এরশাদ নেই, জাতীয় পার্টি থাকবে কি?

শনিবার, ২০ জুলাই ২০১৯

সাবেক সেনাশাসক, ক্ষমতা জবরদখলকারী অবৈধ রাষ্ট্রপতি এইচ এম এরশাদকে মৃত ঘোষণা করা হয়েছে ১৪ জুলাই সকাল পৌনে ৮টায়। তার আগে তিনি কয়েক দিন হাসপাতালে প্রকৃতপক্ষে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছিলেন। তার বয়স হয়েছিল ৮৯ বছর। সে হিসেবে বলা যায় তিনি দীর্ঘ জীবন পেয়েছিলেন। তিনি ছিলেন সামরিক বাহিনীর সদস্য। কিন্তু শেষে হয়েছিলেন রাজনীতিবিদ। তার রাজনীতিতে জড়ানোর প্রক্রিয়া নিয়ে কথা আছে। নিন্দা আছে। তিনি বরাবরই আলোচনায় থাকার মানুষ। সেটা বেঁচে থাকতেও যেমন সত্য ছিল, তেমনি মরার পরও দেখা যাচ্ছে তিনি আলোচনা-সমালোচনার মধ্যেই আছেন। মৃত্যুতেই এরশাদ নিঃশেষ হলেন কিনা, দেখার বিষয় এখন সেটাই।

জীবিত থাকতে শোনা গিয়েছিল মৃত্যুর পর তিনি রংপুরে তার নিজ বাসভবনে সমাহিত হতে চান। কিন্তু সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে তাকে মৃত ঘোষণার পর জানা গেল, তিনি আসলে সেনানিবাসের কবরস্থানে শেষ শয্যা গ্রহণের ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর এরশাদের ক্ষমতার শক্তিকেন্দ্র হয়ে উঠেছিল বৃহত্তর রংপুর। ‘রংপুরের ছাওয়াল’কে সেখানকার মানুষ উজাড় করা ভালোবাসা দিয়েছে। ভোটে জিতিয়ে তাকে রাজনীতিতে পুনর্বাসিত হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। এরশাদের কবর তাই রংপুরে হওয়াই স্বাভাবিক ছিল। এ ছাড়া ‘সেনা’ পরিচয় ছাপিয়ে রাজনৈতিক পরিচয়ই তার মৃত্যুকালে প্রধান ছিল। তিনি ছিলেন সংসদের বিরোধী দলের নেতা এবং জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান। সেনানিবাসে তার কবর হলে সেখানে তার ভক্ত এবং অনুসারীদের অবাধ যাতায়াতের সুযোগ থাকত না। সেটা নিয়ন্ত্রিত ও সীমিত হতো। রংপুরবাসীর দাবির মুখে শেষ পর্যন্ত রংপুরের পল্লী নিবাসেই নিজের লোকজনদের কাছে ‘পল্লীবন্ধু’ বলে পরিচিত এরশাদের কবর হয়েছে। এরশাদের কবর জেয়ারতের জন্য এখন কেউ যেতে চাইলে অবাধেই যেতে পারবেন।

প্রশ্ন সামনে আসছে, এরশাদের মৃত্যুর পর তার ভক্ত, সমর্থক এবং অনুসারী আসলে কত জন, কত দিন থাকবে? এরশাদ রাজনীতিতে টিকে ছিলেন, তার দল সংসদে কিছু আসন পায়, এটা যতটা না এরশাদের নিজের গুণে তার চেয়ে বেশি এর পেছনে কাজ করেছে দেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির দুর্বলতা, সীমাবদ্ধতা। এরশাদ এবং তার আগে জিয়াউর রহমান অসাংবিধানিক উপায়ে ক্ষমতা গ্রহণ করে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য নানা অপকৌশল অবলম্বন করেছেন। চরম সুবিধাবাদী, দলছুট, সুযোগসন্ধানী রাজনীতিবিদ, সামরিক-বেসামরিক আমলাদের রাজনীতিতে ভিড়িয়েছেন। দেশের রাজনীতিকে কলুষিত করেছেন। জিয়া প্রকাশ্যেই বলেছিলেন যে, দেশের রাজনীতিকে তিনি রাজনীতিবিদদের জন্য ‘ডিফিকাল্ট’ করে দেবেন। তিনি কথা রেখেছিলেন। তার আমলেই রাজনীতি কেনাবেচার পণ্যে পরিণত হয়। জিয়ার কাছে টাকা কোনো সমস্যা ছিল না (মানি ইজ নো প্রবলেম)। টাকা ছিটিয়ে তিনি রাজনীতির ‘কাক’ সংগ্রহ করতেন।

জিয়ার আলখাল্লা গায়ে চাপিয়েই এরশাদও ক্ষমতা দখল করেন এবং একইভাবে ব্যারাকে না ফিরে রাজনীতিতে নামেন। একই ধারার, একই রাজনীতি করে জিয়ার চেয়ে এরশাদ যে বেশি সমালোচিত এবং নিন্দিত তারও কয়েকটি কারণ আছে। প্রথমত, জিয়ার গায়ে মুক্তিযুদ্ধের ছাপ্পা ছিল, এরশাদের তা ছিল না। দ্বিতীয়ত, জিয়ার বিরুদ্ধে অর্থ এবং নারী কেলেঙ্কারির অভিযোগ ছিল না, এরশাদের বিরুদ্ধে এন্তার ছিল। এরশাদ রাজনীতিকে যতটা কলুষিত করেছেন, জিয়া তার চেয়ে কম করেননি। তারপরও জিয়া এবং এরশাদকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক পাল্লায় মাপা হবে না। জিয়ার মৃত্যুর পর তার হাতে গড়া দল বিএনপি শক্তিহীন হয়নি বরং বলা যায় জিয়াপতœী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে দলটির পুনর্জীবনলাভ হয়েছে। বিএনপি বাংলাদেশের রাজনীতির যে শূন্যস্থান পূরণ করেছে সেটা হলো মোটা দাগে আওয়ামী লীগবিরোধিতা। এর সঙ্গে আছে সাম্প্রদায়িকতা ও ভারতবিরোধিতা। এরশাদের জাতীয় পার্টির পুঁজিও ওই একই। ফলে একই রাজনৈতিক পুঁজি নিয়ে দুটি দল এক সমান শক্তির অধিকারী হতে পারে না। বিএনপি শক্তিশালী হলে জাতীয় পার্টি দুর্বল হবে। আর জাতীয় পার্টি বলবান হলে বিএনপি হবে হীনবল। এরশাদ তার দলকে কৌশলে একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির প্রতিযোগী ও সহযোগী করতে পেরেছেন। যেখানে তিন জোটের রূপরেখা অনুযায়ী এরশাদ এবং তার দল থেকে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির শত হাত দূরে থাকার কথা, সেখানে দুই দলই এরশাদকে নিয়ে টানাটানি করেছে। বিএনপি যদি এরশাদকে ছয় বছর জেলে না রাখত তাহলে এরশাদ হয়তো বিএনপির পক্ষে থেকে আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় যাওয়ার পথকে কঠিন করে তুলতে পারত। কিন্তু যা হয়নি, সেটা নিয়ে আলোচনা না করে যা হয়েছে তা নিয়েই আলোচনা করা উচিত। আওয়ামী লীগের সহযোগী হয়ে পতিত স্বৈরাচার এরশাদ বাংলাদেশের রাজনীতিকে এক নতুন হিসাব-নিকাশের সম্মুখীন করেছেন। এরশাদের সমর্থন ও সহযোগিতা না পেলে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরতে পারত কিনা, সে প্রশ্ন সঙ্গত কারণেই ওঠে। এরশাদ গণতন্ত্র হত্যাকারী, ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করে তিনি বাংলাদেশকে মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির ধারা থেকে সরিয়ে দিয়েছেন, কিন্তু তিনিই আবার আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি হয়েছেন। আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় আসা এবং থাকা যারা পছন্দ করেন না, তারা তীব্রভাবে এরশাদবিরোধী, এরশাদ তো আসলে তাদের পাকা ধানে মই দিয়েছেন। আবার যারা মনে করেন, আওয়ামী লীগ রাষ্ট্র ক্ষমতায় ফিরতে না পারলে দেশের পাকিস্তানি ধারায় যাত্রা রোধ করা যেত না, তারা এরশাদের সমালোচনায় উচ্চ কণ্ঠ নন। তারা এরশাদকে গিলতে পারেন না তার অবৈধ ও অনৈতিক শাসনকালের জন্য, আবার উগড়ে দিতে পারেন না ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরবর্তী আওয়ামী-সহযোগী রাজনৈতিক ভূমিকার কারণে।

অপশাসন ও অপরাজনীতির ধারকবাহক হলেও এরশাদকে নিয়ে আলোচনা আরো কিছু কাল চলতে থাকবে। ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করে এরশাদ নিশ্চয়ই ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ করেছেন, কিন্তু তার এই কাজের ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছেন কে? কারো কারো কথা শুনে মনে হয়, এরশাদ ছাড়া সবাই বুঝি রাষ্ট্রধর্মের বিরুদ্ধে। যদি তাই হয়, তাহলে এরশাদ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার এত বছর পরও কেন সংবিধান থেকে রাষ্ট্রধর্মের বর্ম সরানো গেল না? আসলে রাষ্ট্রধর্মের জায়গা তৈরি হয়েই ছিল, এরশাদ ঝোপ বুঝে কোপ মেরেছেন। এরশাদকে গাল দেয়া যায়, তার বিরুদ্ধ যা খুশি তা বলা যায় কিন্তু তাকে অস্বীকার করা যাবে না!

এরশাদের অবর্তমানে জাতীয় পার্টির পুনর্জীবনলাভের সম্ভাবনা খুবই কম। তিনি বেঁচে থাকতেই জাতীয় পার্টি সারাদেশে সমান সংগঠিত ও জনপ্রিয় দল হিসেবে গড়ে ওঠেনি। বর্তমান সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করছে জাতীয় পার্টি, সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ছিলেন এরশাদ। এখন তার মৃত্যুর পর কী হবে জাতীয় পার্টির অবস্থা ও অবস্থান, সে প্রশ্নই এখন বড় হয়ে সামনে আসছে। জাতীয় পার্টি একটি ঐক্যবদ্ধ এবং সুসংহত দল নয়। দলের মধ্যে দলাদলি আছে। এরশাদ জীবিত থাকতেই জাতীয় পার্টি অন্তত চারবার ভেঙেছে। তার মৃত্যুর পর দলটি ঐক্যবদ্ধ থাকবে কিনা সেটাই এখন দেখার বিষয়।

১৮ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে এরশাদের ছোট ভাই গোলাম মোহাম্মদ (জি এম) কাদেরকে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ঘোষণা করা হয়েছে। এরশাদ মৃত্যুর আগেই বলে গেছেন, তার অবর্তমানে জি এম কাদের দলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করবেন। তবে জি এম কাদেরের প্রতি সিনিয়র নেতাদের সর্বসম্মত সমর্থন আছে বলে মনে হয় না। যে সংবাদ সম্মেলনে জি এম কাদেরকে নতুন চেয়ারম্যান ঘোষণা করা হয় সেখানে অনুপস্থিত ছিলেন এরশাদের স্ত্রী ও দলের জ্যেষ্ঠ কো-চেয়ারম্যান রওশন এরশাদ, সিনিয়র নেতা আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, রুহুল আমিন হাওলাদারসহ অনেকেই। এরশাদের অবর্তমানে সংসদে বিরোধী দলের নেতা, উপনেতা কে হবেন, কীভাবে হবেন তা নিয়েও সমস্যা দেখা দেবে।

এরশাদকে ছাড়া জাতীয় পার্টি রাজনীতিতে কতটুকু প্রাসঙ্গিক থাকবে সেটা শুধু জাতীয় পার্টির ওপরই নির্ভর করবে না। আওয়ামী লীগ এবং বিএনপিও জাতীয় পার্টির ভবিষ্যৎ নির্মাণে ভূমিকা রাখবে। এরশাদের বিদায়ের মধ্য দিয়ে যেমন দেশে অপরাজনীতির ধারার অবসান ঘটবে না, তেমনি আবার তিনি নেই বলে জাতীয় পার্টি এখনই দেশের রাজনীতিতে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাবে না বলে মনে করাও ঠিক হবে না। জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্যদের ভূমিকা দলটির বর্তমান পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। সংসদ সদস্যরা যে পক্ষে থাকবে সে পক্ষই আগামী সাড়ে চার বছর অন্তত রাজনীতিতে অস্তিত্ব জানান দিতে পারবে। রওশন এরশাদকে সংসদ নেতা বানিয়ে আপাতত একটি সমঝোতার পথে না হাঁটলে বড় ধরনের হোঁচট খাওয়ার আশঙ্কা আছে দলটির। অন্যদিকে এরশাদের সাবেক স্ত্রী বিদিশাও রাজনীতিতে পা রাখার কথা ভাবছে বলে শোনা যায়। জি এম কাদের গ্রুপ যদি বিদিশার জন্য জাপাতে জায়গা করে দেয় তাহলে রওশন এরশাদের গ্রুপ তা হয়তো সহজভাবে নেবে না। যাই হোক না কেন, এরশাদহীন জাতীয় পার্টিতে টানাপড়েন বাড়বে আর দলটির শক্তি ক্রমেই কমতে থাকবে।

বিভুরঞ্জন সরকার : যুগ্ম সম্পাদক, আমাদের নতুন সময়।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj