ভূমি অধিগ্রহণে ধীরগতি : দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ নির্ধারিত সময়ে হচ্ছে না

রবিবার, ২১ জুলাই ২০১৯

কাগজ প্রতিবেদক : প্রধানমন্ত্রীর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের ৯ বছর অতিক্রান্ত হলেও ভূমি অধিগ্রহণে অসম্ভব ধীরগতির কারণে প্রকল্পের মূল কাজ শুরু করতে পারেনি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানগুলো। যার ফলে নির্ধারিত সময়ে শেষ হচ্ছে না দোহাজারী-রামু-কক্সবাজার ও রামু-ঘুনদুম পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণকাজ। এ প্রকল্পের জন্য প্রায় দেড় হাজার একর ভূমি অধিগ্রহণের কথা থাকলেও গতকাল পর্যন্ত ৩০-৪০ শতাংশ ভূমি অধিগ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। যার ফলে সবস্থানে কাজই শুরু করতে পারেনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে প্রকল্পটি নির্ধারিত ২০২০ সালের জুনে শেষ হচ্ছে না। সংশ্লিষ্টরা এসব তথ্য জানিয়েছে।

আবার অতি বিলম্বের কারণে আদৌ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব কিনা তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রকল্প পরিচালক থেকে শুরু করে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট বহু রেল কর্মচারীর বেতন-ভাতা বাবদ খরচ হচ্ছে গাদা গাদা টাকা। প্রধানমন্ত্রীর ফাস্ট ট্র্যাক প্রকল্পের এ রেলপথ প্রকল্পটি নিয়ে রেলওয়েও বিব্রত। তবে দ্রুত জমি অধিগ্রহণ করে প্রকল্পটি নির্ধারিত সময়ে অর্থাৎ ২০২০ সালের মধ্যে শেষ হবে জানিয়েছেন রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন।

সূত্র জানায়, চলতি অর্থবছরে রেলে বরাদ্দকৃত ৩৬৬৪ হাজার কোটির একটি বড় অংশ দোহাজারী-রামু-কক্সবাজার ও রামু-ঘুনদুম প্রকল্প বাস্তবায়নে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। দোহাজারী হতে রামু হয়ে কক্সবাজার এবং রামু হতে মিয়ানমার সীমান্ত সন্নিকট গুণদুম পর্যন্ত রেলওয়ে লাইন নির্মাণ প্রকল্পের ডিপিপি গত ২০১০ সালের ৬ জুলাই একনেকে অনুমোদন পায়। ২০১১ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কক্সবাজারবাসীর স্বপ্নের রেলপথের এই মেগা প্রকল্পের উদ্বোধন করেন। গত বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর দেশি-বিদেশি ৩টি কোম্পানির সঙ্গে

রেলপথ নির্মাণের চুক্তি স্বাক্ষর করে রেলওয়ে। প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ১৩০২৯ কোটি ৬৭ লাখ টাকা ধরা হলেও তা বাড়িয়ে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। আগামী বছরের ৩০ জুনের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করার কথা। এটি প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকারভিত্তিক প্রকল্পের অন্যতম।

গত ২০১৭ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর রেল ভবনে বাংলাদেশ রেলওয়ের সঙ্গে চায়না সিআরইসি ও সিসিইসিসির এ সংক্রান্ত চুক্তি সই হয়। রেলপথ নির্মাণের কাজটি দুটি লটে সম্পাদিত হওয়ার কথা। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে মোট ১৮ হাজার ৩৪ কোটি টাকায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হচ্ছে। চুক্তির মেয়াদ ৩ বছর। জমি দেবে সরকার।

প্রকল্পটির ভূমি অধিগ্রহণ ও নির্ধারিত সময়ে শেষ হওয়ার বিষয়ে রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন বলেন, প্রকল্পটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটি প্রধানমন্ত্রীর ফাস্ট ট্র্যাক প্রকল্পের একটি। তবে এখনো কিছু স্থানে ভূমি অধিগ্রহণে সমস্যা রয়েছে। আসলে মালিকানা সংক্রান্ত কিছু জটিলতার কারণে এখনো কিছু স্থানে জমি আমাদের হস্তগত হয়নি। সে কারণে সব স্থানে আমরা পুরোদমে কাজ শুরু করতে পারিনি।

তিনি বলেন, আমরা স্থানীয় মূল্যের চেয়ে জমির দাম বেশি দিচ্ছি। তবে মালিকানা নিয়ে মামলা মোকদ্দমা, কোথাও বাড়িঘর, দোকানপাটের কারণে অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া বিলম্বিত হচ্ছে। আমি নিজে ৯ ঘণ্টা ধরে পুরো প্রকল্পটি ভিজিট করেছি। কাজ মনিটরিং করা হচ্ছে। আশা করি, খুব দ্রুত আমরা ভূমি অধিগ্রহণ করতে পারব। তবে এখনো সময় রয়েছে- ২০২০ সাল পর্যন্ত। কাজ চলছে, সময়ে যাতে শেষ হয় সে ব্যাপারে আমরা ঠিকাদারদের তাগাদা দিচ্ছি।

প্রকল্পটি নিয়ে দুই জেলা প্রশাসকের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠকের কথা জানিয়ে রেলের সাবেক মহাপরিচালক আমজাদ হোসেন বলেন, প্রকল্পটির কাজ এখনো রেল ঠিকমত শুরু করতে পারেনি। বারবার তাগাদা দিয়েও জেলা প্রশাসন ভূমি অধিগ্রহণ করে দিতে পারেনি। কয়েকবার দুই জেলা প্রশাসকের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। রেলওয়ে জেলা প্রশাসকদের কাছে জমির জন্য পুরো টাকা দিয়েছে।

এদিকে তিনটি কোম্পানির সঙ্গে গত বছর চুক্তি সই হলেও ভূমি অধিগ্রহণ না হওয়ায় তারা কাজ করতে পারছে না। তিনি বলেন, রেলের অনেক প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে, কিন্তু এ প্রকল্পের মতো সমস্যা কোনটিতেই ছিল না।

এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক মফিজুর রহমান বলেন, বহুবার অনুরোধের পরও ভূমি অধিগ্রহণে দেরি করছেন সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসন। আমরা জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে বহুবার মিটিং করে এ বিষয়ে তাদের তৎপর হওয়ার কথা বলেছি। কিন্তু তাদের লোকবল কম, তা ছাড়া ভূমি দিতে অনেক মালিকও রাজি নন। দরদামেও অনেকে গড়রাজি, শরিকরা পয়সাও পাননি বলে জমি দিতে রাজি হচ্ছেন না। এসব কারণে ভূমি অধিগ্রহণ বেশ বিলম্বিত হচ্ছে।

এ বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তমার একজন সাইট ইঞ্জিনিয়ার জানান, এখনো এ প্রকল্পে জমি অধিগ্রহণ শেষ হয়নি। বিষয়টি খুব ধীর গতিতে চলছে। আমরা যেসব এলাকায় জমি বুঝে পেয়েছি সেখানে মাটি ভরাটসহ প্রকল্পের কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। যা অবস্থা, তাতে কবে শেষ করা সম্ভব হবে তা বলা মুশকিল। যেটুকু জমি পাওয়া গেছে সেখানে বাস্তবায়নের কাজ চলছে, মেশিনারিজ পুরো কাজে লাগান যাচ্ছে না। তবে কাজ চলছে। পুরোদমে কাজ শুরু হলে ২-৩ বছরের মধ্যে শেষ হবে বলে জানান তিনি।

উল্লেখ্য, এ প্রকল্পটি ২টি লটে ভাগ করে সম্পাদন করা হচ্ছে। ১ম লটে দোহাজারী থেকে চকরিয়া পর্যন্ত- যেটির কাজ পেয়েছে যৌথভাবে চায়নার সিআরইসি ও বাংলাদেশের তমা কনসট্রাকশন কোম্পানি। ১ম লটের চুক্তিমূল্য ২ হাজার ৬৮৭ কোটি ৯৯ লাখ ৩৪ হাজার টাকা। ২য় লট চকরিয়া থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত অবস্থিত। এ অংশের কাজ পেয়েছে যৌথভাবে চায়নার সিসিইসিসি ও বাংলাদেশের ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাচার লি.। ২য় লটের চুক্তি মূল্য ৩৫০২ কোটি ৫ লাখ ২ হাজার টাকা।

এই প্রকল্পের মাধ্যমে ১০২ কি.মি. নতুন ডুয়েল গেজ রেললাইন নির্মাণ করা হবে। এতে ১৮৪টি ছোট বড় সেতু, ৯টি স্টেশন বিল্ডিং, প্লাটফর্ম ও সেড নির্মাণ করা হবে। এ ছাড়াও সমুদ্রের ঝিনুকের আদলে কক্সবাজারে একটি আইকনিক স্টেশন বিল্ডিং বানানো হবে।

শেষ পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj