কোথায় আমাদের গন্তব্য

রবিবার, ২১ জুলাই ২০১৯

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ভেবে শঙ্কিত হই। মা-বাবার ভালোবাসা, ভাইবোনের ¯েœহ-ভালোবাসার বন্ধন আমাদের পারিবারিক জীবন থেকে ধীরে ধীরে উধাও হয়ে যাচ্ছে। তরুণরা বন্ধনহীন উচ্ছৃঙ্খলতায় সব স্বপ্ন, বড় হওয়ার কামনা, যুদ্ধ করে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার মনোবল হারিয়ে সমাজের বোঝা হয়ে যাচ্ছে। দেশ কি এগোচ্ছে? কী করে? জনগণের ওপর বাড়তি ট্যাক্স, পড়ালেখার ওপর বাড়তি ট্যাক্স, তেল গ্যাস আর বিদ্যুতের ওপর বাড়তি ট্যাক্স বাড়িয়ে ৫ লাখ কোটি টাকার বাজেট দিয়ে দেশকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করলে কি শান্ত-শীতল গ্রাম বাংলার একচ্ছত্র সন্ত্রাস, নীরব চাঁদাবাজি, ডাকাতি, নারী নির্যাতন, শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্ষণ বন্ধ হয়ে যাবে? নাকি মধ্যম আয়ের দেশ বানাতে গিয়ে ত্বরিত গতিতে ডিজিটালাইজড দেশ গড়ে পুরো বাঙালি সমাজের পরিবারের মায়ার বাঁধন ধ্বংস করে ইউরোপের ভাঙা বিচ্ছিন্ন সামাজিক রীতি চালু করা হচ্ছে? পরিণতিতে দেশে ইমারত আর স্থাপনার উন্নয়ন হলেও সমাজের ধ্বংস অনিবার্য।

আকাশ সংস্কৃতির যথেচ্ছতা এমন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যে আমাদের সমাজের প্রতিটি ঘটনা, দুর্ঘটনা, আনন্দ উৎসব এমনকি দাম্পত্য জীবনেও এর প্রভাব পড়ছে। আমাদের নিজস্ব যা কিছু আছে তা যেন দিন দিন কমছে আর যা কিছু আমাদের নয় তাই বাড়ছে, তা সে গ্রাম বা শহর হোক, পার্থক্য তেমন কিছুই নেই। দেশকে এগিয়ে নেয়ার নামে সমাজকে যদি আদিম যুগের দিকে ঠেলে দেয়া হয় তা কি কোনোভাবেই সভ্যতার কষ্টিপাথরে গ্রহণযোগ্য হবে? হলেও কত দিনের জন্য?

দেখেশুনে মনে হয় আমরা সবকিছুতেই হুড়াহুড়ি করছি। হুট করেই ব্যাটারি রিকশা বন্ধ করে আদিম রিকশা চালু রেখেছি, হাইওয়েতে সিএনজি ট্যাক্সি বন্ধ করে দিয়েছি দুর্ঘটনার কারণে, অথচ লক্কড়-ঝক্কড় বাস, প্রাইভেটকার ও ট্রাক চালু রেখেছি। মুখে বলি শিক্ষার হার বাড়াতে হবে অথচ ভ্যাট দিয়ে পড়ার জন্য সিদ্ধান্ত দিই; হাইওয়েতে সিএনজিতে লাখ লাখ ছাত্রছাত্রী কলেজ এবং স্কুলে যেত, তাদের মারাত্মক কষ্টের মধ্যে ফেলে দিয়েছি। স্মার্টফোনের মাধ্যমে পর্নোছবি দেখে তরুণরা প্রতি মুহূর্তে যৌনসন্ত্রাসের তালিম নিচ্ছে, এখন তো কতিপয় শিক্ষকরা আরো বড় যৌনসন্ত্রাসী হয়ে গেছে; কিন্তু এর কারণ কী?

এ বিষয় নিয়ে টকশোতেও বিস্তর আলোচনা হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে দেশের চিন্তাশীল মানুষ, বিবেকবান মানুষ হতাশ। সমাজ যেন হঠাৎ নতুন অস্থিরতায় আক্রান্ত হয়ে গেছে। যে সমাজে শিক্ষকরা বিশেষ করে মাদ্রাসা শিক্ষকরা ছাত্রীদের ধর্ষণ করে সে সমাজের মূল্যবোধ বা ধর্মীয় মূল্যবোধ যে শূন্যের কোঠায় নেমে গেছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু কেন এমন হচ্ছে তা আজ সমাজ বিজ্ঞানীদের গবেষণার বিষয়। সাধারণ সমাজের একজন মানুষ হিসেবে কিছু বিষয় আমাদের সামনে চলে আসে, যা এই সময়ে ধর্ষণের মতো ঘটনাকে উৎসাহিত করছে বলে আমার মনে হয়। যেমন- ফেসবুক, ইন্টারনেটে পর্নোগ্রাফির সাবলীল প্রচার-প্রচারণা, যা থেকে নবীন-প্রবীণ সব বয়সী জৈবিক ক্ষুধায় তাড়িত হচ্ছে। অহরহ স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা আজকাল ১৮ থেকে ২০ ঘণ্টা হাতে মোবাইল চালু রাখছে। তারা পড়ালেখা কখন করছে, পরীক্ষা কী করে দিচ্ছে, ঘুমে কখন যাচ্ছে- মা-বাবা তা বুঝতেই পারছেন না। সময়মতো তাদের সন্তান খায় না এবং ঘুমায় না- এই হতাশা নিয়ে ভীষণ অস্থির একটা সময় কাটাচ্ছেন তারা।

বাংলাদেশের গ্রাম বা শহরাঞ্চলের অবস্থা দেখে মনে হয় যেন দেখার কেউ নেই। কিছু বলারও কেউ নেই। দিন দিন পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। এখনই যদি সরকার এই বিষয়ে নজর না দেন, জঙ্গিবাদ, মাদক ও দুর্নীতির মতো এ বিষয়গুলোর বিরুদ্ধেও যদি জিরো টলারেন্স ঘোষণা না করেন এবং ব্যবস্থা না নেন তাহলে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জনগণের ভাগ্যে আরো বড় দুর্যোগ ঘনিয়ে আসবে এতে সন্দেহ নেই। এই গন্তব্য থেকে ফেরার কোনো পথ আর থাকবে না।

ওসমান গনি এনু

কবি ও লেখক, চট্টগ্রাম।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj