ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের বাড়-বাড়ন্ত

রবিবার, ২১ জুলাই ২০১৯

সময়ের ব্যবধানে বিভিন্ন ধর্মমতের আগমনে এক ধর্মের অনুসারী অপর ধর্মানুসারীর প্রতি সহিষ্ণুতার নজির ইতিহাসে নেই বললেই চলে। নিজ ধর্ম অপর ধর্মের মানুষের ওপর জোরপূর্বক চাপিয়ে দেয়ার অগণিত ঘটনাও ইতিহাসভুক্ত। সংখ্যাগরিষ্ঠের শক্তি-সামর্থ্যরে ওপর ভর করেই এসব অনাচার ধর্মমতের আগমনের পর থেকেই চলে আসছে, আজ অবধি। মধ্যপ্রাচ্যেই সর্বাধিক এবং ভারতবর্ষে কটি ধর্মমতের আবির্ভাব ঘটেছে। আফ্রিকা, ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া কোনো মহাদেশেই ধর্মমতের আবির্ভাব ঘটেনি। মধ্যপ্রাচ্যের এবং ভারতবর্ষের ধর্মমতগুলোই তারা গ্রহণ করেছে। একই মধ্যপ্রাচ্যে সর্বাধিক ধর্মমতের আবির্ভাবের কারণে এক ধর্মমত অপর ধর্মমতের ওপর প্রভাব বিস্তারে অগণিত রক্তক্ষয়ী ঘটনা ক্রমাগত ঘটেছে এবং ধর্ম নিয়ে যুদ্ধ, দাঙ্গা-হাঙ্গামায়, নৃশংসতায় প্রাণ দিতে হয়েছে অগণিত মানুষকে। এসব যুদ্ধকে ধর্মযুদ্ধ (ক্রসেড) নামকরণে ধর্মরক্ষার তাগিদে অকাতরে নৃশংস ঘটনায় অংশ নিয়ে স্বধর্মের প্রসারে জীবনকে তুচ্ছজ্ঞান করে ঝাঁপিয়ে পড়েছে এক ধর্মানুসারী অপর ধর্মের অনুসারীদের ওপর। অথচ প্রত্যেক ধর্মমতই অপর ধর্মের প্রতি সহিষ্ণুতা প্রদর্শনের কঠোর নির্দেশ দিয়েছে। কিন্তু ধর্মান্ধ-সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী ধর্মীয় আদেশ-নির্দেশ উপেক্ষা করে সংখ্যালঘু ধর্মাবলম্বীদের ওপর বর্বরোচিত আচরণ অব্যাহত রেখে এসেছে। বিশ্বজুড়ে তাদের নির্মমতার শিকার হতে হয়েছে এবং হচ্ছে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের। অনায়াসে যেটিকে ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ বললে অত্যুক্তি হবে না। এই ফ্যাসিবাদের চারণক্ষেত্র এখন বিশ্বময়।

বৌদ্ধ ধর্মে অহিংস ও জীব হত্যা মহাপাপের কথা সর্বাধিক গুরুত্বের সঙ্গে বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। আমরা বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ মিয়ানমার এবং শ্রীলঙ্কার দিকে তাকালে দেখতে পাব অন্য চিত্র। মিয়ানমারে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের ওপর বর্বরোচিত গণহত্যা চালিয়ে তাদের দেশছাড়া করা হয়েছে। মুসলিম ধর্মাবলম্বী রোহিঙ্গাদের ওপর সে দেশের সেনাবাহিনী, শান্তিরক্ষী বাহিনী, বৌদ্ধ-ভিক্ষু থেকে সর্বস্তরের বৌদ্ধরা শামিল হয়েছে ভূমি থেকে উচ্ছেদে এবং নির্মম হত্যাযজ্ঞে। শান্তিতে নোবেল জয়ী অং সান সু কিও মিয়ানমারের শাসকগোষ্ঠী এবং নিজ বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি আনুগত্যে এই নৃশংসতার বিরুদ্ধে টুঁ শব্দ না করে পক্ষান্তরে ওই রোহিঙ্গা গণহত্যা এবং রোহিঙ্গাদের বিতাড়নকেই সমর্থন জুগিয়ে এসেছে। মিয়ানমারের বাণিজ্যিক বাজার একচেটিয়া দখলকারী চীন-ভারত মানবিকতা পরিহার করে জাতীয় স্বার্থ রক্ষার তাগিদকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে আসছে। এক সময়ে সারা বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন মিয়ানমার ওই চীন-ভারতের বলয়ে থাকলেও এখন মিয়ানমারের পাশে দাঁড়িয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল। গত কয়েক বছরে মিয়ানমারকে আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত করার ক্ষেত্রে ওই দুই দেশ সামরিক সহায়তা দিয়ে এসেছে। এমনকি মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে সামরিক প্রশিক্ষণও দিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের সামরিক বিশেষজ্ঞের দল। সামরিক শক্তিতে মিয়ানমার এতটাই এগিয়ে গেছে যে, রোহিঙ্গাদের নির্ভাবনায় বাংলাদেশে ঠেলে দেয়ার ধৃষ্টতা দেখাতে বিলম্ব করেনি। বাংলাদেশের সামরিক শক্তির তুলনায় বহুগুণ শক্তিশালী মিয়ানমার বাংলাদেশকে সে কারণেই তুচ্ছজ্ঞান করছে। বাংলাদেশকে তাদের তুলনায় দুর্বল রাষ্ট্র ভেবে রোহিঙ্গা প্রশ্নে অটল অবস্থান নিয়েছে। কেননা নিজেদের সামরিক শক্তি বৃদ্ধির পাশাপাশি তাদের পাশে রয়েছে শক্তিধর চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের মতো রাষ্ট্রগুলো। বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ মিয়ানমারে মুসলিম নিধন-বিতাড়ন সম্পন্ন হলেও অপর সংখ্যালঘু শান প্রদেশের খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের ওপর আগাগোড়া চাপ থাকলেও খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীর মিত্র রাষ্ট্রগুলোর কারণে খ্রিস্টানদের দেশছাড়া-গণহত্যার শিকারে পরিণত হতে হয়নি। তবে মিয়ানমারের খ্রিস্টানরাও মূলধারা থেকে বিচ্যুত। অনেক ক্ষেত্রে নাগরিক অধিকার থেকেও। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ছাড়া অপরাপর ধর্মমতের ওপর রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ও ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ নৃশংসতার নজির রেখে চলেছে। পরমতসহিষ্ণুতার কোনো বালাই সেখানে খুঁজে পাওয়া যাবে না। বৌদ্ধ ফ্যাসিবাদ সেখানে চরমভাবে ক্রিয়াশীল।

শ্রীলঙ্কাও বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠের দেশ। সেখানেও অপরাপর ধর্মমতের মানুষরা নিরাপদে নেই। তুলনামূলক বিচারে খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীরা দ্বিতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ায় তারা অনেকটাই পূর্ণ নিরাপত্তায় নাগরিক অধিকার পেয়ে এসেছে। তামিল ভাষী হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ব্রিটিশরা চা ও রাবার বাগানের দক্ষ শ্রমিক হিসেবে ভারতের তামিলনাড়– রাজ্য থেকে নিয়ে এসেছিল। ব্রিটিশ শাসনাধীন শ্রীলঙ্কার জনগণ সেটি কখনো ভালো চোখে দেখেনি। ব্রিটিশদের বিদায়ের পর স্বাধীন শ্রীলঙ্কায় তামিলদের মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন করে নাগরিক অধিকার বঞ্চিত করা হয়। ভোটাধিকার পর্যন্ত হরণ করা হয়। এতে বঞ্চিত তামিল জনগোষ্ঠীর মধ্যে ক্ষোভ-বিক্ষোভের দানা বাঁধে। বঞ্চনার থেকেই তামিল টাইগার নামক সশস্ত্র সংগঠন গড়ে ওঠে। ক’যুগের গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটে নির্বিচারে তামিল গণহত্যার মধ্য দিয়ে।

সাম্প্রতিক সময়ে শ্রীলঙ্কায় গির্জায় হামলার পর সংখ্যালঘু মুসলিমদের ওপর নৃশংসতা ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে। মোট জনসংখ্যার ক্ষুদ্র অংশ মুসলিম সম্প্রদায় শ্রীলঙ্কায় পূর্ণ নাগরিক অধিকার-মর্যাদা কখনো পায়নি। মুসলিমদের ব্রাত্য হিসেবেই গণ্য করা হয়। গত এপ্রিল মাসে ইস্টার সানডে উদযাপনকালে খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীদের গির্জায় বোমা হামলার পর দেশটির মুসলিম সম্প্রদায় বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের সম্মিলিত হামলার মুখে পড়েছে। চরম নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে শ্রীলঙ্কার মুসলমানদের। গত ২১ এপ্রিলে তিনটি গির্জাসহ আটটি স্থানে আত্মঘাতী হামলায় ৩৫৯ জন নিহত হয়। আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট (আইএস) এ হামলার দায় স্বীকার করে। আইএসের প্রধান পৃষ্ঠপোষক খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং সৌদি আরব। আরব বিশ্বে ইসরায়েলের ক্রমাগত ভূমি দখল, হত্যা, গণহত্যার বিরুদ্ধে আজ অবধি আইএসের ন্যূনতম ভূমিকা নেই। বিপরীতে মুসলিম সংখ্যাধিক্য দেশগুলোতে আইএসের নৃশংস জঙ্গি তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। আইএসের তিন পৃষ্ঠপোষক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং সৌদি আরব তাই নিরবচ্ছিন্ন নিরাপত্তায় রয়েছে। আইএস ব্যবহৃত হচ্ছে ওই তিন রাষ্ট্রের ইশারা-ইঙ্গিতে। গির্জার ওই বোমা হামলার পর থেকে সন্ত্রাস দমনের অজুহাতে জরুরি অবস্থা জারির পর শ্রীলঙ্কায় অগণিত মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর নির্বিচারে আটক, নির্যাতন, নিপীড়ন অব্যাহত গতিতে চলছে। শ্রীলঙ্কার পুলিশের ভাষ্য মতে, এ যাবৎ কয়েক হাজার মুসলিম নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদের নামে চলছে নির্বিচারে শারীরিক নির্যাতন। শ্রীলঙ্কা সরকারের কর্তব্য ছিল প্রকৃত দোষীদের শনাক্ত করে বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত করা। নিরপরাধ মুসলিম নাগরিকদের ওপর ঢালাও নির্যাতন না করে তাদের জানমালের রক্ষা করা। অথচ বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রীলঙ্কার সরকার ও ধর্মীয় সংখ্যাগুরুরা সংখ্যালঘু মুসলমানদের ওপর ক্রমাগত নির্যাতন-নিপীড়ন জারি রেখে দেশটির মুসলমান নাগরিকদের জীবন বিপন্ন করে তুলেছে। নিউইয়র্কভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এ বিষয়ে নানা প্রতিক্রিয়া জানালেও, শ্রীলঙ্কা সরকার ও বৌদ্ধ-খ্রিস্টানদের ক্রমাগত মুসলিমদের ওপর নৃশংসতা থেকে বিরত রাখা সম্ভব হয়নি।

ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ বিশ্বজুড়ে ক্রমাগত বিস্তারের পেছনে রাষ্ট্র ও সাম্রাজ্যবাদ উসকে দিচ্ছে নিজেদের কায়েমি স্বার্থ হাসিলে। ইউরোপ, আমেরিকায় চলছে শ্বেতাঙ্গ-খ্রিস্ট ধর্মীয়দের অনাচার সংখ্যালঘু ধর্মমতের এবং অভিবাসীদের ওপর। ভারতে চলছে হিন্দু জাতীয়তাবাদের নৃশংসতা, সংখ্যালঘু মুসলিমসহ অপরাপর ধর্মমতের বিরুদ্ধে। বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ মিয়ানমার ও শ্রীলঙ্কায় একই ঘটনা ঘটে চলছে সংখ্যালঘু ধর্মমতের অনুসারীদের ওপর। বিশ্বের একমাত্র ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র ইসরায়েলের নৃশংস তাণ্ডবে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে চলছে ইহুদিদের নির্মম হত্যাযজ্ঞ। এই ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ নির্মূল করা সম্ভব না হলে সেটা তীব্র আকার ধারণ করে সারা বিশ্বপরিস্থিতিকে কেবল অশান্ত নয়, চরম ভয়াবহতায় বিপন্ন করে তুলবে। যার মাসুল গুনতে হবে সব ধর্মমতের অনুসারীদের। কেননা সব ধর্মের মানুষই বিভিন্ন দেশে রয়েছে। কোনো দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠে আবার কোনো দেশে সংখ্যালঘু হিসেবে। ধর্মীয় অনুশাসন কোনোক্রমেই চলমান ধর্মীয় ফ্যাসিবাদকে অনুমোদন করে না। বরং পরমতসহিষ্ণুতার কথাই জোর দিয়ে বারংবার বলেছে। কিন্তু প্রবচন আছে- চোরে না শোনে ধর্মের কাহিনী। অবস্থাটা তেমনই।

মযহারুল ইসলাম বাবলা : নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj