সংস্কৃতির বিকাশে মুক্তির দিশা

শনিবার, ২০ জুলাই ২০১৯

বাঙালি জাতির স্বপ্নের অঙ্কুরোদগম আর বিস্তৃতির উৎস যদি খুঁজতে চাই, বারবারই আমার দৃষ্টি আটকে যায় ১৯৭১-এর ৭ মার্চে, রেসকোর্স ময়দানে। বাঙালির স্বাধীনতা আর মুক্তির আকাক্সক্ষা অঙ্কুরিত হয়েছিল সেদিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণে। সেদিনই বঙ্গবন্ধু তাঁর স্বপ্নটি জাতির চেতনায় সেঁটে দিতে পেরেছিলেন; এর আগের সবটাই ছিল বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নজাগরণ পর্ব। বঙ্গবন্ধুর সেদিনের স্বপ্ন যখন আজ সময়ের বিবর্তনে নানাভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করার প্রয়াস দেখি, তখন তাঁর মুক্তির আকাক্সক্ষাকে কিছুটা বিচিত্র কৌণিক অবস্থান থেকে মূল্যায়ন করে নেয়ার প্রয়োজন বোধ করি এবং সে লক্ষ্যেই ‘সংস্কৃতি’ অভিধাটিকে বিবেচনায় আনতে চাই।

সংস্কৃতি বিষয়ে আমি আজ ভিন্ন আঙ্গিকে সামান্য কটি কথা নিবেদন করতে চাই। আমি বিশ্বাস করি আমার এ নিবেদন প্রত্যেকেরই পড়া আবশ্যক। পড়ার পর কেউ চাইলে আমার সঙ্গে ঐকমত্য প্রকাশ অথবা ভিন্নমত প্রকাশের উদ্যোগ নিতেই পারেন; তবে যদি আমার পাঠক আমার বক্তব্যের সঙ্গে ঐকমত্য প্রকাশ করেন, তাহলে পাঠকের কাছে আমার একটা নিবেদন আছে, আমি চাই প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান আর সামর্থ্য নিয়ে আমার প্রস্তাব বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখবেন। আর যদি আপনি একমত হয়েও ভূমিকা না রাখেন, তাহলে জানবেন আপনি নিজের সঙ্গে, পরিবার-সমাজ-দেশ এবং পৃথিবীর সঙ্গে প্রতারণা করলেন। যে প্রতারণার জন্য আমি, সমাজ বা রাষ্ট্র আপনার জন্য কোনো শাস্তির বিধান হয়তো করতে পারব না, কিন্তু আপনি নিজে নিজের বিবেকের কাছে অপরাধী হয়ে থাকবেন। আজ অথবা আগামীকাল নিজের বিবেকের দংশনে অনুতপ্ত হবেন নিজে, অনুতাপের অনলে নিজেই পোড়াবেন নিজেকে।

আমার দৃঢ় বিশ্বাস আমাদের সমাজে যারা নিজেকে সংস্কৃতিমান বলে পরিচয় দেন, তাদের অধিকাংশেরই ‘সংস্কৃতি’ অভিধাটি সম্পর্কে সম্যক ধারণা নেই। সমাজের বিপুলাংশের ধারণা গান-বাজনা-নাটক-আবৃত্তি-নৃত্যকলা-চিত্রকলা ইত্যাদিতেই ‘সংস্কৃতি’ সীমাবদ্ধ; আবার অনেকেই আছেন, যাকে সংস্কৃতি বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে প্রায় সঠিক উত্তরটিই দেবেন, কিন্তু তার মেন্টাল সেটআপটা পূর্বোক্তদের মতোই; সঙ্গত কারণেই সংস্কৃতি বিষয়টি নিয়ে তৈরি হয় সংকট। ফলে সংস্কৃতির বিশাল সমুদ্র আটকে যেতে চায় ক্ষুদ্র ডোবায়। প্রশ্ন হচ্ছে, সংস্কৃতিকে ক্ষুদ্র ডোবার সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্তি দেবে কে?

ধরা যাক একটা সংগঠন, হতে পারে সেটি স্থানীয় পর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায়, সেখানে সাংস্কৃতিক সম্পাদক বা সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নির্বাচন অথবা সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জন্য বার্ষিক বাজেট বরাদ্দ নির্ধারণ, সর্বত্র ‘থোক’ প্রথা প্রচলিত। ভাবখানা এই যেন, ‘ও তো সাজের লাঠি-ঢাকের বাঁয়া, সমাজের অনুৎপাদনশীল আঙিনা; ওখানে অতটা যোগ্য মানুষ না হলেও চলবে, বনসাইয়ের মতো স্বল্প জল বরাদ্দ হলেই চলবে।’ অনুগত-বনসাই জাতীয় একজনকে নির্বাচন করে দেয়া হলো সাংস্কৃতিক সম্পাদক অথবা সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী হিসাবে; এটা শুধু সরকার বা সরকারি দলে নয়, সরকারবিরোধী দলেও নয় বরং সব সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য এবং আমাদের এই ভুল চিন্তাই পশ্চাৎপদ করে রাখছে জাতিকে। যাকে নির্বাচন করা হলো সাংস্কৃতিক সম্পাদক অথবা সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী, তিনি নিজে সংস্কৃতি বিষয়ে কতটা প্রজ্ঞাবান খোঁজ নেয়ার প্রয়োজনই বোধ করেননি। এই বাস্তবতায় আমরা থেমে থাকলেও সময় কিন্তু থেমে থাকছে না। যারা সাংস্কৃতিক সম্পাদক অথবা সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নির্বাচিত বা মনোনীত হচ্ছেন তাদের আমি দোষ দেখছি না; দোষ তাদের যারা নির্বাচিত বা মনোনীত করছেন।

সংস্কৃতি একটি জাতির জন্য হৃদস্পন্দন; বৃক্ষের বেঁচে থাকা, বেড়ে ওঠার জন্য শিকড় যেমন প্রাণের উৎস, তেমনি একটি সমাজ-জাতির বিকশিত হওয়ার জন্য প্রধানতম শর্তটি হচ্ছে সংস্কৃতিমান হয়ে ওঠা। জাতি কতটা সভ্য, কতটা মানবিক গুণসম্পন্ন, কতটা প্রাগ্রসর তা পরিমাপ করার মানদণ্ড হচ্ছে তার সংস্কৃতি। সংস্কৃতি একটা জাতির দর্পন; যে দর্পন দেখে বিশ্ব অনুমান করে নেয় জাতির আর্থসামাজিক উন্নয়নের উচ্চতা। এসব সত্য জানার পরও কেন যে আমরা সংস্কৃতি বিষয়ে নির্লিপ্ত থাকি, তা আমার কাছে বোধগম্য নয়। দেশে খুন-ধর্ষণ-দুর্নীতি-অনাচার-অবিচার-দুঃশাসন-স্বেচ্ছাচারিতা যখন আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাচ্ছে, তখন সঙ্গত কারণেই নানা প্রশ্ন সামনে এসে যায়; তখন সমাজের নীতিনির্ধারকদের নিয়ে জনতার মনে বৈচিত্র্যপূর্ণ প্রশ্ন এসে দাঁড়ায়।

যারা নেতৃত্বের জন্য নেতা নির্বাচিত বা মনোনীত করছেন তারা নিশ্চয়ই পড়েছেন জীবনানন্দ দাশের সেই কবিতাটি, যেটি বাণীস্বত্ব ইতোমধ্যেই কালের গণ্ডি পেরিয়ে মহাকালের পথে চলেছে। আসুন আমরা ছোট্ট সে কবিতাটি পাঠ করি মনোযোগে-

অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ-পৃথিবীতে আজ,

যারা অন্ধ সবচেয়ে আজ চোখে দ্যাখে তারা;

যাদের হৃদয়ে কোনো প্রেম নেই- প্রীতি নেই- করুণার আলোড়ন নেই

পৃথিবী অচল আজ তাদের সুপরামর্শ ছাড়া

যাদের গভীর আস্থা আছে আজো মানুষের প্রতি

এখনো যাদের কাছে স্বাভাবিক ব’লে মনে হয়

মহৎ সত্য বা রীতি, কিংবা শিল্প অথবা সাধনা

শকুন ও শেয়ালের খাদ্য আজ তাদের হৃদয়।

(অদ্ভুত আঁধার এক \ জীবনানন্দ দাশ)

সত্যিই আমরা যেন জেনে গেছি অন্ধ-হৃদয়হীনের সুপরামর্শ ছাড়া আমাদের পৃথিবী অচল, আমরা যেন বুঝে গেছি সৎ-নির্লোভ-বিশ্বাসীরা আজ পৃথিবীতে অযোগ্য; সচল কেবল স্তুতি-স্তাবকতা। কিন্তু বড় সত্য এই, স্তুতি-স্তাবকতায় সাময়িক প্রসাদলাভ ঘটলেও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে নিজেদের সংস্কৃতির মান উন্নততর পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া অত্যাবশ্যক; সমস্যা হচ্ছে, কী করে সেটা সম্ভব? যখন আমাদের সংস্কৃতির স্বরূপ সন্ধান করাই হয়নি; যখন আমাদের জানাই নেই সংস্কৃতি কোন দীঘির জল, কোন সমুদ্রের ঢেউ? যখন আমরা বুঝতেই পারিনি সংস্কৃতি কোন কাননের ফুল, কোন আকাশের মেঘ; যখন আমাদের দেখাই হলো না সংস্কৃতি কোন বাথানের গাই, কোন পাহাড়ের ঝর্না, কোন শ্রাবণের রাত, কোন দিগন্তের জলপ্রপাত; তখন সংস্কৃতির মানোন্নয়ন কীভাবে সম্ভব, কে বলবেন?

সংস্কৃতি যখন কোনো ব্যক্তি-পরিবার-গোষ্ঠী-সমাজ-দেশের প্রাগ্রসরতার পরিচায়ক, তখন সংস্কৃতি বিষয়টাকে আমলে আনতে হবে বৈকি। প্রাগ্রসরতা কে না চায়? অর্থনৈতিক স্বয়ম্ভরতার পথে দেশ যখন এগিয়ে যাচ্ছে, নিম্ন আয়ের দেশ থেকে বাংলাদেশ যখন উন্নয়নশীল দেশের পরিচিতি পাচ্ছে, উন্নয়নের মহাসড়কে যখন দেশ অপ্রতিরোধ্য বিবেচিত হচ্ছে; তখন কি এ দেশের প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্বপূর্ণ আচরণ করা উচিত নয়? উন্নয়ন অগ্রযাত্রার যারা নিশানবরদার তাদের কী শিষ্ট-সহিষ্ণু আর সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ করা উচিত নয়? কিন্তু তা কি করছেন কেউ?

আজ থেকে সত্তর-আশি বছর আগে জীবনানন্দ দাশ যে কথা তার কবিতায় উচ্চারণ করেছিলেন, আজকের সমাজবাস্তবতায় আমাদের মূল্যবোধ আর মানবিক রুচির স্তর যে কতটা নিচে সে কথা কি কাউকে যুক্তি-প্রমাণ দিয়ে বোঝানোর প্রয়োজন আছে? তাহলে আজ যারা সমাজ-সংস্কৃতি-রাজনীতির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আছেন, তাদের কি সে বাস্তবতা উপলব্ধি করা উচিত নয়? যারা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নেতৃত্বে আছেন তারা সৎ হবেন, তারা দেশপ্রেমী হবেন, তারা নির্লোভ হবেন, তারা সব ধরনের সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে থাকবেন; এমনটি কি মানুষ প্রত্যাশা করতে পারে না? কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, মানুষ তাদের কাছ থেকে তেমনটি পাচ্ছে না এবং সঙ্গত কারণেই মানুষের বুকে সঞ্চিত হচ্ছে ক্ষোভ আর ঘৃণা; যে ঘৃণা আর ক্ষোভ একদিন বিস্ফোরণ ঘটাতে বাধ্য; কিছুতেই মানুষের ক্ষোভ আর ঘৃণা থেকে মুক্তি পাবে না জাতি। উন্নয়ন আর ঘৃণার সমন্বয় সহজ হবে না এবং সমন্বয়হীনতা আমাদের সব শুভ অর্জনকে ধূলিসাৎ করে দিতেই পারে। সুতরাং জাতির বৃহত্তর স্বার্থে সংস্কৃতির শিখাটিকে আলোময় করে তুলতে দ্রুততার সঙ্গে আমাদের সঠিক সিদ্ধান্তটি নেয়া আবশ্যক।

একবার একটু বিষয়টিকে বিবেচনায় নিয়ে ভাবুন, অর্থনৈতিক উন্নয়নকে টেকসই করতে, অর্থবহ করতে দেশের সামাজিক-সাংস্কৃতিক উন্নয়নকে অর্থবহ করে তোলা আবশ্যক নয়? আমার বিশ্বাস অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের জীবনে সাংস্কৃতিক মুক্তি নিশ্চিত করাটা অনিবার্য এবং সাংস্কৃতিক মুক্তির জন্য আমাদের সমাজ-রাষ্ট্রের সব স্তরে সাংস্কৃতিক অগ্রযাত্রাকে সমন্বয় করা জরুরি। সে বিবেচনায় দেশের মাঠপর্যায় থেকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়, প্রতিটি অঙ্গনে সংস্কৃতির বিকাশকে নিশ্চিত করা আবশ্যক। সংস্কৃতির বিকাশকে ‘থোক’ বরাদ্দ দিয়ে করুণার স্তরে রাখা আত্মঘাতী, এ সত্যটি উপলব্ধি করতে হবে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে; আর যতক্ষণ তা না করা হবে, ততক্ষণ জাতির ‘মুক্তি’র আকাক্সক্ষা দুঃস্বপ্ন মাত্র।

ফরিদ আহমদ দুলাল : কবি ও প্রাবন্ধিক; সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ রাইটার্স ক্লাব।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj