করিয়ে দেয়া হলো, বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ধ্বংস হয়ে গেছে। কিন্তু সেই ধ্বংসযজ্ঞ স্থায়ী হতে পারেনি। এই ধ্বংসযজ্ঞের মধ্য দিয়েই বেরিয়ে এসেছিল স্থানীয় রাজনীতির কলুষিত রূপ, সেখানকার উপজেলা চেয়ারম্যান-এমপির কার্যকলাপ ছিল প্রশ্নবিদ্ধ, সন্ত্রাস দমনে ব্যর্থতায় ওসি ইউএনওকে সরিয়ে নেয়া হয়েছিল। মুসলমান ধর্মের অসংখ্য মানুষ তখন সংখ্যালঘু মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিল।

নাসিরনগরে ছিল না কোনো সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। এটা ছিল মূলত ক্ষমতায় থাকা মানুষগুলোর প্রভাব-প্রতিপত্তি-স্বার্থ-অহমিকা প্রতিষ্ঠার রক্তাক্ত এক অধ্যায়। এভাবে বাংলাদেশের যে কোনো সময় যা-ই সংঘটিত হয়েছে, অন্তত এই সরকারের আমলে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ধ্বংস করার কোনো পাঁয়তারাই সার্থকতা পায়নি। বরং অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে বলা যায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অটুট রাখতে পৃথিবীর যে কোনো দেশের চেয়ে বাংলাদেশ পিছিয়ে নেই, বরং এগিয়ে আছে রাষ্ট্রীয়ভাবে। বাংলাদেশে জাতীয় দিবসগুলোতে যেভাবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অনুদান দেয়া হয়, সেভাবেই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিভিন্ন অনুষ্ঠান ঘিরে সরকারি সহায়তা আছে এখন ব্যাপক। এমনকি বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পূজা-পার্বণকে জাতীয় অনুষ্ঠানের মতোই মনে হয়। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকে কঠোর। যার যার ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করেন সবাই নির্ভার হয়ে। রাষ্ট্রীয় এই সুযোগ-সুবিধা থাকায় বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় এমনকি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানেরও আত্মপ্রকাশ হয়েছে। যেখানে তারা আর্থিক সুযোগ-সুবিধা পর্যন্ত পাচ্ছে রাষ্ট্রের কাছ থেকেই। আমি আমার এলাকার একটা প্রতিষ্ঠান দেখেছি। ‘ক্ষুদে নবদ্বীপ’ খ্যাত সিলেটের পঞ্চখণ্ড (এই নামটা এখন ইতিহাস) এক সময় বাংলা ভাষার পণ্ডিতদের একটা সমৃদ্ধ জনপদ ছিল, জ্ঞানচর্চার জন্য তাদের ছিল নিজস্ব জগত। ছিল তাদের বইয়ের ভাণ্ডার। ছিল লাইব্রেরি ভবন। মুক্তিযুদ্ধের সময় সেই লাইব্রেরির শেষ সম্পদ বইগুলো লুট হয়ে যায়। পাকিস্তানি আর তাদের দোসরদের হাতে এগুলো ধ্বংস হয়ে যায় একেবারে। ক্রমে লাইব্রেরি ভবনটি ক্ষয় হতে থাকে, পার্শ্ববর্তী জায়গা দখল হতে থাকে রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের হাতে। এরকম অস্থির সময়ে বর্তমান সরকারেরই সহায়তায় কিছু জায়গাকে তুলে দেয়া হয়েছে হিন্দু ধর্মের একটা গ্রুপ ইসকনের হাতে। রাষ্ট্রীয় অনুদানে সেখানে এখন বিরাট ভবন। লাইব্রেরি নামক শূন্য ঘরটি এখন বন লতা-পাতায় আবৃত। উপরে ছাদহীন শুধু সেই স্মৃতিমাখা দেয়ালটাকে টিকিয়ে রাখা হয়েছে, ক্ষয়িষ্ণু স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে, হয়তো নতুন কোনো অর্থনৈতিক প্রাপ্তির আশায়। শিক্ষায়-বৈভবে প্রভাবশালী মানুষ চারদিকে, কিন্তু ধর্মীয় সম্প্রীতিতে কোনোই ব্যত্যয় ঘটছে না। কারণ রাষ্ট্রই এখানে নিরাপত্তা দিয়েছে ভিন্ন ধর্মের মানুষদের সহাবস্থানে।

সে হিসেবে বাংলাদেশকে সাম্প্রদায়িকতার অপবাদ দেয়া একটা নিখাদ মিথ্যে বলা ছাড়া আর কিছুই না। বিশেষত এটা যদি কেউ বহির্বিশ্বে করে থাকে, মনে হওয়াটা স্বাভাবিক কোনো ষড়যন্ত্রের অংশই হতে পারে এটা। এরকম অপপ্রচার কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। আর সে জন্যই বাংলাদেশ জেগে উঠেছে একজন প্রিয়া সাহার মাত্র কয়েক সেকেন্ডের আলোচনায়। প্রিয়া সাহা যখন নালিশ করছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে, নালিশটাকে একটা হাস্যকর ব্যাপারই মনে হয়েছে। কারণ এরকম নালিশের জায়গা এটা তো নয়। কিন্তু এরপর যখন ট্রাম্প জিজ্ঞেস করেছেন, কে জ্বালিয়েছে তোমার বাড়িঘর। উত্তরটা হয়তো পরিকল্পিতই ছিল, কিন্তু তারপরও মনে হয়েছে নারী নেত্রী এর জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। তিনি চাইছিলেন সরকারের বিরুদ্ধে বলবেন, কিন্তু তার জিহ্বা আটকে যায়। বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের কোলঘেঁষে বেড়ে ওঠা স্বামী-সন্তান-স্বজন কিংবা তার বিশাল বিত্তবৈভব তো এ সরকারের অবারিত সুযোগের ফসল। বাংলাদেশে ‘কোটা’ ব্যবহার করে উচ্চাসনে পৌঁছা মানুষের মাঝে তিনি একজন, তার পরিবারও এর মাঝে একটি। আর সে জন্যই একটা ডাহা মিথ্যা কথা তিনি উচ্চারণ করতে পারছিলেন না। সেই মিথ্যেটি উচ্চারণ না করতে পেরে আরেকটা মিথ্যের আশ্রয় নেন। মুখস্ত একটা কথা বলে ফেললেন, ‘মৌলবাদীরা’- কোন সেই মৌলবাদ? ‘মুসলিম না হিন্দু’ সে প্রশ্নটা আমাদের থেকেই যায়। বাংলাদেশ সরকার যেখানে মুসলিম উগ্রবাদ শক্ত হাতে দমন করে এমনকি বিশ্বেও প্রশংসিত হচ্ছে, সেখানে হয়তো ‘মুসলিম মৌলবাদ’ শব্দ দুটো উচ্চারণ করতেই পারছিলেন না তিনি। কারণ সেখানেও সরকারের বিরুদ্ধেই চলে যাবে তার অবস্থান। অসংলগ্ন এবং কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে তিনি ট্রাম্পকে অনুরোধ করে বসলেন, যেন প্রার্থনা করলেন ‘আমাদের বাঁচান, আমরা আমাদের দেশে থাকতে চাই’। নিজের দেশে বাঁচতে হলে প্রচলিত আইনের মধ্যেই বাঁচতে হয়। দেশীয় সমাজ-সভ্যতার প্রতিক‚লতা ডিঙাতে হয় দেশটির প্রচলিত আইনের মধ্য দিয়েই।

প্রিয়া সাহা তা না করে ‘ফান্ডামেন্টালিস্ট’ শব্দ দিয়ে আমাদের দেশটাকে ব্রেকেটবন্দি করে দিতে চাইলেন। সারাদেশটাকেই করে দিতে চাইলেন ‘ফান্ডামেন্টালিস্ট’দের লেভেল। সত্যি কথা বলতে কি, এ জায়গাটাতে তিনি সার্থকও। কারণ পৃথিবীর মিলিয়ন মিলিয়ন মানুষ এই ফুটেজটি দেখছে। বাংলাদেশের মানুষ ছাড়া বিশ্বের অন্যান্য মানুষ প্রিয়া সাহার কথাগুলো গুরুত্ব দিয়েই দেখবে। বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষ এর বিপরীতে অবস্থান নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম উষ্ণ করে তুললেও যা করার প্রিয়া কিন্তু তা করে ফেলেছেন। বহির্বিশ্বে একটা নেগেটিভ বার্তা পৌঁছাতে পেরেছেন। আমেরিকান প্রশাসন জানে, বাংলাদেশ সেই জঙ্গিত্বের ছায়ায় নেই, এমনকি আমেরিকার রাষ্ট্রদূতও সেটা গণমাধ্যমে পরিষ্কার করেছেন। কিন্তু বিস্ময়করভাবে সত্যি হলো, বাংলাদেশের কিছু মানুষ যেন তার এই ‘সাহসী উচ্চারণ’ (!) এর সঙ্গে একমত। সে কারণে যে জায়গা কিংবা সংগঠন থেকে দাঁড়িয়ে তিনি ট্রাম্প পর্যন্ত পৌঁছাতে পেরেছেন, সে জায়গা থেকে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া আসেনি। এমনকি এই ব্রিটেনেও দেখছি কেউ কেউ মৌন সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন তার এ উক্তিতে। অন্যদিকে একটা গোষ্ঠী সুযোগ খুঁজছে, এ নিয়ে তারা নতুন প্লট তৈরিতে সচেষ্ট।

বাংলাদেশ নয়, পৃথিবীর সব দেশেই সংখ্যালঘুরা কোনো না কোনোভাবে নিজেদের নিয়ে কিছুটা হলেও অন্যভাবে থাকে, বিব্রত থাকে, কেউ কেউ হীনমন্যতায় ভোগে। এমনকি ট্রাম্পের দেশেও মুসলিমরা নিগ্রহের শিকার বলে অনেকেই মনে করেন। কিন্তু মুসলিমরা নয়, আমেরিকায় সব ধরনের সংখ্যালঘুরাই বিভিন্ন সময় তাদের অধিকার নিয়ে সোচ্চার হন। ব্রিটেনেও এরকম কথাবার্তা উচ্চারিত হয়। কিন্তু অধিকারের জন্য সবাই সোচ্চার হতে পারাটাই অধিকার। এই অধিকারটা অন্তত বাংলাদেশেও আছে। একটা ঘটনা দিয়ে উল্লেখ করতে চাই। গত ক’দিন আগে সিলেটের একটা উপজেলায় রথযাত্রা নিয়ে একটা সাম্প্রদায়িক বাতাস প্রবাহিত হয় হঠাৎ। রথযাত্রা আয়োজক কর্তৃপক্ষ হঠাৎ করে সাংবাদিকদের দিয়ে ঘোষণা দিল, তারা উদ্ভূত সাম্প্রদায়িকতার সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত ধর্মীয় দিক থেকে নিরাপদ বোধ করছেন না। অথচ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে এই এলাকাটির সুখ্যাতি আছে। স্বাভাবিকভাবে এলাকার লোকজনের দ্বারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় উঠল। তারপর জানা গেল, একজন দলিত মানুষের সঙ্গে কর্তৃপক্ষের ধর্মীয় স্থাপনার জায়গা নিয়ে কিছুটা বিরোধ দেখা দিলে ভিন্ন ধর্মের এক যুবক তাকে সহায়তা দেয়ায় শেষ পর্যন্ত তা সাম্প্রদায়িকতায় গিয়ে পৌঁছায়। ভাগ্যিস, প্রশাসন তখন সরব হয়। প্রকৃত ঘটনা উন্মোচিত হওয়ায় অন্তত ধর্মীয় উত্তেজনায় আর গড়ায়নি গোটা ব্যাপার।

সাম্প্রদায়িকতা একটা ছোঁয়াছে রোগের মতো। এই রোগটা ছড়িয়ে দিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা নেয়া যায়, নেয়া যায় বৈষয়িক সমৃদ্ধিও। সে জন্যই রাজনীতিতে তা ব্যবহৃত হয়। সাম্প্রদায়িকতার ধোঁয়া দিয়ে উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক দলগুলো কিংবা প্রভাবশালী মানুষগুলো এটা করে থাকে। এই ধোঁয়া সবদিক থেকেই ওঠে, কখনো ‘মুসলিম’ শব্দ কখনো ‘সংখ্যালঘু’ শব্দ ব্যবহার করে।

ফারুক যোশী : কলাম লেখক।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj